পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মাতৃবন্দনা ৫

  • 26 October, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 171 view(s)
  • লিখেছেন : শামিম আহমেদ
যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র, ভীম কামকে বেশি গুরুত্ব দেন কিন্তু অর্জুন বেশ পণ্ডিত মানুষ, তিনি বলছেন অর্থই হল পরম পুরুষার্থ। অপার্থিব ধনের কথা ঋষিরা ভাবতে পারেন। অর্জুনের মতে, পণ্ডিতরা যাকে ধর্ম বলে মনে করেন তার উদ্ভব ধন থেকেই। ক্ষমতাশালী যাকে ধনে মারে তাকে প্রাণেও মারে এবং তার ধর্মও হরণ করে। অর্থ থেকেই ধর্ম, কাম ও স্বর্গ আসে। আজ দশমী আজ ৫ম ও শেষ পর্ব।

দেবী দুর্গা মহাদেবের পত্নী। অনুশাসনপর্বে উমামহেশ্বর-সংবাদে এই সিদ্ধান্ত রয়েছে—দেব্যা প্রণোদিতো দেবঃ কারুণ্যার্দ্রীকৃতেক্ষণঃ। শল্যপর্বে তিনিই শৈলপুত্রী—শৈলপুত্র্যা সহাসীনম্। হিমালয়ের কন্যারূপে দেহধারণ করেছিলেন বলে তিনি শৈলপুত্রী।

এই সব কথা পড়ে, বিশেষত দর্শন ও সংস্কৃতির নানা শাখা অবলোকন করে বোঝা যায়, দেবী দুর্গা একক কোনও শক্তি নন। তিনি এই জগতের নানা শক্তির সমাহার। তাই ভক্তরা তাঁকে শক্তির দেবী হিসাবে পূজা করেন। এই শক্তি শুভ। বৈদিক সাহিত্যেও দুর্গার নানা উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সেই সব তত্ত্বকথা আধিবিদ্যক। সাধারণ মানুষ সেই বৈদিক সাহিত্যের সহজ রূপ পুরাণে দেবীর সম্যক পরিচয় পেতে পারেন। দুর্গার সবিশেষ আলোচনা ও পূজাবিধি রয়েছে ভারতীয় তন্ত্র ও পুরাণে। যে সমস্ত পুরাণ ও উপপুরাণে শক্তির দেবী দুর্গা সম্পর্কে আলোচনা আছে, সেগুলি হল: মৎস্যপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণ, দেবীপুরাণ, কালিকাপুরাণ ও দেবী-ভাগবত। তিনি জয়দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, গন্ধেশ্বরী, বনদুর্গা, চণ্ডী, নারায়ণী প্রভৃতি নামে ও রূপে পূজিতা হন। তিনি যে একক শক্তি নন, সকলের মিলিত শক্তি তা পুরাণ পাঠ করলে বোঝা যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরকে নিবৃত্ত করার জন্য ব্রহ্মা দ্বিতীয় বার দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামক এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে মহাদেব সঙ্কটে পড়লে তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গাপূজা। তার পর থেকে নানা রকম যন্ত্রণা, সঙ্কট, দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন শক্তির আরাধনার প্রচলন হয়। এই শক্তির সম্মিলিত রূপই দেবী দুর্গা। মজার ব্যাপার, শক্তির এই রূপকে শিবের নারী-অংশ বলা হচ্ছে যার পূজা করছেন ব্রহ্মা ও বিষ্ণু। মহাদেবও সঙ্কটমোচনের জন্য তাঁর শরণ নেন। দেবীকে কেন্দ্র করে শৈব-বৈষ্ণবদের যেমন একটি সমন্বয় ঘটেছে, তেমনি ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরেরও এক ও অদ্বিতীয়া আরাধ্যা হয়ে উঠেছেন দুনিয়া জাহানের শক্তিরূপিনী নানা প্রকৃতি।

 

আর একজন মা হলেন দেবী সরস্বতী। বেদে সরস্বতী হলেন জ্যোতির্ময়ী অধিষ্ঠাত্রী দেবী। গঙ্গা দেবী যেমন নদী, সুর্য দেবতা যেমন অগ্নিপিণ্ডও তেমনি সরস্বতী একটি নদীও। এই নদীর মাধ্যমে দেবী দেশকে উর্বর করতেন, সমৃদ্ধি আনতেন, দেশের অর্থ সম্পদ বাড়াতেন। বেদে সরস্বতী বাগদেবী নন। এই নদীর তীরে সারা বছর বেদধ্বনি হত বলে কালক্রমে তটিনী বাগদেবীর আবাসস্থল বলে পরিগণিত হয়।

