(১৭)
প্রতিদিন তিনি একবার না একবার এসে মিস্ত্রি মজুরদের কাজ দেখে তাদের মজুরি দিয়ে যেতেন। এইভাবে চলতে চলতে একদিন তিনি লখাইকে করলেন, “তোমাদের ঐ মাটির ঘরটা কি ভেঙে ফেলবে?”
“না না। ওটায় আমি থাকবো।”
“ওটাও পাকা করে নাও।”
“অত টাকা কোথায়!”
প্রোমোটার জেনে গেছেন, ওদের দু’ভাইয়ের এই পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ হয়ে গেছে। রামের কাছে সব বৃত্তান্ত জেনেও গেছেন তিনি। তাই লখাইকে টোপ দিয়ে তিনি বললেন, “আমাকে দিয়ে দাও। আমি একটা অ্যাপার্টমেন্ট বানিয়ে গ্রাউন্ড ফ্ল্যাটটা তোমাকে দিয়ে দেবো। তোমার কোনো খরচও হবে না। অথচ সুন্দর একটা ফ্ল্যাটও পেয়ে যাবে। ভেবে দেখো। রাজি থাকলে সেইমতো কাজও শুরু করে দেবো শিগগির।”
লখাই বলে, “ঘরটা ভেঙে দিলে তখন আমরা থাকবো কোথায়?”
— “সেভাবেই প্ল্যান করা যাবে। অসুবিধা হতে দেবো না। তোমরা রাজি থাকলেই হলো।”
লখাই বলে, “ঘরে একটু আলোচনা করে দেখি। পরে বলবো। তবে একথা এখন যেন কেউ জানতে না পারে। এমনকি দাদাও না।”
— “তা কি আর বলতে! প্রোমোটারি করে করে আমার চুল পেকে গেলো। আমাকে বলতে হবে।”
লখাইয়ের কাছে কথাটা শুনে মনে মনে খুব খুশি হল আদরিনী। বললো, “দেখলে তো স্বয়ং ভগবান এসে হাজির হল কেমন। তবে শোনো, তুমি বলবে, মাটির ঘর যেটি বাবার স্মৃতি, সেই ঘরটি আমাদের থাকবে। সেটা ভাঙা যাবে না। বাকি জায়গাটা দিতে পারবো। তাতে যদি হয়, আমার আপত্তি নেই।”
লখাই বলে, “এই পুরানো ঘর নিয়ে কী করবি।”
আদরিনী বলে, “তাও বোঝো না। তোমার খুব মাথা মোটা। আরে বাবা, ঘরটা ভাড়ায় দিলেও তো মাসে মাসে কিছু টাকা আসবে। কী, আসবে না?”
“তা আসবে”, লখাই বলে।
সেইমতো বটব্যালবাবু এলে তাঁকে লখাইদের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। অনেক টালবাহানার পর অবশেষে প্রোমোটার রাজি হয়ে যান। ঠিক হয়, দাদার গৃহপ্রবেশের পর ফ্ল্যাটের কাজ শুরু হবে। তার আগে বটব্যালবাবু লখাইয়ের প্রাপ্ত বাস্তুবাড়ির মিউটেশন, কনভার্সন এবং রেজেস্ট্রির কাজটি সেরে নেবেন।
(১৮)
মাসখানেকের মধ্যেই রামের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়। এবার একতলার কাজ শুরু হবে। রাম সেকথা অবশ্য লখাইকে আগে জানিয়েছিল।
বলেছিল, “আমরা তো নিঃসন্তান। ভাবছিস একতলা করে কী হবে। আরে, তোরাও তো এসে থাকবি যখন ইচ্ছে হবে। ভাবিস না, দাদা তোদের মাটির ঘরটা দিয়ে নিজে দালান বানিয়ে নিলো। আমরা আর কতদিন। তখন তো তোরাই ভোগ করবি সব।”
