প্রথম পর্ব : প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ ও সংগীতে প্রকৃতি ভাবনা
কবিগুরুর পরিবেশ ও নৈতিকতা সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা সহ তাঁর সমগ্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটা কেন্দ্রীভূত মূল সুর রয়েছে। এক অখন্ড জীবন দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবারভুক্ত –এই বিশ্বমানবতার বোধ গড়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনে। তিনি মনে করতেন, প্রকৃতি ও মানুষ এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
‘অরণ্য দেবতা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখছেন –“মানুষ অমিতাচারী। যত দিন সে অরণ্যবাসী ছিল ততদিন অরণ্যের সঙ্গে তার আদান-প্রদান ছিল। ক্রমে মানুষ যখন নগরবাসী হল, তখন অরণ্যের প্রতি মমত্ববোধও সে হারাল। মানুষ তার প্রথম সুহৃদ তরুলতাকে নির্মমভাবে নির্বিচারে ধ্বংস করে ইটকাঠ আর কংক্রিটের শহর গড়ে তুলতে মনপ্রাণ এক করল।”
তারপর লিখছেন –“অরণ্য ধ্বংস ও বৃক্ষছেদনের ফলস্বরূপ ভারতবর্ষের উত্তর-অংশে গ্রীষ্মের উৎপাত মাত্রাছাড়া হয়েছে। সবুজ বৃক্ষ ও জঙ্গল বিনাশ করে মানুষ যেন দেশে মরুভূমি ফিরিয়ে আনবার উদ্যোগ নিয়েছে।”
কী অসম্ভব দূরদৃষ্টি। একশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে উঠে এসেছে আজকের দিনের ভয়ানক পরিবেশ বিপর্যয়ের স্পষ্ট চালচিত্র। বিপন্ন হিমালয় ও আরাবল্লি পর্বতরাজি পৃথিবীর মানচিত্র থেকে উধাও হয়ে গেলে ভারত সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক বৃহৎ অঞ্চল রূখাশুখা মরুভূমি বই অন্য কিছু নয়।
প্রকৃতির কাছেই ফিরে গিয়ে লিখছেন –“সেই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের আহ্বান করতে হবে বরদাত্রী বনলক্ষ্মীকে –আবার তিনি রক্ষা করুন এই ভূমিকে। দিন তাঁর ফল, দিন তাঁর ছায়া।” কবির উপলব্ধি –আধুনিক মানুষ বিলাসবহুল ও প্রদর্শনমূলক জীবনযাপনে নিদারুণভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্বমানবতার পূজারী রবীন্দ্রনাথের অন্তর্দৃষ্টি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বলোকে পরিব্যাপ্ত।
তারপর তিনি লিখছেন –“এই সমস্যা আজ শুধু এখানে নয়। মানুষের সর্বগ্রাসী লোভের হাত থেকে অরণ্য- সম্পদকে রক্ষা করা সর্বত্রই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ….. লোভী মানুষ অরন্যকে ধ্বংস করে নিজেরই ক্ষতি ডেকে এনেছে। বায়ুকে নির্মল করার ভার যে গাছপালার উপর, যার পত্র ঝরে গিয়ে ভূমিকে উর্বরতা দেয়, তাকেই সে নির্মূল করেছে”।
আজকে একের পর এক বৃহৎ বনাঞ্চল সাফ করার বিরূপ প্রভাবের মধ্য দিয়েও রবীন্দ্রনাথের এই দুরদর্শীতার প্রমাণ মেলে। ধন্য তুমি প্রকৃতিপ্রেমিক, প্রকৃতির পূজারী আমাদের প্রাণের কবি।