দেবী সরস্বতীর উৎপত্তি বিষয়ে পুরাণে নানা কথা আছে। কোথাও বলা হয়েছে, তিনি পরমাত্মার মুখ থেকে নির্গত, তিনি স্বয়ং বাক। দেবী শুক্লবর্ণা, তাঁর হস্তে বীণা। তিনি দেবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা। কবিদের ইষ্টও তিনি। ঈশ্বরের ইচ্ছায় প্রধান শক্তি সৃষ্টিকালে পাঁচ ভাগে ভাগ হয়ে যায়—রাধা, পদ্মা, সাবিত্রী, দুর্গা ও সরস্বতী। মহাভারত বলে, জগতে সরস্বতীর প্রথম পূজা করেন সর্বকালের বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। কোথাও বলা হয়েছে, দেবী শ্রীকৃষ্ণ থেকে উদ্ভূতা। এই দেবী পরে শ্রীকৃষ্ণকেই কামনা করেন। তখন কৃষ্ণ দেবীকে নারায়ণের পূজা করতে বলেন। দেবীভাগবত অনুসারে, সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বলে, সরস্বতী ব্রহ্মার কন্যা এবং লক্ষ্মী ও সরস্বতী দুজনেই নারায়ণের স্ত্রী। আবার ‘শব্দমালা’ অনুযায়ী ব্রহ্মার পত্নী ব্রহ্মাণী। এই ব্রহ্মাণী ব্রহ্মার শরীর থেকে জাত। পরমাত্মার মুখ থেকে নির্গত বলে সরস্বতী বাক্যের দেবী। বাক্য হল সার্থক পদসমষ্টি। পদ কী? যা শক্তিবিশিষ্ট তাকে পদ বলে। শক্তি হল পদ ও তার অর্থের সম্বন্ধ। মহাভারত বলছে, সসৃজে দণ্ডনীতি সা ত্রিষু লোকেষু বিশ্রুতা—সরস্বতী দণ্ডনীতির সৃষ্টি করেছিলেন। মহাকাব্যের প্রত্যেক পর্বের শুরুতে ‘নারায়ণং নমস্কৃত্য’ প্রভৃতি শ্লোকে দেবী সরস্বতীকে বন্দনা করা হয়েছে—দেবীং সরস্বতীঞ্চৈব ততো জয়মুদীরয়েৎ। সরস্বতীর সঙ্গে দুটো বিষয় খুব গভীরভাবে সম্পৃক্ত—একটি হল নিরুক্ত (semantics) এবং অন্যটি দণ্ডনীতি যাকে আমরা politics বলতে পারি। পদ ও তার অর্থের সম্পর্ক সাধারণত সিমান্টিক্সে আলোচিত হয়। কোন শব্দ বা পদ দিয়ে কোন অর্থ বুঝবো তাকে এই ভাবে বায়বীয় শক্তি দিয়ে বোঝার মধ্যে এক ধরণের রাজনীতি আছে। সে নিয়ে প্রচুর তত্ত্ব ও কথাবার্তা রয়েছে।

শাস্ত্রের যে দণ্ডনীতি তা কেমন ধরণের রাজনীতি? পুরাণ বলে, দেবী সরস্বতী এই দণ্ডনীতির সৃষ্টি করেছিলেন। সাধারণত চার বিদ্যার কথা শাস্ত্রে পাওয়া যায়—আন্বীক্ষিকী, ত্রয়ী, বার্তা ও দণ্ডনীতি। আন্বীক্ষিকী হল যুক্তিবিজ্ঞান। ত্রয়ী হল তিন বেদ, বার্তা অর্থনীতি এবং দণ্ডনীতি হল রাজনীতি।  আচার্য মনু যুক্তিবিজ্ঞানকে স্বতন্ত্রভাবে মানেননি। তিনি তিন বিদ্যার সমর্থক-- ত্রয়ী, বার্তা ও দণ্ডনীতি। যুক্তিবিজ্ঞানের বিষয়টি তাঁর মতে এই ত্রয়ীর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ কিনা বেদের যুক্তি তাঁর কাছে শিরোধার্য। কিন্তু বেদ তো শব্দ-প্রমাণ। তাঁকে বহু ক্ষেত্রে নির্বিচারে মেনে নিতে হয়। যুক্তিবিজ্ঞান নির্বিচারবাদের ঘোর বিরোধী। দেবতাদের গুরু আচার্য বৃহস্পতি আন্বীক্ষিকী ও ত্রয়ী দুটিকেই মানেননি। দেবগুরু বার্তা ও দণ্ডনীতি এই দুই বিদ্যা মেনেছেন। তাঁর অভিমত, অর্থনীতি ও রাজধর্ম জানলে যুক্তিবিজ্ঞান বা তিন বেদকে পৃথক বিদ্যা মানা নিষ্প্রয়োজন। এই দুই বিদ্যা—অর্থনীতি ও রাজনীতি সব কিছুর নিয়ামক। অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বিদ্যার সংখ্যা এক, এবং সেটি হল দণ্ডনীতি। একত্ববাদী শুক্র তার কারণ হিসেবে জানিয়েছেন, ত্রয়ী, বার্তা ও আন্বীক্ষিকীর উৎস হল দণ্ডনীতি বা রাজনীতি যা সৃষ্টি করেছিলেন দেবী সরস্বতী। এত ক্ষণ পদ ও পদার্থের সম্পর্ক নিয়ে যা বলা হচ্ছিল তাকে ত্রয়ীর অন্তর্ভুক্ত করে বিবেচনা করলে রাজনীতির বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

