প্রেক্ষাপট
ইদানীং বাঙালি জাতিসত্ত্বার ওপর বিজেপি/আরএসএস পরিচালিত ব্রাহ্মণ্যবাদী ফ্যাসিবাদের আক্রমণ বেড়ে উঠছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি শ্রমিকদের বাংলাদেশী তকমা দিয়ে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, এমনকি মব আক্রমণ শুরু হয়েছিল যা এখনও কম তীব্রতায় চলছে। বাঙালিদের খাদ্যাভাসের ওপর আক্রমণ সমান তালে চলছে। উত্তর ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল নিরামিষ ভোজন, যা এখন বাঙালিদের ওপর চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। এই প্রচেষ্টা শুধু বাঙালিদের ক্ষেত্রেই নয়, দক্ষিণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রেও চলছে। ইদানীং শুরু হয়েছে বাংলার নবজাগরণ নিয়ে পুরোদস্তুর অজ্ঞ বিজেপি নেতাদের হাস্যকর সব বিবৃতি। সম্প্রতি রাজা রামমোহন রায়কে ব্রিটিশের দালাল বলে পাদপ্রদীপের আলোয় নিজেকে নিয়ে এসেছেন এক মধ্যপ্রদেশীয় বিজেপি মন্ত্রী। আবার, ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিজেপি যে আদেখলাপনা শুরু করেছে তার অংশ হিসাবে তারা বলতে শুরু করেছে যে, জাতীয় স্তোত্র হিসাবে ‘বন্দে মাতরম’ থেকে দুর্গাবন্দনার অংশটি বাদ দিয়ে কংগ্রেস যে অন্যায় করেছিল তারা তার প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে উক্ত অংশটিকে ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ! ইদানীং আবার শুরু হয়েছে বাঙালিদের মধ্যে অনেকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ –--- এই সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়ার খেলা। বাংলার ভোটার লিস্ট পরিবর্তন করে বাংলার মসনদ দখল করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। সব মিলিয়ে বাংলা এবং বাঙালি নিয়ে বিজেপির সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অব্যহত আছে। এমতাবস্থায়, কমিউনিষ্টদের অবস্থান কী হবে তাই নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রচুর বিভ্রান্তি এবং ফলত, মৌনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুতরাং, বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রশ্নটিকে কমিউনিষ্ট দৃষ্টিকোন থেকে আমাদের বিচার করে দেখা দরকার। সেই লক্ষ্যেই এই লেখার অবতারণা।
কমিউনিষ্টদের বিভ্রান্তি
ভারতবর্ষের কমিউনিষ্টদের অধিকংশই মার্কসবাদ বলতে অর্থনীতি বোঝেন। শ্রেণি বলতে উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে বিপরীত অবস্থানে থাকা দুই দল মানুষকে বোঝেন। শ্রেণিস্বার্থ বলতে শুধুমাত্র খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি সম্পর্কিত স্বার্থকেই বোঝেন। শ্রেণিসংগ্রাম বলতে পেটের জন্য সংগ্রামকেই শুধু বোঝেন। মার্কসবাদকে এভাবে খন্ডিতভাবে বোঝা আসলে প্রকৃতি ও সমাজের জটিলতা ও ব্যাপকতাকে বোঝার ক্ষেত্রে তাঁদের মস্তিষ্কের অপারগতাকেই যে নির্দেশ করে সে সম্পর্কেও তাঁরা সচেতন নন। ফলে, লিঙ্গ প্রশ্ন, জাতিবর্ণ প্রশ্ন, জাতিসত্ত্বার প্রশ্ন —- এসবই তাঁদের গভীর চর্চার বাইরে থেকে গেছে। তার ওপর আছে ফর্মুলার প্রাদুর্ভাব। একবার একটি শর্টকাট ফর্মুলা পকেটস্থ করে নিয়ে তাই দিয়েই তাঁরা তাঁদের সমস্ত রণনীতি এবং রণকৌশল নির্ধারণ করে নিতে চান। এসবের ফলে বাঙালি কমিউনিষ্টরা কখনই বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করেন নি বা সেই সংক্রান্ত লড়াই গড়ে তোলার চেষ্টাও করেন নি।