‘শান্তিনিকেতন’ প্রবন্ধে তিনি লিখছেন –“যে বিরাট প্রকৃতির দ্বারা মানুষ পরিবেষ্টিত, যার আলোক এসে তার চক্ষুকে সার্থক করেছে, যার উত্তাপ তার প্রানকে স্পন্দিত করে তুলেছে, যার জল তার অভিষেক, যার অন্নে তার জীবন, …. ভারতবর্ষ সেই প্রকৃতির মধ্যে আপনার ভক্তিবৃত্তিকে সর্বত্র ওতপ্রোত করে প্রসারিত করে রেখে দিয়েছে।”
তিনি বলছেন, এই বিশ্বপ্রকৃতির সাথে পবিত্র যোগেই ভারতবর্ষ নিজেকে বৃহৎ করে জেনেছে। আহা, প্রকৃতির সাথে মানবসত্তার কী অপূর্ব আত্মিক যোগ।
পাশ্চাত্যের সাথে প্রাচ্য তথা ভারতের প্রকৃতিবোধ ও জীবনদর্শনের স্পষ্ট ফারাক তুলে ধরেছেন তিনি –“শেকসপীয়রের ‘As You like’ নাটক একটা বনবাস কাহিনী, টেম্পেস্টও তাই, Midsummer Night's Dream-ও অরণ্যের কাব্য। কিন্তু সে-সকল কাব্যে মানুষের প্রভুত্ব ও প্রবৃত্তির লীলাই একেবারে একান্ত। সেখানে অরণ্যের সঙ্গে সৌহার্দ্য দেখতে পাইনে। অরণ্যবাসের সঙ্গে মানুষের চিত্তের সামঞ্জস্য সাধন ঘটেনি।”
অন্যদিকে, কালিদাসের শকুন্তলা নাটকের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তিনি। তাঁর ‘শকুন্তলা’ প্রবন্ধে বলছেন –কালিদাস তাঁর অপরূপ কৌশল ও প্রতিভায় শকুন্তলাকে লীলা ও ধর্মের, স্বভাব ও নিয়মের, নদী ও সমুদ্রের ঠিক মোহনার উপর স্থাপিত করেছেন। তপোবনের প্রকৃতি বর্ণন সম্পর্কে তিনি উচ্ছ্বসিত। তাঁর মতে –তপোবনে স্বভাব এবং তপস্যা, সৌন্দর্য এবং সংযম সব মিলেমিশে একাকার। সেখানে সমাজের কৃত্রিম বিধান না থাকলেও ধর্মের কঠোর নিয়ম বিদ্যমান। শকুন্তলার সহজ সরল সুন্দর অথচ গভীর পবিত্রতা সম্পর্কে তিনি লিখছেন– “শকুন্তলাকেও ধূলা লাগিয়াছিল, কিন্তু তাহা সে নিজেও জানিতে পারে নাই। …. সে অরণ্যের চঞ্চলা মৃগীর মতো, নির্ঝরের জলধারার মতো, মলিনতার সংসর্গেও অনায়াসেই নির্মল।”
রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেম ভীষণ প্রগ্রাঢ় ছিল বলেই ‘ধূলোলাগা মলিন শকুন্তলা’কে তিনি অনাবিল জলাধারার সাথে, অরণ্যের সরলা হরিনীর সাথে তুলনা করতে পারেন।
নদীবাঁধের অযৌক্তিকতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘মুক্তধারা’ নাটকের কথা উল্লেখ করতেই হয়। ভারতবর্ষের বুকে তখনো বড়ো নদীবাঁধ নির্মিত না হলেও তিনি প্রকৃতির স্বাভাবিক গতি বা প্রবাহমানতা রুদ্ধ করার বিপক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। প্রাকৃতিক জলধারার ওপর আমাদের সকলের সমান অধিকার, এই গভীর দর্শনবোধ থেকেই তিনি উপলব্ধি করতে পারেন –জলধারার স্রোত বা গতিপথ পরিবর্তন করা অমার্জনীয় অপরাধ। তাই শেষ পর্যন্ত এই অপ্রয়োজনীয় বাঁধকে মুক্ত করে স্রোতকে তার নিজস্ব গতিতে বইতে দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন –জল, নদী, জঙ্গল, কারোর ব্যক্তিগত অধিকারে থাকতে পারেনা। আধুনিক ভারতে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে প্রকৃতিভাবনা, জীবনদর্শন এক উন্নত মাত্রা লাভ করেছে। এই ভাবনাগুলোকে আজকের স্থানকালের প্রেক্ষিতে প্রয়োগ করার মধ্য দিয়ে বিশ্বজোড়া প্রকৃতি বিপর্যয়ের সমাধানের তল পাওয়া সম্ভব বলেই মনে করি।