লখাই বাধা দিয়ে বলে, “অমন কথা বলছো কেন! আমি কি কিছু বলেছি তোমাকে! মানুষ একবারই ঘর বানায়। সেটা মনের মতো করে বানানোই তো ঠিক। পরে আফসোস করতে হবে না। যেমন ইচ্ছে বানাও। আমাকে যা বলবে আমি তাই করবো। ঘরটা শেষ না হওয়া অব্দি আমি আছি।”
রাম লখাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে বললো, “বাঃ! এই না হ'লে ভাই।”
তারপর কেটে গেল আরও মাস দুয়েক। শুধু দেয়াল গাঁথা আর ছাদ ঢালাই তো নয়। দেয়ালে ছাদে জল দেওয়া, পলেস্তারা করা, ডিজাইন করা, জানালা দরজার পাল্লা বানিয়ে তা লাগানো—নানারকম আনুষঙ্গিক কাজ।
সমস্ত কাজ শেষ হওয়ার পর পাঁজিতে শুভ দিন দেখে ঠিক হল, আষাঢ়ের বারো তারিখ রাম গৃহপ্রবেশ করবে।
গৃহপ্রবেশের সব যোগাড়যন্ত্র সেরে পূজারী ডেকে পুজোপাঠ সেরে রামলাল আর সৌদামিনী গৃহপ্রবেশ করলো বারোই আষাঢ়। লখাই আর আদরিনীও তাদের সঙ্গে। আপাতত কোঠাঘর রইলো তালাবন্ধ। সেই ঘর থেকে প্রায় সবকিছুই নিয়ে আসা হয়েছে নতুন দালানে।
পরের দিন থেকে কি লখাইদের আলাদা হাঁড়িতে রান্না হবে, মাটির কোঠাঘরে!
কে বলবে আলাদা রান্নার কথা। রামলাল। নাকি লখাই!
জল্পনার অবসান হল সেদিন বিকেলেই।
রাম-ই মুখ খুললো।
লখাই তখন দাদার একতলার ছাদে পায়চারি করতে করতে শহরের এদিক থেকে সেদিক দেখছিল বারবার।
দাদা উঠে এলো ছাদে। লখাইকে বললো, “কিরে। সব ঠিক আছে তো?”
— “দারুণ লাগছে দাদা! ভেতরের দিকটা খুব সুন্দর রং করা হয়েছে। বাইরের দিকটাও তাড়াতাড়ি রং করিয়ে নিও। নইলে জলের ছাটে দেয়ালটা নষ্ট হয়ে যাবে।”
— “সবই তো বুঝছি। কিন্তু টাকা তো শেষ। অ্যাতো খরচ হবে ভাবতে পারিনি।”
—“কী করবে। যা জিনিসের দাম, হাত দেওয়াই মুশকিল। তবু কষ্ট করে যখন অ্যাতোই খরচ করলে তখন একটুর জন্য ঘরটা নষ্ট করবে কেন!”
— “এখন তো ঘোরতর বর্ষা। বর্ষাটা পেরোলে তখন দেখবো যদি টাকার যোগাড় করতে পারি।”
কিছুক্ষন চুপ থাকার পর এবার রাম বললো, “শোন লখাই, তোকে একটা কথা বলি।”
— “বলো।”
— “বলছি, কোঠাঘরটাতো খালি করে দিয়েছি। তুই এবার তোর মনের মতো করে ঘরটা সাজিয়ে নিবি। আর রান্নাবান্নার জিনিসপত্র আমি যে দোকান থেকে নিই, সেখান থেকেই নিয়ে আসবি। টাকা লাগবে না। আমি দোকানদারকে বলে দিয়েছি।”
“দাদা এর মধ্যে বলেও দিয়েছে।” লখাই ভাবে। বলে “ঠিক আছে। তো আজই আনতে হবে কি?”