অথচ, ভারতবর্ষের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত এমন কোনো অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে নি যারা বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে ভয় করে নি। এর বহুবিধ কারণ আছে যার বিস্তারিত আলোচনায় ঢোকার অবকাশ এই লেখায় নেই। কিন্তু প্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গদেশ নানা কারণেই বিশিষ্ট। এই অঞ্চলের উর্বর জমি, সমুদ্র সন্নিহিত হবার ফলে বন্দরের সুবিধা, উন্নত অর্থনীতি, উন্নত সংস্কৃতি, তদুপরি তার স্বাধীনতা আকাঙ্খা বরাবরই শাসকদের কাছে ত্রাস হয়ে দেখা দিয়েছে। এর মানে এই নয়, বাঙালি জাতিসত্ত্বার মধ্যে খারাপ কিছু নেই। অবশ্যই আছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রগতিশীল সংগ্রামও বাঙালি জাতিসত্ত্বার বৈশিষ্ট্য। বাঙালি কমিউনিষ্টরা অনেক সময়েই এটা বুঝে পান না যে, বাঙালি জাতিসত্ত্বা নিয়ে গর্ববোধ করা আদৌ বাঙালি কমিউনিষ্টদের শোভা দেয় কি না। ব্যাপারটা ভালো না কি জাতিদম্ভবাদী –---- এই সংশয় তাঁদের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে আছে। বাঙালি জাতিসত্ত্বার মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য ভারতের শাসকরা বারেবারেই বাঙালিদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে থাকে অধিকাংশ বাঙালি কমিউনিষ্টরাই তাতে গা ভাসিয়ে নিজেদের জাতিদম্ভবাদী হিসাবে অ-প্রমাণ করার আত্মঘাতী প্রচেষ্টা নিয়ে থাকেন তা আমরা সকলেই জানি।
এখানে আমি প্রথমেই লেনিনের একটি লেখা থেকে একটি অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করব এটা দেখানো জন্য যে জাতীয় গর্ববোধ প্রসঙ্গে তাঁর কী মনোভাব ছিল। “বড়-রুশীদের জাতীয় গর্ববোধ” নামের একটি ছোট্ট প্রবন্ধে লেনিন লিখেছিলেন নিচের কথাগুলো :
“জাতীয় গর্ববোধ কি আমাদের, বড়-রুশী শ্রেণীসচেতন প্রলেতারিয়ানদের কাছে পরধর্ম? নিশ্চয়ই নয়! আমাদের স্বভাষা ও স্বদেশকে আমরা ভালোবাসি, স্বদেশের মেহনতী জনগণকে (অর্থাৎ স্বদেশের জনসংখ্যার ৯/১০ ভাগকেই) গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উন্নীত করার জন্য আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা। আমাদের এই অপূর্ব দেশের ওপর জারতন্ত্রী জল্লাদ, অভিজাত আর পুঁজিপতিরা যে কী জুলুম, নিপীড়ন আর লাঞ্চনা হেনেছে তা দেখে, তা অনুভব করে কষ্ট লাগে আমাদেরই বেশি। আমাদের গর্ব এই যে, এ জুলুমের প্রতিরোধ জেগেছে আমাদের মধ্য থেকে, বড়-রুশীদের মধ্য থেকেই, এরই মধ্য থেকেই এসেছেন রাদিশ্চেভ, ডিসেম্বরীরা, এসেছেন অষ্টম দশকের বিপ্লবী রাজনোচিনেৎসরা, গর্ব এই যে, বড়-রুশী শ্রমিক ১৯০৫ সালে বানিয়ে তুলেছে এক পরাক্রান্ত বিপ্লবী গণ পার্টি, এবং ঐ সময় থেকেই বড়-রুশী চাষী হয়ে উঠতে শুরু করেছে গণতন্ত্রী, উচ্ছেদ করতে আরম্ভ করেছে পুরোহিত ও জমিদারদের।”
লেনিনের একটি দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিতে হল এটা দেখানো জন্য যে কমিউনিষ্টদের কাছে জাতীয় গর্ববোধ কোনো “পরধর্ম” নয় —- এ বিষয়ে লেনিনের ভাবনাচিন্তা কতটা পরিষ্কার ছিল তা দেখানোর জন্য। অথচ বাঙালি কমিউনিষ্টদের বাঙালি ঐতিহ্য নিয়ে কোনো গর্ববোধই নেই। ফলে প্রশ্নটা যখনই আসে জাতীয় নিপীড়ন ও জাতীয় হেনস্থার তখন বাঙালি কমিউনিষ্টরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই নিতে পারেন না। পুরো লড়াইটাই ছেড়ে দেওয়া হয় তৃণমূল কংগ্রেস, জাগো বাঙালী বা বাংলা পক্ষের মত দক্ষিণপন্থী বা অ-বাম সংগঠনগুলির হাতে।
অথচ, বাঙালি কমিউনিষ্টরা লেনিনের মতই বলতে পারতেন যে, “আমরা গর্ববোধ করি বাঙালিদের মধ্যে থেকেই এসেছেন চৈতন্য, লালনের মত চিন্তাবিদরা, এসেছেন বহু বৌদ্ধ আচার্যরা, এসেছেন বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের মত ব্যক্তিরা যাঁরা যাঁরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে সকলেই ছিলেন বিপ্লবী”। বাঙালিদের মধ্য থেকেই এসেছেন অসংখ্য বিজ্ঞানীরা যাঁরা হিন্দু সমাজের ফতোয়া অগ্রাহ্য করে বিজ্ঞান চর্চা করেছেন, সমাজ-সংস্কার করেছেন। সমাজকে এগোতে সাহায্য করেছেন। বাঙালিদের মধ্যে থেকেই এসেছেন অসংখ্য ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী যাঁদের আত্মবলিদানের