ভোগ-সর্বস্বতা সম্পর্কে ‘বিলাসের ফাঁস’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ একটি প্রণিধানযোগ্য বক্তব্য রেখেছেন –“এখনকার দিনে ব্যক্তিগত ভোগের আদর্শ বাড়িয়া উঠিয়াছে। এখন আহার পরিচ্ছদ, বাড়ি গাড়ি জুড়ি, আসবাবপত্র দ্বারা লোকে আপন মহত্ব ঘোষণা করিতেছে। ধনীতে ধনীতে এখন এই লোভের প্রতিযোগিতা। আমাদের দেশে ইহাতে যে কতদূর পর্যন্ত দুঃখ সৃষ্টি করিতেছে, তাহা আলোচনা করিলেই বুঝা যাইবে।”
প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবেই মানব প্রজাতি লড়াই করে চলেছে তার নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য। এই কাজ করতে গিয়ে সে প্রকৃতির পরিবর্তন করে। সেইসঙ্গে মানুষ নিজেকেও পাল্টায়। মানুষের জীবনযাত্রার সেই আদিলগ্ন থেকেই মানুষ ও প্রকৃতির এই পারস্পরিক আন্তক্রিয়া চলছে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে দেখা যায় প্রকৃতির প্রতি প্রবল ভালোবাসা, উদারতা, মমত্ববোধ। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের পরিবেশকে সুন্দর রাখতে আমাদেরই উদ্যোগী হতে হবে।
গান্ধীজী ও রবীন্দ্রনাথ দুজনেই গুরুত্ব দিয়েছেন গ্রামীণ পুনর্গঠনের ওপর। গান্ধীজীর স্বদেশ ভাবনার সাথে কিছু ফারাক বা দ্বিমত থাকলেও রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ভারতবর্ষের যথার্থ উন্নয়ন সম্ভব গ্রাম-জীবনের উন্নয়নের মাধ্যমে। নগরায়নের মাধ্যমে নয়। যদিও উন্নয়নের জন্য তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন না, একথা তাঁর ‘রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থে পরিষ্কার।
মানুষের লোভ লালসা প্রকৃতিকে যে কতটা কলুষিত করছে, সেই প্রসঙ্গে জাপান যাত্রী প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন –“যেখানে প্রকৃতির ছন্দে লয়ে মানুষকে চলতে হয়েছে, সেখানে মানুষের সৃষ্টি সুন্দর না হয়ে থাকতে পারেনা। নৌকোকে জল বাতাসের সঙ্গে সন্ধি করতে হয়েছে। এইজন্যেই জল বাতাসের শ্রীটুকু সে পেয়েছে। কল যেখানে নিজের জোরে প্রকৃতিকে উপেক্ষা করতে পারে সেখানেই সেই ঔদ্ধত্যৈ মানুষের রচনা কুশ্রী হয়ে উঠতে লজ্জামাত্র করেনা। কলের জাহাজে পালের জাহাজের চেয়ে সুবিধা আছে, কিন্তু সৌন্দর্য নেই।” এর সাথে তাঁর খেদোক্তি –“আমার পরম সৌভাগ্য এই যে, ...আমি তার আগেই জন্মেছি। তখনো গঙ্গার ঘাটগুলি গ্রামের স্নিগ্ধ বাহুর মতো গঙ্গাকে বুকের কাছে আপন করে ধরে রেখেছিল। ...একদিকে দেশের হৃদয়ের ধারা, আর একদিকে দেশের এই নদীর ধারা, এর মাঝখানে কোনো কঠিন কুৎসিত বিচ্ছেদ (বাণিজ্য) এসে দাঁড়ায়নি। ... সেইজন্যেই কলকাতা আধুনিক শহর হলেও কোকিল শিশুর মতো তার পালনকর্ত্রীর নীড়কে একেবারে রিক্ত করে অধিকার করেনি। কিন্তু তারপরে বাণিজ্য সভ্যতা যতই প্রবল হয়ে উঠতে লাগল ততই দেশের রূপ আচ্ছন্ন হতে চলল। দেশ ও কালের লড়াইয়ে দেশের শ্যামল শোভা পরাভূত হল। কালের করাল মূর্তিই লোহার দাঁত নখ মেলে কালো নিঃশ্বাস ছড়াতে লাগল।”