— “যেমন সুবিধা বুঝবি। অসুবিধা থাকলে দু’ চার দিন এখানেই খাওয়া দাওয়া করবি।”
লখাই আদরিণীর সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবার কথা জানায়।
আজকের দিনটা দালানঘরেই কাটালো লখাই দম্পতি। দাদার কথা ফেলতে পারল না। সেই রাত্তিরেই আদরিনী লখাইকে বোঝায়, “দ্যাখো, এই ঘরটা কিন্তু নিজের ঘর বলে মনে হচ্ছে না। কেমন অন্য কারোর ঘর মনে হচ্ছে। আমাদের আর এই ঘরে থাকা ঠিক হবে না।”
লখাই বলে, “আমারও তাই মনে হচ্ছে। এবার মনে হচ্ছে সত্যিই আমরা পৃথক হয়েছি। কিন্তু কী জানিস আদু। আলাদা তো থাকবোই। থাকতে তো হবেই। কিন্তু সংসার ঠিকমতো চালাতে পারবি তো? আমার তো এখন আর কোনো রোজগারই নেই।”
আদু বলে, “ঠিক চলবে। রেশনের চাল, আটা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের হাজার টাকা আর সাহাকাকুদের দেড় হাজার টাকা। ভয় কিসের। দরকার হলে আমি আরও কোনো ঘরে কাজ ধরবো। ঠিক চলে যাবে। ফ্ল্যাট হয়ে গেলে তখন তো এই ঘরটার ভাড়াও পাবো। তুমি পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকবে। তোমার আদু আছে তো।
— “'দাঁড়া। প্রোমোটারের তো আর দেখাই পাচ্ছি না। সেসব হবে কিনা কী জানি!”
— “ঠিক হবে। কোনো কাজে হয়তো ফেঁসে আছে। আসবেই, দেখে নিও।”
অতঃপর ঠিক হয়, আগামী কাল তেরো তারিখটাতো শুভ নয়, চৌদ্দ তারিখ থেকেই আলাদা রান্নার উদ্বোধন হবে।
এই ক’মাসের আদুর জমানো টাকা থেকে রান্নার আসবাবপত্র এবং কিছু সবজি কেনা হবে, ঠিক হয়। আর কাঠ তো ঘরেই আছে। মাটির উনুনও পাতা আছে আগে থেকেই। দুটো থালা, দুটো বাটি আর দুটো গেলাস কিনে আনলেই হবে।
আর কী চাই!
একটা বালতি, একটা মগ আর একটা শিলনোড়া দরকার।
দাঁতন তো ঘরের গাছে দেদার। পুরানো গামছা তো আছেই। গুচ্চেক কাপ ডিস হলে ভালো হয়। গোটা কয়েক মোমবাতি আর দেশলাই। ব্যস। পরে যখন যা মনে পড়বে, নিয়ে এলেই হবে।
হ্যাঁ। চাল কিনতে হবে দিন পনের ষোলোর জন্য। তারপর রেশনে তো চাল, আটা সবই পাওয়া যাবে।
বৌদি তো পুরানো ঘরটা ছাড়ার সময় নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই নতুন ঘরে নিয়ে গেছে। তাই চালও কিছু কিনে আনতে হবে।
মশলাপাতি তো দাদার ঐ দোকান থেকেই পাওয়া যাবে।
পরদিন সকালে সৌদামিনীর হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে দাদার কাছে গিয়ে লখাই তাদের এই মনোভাবের কথা জানালে দাদা বলে, “ঠিক আছে। তাই কর। তবে আজই দোকান থেকে মশলাপাতিগুলো নিয়ে আসবি। আর যদি টাকার দরকার হয় বলবি। ব্যবস্থা করে দেবো।”
দাদার মাসকাবারির দোকান থেকে দাদার কথামতো মশলাপাতি আনতে গিয়ে লখাই দেখে, সেখানে দোকানদারের পাশে বসে কথা বলছেন বটব্যালবাবু। লখাই তো অবাক।
দাদার প্রসঙ্গ টেনে দোকানদারকে তার মশলাপাতির একটা ফর্দ লিখিয়ে নিয়ে বটব্যালবাবুকে লখাই বলে, “কী হল। আপনি আর এলেন না যে।”
বটব্যালবাবু বললেন, “পরে বলছি।”