মধ্যে দিয়েই ভারত স্বাধীন হয়েছিল। বিপ্লবীর সংজ্ঞাটা খুব ছোট করে দেখার একটা প্রবণতা আছে ভারতের কমিউনিষ্ট আন্দোলনে যা শেষ পর্যন্ত এই বিশ্বাসেই অবতরণ করে যে সে একাই বিপ্লবী। বাকীরা সব অবিপ্লবী। এমনকি যে আন্দোলন শুধু নিজেকেই বিপ্লবী আখ্যা দেয় সেই একই আন্দোলনের মধ্যেকার ব্যক্তিরাও একে অন্যকে অবিপ্লবী বলে মনে করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত এক অদ্ভুত অবস্থা সৃষ্টি হয় যখন প্রতিটি ব্যক্তি শুধু নিজেকে বিপ্লবী ঠাওরায়, বাকীরা অবিপ্লবী হয়ে দাঁড়ায়। উল্টাদিকে লেনিনের ধারণা কত পরিষ্কার, কত বৃহত্তর ভিত্তিতে প্রোথিত (broad based) তা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। ভারতীয় তথা বাঙালি কমিউনিষ্টদের এই চিন্তার ক্ষুদ্রতা শেষ পর্যন্ত তাঁদের কর্মের ক্ষুদ্রতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাঙালি বিদ্বেষ
ভারতের সমস্ত শাসক শ্রেণি বাঙালি বিদ্বেষে জর্জরিত হয়েছে। এর কারণ নিহিত আছে ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালির প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতার মধ্যে। বাঙালিদের মধ্যে থেকেই এক সময়ে নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে জনতার মধ্যে থেকে রাজার উত্থান হয়েছিল যা ভূভারতে অভূতপূর্ব ছিল। এভাবেই যে পাল বংশের শাসনের সূচনা হয়েছিল তা প্রতিবাদী আদর্শ বৌদ্ধ আন্দোলনকেই তার মতাদর্শগত ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে। বাংলায় মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল পালদের হাত ধরে। স্বাভাবিকভাবেই উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকরা কখনই পূর্ব ভারতের এই বৌদ্ধ রাজবংশের শাসনকে ভালো চোখে দেখে নি। ফলত, পাল বংশের সাথে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শক্তির লাগাতার যুদ্ধবিগ্রহ চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত যখন পালদের পরাজিত করে সেন বংশ ক্ষমতায় আসে তখন ব্রাহ্মণ্যবাদ পূর্ব ভারতে জাঁকিয়ে বসে। প্রকৃতপক্ষে এর পর থেকেই বাংলায় এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের সূচনা হয়ে যায়। এমনিতেই বৈদিকরা প্রথম থেকেই বাংলার মানুষ ও সংস্কৃতিকে ঘৃণা করত। বেদে এই অঞ্চলের ভাষাকে ‘পাখির কিচিরমিচির শব্দ’’ (বায়াংসি) বলে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল। উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণদের পূর্ব ভারতে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কেউ কোনো কারণে এসে পড়লে তাকে ফিরে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হত। পরবর্তীকালে যখন সেনদের হাত ধরে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের সূচনা হয় তখন বাংলায় বর্ণজাতি প্রথা গড়ে ওঠে। বৌদ্ধরা ভূমিগত (আন্ডারগ্রাউন্ড) হতে বাধ্য হন। মধ্যযুগে লালন এবং চৈতন্যের নেতৃত্বে ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী এবং বর্ণজাতি বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। এখানে আরও একটা বিষয়ও হিসাবে রাখতে হবে। সেটা হল, বাংলার মাতৃকেন্দ্রিক আমিষভোজী তান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে পুরুষবাদী বৈদিক সংস্কৃতির দীর্ঘ এবং বিতৃষ্ণামূলক সংঘাতের সম্পর্ক আছে। এই দ্বন্দ্বগুলিকে তথাকথিত আধুনিকতা কখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখে না। