পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভয়

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 205 view(s)
  • লিখেছেন : নীহারুল ইসলাম
স্কুলে এলেই হামিদ ভয় পায়। বিশেষ করে স্কুলের ওই পরিত্যক্ত ঘরটা- যার পেছন দিকে সবুজ ঘাসে ঢাকা বিশাল গোরস্থান- মানুষ মরলে যেখানে মানুষের লাশ নিয়ে গিয়ে সবাই গোর দেয়। যখন ইস্কুলের পেছন দিকে পরিত্যক্ত ওই ঘরটার দিকে হামিদের চোখ যায়, গোরস্থানের ওপরেও তার দৃষ্টি পড়ে, তার বুকের ভেতরটা শূণ্য হয়ে যায়। কেমন যেন শিরশির করে ওঠে। কলিজা ঠান্ডা মেরে যায়। গলা শুকিয়ে আসে। ভয়ে সে তখন দোস্ত মতিকে জড়িয়ে ধরে।

এই মতিই তাকে একদিন ওই ঘরটার গল্প করে ছিল। বহুকাল আগে নাকি ওই ঘরের বারান্দায় কোথা থেকে একজন পাগলা এসে ডেরা গেড়েছিল। সেই যে এসে ডেরা গেড়েছিল তারপর সেখান থেকে সে না নড়ত, না চড়ত। কারও সঙ্গে কোনও কথা বলত না। কারও কিছু শুনত না। কী খেত না খেত তাও কেউ কোনও দিন দেখেনি। অথচ পাগলাটা সেখানে অনেকদিন ছিল। লোকে দেখেছিল। একদিন নাকি স্কুল চলাকালীন সেই পাগলা সবার সামনে ওই ঘরে ঢুকে স্বেচ্ছায় সমাধিস্থ হয়েছিল এই বলে, “ আমাকে তোরা কেউ বিরক্ত করবি না। এই ঘরই আমার কবর। এই ঘরেই আমি শুয়ে থাকব কেয়ামত পর্যন্ত। আমার বারযাখ কাল কাটবে এই ঘরে শুয়েই। খবরদার! কেউ আমাকে বিরক্ত করলে গাঁ-সুদ্দ সবাই মজা টের পাবি! ”

সেই থেকে আজ পর্যন্ত একজন ছাড়া আর কেউ ওই পাগলাকে বিরক্ত করেনি। তার জন্য গাঁ-সুদ্দ সবাই নয়, শুধু একজন চরম শাস্তি পেয়েছিল। লোকে দেখেছিল সেই শাস্তি। এমন কী হামিদও দেখেছিল। তারপর থেকে পাগলা ওই ঘরে দরজা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে। আর ওই ঘরটাও এতদিনে গোরস্থানেরই অঙ্গ হয়ে গেছে। পাগলা আর কারও কোনও ক্ষতি করেনি আজ পর্যন্ত, হামিদ তবু ভয় পায়। কীসের ভয় ? কেমন ভয়? হামিদ তা ব্যক্ত করতে পারে না। তবে বুঝতে পারে ভয়টা সাংঘাতিক! বুকের ভেতর শিরশির করে ওঠা, কলজে ঠান্ডা মেরে যাওয়া, গলা শুকিয়ে আসা- এসব চলতেই থাকে যতক্ষণ সে স্কুলে থাকে। ওই সময়টুকু তাও হয়ত সে স্কুলে থাকতে পারত না, যদি না তার মতি তার সঙ্গে থাকত! মতি তার সঙ্গে একই ক্লাসে পড়লেও বয়সে বেশ বড়। দেখতেও একেবারে ষন্ডাগন্ডা। স্কুলে সবসময় তার সঙ্গেই থাকে। সেই সাহসে তাই সে রোজ স্কুলে আসে। যদিও লেখাপড়ায় মন বসাতে পারে না। প্রথমে তার বিশ্বাস হয়নি মতির বলা পাগলার সেই গল্প। অবিশ্বাস নিয়ে বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল। মা বলেছিল, “ খবরদার বাপ হামার- ভুল করিও ওই ঘরের দিকে যেস ন্যা খো! যাবি কী, তাকাবি না পর্যন্ত! যে সে মানুষ ছিল না ওই পাগল, খাস খোদার পয়গম্বর ছিল। আর পয়গম্বরের বারণ না শুনলে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতি হয়-পুড়তি হয়। তার আগে বেঁচি থেকি মেলা শাস্তি ভোগ করতি হয়। ”

“ কী কী শাস্তি ভোগ করতে হয় গে মা? ”

কী কী শাস্তি মা কি ছাই তা জানে? তবু ছেলের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় তাকে। সে যে মা!