দোকানদারের সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করে বটব্যালবাবু বাইরে এসে লখাইকে ডেকে বলেন, “তোমার বি এল আর ও অফিসের কাগজপত্র সব রেডি করেছি। আমার সঙ্গে অফিসে গিয়ে তুমি সই করে এলেই কাজ হয়ে যাবে। তারপর একদিন রেজিস্ট্রি করলেই ওদিকের সব ঝামেলা মিটে যাবে।”
তারপর বললেন, “বর্ষায় তো কাজ হবে না। আর যেহেতু ভাদ্রমাস অশুভ, তাই ভাবছি শ্রাবণের শেষ দিকে ভিত খোঁড়ার কাজ শুরু করবো। তাহলে ভাদ্রেও কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে।”
লখাই নিশ্চিন্ত হয়। বটব্যালবাবুর মোবাইল নম্বর নিয়ে সে মশলাপাতি সঙ্গে করে ঘরে ফিরলো।
সেদিন দাদার ঘরেই খাওয়া দাওয়া ও রাত্রিযাপনের পর পরদিন ১৪ আষাঢ় শুরু হলো লখাই ও আদরিনীর আক্ষরিক অর্থেই সংসার সাগরে পাড়ি দেওয়া। সেদিন দাদা বৌদিকেও তাদের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের অনুরোধ জানালো লখাই।
মধ্যাহ্নভোজন পর্ব বেশ হাসিখুশিতেই পেরিয়ে গেলো বটে, কিন্তু তারপরই দু'ভাইয়ের সম্পর্ক মোড় নিলো অন্য খাতে।
পরের দিন বটব্যালবাবুর সঙ্গে বি এল আর ও অফিসের যাবতীয় কাজ সেরে লখাই ভাবলো, প্রোমোটারের বিষয়টা দাদাকে না জানানো ঠিক হবে না। দাদার মতামত নেওয়াও প্রয়োজন।
তবে দাদা যাই বলুক না কেন, লখাই আর পিছিয়ে আসবে না। এ সুযোগ হাতছাড়া করা জীবনের মস্তবড় একটা ভুল হবে, লখাই ভাবে।
সেইমতো সে দাদাকে গিয়ে সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বললো এবং সে বুঝলো, দাদা মোটেই সন্তুষ্ট নয় এ ব্যপারে।
কথাটা শুনে রাম কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেলো। কিছুক্ষন চুপ থাকার পর লখাইকে বললো, “দ্যাখ, তোর জায়গা। আমি আর কী বলবো। যা ভালো বুঝবি কর। তবে পৈতৃক ভিটে অন্যের দখলে চলে যাবে এটা একটু ভেবে দেখিস। আর কী বলবো।”
“দেখছি, কী করা যায়।”
সেই থেকে রাম একটু এড়িয়ে এড়িয়েই চলতে লাগলো। সৌদামিনীও আর এধারে আসে না।
কিছুদিন পর রাম একবার জানতে চেয়েছিল, “কী ঠিক করলি?”
লখাই বলেছিল, “দাদা। প্রোমোটারকেই দিয়ে দেবো ভাবছি। আমি কি আর টাকা খরচ করে দালান বানাতে পারবো, বলো?”
দাদা অতি গম্ভীরভাবে বলেছিল,'ও'।
আর কিছু না বলেই একটা অন্যরকম ভঙ্গিতে রাম চলে গিয়েছিল। আর এমুখো হয়নি।
(১৯)
দেখতে দেখতে এসে গেলো শ্রাবণের সাতাশ। লখাই দেখে, জনা আটেক লুঙ্গি গেঞ্জি পরা লোক তার কোঠাঘরের বাইরে এসে দাঁড়ায়। কারো গায়ে জামা। কিছু ছেঁড়া, কিছু নোংরা। কারো হাতে গাঁইতি, কারো হাতে কোদাল। কেউ আবার হাতে ঝুড়ি নিয়ে। আবার কারোর হাতে কিছুই নেই। কারো কাঁধে গামছা, কারোর কোমরে।
লখাই ব্যপারটা বুঝতে দেরি করেনি। তৎক্ষণাৎ ঘরে ঢুকেই আদরিনীর গালে ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা একটু দুরে রেখে বাকি আঙুলগুলো দিয়ে আলতোভাবে ছুঁয়ে বলে, “যা দেখে আয়, কারা এসেছে।”
— “দাদা দিদি?”
一 “ধ্যাৎ! কী যে বলে। বাইরে বেরিয়ে দ্যাখ না।”
আদরিনী বেরিয়েই বুঝতে পারে, এবার তবে দালান হচ্ছেই।
ততক্ষণে বটব্যালবাবুও এসে হাজির। হাতে মাপদড়ি।
লখাই প্রোমোটারকে জিজ্ঞেস করে, “আজ থেকেই শুরু করবেন?”