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা করা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করা আধুনিক রাজনীতির কোনো ধারার পক্ষেই সম্ভব হয় না। কমিউনিষ্টরাও এর বাইরে নয়। তাদের তো আরও অধিক সমস্যা আছে। শ্রেণি রাজনীতির এক বিকৃত বোঝাবুঝি তাদের মধ্যে গড়ে ওঠার ফলে তারা এই বিষয়গুলো জানেন না, জানার চেষ্টাও করেন না, বোঝেন না বা বোঝার চেষ্টা করেন না। সম্প্রতি বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালিদের ওপর নির্যাতন, হামলা এবং হয়রানি শুরু হবার পর বাঙালি কমিউনিষ্টরা বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন নি। তারা তাদের সিলেবাসের বাইরে যেতে পারেন না। ফলে তারা বাঙালিদের ওপর আক্রমণটিকে শুধুমাত্র পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনা হিসাবেই দেখতে চাইলেন। তার বাইরে বৃহত্তর সত্যটিকে দেখতে পেলেন না।
ব্রাহ্ম সমাজের হাত ধরে বাংলায় যে নবজাগরণ হয় তার মর্মবস্তুর সাথেও বিজেপি বা আরএসএসের হিন্দুত্বের তীব্র বিরোধ আছে। প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মরা বাংলায় যাকে মূলত তীব্র আঘাতে ধরাশায়ী করেছিলেন তা হল ঐ উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্বের বাংলা সংস্করণটিকেই। গোঁড়া হিন্দু আচারের ফলেই এখানে তৈরি হয়েছিল বাল্যবিবাহ এবং সতীদাহের মত ঘৃণ্য প্রথা। মেয়েদের পর্দানশীন করে ঘরে আটকে রাখা, তাঁদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার কয়েক দশকের প্রথা ও ধারণাগুলি রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় দত্তদের তীব্র আন্দোলনে ধ্বসে পড়ে। ফলত, আজ রামমোহনকে যে মধ্যপ্রদেশের বিজেপি মন্ত্রী “ব্রিটিশের দালাল” বলবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যেখানে আরও মজার ঘটনা হল বিজেপির পিতৃসংগঠন আরএসএসের মত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি কখনই ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামে অংশ নেয় নি। এখন তাদের হাবভাব হল তারা কতই না স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে ভাবিত! যোগীর রাজ্য উত্তর প্রদেশে স্কুল কলেজের সিলেবাস থেকে রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলিকে এক এক করে বাদ দিয়ে সেখানে যোগীর নিজের লেখা আর বাবা রামদেবের লেখা ঢোকানো হচ্ছে। এই লেখা লিখতে লিখতেই দেখলাম, আজকাল নাকি সংসদে ‘'বন্দে মাতরম্” এবং “জয় হিন্দ্” স্লোগান দেওয়ায় নিষেধ আছে! এই দুটি স্লোগানের পেছনেই দুই বাঙালীর অবদান আছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি তাঁর একটি ভাষণে এর বিরোধিতা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে খোঁজ খবর করতে গিয়ে ইন্টারনেটে দেখতে পাচ্ছি গত বছর রাজ্যসভার সদস্যদের জন্য প্রকাশিত হ্যান্ডবুকে বলা হয়েছিল যে রাজ্যসভার গাম্ভীর্য রক্ষার জন্য সংসদের ভিতরে এবং বাইরে যেন ঐ সব স্লোগান না দেওয়া হয়। বিজেপির কাছ থেকে এসব অপ্রত্যাশিত নয় কিন্তু এক বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেসই বা কেন বিষয়টা সামনে আনে নি? আর বামেরাই বা কী করছিলেন? তাঁরাও কি ব্যাপারটা জানতেন না? নাকি জেনেও গুরুত্ব দেন নি? যত যাই হোক না কেন, এসব তো আর ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ নয়!
শেষের কথা
বামপন্থীদের ভেবে দেখার সময় এসেছে যে তত্ত্বায়নের ওপর দাঁড়িয়ে এক সময় তাঁরা এগিয়েছিলেন আজকে আর শুধু সেগুলি আউরেই তাঁরা এগোতে পারবেন কি না! যান্ত্রিক মার্কসবাদের সর্বোচ্চ প্রয়োগ ভারতবর্ষে ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। প্রচলিত ভাবনাচিন্তাকে আগাগোড়া প্রশ্ন করা, পুনর্মূল্যায়ন করা ছাড়া আর এক কদমও সামনে এগোনো যাবে না। বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রশ্নটিকে ধরে অনেক কার্যকর পথে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলিকে মোকাবিলা করা যেত। বাংলায় নিজেদের জমিকেও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো যেত। সেসব সম্ভাবনা হেলায় হারাচ্ছেন বামেরা। দুঃখের কথা এই যে, সেসবের বোধদয়ও তাঁদের নেই!