খসড়া ভোটার তালিকায় এক কোটি রোহিঙ্গার হদিশ করতে না পেরে জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন উন্মাদের মত আচরণ করছে। এই আচরণের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল শুনানির প্রয়োজনীয় খসড়া হিসাবে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে বাতিল করা।অথচ একথা সবার জানা যে একটা সময় যখন ছোটবেলায় জন্ম নথিভুক্ত করার রেওয়াজ ছিল না তখন একটা বড় অংশের মানুষের কাছে জন্মের শংসাপত্র বলতে এই মাধ্যমিক কার্ডকেই বোঝাত।কমিশনের নির্দেশিকার নির্বুদ্ধিতা তখনই স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি মাধ্যমিক পাশের সার্টিফিকেটের গ্রহণযোগ্যতা আছে অথচ সেই সার্টিফিকেটে দেওয়া জন্মতারিখটি যে অ্যাডমিট কার্ডের অনুসারী,তার গ্রহণযোগ্যতা নেই।নির্বাচন কমিশন বোধহয় ভুলে গেছে যে ভারতের ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য মাধ্যমিক পাশ হওয়ার দরকার হয় না,দরকার জন্মতারিখটি যা এই অ্যাডমিট কার্ডে পরিষ্কার ভাবে দর্শানো থাকে।আশঙ্কামত কমিশনের এই তুঘলকি চাল,নিত্য নতুন নিয়ম বদল সাধারণ মানুষের কাছে বলির পাঁঠা করে তুলছে বুথ লেভেল অফিসারদের ( বিএলও)।গত ৭২ ঘন্টায় বিভিন্ন জায়গা থেকে বিএলওদের ক্ষোভ ও গণ পদত্যাগের খবর আসছে।এ রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া চালু হবার পর থেকে প্রায় ২৫ জন মানুষ মারা গেছেন।এই তালিকায় যেমন প্রয়োজনীয় নথি না থাকার ফলে আতঙ্কিত মানুষ আছেন,তেমনি আছেন অসম্ভব মানসিক চাপের শিকার বিএলওরা।ভোটার তালিকা সংশোধনের মত একটি স্বাভাবিক,সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে রক্তাক্ত করে তোলার দায় অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করার পর এটা পরিষ্কার যে বাংলায় এসআইআরের নামে এক চক্রান্ত জাল বিস্তার করছে।এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য বিজেপির নির্বাচনী সুবিধা সুনিশ্চিত করা।এই বিষয়টি বুঝতে আমাদের প্রথমেই নজর করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের বিডিও ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (AERO) মৌসম সরকারের পদত্যাগ পত্র।এই পদত্যাগ পত্রে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে যে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির মাধ্যমে এক ত্রুটিপূর্ণ অ্যাপকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার মানুষকে ভোটার তালিকার বাইরে করা হচ্ছে। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যে সমস্ত নামের বানান, লিঙ্গ পরিচয় ভুল ছিল, তা ভোটাররা পরবর্তী কালে ফর্ম ৮ এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে সংশোধন করে।অথচ ২০০২ ও ২০২৫ এর তালিকার তথ্য মিলছে না এই অজুহাতে সেইসমস্ত ভোটারকে শুনানির নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পর্যন্ত স্বীকার করেছেন যে এই অ্যাপ ভুলে ভরা।মৌসম সরকার তার পদত্যাগের শেষ অনুচ্ছেদে যে কয়টি কথা লিখেছেন তা আরেকবার উল্লেখ করা প্রয়োজন : "Therefore I want to tender my resignation from the post of AERO so that I would have the consolation that I have not betrayed my countrymen and nations consciously "। (চিঠিটির বিস্তারিত বিবরণের জন্য দি নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস / ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ দ্রষ্টব্য) । একই সঙ্গে ভারতের অন্যতম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ' দি রিপোটার্স কালেকটিভ ' ( ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬) এর বিস্তৃত প্রতিবেদনটা উল্লেখ করা দরকার যেখানে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বলা হয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় অফিসাররা বাংলার জন্য এমন কিছু নির্দেশিকা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দিয়েছেন যার কমিশনের পক্ষ থেকে কোন লিখিত আদেশ নেই।এমনকি বহু ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সর্বভারতীয় নির্দেশিকার বিরোধী বক্তব্য বাংলায় মৌখিক ভাবে লাগু করার কথা বলা হচ্ছে।