— “হ্যাঁ। আকাশটা আজ পরিষ্কার আছে। আর ভাদ্রমাস পড়তেও তিন চার দিন বাকি আছে। তাছাড়া পাঁজিতেও দেখলাম গৃহারম্ভের পক্ষে আজ দিনটা শুভ।”
তারপর লখাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কুয়ো থেকে জল নেওয়া যাবে তো?”
লখাই জানে, দাদা আপত্তি করতেও পারে। কারণ দাদার মন আর আগের মতো নেই।
অতএব শুরুতেই একটা খুঁত না হওয়াই ভালো।
এইসব ভেবে লখাই বললো, “দেখুন, এটা তো দু-চার দিনের কাজ নয়, আপনাকে আর কী ব'লবো।”
বটব্যালবাবু হাসলেন। বললেন, “বুঝেছি। দুনিয়া তো একই নিয়মে চলে। এখানে ব্যতিক্রম হবে কী ক'রে। যাক গে, আমি গাড়িতে গ্যালন গ্যালন জল আনার ব্যবস্থা করছি। অন্য জায়গায় এভাবেই তো করে আসছি। ভেবেছিলাম দু-একদিন যদি পাওয়া যায়। যাক, দরকার নেই। আজ অবশ্য জল না হলেও চলবে। মাটি তো এমনিতেই ভেজা আছে। ভিত খোঁড়ার অসুবিধা হবে না।
এবার চারদিকটা একটু দেখে নিয়ে ফিতা খুলে দড়ি টেনে দাগ বরাবর চুনের দাগ টেনে ভিত খোঁড়ার কাজ শুরু করলেন।
তার আগে কিছু লাড্ডু, একটা নারকেল আর ধূপ এনে পুজো করানো হলো।
শুরু হ'লো ফ্ল্যাট তৈরির প্রাথমিক কাজ।
রাম সেই সময় কাজে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল। তৈরি হতে হতেই বারকয়েক দেখে নিল লখাইয়ের ঘরের দিকে। তারপর পুরানো সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
“আজ সদর দরজা বন্ধ করার আওয়াজটা একটু যেন হুমকি দিয়ে গেলো”—লখাইয়ের মনে হলো।
(২০)
সেই থেকে প্রায় প্রতিদিনই রাম কাজে যাবার সময় দরজাটা অ্যাতো জোরে বন্ধ করতো, যার শব্দ যেকোনো মানুষের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। লখাই কেন, কাজে আসা মিস্ত্রি মজুররাও পরিস্থিতিটা অনুভব করতো। কিছু বলতো না। লখাইও বুঝেছিল, একটা কিছু বললেই অশান্তির সুযোগ পেয়ে যাবে দাদা। তাই সবকিছু হজম করতো চুপচাপ।
দরজাটা ছিল দাদার সীমানার মধ্যে। কিছু বললে সে দেয়ালও তুলে দিতে পারে। তখন আবার দরজা খোলা, কপাট বানানো বেশকিছু খরচের মধ্যে পড়তে হবে। তাই, সহ্য করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কুয়োটাও আছে দাদার সীমানায়। সেখানেও ইদানীং নানারকম বিঘ্ন সৃষ্টি হতে থাকলো। কুয়ো যাওয়া বন্ধ করে দিল আদরিনী। টাইম কল আর পুকুরের জল এনে ঘরের কাজ করতো সে।
দাদা-বৌদির এরকম পরিবর্তন দেখে লখাই ভাবে, দাদার ওই মুদিখানার বিলটা মিটিয়ে দিয়ে আসবে কিনা।
আদরিণী বলে, “দ্যাখো, বিলটা মিটিয়ে দেওয়া তোমার ঠিক হবে না। দাদা আঘাত পাবেন। আর তাছাড়া দোকানদারই বা কী ভাববেন। দাদা বলে গেলো আর ভাই বিল মিটিয়ে দিচ্ছে। তবে কি ভাইয়ে ভাইয়ে কিছু ঝুট-ঝামেলা হয়েছে। ঘরে কী হয়েছে তা বাইরের লোক জানবে কেন। তুমি অমন কাজও কোরো না। দাদা যদি বলেন, তখন না হয় দিয়ে আসবে।”
