পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

'তিতুমীর' – প্রতিরোধের নাটক। প্রতিবাদের নাটক।

  • 30 August, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 2132 view(s)
  • লিখেছেন : সাদিক হোসেন
'তিতুমীর' নাটকটিতে বস্তুত দর্শক প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণ না করে তার উপায় নেই। কেননা অডিটোরিয়ামের প্রতিটি কোণ থেকে নাটকটি সঞ্চালিত হয়। কখনো উপর থেকে মই দিয়ে নিচে নামা, আবার উপরে ওঠা এই নিয়ে লেখা।

আমার কিশোরবেলার বিকেল-সন্ধে কেটেছে হুগলী নদীর ধারে। কখনো শিবমন্দিরের চাতালে, কখনো পরিত্যক্ত ইটখোলায়, বটগাছের ডালে পা ছড়িয়ে অথবা সূর্য নেবে যাবার পর নিবু নিবু আলোর ডুমে যখন নদী বৃদ্ধার মেদের মত থলথলে আর পারে বাঁধা নৌকোর গলুইয়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে ফিসফাস – যেন ষড়যন্ত্র - অথবা লম্ফের আলোয় কাঁপছে দূরের বসতি, রেডিওর গান, জন্মভূমি জন্মভূমি , হায় ইট-কাঠ-পাথরের ইতিহাস। অথবা এসব থেকে অনেক দূরের কোন ঘাটে, যেখানে আমি নেই , তবু ঠিক হয়ত তখনি শ্মশানঘাটে সদ্য নেড়া হওয়া ছেলেটার চুল খাবি খাচ্ছে, আর শ্মশানযাত্রীরা চায়ের দোকানে ভিড় জমিয়েছে, গরম গরম কচুরি পাওয়া যাবে, কিংবা সেই যে কবে এইখানে, ঠিক এইখানে এক আসমানি চাদর উড়িয়ে তিনি দেখা দিয়ে আবার গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন – তাঁর হাতে ছিল বল্লম, দু-চোখে সুরমা, চোখের ভেতরটা পাকা করমচার মত লাল – হ্যাঁ লাল – আর তারপর তিনি এলেন – যেমন পদাতিকরা এসেছিল কোন এক সময় – যেমন তারা ফি্রে গেছে - ফিরে ফিরে যায় – ফুলের মত, ফলের মত, শাক ও সব্জির মত – কেননা এই ঘন বরষায় প্রতিদিন কোন না কোন নৌকো থেকে ঠিক ঝকঝকে রুপালি মৎস উঠবেই – আর কেউ না কেউ সেই মৎস ঝুলিয়ে হা হা উল্লাসে ঘরে ফিরবেই – কেননা তখন আমাদের ঘর ছিল – নিবু নিবু আলো ছিল – ধোঁয়া ধোঁয়া দিগন্ত ছিল। ছিল; কিন্তু এখন নেই। এখন নেই; তাই, এখন তাকে উপস্থিত করতে গেলে আমাদের বহুদূর অব্দি এগিয়ে যেতে হবে। 'তিতুমীর' নাটকে মঞ্চের উপর দিগন্ত তৈরি হয়। সেই দিগন্ত আবার মাঝখান থেকে চীরে উপর-নীচ গভীরতা তৈরি হয় – তারা পরস্পরকে ভেদ করে, পরস্পরকে নাকচ করে, আবার একই সঙ্গে পরস্পর সহাবস্থান করে। হায়! আলো এমন রাজনৈতিক হতে পারে তা কেই বা জানত! এই আলো বহুদূর থেকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। ভাবতে ভালো লাগবে - এই আলো ছিল নক্ষত্রের। এই নাটকে আলো যত অলৌকিক হতে পেরেছে - প্রতিবাদ তত লৌকিক হতে পেরেছে।