প্রথম খসড়া তালিকায় সুবিধা করতে না পেরে নির্বাচন কমিশন এক নতুন অস্ত্র বের করেছে যার নাম logical discrepancies ( যৌক্তিক অসঙ্গতি)।এই অস্ত্রকে নতুন বলার কারণ বিহার এসআইআরে এই বিষয়টি ছিল না।আসুন দেখে নেওয়া যাক এই অসঙ্গতি বলতে কি বোঝানো হয়েছে। এক্ষেত্রে পুনরায় উল্লেখ করা প্রয়োজন প্রাথমিক খসড়া তালিকার সময়ে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল।সে সময় যাদের নাম তালিকায় উল্লেখ ছিল,সেই অংশের অনেকেই উল্লাসে মেতেছিল।আমাদের আশঙ্কা ছিল দ্বিতীয় পর্বে অনেকের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।এখন নির্বাচন কমিশনের দেয় তথ্য মোতাবেক বোঝা যাচ্ছে যে ১.৬৭ কোটি মানুষের কাছে শুনানির নোটিশ যাবে।এদের মধ্যে ১.৩৬ লক্ষ হতে চলেছেন এই যৌক্তিক অসঙ্গতির শিকার।কারা থাকছেন এই তালিকায়!সেই মানুষেরা যারা বাবা- মায়ের পরিবর্তে তাদের ঠাকুর্দা ও ঠাকুমার নাম দিয়েছেন।সেই সমস্ত ভোটার যাদের সন্তানের সংখ্যা ৬।এছাড়া বাবা ও ছেলের বয়সের অসঙ্গতি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকা ছিল বাংলাতে।অ্যাপের মাধ্যমে সেগুলো ইংরেজি করতে গিয়ে একাধিক অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে যা মূলত অ্যাপের প্রয়োগগত সমস্যা। দু একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।পদবির ক্ষেত্রে এই ভুল সবচেয়ে বেশি।পদবি বণিক ( Banik/Vanik),মন্ডল (Mondal/Mandal)।এছাড়া রয়েছে ব্যানার্জী/ বন্দোপাধ্যায়,চ্যাটার্জী/চট্টোপাধ্যায় যে এক তা বুঝতে না পারার ব্যর্থতা।এই সব অসঙ্গতিকে কেন্দ্র করে পাইকারি হারে অশক্ত,বৃদ্ধ, অসুস্থ, কর্মসূত্রে প্রবাসী মানুষদের নোটিশ ধরানো হচ্ছে। এই ভাবে বাংলায় এক বিশাল সংখ্যক মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে।
এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছি যে এক কোটি রোহিঙ্গা খুঁজে না পেয়ে এবং নির্দিষ্ট করে মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী সাব্যস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে বিজেপির স্বার্থ পূরণ করতে এই যৌক্তিক অসঙ্গতির মুখোশে নিশানা করা হচ্ছে মুসলিমদের।দি ওয়ার ওয়েব ম্যাগাজিনে অপর্ণা ভট্টাচার্যের অনবদ্য সমীক্ষা গোটা বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই সমীক্ষা দেখিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতে শুনানির হার অনেক বেশি।যেমন মুর্শিদাবাদ ( ৬৬% মুসলিম,এসআইআর নোটিশ ৩০.২০%),উত্তর দিনাজপুর ( ৪৯.৯% মুসলিম,নোটিশ ২৯.৭৫%),মালদা ( ৫১.৩% মুসলিম,২৮.৪২% এসআইআর নোটিশ)। কিন্তু যে সমস্ত জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা কম,সেখানে এসআইআর নোটিশের হারও কম।যেমন বাঁকুড়া ( ৮% মুসলিম,এসআইআর নোটিশ ১১%),পুরুলিয়া ( ৭.৮% মুসলিম,শুনানির হার ১২%)।আমরা যদি মুসলিম প্রধান কিছু বুথের দিকে তাকাই তাহলে সংখ্যা তত্ত্বটা আরো সহজে বোধগম্য হবে।মালদার হরিশ্চন্দ্রপুর বিধানসভায় পোলিং স্টেশন ৫২,নোটিশ ৫৪০ জন,পিএস ৫৩,নোটিশ ৫৩০,পিএস ৬৩,নোটিশ ৫০৩।আবার হুগলি যেখানে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ট কিন্তু মুসলিমরাও আছেন, সেখানে পঞ্চায়েত ভিত্তিক ছবিটাও একই প্যাটার্নের।মুসলিম প্রধান নবাবপুর, ভগবতীপুর পঞ্চায়েত নোটিশের সংখ্যা যথাক্রমে ৫০০০ ও ৪০০০ কিন্তু হিন্দু প্রধান কৃষ্ণরামপুরে নোটিশের সংখ্যা ১০০০ মাত্র। একথা আর লুকানো যাচ্ছে না যে এই যৌক্তিক অসঙ্গতির গল্পের একটা সাম্প্রদায়িক সূত্র রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশনের এই তুঘলকি আচরণ করতে পারার একটা বড় কারণ এ রাজ্যে বিজেপি বিরোধী দলগুলির নিস্ক্রিয়তা।স্থানীয় রাজনীতির পাটিগণিতে এবং ভালো এসআইআরের খোয়াবে বুঁদ হয়ে থেকে আমরা এই বাংলা বিরোধী ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারি নি।সত্য হল একমাত্র অধিকার সংগঠনগুলো তাদের সামান্য ক্ষমতায় এর ধারাবাহিক বিরোধিতা করে গেছে।আজ বিজেপি বিরোধী দলগুলি পথে নেমেছে বটে কিন্তু ততদিনে নির্বাচন কমিশন তাদের নোংরা খেলায় অনেকখানি সফল।এরপর আছে পাইকারি হারে ফর্ম পূরণ করে সম্ভাব্য বিজেপি বিরোধী ভোটারদের নাম কাটা ও অনলাইনে ভুয়ো ভোটার ঢোকানোর কৌশল।বিহারে বিজেপি এই পরিকল্পনার ফল পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তাদের গেমপ্ল্যান একই থাকছে।