পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

প্রাচীন ভারতের রূপকল্পে মহাগজ

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : মুকুট তপাদার
হাতিকে কেন্দ্র করে কেবল রাজকীয় শক্তির প্রকাশ ঘটেনি, বরং গভীর আধ্যাত্মিক এবং অনুভূতিমূলক শিল্পকর্মও সৃষ্টি হয়েছে। তেমনই এক অনন্য টেরাকোটা মোটিফ হলো ‘নবনারীকুঞ্জ’। তাছাড়া টেরাকোটা চিত্রে হাতির প্যানেল ও শিকারের দৃশ্যে হাতির বিবরণ উঠে আসে। বাংলায় বিষ্ণুপুর, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমানে এমন টেরাকোটা চিত্র পাওয়া যায়।

প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে হাতির স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাতি কেবল একটি সাধারণ পশু নয়; এটি শক্তি, সমৃদ্ধি, রাজকীয়তা ও নান্দনিকতার এক বিশেষ প্রতীক। প্রাচীন মন্দির, ভাস্কর্য এবং টেরাকোটা শিল্পে হাতির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে মানুষের সঙ্গে এই বিশাল আকার প্রাণীর আত্মিক যোগাযোগ কতটা গভীর ছিল।

সপ্তম থেকে অষ্টম শতাব্দীতে শৈলোদ্ভব রাজবংশের রাজত্বকালে গজ সিংহ শৈলীর বহুল ব্যবহার দেখা যায়। ওড়িশার ভুবনেশ্বরে অবস্থিত বিখ্যাত পরশুরামেশ্বর মন্দিরে এই ভাস্কর্যের চমৎকার নিদর্শন আছে। মন্দিরটি নাগারা এবং কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য স্থাপত্য শৈলী। এই ভাস্কর্যে সিংহ রাজকীয় ক্ষমতা এবং হাতি অপরিসীম শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। রাজারা নিজেদের প্রভাব ও পরাক্রম প্রকাশ করার জন্যই মন্দির গায়ে এই ধরনের প্রতিকৃতি খোদাই করতেন। শুধু পরশুরামেশ্বর নয় রাজারানী মন্দির, মুক্তেশ্বর মন্দির ও উড়িষ্যার বিভিন্ন মন্দির স্থাপত্যে গজ সিংহ পাওয়া যায়। সাধারণত মন্দিরের প্রবেশদ্বারের দুই পাশে এই কাজটি দেখা যায়। তবে সব থেকে পুরনো শৈলীর মধ্যে পরশুরামেশ্বরকেই বলতে হবে। তাছাড়া লতা পাতা নকশার সঙ্গে হাতি ও অন্যান্য জীবজন্তুর মোটিফ মন্দিরের গায়ে দেখা যায়। বৌদ্ধ ধর্মে হাতি শক্তি, ধৈর্য, ও মানসিক সংযমের এক প্রতীক। মৌর্য সাম্রাজ্যে হাতি ছিল রাজকীয় ক্ষমতা। অশোকের হস্তীমুণ্ডক স্তম্ভটি আজও অবশিষ্ট আছে গয়ার মহাবোধি মন্দিরে।

হাতিকে কেন্দ্র করে কেবল রাজকীয় শক্তির প্রকাশ ঘটেনি, বরং গভীর আধ্যাত্মিক এবং অনুভূতিমূলক শিল্পকর্মও সৃষ্টি হয়েছে। তেমনই এক অনন্য টেরাকোটা মোটিফ হলো ‘নবনারীকুঞ্জ’। তাছাড়া টেরাকোটা চিত্রে হাতির প্যানেল ও শিকারের দৃশ্যে হাতির বিবরণ উঠে আসে। বাংলায় বিষ্ণুপুর, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমানে এমন টেরাকোটা চিত্র পাওয়া যায়।

নবনারীকুঞ্জ শিল্পকর্মে নয়জন নারী বা গোপী অতি নিপুণভাবে একে অপরের সঙ্গে মিলে একটি হাতির রূপ ধারণ করেন। আর সেই কাল্পনিক হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে পরম আনন্দে বাঁশি বাজান শ্রীকৃষ্ণ। এটি কেবল এক দৃশ্য নয়, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর মানবীয় তত্ত্ব। নয়জন নারী মূলত মানুষের ভেতরের নয়টি মূল আবেগ বা অনুভূতি (নবরস) প্রকাশ করে: হাসি (হাস্য), দুঃখ (করুণ), প্রেম (শঙ্গার), রাগ (রৌদ্র), সাহস (বীর), ভয় (ভয়ানক), ঘৃণা (বীভৎস), বিস্ময় (অদ্ভুত), শান্তি (শান্ত) এই নবরস মিলেই মানুষের জীবন গড়ে ওঠে। সমস্ত অনুভূতি ও আবেগ যখন একসাথে মিলেমিশে একসূত্রে বাঁধা পড়ে, তখনই তা পরমেশ্বরের বাহন। যে হাতি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য এবং ভাবাবেগের সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িত, সেই হাতিই আজ মারাত্মক সংকটের মুখে। মানুষের অসচেতনতা ও লোভের কারণে প্রকৃতি থেকে হাতি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

 

বন-জঙ্গল কেটে বসতি ও কারখানা গড়ে তোলার ফলে হাতির স্বাভাবিক বসবাসের জায়গা কমে যাচ্ছে। খাদ্যের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে চলে এলে মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে, যা প্রায়শই হাতির মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হাতির দাঁতের বেআইনি ব্যবসা, ট্রেনের ধাক্কা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বহু হাতি প্রাণ হারাচ্ছে। হাতিকে বনের ‘বাস্তুতন্ত্রের প্রকৌশলী’ বা Ecosystem Engineer বলা হয়। একটি হাতির অস্তিত্বের ওপর পুরো বনের গাছের বিস্তার এবং অন্যান্য ছোট পশুপাখির বেঁচে থাকা নির্ভর করে। হাতি বিলুপ্ত হলে আমাদের বন ও পরিবেশের ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। তাই হাতি সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। উচিত হাতির চলাচলের পথ (Elephant Corridor) সুরক্ষিত রাখা। চোরাশিকার বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা। স্থানীয় মানুষদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা যাতে মানুষ ও হাতি শান্তিতে সহাবস্থান করতে পারে। আদিবাসী পোড়ামাটি দিয়ে হাতিকে (বোঙা হাতি) পুজো করেন। 

আমাদের প্রাচীন শিল্প ও সংস্কৃতি আমাদের শেখায় যে প্রকৃতি ও প্রাণীকূলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা মধুর ছিল। মন্দিরের গজ-সিংহ ভাস্কর্য কিংবা নবনারীকুঞ্জ মোটিফ—প্রতিটি শিল্পকর্মেই হাতির উপস্থিতি আমাদের গৌরবান্বিত ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয়।

0 Comments

Post Comment