কিংবা নক্ষত্রকে কেই বা জানে! আমরা তো জেনেছি চাষবাস, দিনাতিপাত, আম-খেঁজুরের খোঁজ – বটতলা, হালিশহর, মোকামগঞ্জ। আমরা জেনেছি সেইসব মানুষের হাঁটাচলা, গলা খাঁকারি দিয়ে কথা বলার অভ্যাস, তাদের ভাত, ডাল, তরিতরকারি, লম্ফের নিচে পিপীলিকার পাখনা - এই আমাদের জ্ঞান, এই আমাদের গায়েবি চাদর, এই চাদর উড়িয়েই আমরা আছি অথবা নেই; আমরা 'নেই' 'আছি'র সম্মিলিত আধার। সুতরাং, এইখানে আলো বার্তাবহ হলে তার ইশারা হয়ে ওঠে কুশীলব, আবার উল্টোটাও একই সঙ্গে ঘটে যায়।

আমরা দেখি তিতুমীরের নামভূমিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে। অথবা দেখি আমাদের মোল্লাপাড়ার রশিদ চাচাকে, হাবিব মিঞাকে। তারা তিতুমীরের সঙ্গে একাত্ম হতে পারছে অভিনেতার কথাবার্তায়, হাঁটাচলায়, রাগে ও কান্নায়। যেন এতদিন যারা মঞ্চে অনুপস্থিত ছিল – এইক্ষণে তারা শুধু যে উপস্থিত হতে পারছে তাই না, তারা প্রতিশোধও নিচ্ছে। অভিযোগ করছে। ফলে তাদের প্রতিটা মুদ্রা প্রতিরোধের ভাষ্য হয়ে ওঠে - আমরা সমকালকে চিনতে পারি।

কিংবা নির্দেশক তো নিজেই শববাহক এইখানে। তিনি সাম্প্রতিক শিল্পকর্মের শবকে বহন করছেন। শববাহক, তবু অচ্ছুৎ তিনি হতে পারলেন কই? কুশীলবের ইশারায় তিনি সাড়া দেন, মুহুর্তে তৈরি হয় ঢেউ-এর মত নাচ, নাচের মত আনন্দ , আনন্দের মত মুদ্রা। আর আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করি - ঐতো, ঐতো তিনি, যাকে অত দূরের মনে হত – তিনি তো আমাদেরই একজন – আমরা নিজেদেরকে মঞ্চে আবিষ্কার করি - আমরা মঞ্চের উপর নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করি।

'তিতুমীর' নাটকটিতে বস্তুত দর্শক প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। অংশগ্রহণ না করে তার উপায় নেই। কেননা অডিটোরিয়ামের প্রতিটি কোণ থেকে নাটকটি সঞ্চালিত হয়। কখনো উপর থেকে মই দিয়ে নিচে নামা, আবার উপরে ওঠা, কখনো আলো প্রক্ষেপণের অংশটি হয়ে ওঠে জমিদার বাড়ির জানালা, আবার পরমুহুর্তেই তা পরিণত হয়ে যায় লড়াকু মানুষের আস্তানায়। দর্শকের ভেতর থেকে উঠে আসে বিপ্লবীরা, আবার দর্শক নীরব জনমানব যেন; ভিন্ন অর্থে অচল, অনড়, স্থাবর!

এই নাটকে মঞ্চকে শুধু সামনে-পেছনে ভাগ করা হয়নি, ভাগ করা হয়েছে উপর-নিচেও। ফলে গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে তার বিস্তারও ঘটেছে। তার বিস্তার -ই গভীরতা - আবার গভীরতাই তার বিস্তারকে নিরূপণ করেছে। ফলে নাটকটির রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ পেয়ে যায় আলোতে, কুশীলবের হাঁটাচলায়-কথায়, মঞ্চের নির্মানে , সঙ্গীতে।

'তিতুমীর' আধুনিক সময়ের নাটক। 'তিতুমীর' চিরায়ত প্রতিরোধের আধুনিক ভাষ্য।

0 Comments

Post Comment