দু’ভাইয়ের সীমানা বরাবর যে ছোট ছোট পিলার, অ্যাপার্টমেন্টের নিরাপত্তার স্বার্থে বটব্যালবাবু সেই পিলার তুলে বাউন্ডারী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাম আর লখাইয়ের মৌখিক বোঝাপড়ার আর কোনো দাম থাকলো না। লখাইয়ের জায়গাটা যেহেতু এখন প্রোমোটারের (কোঠাঘর বাদে), সেক্ষেত্রে ঐ আগের বোঝাপড়া এখন মূল্যহীন। তাই রাম-ও আর এ নিয়ে টুঁ শব্দটি করতে পারছে না। এ নিয়ে বটব্যালবাবুর সাথে রামের কথা হয়। এবং রামের উপস্থিতিতেই শুরু হয় বাউন্ডারীর ভিত খোঁড়ার কাজ।
আজ আদরিনী গেছে বাপের ঘর। সকাল সকাল লখাইকে চা জলখাবার খাইয়ে এবং নিজেও জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়েছে। এসে দুপুরের রান্না করবে। ওর রেশন কার্ডটা নিয়ে আসতে হবে তো।
দুজনের কার্ডে অনেকটাই মাল পাবে ওরা। ফলে খাবারের জন্য অত চিন্তা করতে হবে না। লখাই তো ওর কার্ড দাদার কাছ থেকে ইতিমধ্যে নিয়েও এসেছে। এবার আদরিনীর কার্ডটা আনলেই কেল্লা ফতে।
(২১)
উপেন আদরিনীকে দেখে খুব খুশি। বললো, “রাগ কমেছে মা। আয়।”
উপেনের বৌ মেয়ের গলার আওয়াজ পেতেই বেরিয়ে এলো ঘর থেকে — “কতদিন দেখিনি তোকে বলতো! ভালো আছিস তো মা?”
— “হ্যাঁ মা, ভালোই আছি। তোমরা ভালো আছ তো?”
— “ঐ আছি একরকম। আর কদ্দিন বাঁচবো কি জানি। যতদিন আছি, একবার করে আসবি মা। মায়ের মন তো। সবসময় তোর কাছেই মনটা পড়ে থাকে।”
আদরিনী চোখ মোছে। বলে, “দাদা সেদিন যে ব্যবহারটা করেছে, তারপর কি আর এমুখো হতে মন চায়, বলো।”
— “'দুটো বাসন পাশাপাশি থাকলে অমন একটু আধটু ঠোঁকাঠুকি লাগবেই। তা বলে একেবারে মুখ ফিরিয়ে থাকবি।'’
মা-মেয়ের এই কথাবার্তা রূপেনের কানে যায়। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ওদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “আমি কী এমন বলেছিলাম যে সেইদিনই তুই চলে গেলি। কাজটা কি তুই ঠিক করেছিস? ভেবে দ্যাখ তো।”
উপেন বাধা দিয়ে বলে, “পুরানো কথা বাদ দে তো।”
তারপর আদরিনীকে ঘরে নিয়ে যায়।
দাদার কথা শুনে আদরিনী তখন রাগে ফুঁসছে। বাবাকে বলে, “আমি আর বসবো না। আমার রেশন কার্ডটা নিতে এসেছি। কার্ডটা দাও।”
বাবা বলে, “তা তো নিবি, একটু বোস। দাদার কথায় অত রাগ করলে চলে! খাওয়া দাওয়া করেই যাবি। অত তাড়াহুড়োর কী আছে।”
— “না বাবা, আছে। ঘরে মিস্ত্রি মজুর কাজ করছে। তোমার জামাইয়ের জন্য রান্নাও করতে হবে। তাড়াতাড়ি দাও। আর একদিন না হয় আসবো।”
উপেন জিজ্ঞেস করে, “মিস্ত্রী মজুর কী করছে?”
সব ঘটনাটা চটজলদি বলে মা বাবার মনখারাপ সত্ত্বেও কার্ডটা নিয়ে আদরিনী ফিরে এলো নিজের আস্তানায়।
রূপেন আর কিছু না বলে চুপচাপ সরে যায় নিজের ঘরে। রূপেনের বৌ তখন বাপের বাড়িতে। তাই বৌদির সঙ্গে আর দেখা হলো না আদরিনীর।