প্রকৃতির কলুষতা তাঁর মনকে বিদ্ধ করছে। তাই তিনি লিখছেন –“জাহাজ যখন আস্তে আস্তে জাপানের পিনাঙ বন্দরের গা ঘেঁষে এল, যখন প্রকৃতির চেয়ে মানুষের দুশ্চেষ্টা বড় হয়ে দেখা দিল, কলের চিমনিগুলো প্রকৃতির বাঁকা ভঙ্গিমার উপর তার সোজা আঁচড় কাটতে লাগল, তখন দেখতে পেলুম মানুষের রিপু, জগতে কি কুশ্রীতাই সৃষ্টি করছে। সমুদ্রের তীরে তীরে, বন্দরে বন্দরে, মানুষের লোভ কদর্য ভঙ্গিতে স্বর্গকে ব্যঙ্গ করছে –এমনি করেই নিজেকে স্বর্গ থেকে নির্বাসিত করে দিচ্ছে।”
রবীন্দ্র ভাবনায় অরণ্যের একটি বড় ভূমিকা আছে। বৃক্ষকে নিয়ে তিনি 'বনবাণী' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৩৮ সালে বৃক্ষরোপণ উৎসবের সময় তিনি রচনা করলেন “মরু বিজয়ের কেতন উড়াও হে শূন্যে।” বৃক্ষরোপনের মাধ্যমে সবুজ ক্ষেত্র বাড়ানোর জন্য কবির ডাক এইভাবেই ধ্বনিত হয়েছে। শান্তিনিকেতনে গাছের তলায় পড়াশুনোর মহৎ ভাবনার মধ্য দিয়েও তিনি গাছ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে উদগ্রীব ছিলেন। তাঁর ভাবনা, পরিবেশের সুস্থিতির জন্য চাই আরও গাছ। বর্ষার সময় চারপাশের পতিত জমিতে বেশি করে গাছ লাগিয়ে এই ভারসাম্য রক্ষা করতে চেয়েছিলেন তিনি। পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শান্তিনিকেতনকে জীবনচর্চার একটি মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি মনে করতেন, ভারতীয় সাহিত্য সভ্যতার মূল প্রস্রবণ শহরে নয়, তা লুকিয়ে আছে বনে। বনের নির্জনতা ভারতবর্ষের চিত্ত চেতনাকে করেছে উজ্জ্বল ও জীবন্ত। দেশের কাব্যের শক্তি নিহিত আছে মানুষের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির সম্মিলনে। “ভারতবর্ষের মহত্ব ভোগের মধ্যে নেই, আছে যোগে।”
আসলে, ভারতবর্ষের নিখিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যোগ ও সামঞ্জস্যের মধ্যে তিনি দেখেছেন পরিপূর্ণতা। যা ভারতীয় উপমহাদেশের এক বিশেষ সাধনা। যদিও আজ অর্থপুঁজির করাল গ্রাস শহর থেকে মফস্বলেও ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র গতিতে। সেখানে শুধুই পণ্যসামগ্রীর বাহার। শুধুই বিকিকিনি। রবীন্দ্রনাথ দুঃখ পেয়েছেন এই দেখে যে, মানুষ বৃহৎ জগতের মধ্যে সদা ক্ষুদ্রতার প্রাচীর তুলে চলেছে। ভারতবর্ষের এই বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্র্য ক্রমে ক্রমে আপন ঔদ্ধত্যের বেগে চারিদিকের বিপুল বিশাল প্রকৃতি থেকে অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন হতে থাকলে ক্রমশ বিকৃতিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। চিরনবীন বিশ্বজগতের মধ্যে জরাজীর্ণ হয়েই যেন মানব প্রজাতি বাস করবে। বাস্তবে হচ্ছেও তাই। তাই তিনি সখেদে লিখছেন –“ভোগসুখ মোহকলুষ আমাদের পায়ে পায়ে জড়িয়ে ধরেছে, নির্ভয়ে সব মিলে দিয়ে বীরত্বের অভিষেক স্নানে শুচি হয়ে বেরিয়ে এসো।”