শব্দ বা পদ কিংবা বাক্য দিয়ে কোন অর্থ বুঝবো তা যেমন শেষমেশ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে তেমনি যুক্তিশাস্ত্র, ত্রয়ী, অর্থনীতি সব কিছুর অন্তিম নিয়ন্ত্রক হল রাজনীতি বা দণ্ডনীতি। দণ্ডনীতি বলতে শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত যে কোনও নীতিকে বোঝায়। শাসন হল উপদেশ, দমন, নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি। নীতি হল নৈতিকতা, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি; ন্যায়, সাম-দান ইত্যাদি। বার্তা বা অর্থনীতিকে তাই এক কালে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলা হত। অর্থনীতির বিবর্তন ঘটেছিল প্রধানত নীতিশাস্ত্রের শাখা হিসাবে। অর্থনীতির যে দুটো উৎস—নৈতিকতা ও যন্ত্রবিদ্যা তাদের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ আছে। সর্বোপরি, অর্থনীতির সঙ্গে মানুষের লক্ষ্যের বা মানবকল্যাণের যোগ রয়েছে। রাজনীতি পরম শিল্প। অর্থনীতি চূড়ান্তে এসে যোগ হয় নীতিশাস্ত্র ও রাজনীতির চর্চার সঙ্গে। আমাদের দেশে যে চার পুরুষার্থের কথা বলা হয় তার প্রথমটি হল ধর্ম বা নীতি। ‘ধর্ম’ শব্দের একটি অর্থ হল যা ধন প্রদান করে। রাজধর্ম বা রাজনীতিও কিন্তু ধন প্রদান করে। ‘ধন’ শব্দ দিয়ে পার্থিব ও অপার্থিব দু প্রকার ধনকেই বুঝতে হবে। ক্ষত্রিয়রা মোক্ষের কথা ভাবে না। তাদের কাছে তিনটি পুরুষার্থ—ধর্ম, অর্থ ও কাম। যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র, ভীম কামকে বেশি গুরুত্ব দেন কিন্তু অর্জুন বেশ পণ্ডিত মানুষ, তিনি বলছেন অর্থই হল পরম পুরুষার্থ। অপার্থিব  ধনের কথা ঋষিরা ভাবতে পারেন। অর্জুনের মতে, পণ্ডিতরা যাকে ধর্ম বলে মনে করেন তার উদ্ভব ধন থেকেই। ক্ষমতাশালী যাকে ধনে মারে তাকে প্রাণেও মারে এবং তার ধর্মও হরণ করে। অর্থ থেকেই ধর্ম, কাম ও স্বর্গ আসে। দারিদ্র জীবনের মহাপাপ। শব্দ নিয়ে রাজনীতি এবং রাজধর্ম অর্থাৎ দণ্ডনীতি বা রাজনীতি নিয়ে নীতিশাস্ত্রের কথা চলতে থাকুক। যদিও সমস্ত আলোচনা গুলিয়ে যেতে থাকে। গুলিয়ে দেওয়া হয়। স্বাভাবিক। গুলিয়ে গেলে রাজনীতিরই সুবিধা।

দেবী সরস্বতী আমাদের সুবুদ্ধি দিন। 

ছবি --- আনখ সমুদ্দুর।

মাতৃবন্দনা প্রথম পর্ব ---https://www.sahomon.com/welcome/singlepost/worshipping-the-mother-part-1

মাতৃবন্দনা দ্বিতীয় পর্ব---https://www.sahomon.com/welcome/singlepost/worshipping-the-mother-part-2

মাতৃবন্দনা তৃতীয় পর্ব---https://www.sahomon.com/welcome/singlepost/worshipping-the-mother-part-3

মাতৃবন্দনা চতুর্থ পর্ব---https://www.sahomon.com/welcome/singlepost/worshipping-the-mother-part-4

 

 

0 Comments

Post Comment