অন্যদিকে ‘রক্তকরবী' নাটকে তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন গ্রাম ও শহর জীবনের সমন্বয় সাধন ও যৌথশক্তির জাগরণের প্রয়োজনীয়তা। ‘নন্দিনী’ ও ‘রঞ্জন’ যেন তারই প্রতীক। তিনি লিখলেন – “অর্থপিপাসু কুবেরের একমাত্র লক্ষ্য হল তাল তাল সোনা তোলার প্রযুক্তিকে আয়ত্ত করা।” নন্দিনী তাই বলে ওঠে –“অবাক হয়ে দেখছি, সমস্ত শহর মাটির তলার মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে অন্ধকার হাতড়ে বেড়াচ্ছে। পাতালে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে যক্ষের ধন বের করে আনছে। সে যে অনেক যুগের অনেক মরা ধন।”
নন্দিনী রাজাকে এ শক্তি মদমত্ততার অহংকার থেকে বেরিয়ে আসতে আহ্বান জানায়। সে রাজাকে বলে –অন্ধকার কূপ থেকে আলোয় বেরিয়ে এসো, মাটির উপর পা দাও, পৃথিবী খুশি হয়ে উঠুক। নন্দিনীর এই ডাকে অর্থ ও ক্ষমতার প্রতিভূ রাজাও বেরিয়ে আসতে চায় সেই ঘন অন্ধকার থেকে। তাই প্রজাদের পবিত্র দেবতার ধ্বজা ভেঙ্গে, সমস্ত জাল ছিন্ন করে রাজা মুক্তি পেতে চাইছে। অন্ধকার নয় আলোয় বেরিয়ে আসতে চাইছে। নন্দিনীকেও এই কাজে তার সাথী হতে আহ্বান জানাচ্ছে। নানা দ্বন্দ্বের সমাহারে পরিবেশগত ভারসাম্য খোঁজের নাটক রক্তকরবীতে রবীন্দ্রনাথ এইভাবেই আগামী ভবিষ্যতের ছবি এঁকেছেন। এটাই তাঁর দূরদর্শিতা। তাঁর চিন্তার মধ্যে আজকের পরিবেশ সংকটের পূর্বাভাস বা আশ্চর্য প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।
আজকের তথাকথিত ‘উন্নত ও সভ্য সমাজ’ জঙ্গল কেটে-পাহাড় ফাটিয়ে ‘মরা ধন’ মাটির গর্ভ থেকে তুলে আনার তীব্র বাসনায় মদমত্ত। আর আমরা সাধারণ মানুষও ছুটছি বাজারের অমোঘ টানে পিপীলিকার মতো মরণের তরে। অথচ আমাদের যে জীবন্ত প্রকৃতি, জড়-জীব সবকিছু উপেক্ষা করে চলেছি কত অবলীলায়। যেখানে সাধারণ মানুষের স্বার্থ, সমাজ প্রগতি, দশের হিতসাধন, প্রকৃতি, সবই অবান্তর। বরং মানুষের মূর্ত শ্রম, মূর্ত প্রকৃতি ও বিজ্ঞান প্রযুক্তির জয়যাত্রাকে ব্যবহার করেই অর্থের মতো এক বিমূর্ত বস্তু আরও বলবান হচ্ছে। বিশ্বমানবকে অর্থের কানাগলিতে ছুটিয়ে মারার চক্রান্ত চলছে মহাসমারোহে।
মানুষের মূর্ত শ্রমকে বৃহৎ পরিসরে মুক্ত করে বিশ্ব মানবতার স্তরে উন্নীত হওয়ার পথে অর্থই আজ এক বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষকে তার বৃহত্তর সত্তা মূর্ত প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ক্ষুদ্র গন্ডির মধ্যে স্বার্থপর ব্যক্তি সত্তায় পরিণত করা হয়েছে। এক চূড়ান্ত ঋণাত্বক প্রক্রিয়ার মধ্যে এগিয়ে চলেছে মানব সমাজ, সভ্যতা ও প্রকৃতি।
পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে ভারতবর্ষের সভ্যতার তুলনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠেছে প্রকৃতিকে বশ করার মধ্য দিয়ে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও দর্শনে পরিবেশকে ভাবা হয়েছে যেন মানবসভ্যতা বিকাশের উপকরণ হিসেবে। সেখানে পরিবেশের কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই। তিনি লিখছেন – অর্থের অন্তর্নিহিত মূল্য নেই। কারণ অর্থ দিয়ে আমরা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনলে তবেই আনন্দ লাভ করি। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় –বিনিময় মূল্য। কিন্তু জনহীন মরুভূমিতে, বা ঘন জঙ্গলে, অপার সমুদ্রে অর্থ কোনো কাজে লাগে না। সেখানে কেবলই প্রকৃতি পরিবেশ ও প্রাণের সম্ভার। প্রকৃতির এই অপার ভান্ডার, নৈসর্গ পরিবেশকে ধ্বংস করতে আজ আমরা উদ্যত তরবারি হাতে।
ভারতীয় ঋতু-বৈচিত্রেয় এক ধারা যেন পরিণতি পায় রবীন্দ্রনাথের ঋতুসাধনায়। ঋতুপ্রকৃতির সঙ্গে জীবন-প্রকৃতির সমন্বয় সাধনের আদর্শ ধারা। যার উজ্জ্বল প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই 'তপোবন' প্রবন্ধটিতে। গ্রীষ্মের পরিণতি যেমন বর্ষার সরল শ্যামলতায়, তেমনি বর্ষায় পরিণতি হেমন্তের সোনালীতে। তাই বৈশাখকে নিয়ে লিখেছেন –“এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ। তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে
দাও উড়ায়ে।” গ্রীষ্মে তিনি দেখেছেন –পাতা ঝরে পড়ে, গাঁথা মালা ম্লান হয়ে যায়। জনহীন পথে মরীচিকা, শুষ্ক ধূলায় ফুলদল খসে পড়ে, হৃদয় হয় তৃষায় ব্যথিত –“নাই, রস নাই, দারুন দহনবেলা।” বর্ষার নবধারা নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত –“এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে, এসো করো স্নান নবধারা জলে।” তারপরই লিখছেন, “এসো শ্যামলসুন্দর, আনো তব তাপহরা, তৃষাহরা সঙ্গসুধা।” গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের পর নববর্ষার ধারাকে তিনি চঞ্চল নৃত্যের সাথে তুলনা করে বলছেন –“বাজিবে কঙ্কন, বাজিবে কিঙ্কণী, ঝঙ্কারিবে মঞ্জির রুণুরুণু।” বর্ষার রুদ্ররূপকেও কবি আহ্বান জানাতে দ্বিধা করেননি। তিনিই বলতে পারেন —“ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে, জল সিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ ভরসে, ক্ষণগৌরবে নবযৌবনা বরষা, শ্যামগম্ভীর সরসা।”
শরৎকালে নানান উৎসব, পার্বনে মেতে থাকে বাঙালি। একটি নাটিকার মধ্য দিয়ে “শারোদৎসব” নামটি তিনিই প্রথম চয়ন করেন। তাঁর লেখা নানান সংগীতের মধ্য দিয়ে শরতের এক অপূর্ব রূপ ধরা পড়েছে –শস্যখেতে চলেছে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি খেলা। ধানের শারদলক্ষ্মীর আহ্বানে বাঁধা হয়েছে কাশের গুচ্ছ। গাঁথা হয়েছে শেফালী মালা। শিউলি তলার পাশে ঝরা ফুলের রাশি রয়েছে পড়ে। আর শিশিরভেজা ঘাসে সূর্যালোকের যে দৃশ্য দেখা যায়, তা সত্যিই নয়ন ভোলানো। শরৎকালে প্রকৃতির যে বিশেষরূপ কবির চোখে ধরা পড়েছিল, তা অনিন্দ্যসুন্দর ও মনোহর।
বর্ষার মতো বসন্তও কবিকে বারে বারে দিয়েছে ডাক। বসন্তের অসংখ্য সঙ্গীতে পলাশ ও অশোক ফুলের রাঙা হাসিতে নবীন পাতায় যেন লাগে হিল্লোল। কবির নানান কবিতা ও গান থেকে আমরা জানতে পারি –নতুন ফুলের দাক্ষিণ্য চেয়ে মৌমাছির দল গুঞ্জন মুখরিত। নরম ঘাসে, সদ্য ফোটা ফুলে দোল খায় প্রজাপতি। বসন্তের পলাশের নেশা ও চাঁপা ফুলের গন্ধে মিশে যায় পারুলের হিল্লোল ও শিরীষের হিন্দোল। ফাগুন পূর্ণিমায় যখন বনে বনে ধরল মুকুল, তখন সন্ধ্যাবেলার চামেলী আর সকালবেলার মল্লিকা তরুণ করবীকে কবি আহ্বান জানিয়েছেন। ফাল্গুনের পরিচয় দিতে গিয়ে কবি লিখছেন –মল্লিকামাল্যে কোমল কিশলয় বসনে সজ্জিত মূর্তির কথা। সুন্দর বসন্তকে উদাত্ত কন্ঠে আহ্বান জানিয়েছেন –যৌবন বেগে দীপ্ত বীর আমাদের এই বসন্ত। নবতেজে দুর্মদ। যখন বসন্ত জাগ্রত দ্বারে তখন কবি লিখছেন, ব্যাকুল বসুন্ধরা আকাশে কারোর পথ চেয়ে সজ্জিত হচ্ছে। এই সংগীত মুখরিত গগনে আপন-পর ভুলে হৃদয়কে মেলে ধরছে। বসন্তকালের নানান রকমের ফুল সম্পর্কে লিখছেন –“বসন্তে বসন্তে তোমার কবিরে দাও ডাক।” কবির সুরে সুর মিলিয়ে ঋতু পর্যায়ের কবিতাগুলো আমাদের মননেও দেয় দোলা। ঝংকার ওঠে হৃদয়ে। আমরা হারিয়ে যাই প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের কাছে। ফুলের কাছে, ফলের কাছে, শিশির ভেজা ঘাসের কাছে। এটাই তো রবীন্দ্র সংগীতের আসল মহিমা, ব্যঞ্জনা এবং সার্থকতা মানব জমিনে।
আমাদের ভোগের পৃথিবীতে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে ভাবা সকলে মনে করেন, জগত দুই বিচ্ছিন্ন বস্তু। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন –“তার সঙ্গে আমাদের নাড়ির রক্ত চলাচলের যোগ রয়েছে। সমগ্র বিশ্বচরাচরের সঙ্গে আমরা একই ছন্দে বসানো। এই ছন্দের যেখানে যতি পড়ছে, সেখানেই প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে। প্রকৃতির সমস্ত অণুপরমাণু যদি আমাদের স্বগোত্র না হত, যদি প্রাণে সৌন্দর্যে এবং নিগুঢ় একটা আনন্দে অনন্তকাল স্পন্দমান হয়ে না থাকত, তাহলে কখনোই এই বাহ্যজগতের সংসর্গে আমাদের এমন একটা আন্তরিক আনন্দ ঘটত না।” তিনি আরও বলছেন – “অন্যায়পূর্বকভাবে প্রকৃতিকে জড়পদার্থ বলে থাকি। কিন্তু এই জড়ের সঙ্গে আমাদের চেতনার একটা গভীর যোগাযোগের গোপন পথ আছে। নইলে কখনোই নিজের প্রতি, জীবনের প্রতি অন্তরের এমন একটা অনিবার্য ভালোবাসার বন্ধন থাকতেই পারেনা। বিশ্বের ক্ষুদ্রতম পরমাণুর বাস্তবিক কোন জাতিভেদ নেই। সেজন্যেই এই জগতে আমরা একত্রে স্থান পেয়েছি। নইলে আমাদের উভয়ের জন্য দুই ভিন্নজগৎ সৃষ্টি হয়ে উঠতো।” এটাই তো স্বার্থকনামা সাহিত্যিকের উন্নত চেতনা। প্রকৃতির প্রতি গভীর উপলব্ধি।
অসংখ্য ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি জগতের নিজস্ব 'নগ্ন সৌন্দর্য’ ও অনির্বচনীয় মাধুর্য অত্যন্ত সুক্ষভাবে তুলে ধরেছেন। ছোটগল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি প্রকৃতির রূপকে চাক্ষুষ করেন।
পরের পর্বে আমরা আলোচনায় আনবো –রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ছোটগল্পের সাতকাহন ও পরিবেশ ভাবনা।