“ চোখের সামনে রাস্তা সাপ হুন যায় বাপ! গাছপালা ভাল্লুক হুন যায়! রাস্তার মানুষজন জিন পরি হুন যায়! বেঁচি থেকি মানুষ স্বস্তি পায় না। ভুল দেখে। ভুল শুনে। ভুল কাম করে। ওই করি একদিন ভয় আর আতঙ্কের ভিতর মানুষের মওত হয়। সে বুলি গোরে যেইও শাস্তি কমে না। সেখানেও আজাব পোহাতে হয় যতদিন না কেয়ামত আসে। ”

মায়ের কাছে এই গল্প শোনার পর থেকে বাড়ির কান্টার দিকে এঁকেবেঁকে যে পিচ সড়ক জঙ্গলের দিকে ঢুকে গেছে সেটাকে সে মেঠো-আলাদ সাপ মনে করতে শুরু করে। দিনের বেলা সূর্যের আলোয় দেখলে মনে হয় সাপটার গা থেকে তার হিস্‌হিস্‌ শব্দ ফুটে বেরোচ্ছে। আর রাতের অন্ধকারে সে তো মিশে থাকে অন্ধকারেই। তারপর থেকে সবসময় তার ওটাকে নিয়েই যত ভয়! তাই আর তার পিচ সড়কটা দেখা হয় না। বাড়িতে থাকলে সে তার নিজের ঘরেই শুয়ে থাকে। শুধু সড়কটাকে ভাবে, নাকি মেঠো-আলাদ সাপটাকে?

আসল কথা হামিদের কাছে ওই সড়কটা কবে যে সত্যি সত্যি একটা মেঠো-আলাদ সাপে রূপান্তরিত হয়েছে হামিদ তা নিজেও জানে না। একদিন মাকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, “ মা- ওই সাপটো কোন দিকে গেলছে? ”

মা বলেছিল, “ জঙ্গলের দিকে। ”

সত্যিই হামিদদের বাড়ির কান্টার দিকে বিশাল একটা জঙ্গল আছে। পেছনের জানালা খুললে হামিদ সেই জঙ্গলটাকে স্পষ্ট দেখতে পায়। কী ঘন আর কী মিশমিশে ঘন সবুজ ওই জঙ্গলের ভেতরে মেঠো-আলাদ সাপটা মুখ ঢুকিয়ে বসে আছে সেই কবে থেকে। হামিদ আর একদিন তার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ মা মেঠো-আলাদ সাপটো ওই জঙ্গলে মুখ ঢুকিন কী করে? ”

মা উত্তর করেছিল, “ দম লেয়। ”

হামিদ নিজেও দম নেয়। বিশেষ করে শীতের রাতে। কিন্তু সে দম নেয় লেপের তলা থেকে মুখ বের করে। ঠান্ডা লেগে যাবে বলে মা যখন তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত লেপ মুড়ে দিয়ে শুয়ে থাকতে বলে, তার তখন দম বন্ধ হয়ে আসে। সে তখন লেপ থেকে মাথা বের করে দম নেয়। স্বস্তি পায়। শান্তি পায়। তাহলে মেঠো-আলাদ সাপটা ওই ঘন জঙ্গলে মুখ ঢুকিয়ে কীভাবে দম নেয়? সাপটার দম বন্ধ হয়ে আসে না?

হামিদ কিছুই বুঝতে পারে না। মাকে তাই আবার সে জিজ্ঞেস করে, “ সাপটো দম লেয় কেনি মা? ”

“ তুমার মুতোন বাচ্চা ছেল্যাপিলাকে গিলি খাবে বুলি। ”

হামিদ মাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে না। খুব ভয় পায়। সাংঘাতিক ভয়! স্কুলের পরিত্যক্ত ওই ঘরটার চেয়েও বেশী ভয়। যদিও যে রাত্রে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে, সেই রাত্রে মনের ভয়কে উপেক্ষা করে তার সাপটাকে দেখার বড্ড সাধ জাগে। কিন্তু তার মা বলে, “ খবরদার বেটা! জানালার খিড়কি খুলবি না খো। এখুন এই জ্যোৎস্নায় রাতপরিরা সাপের মাথায় নাচতে নামবে। ”

মায়ের কথা শেষ হয় না, রাত পরিদের পায়ের ঘুঙুরের আওয়াজ ভেসে আসে তার কানে। সঙ্গে মাদলের বোল। সেইসঙ্গে কোন এক অজানা সুর! ঘরে বসে সব শুনতে পায় হামিদ। মা তখন হয়ত রান্নাঘরে, রাতের খাবার দাবার রাঁধতে ব্যস্ত। আব্বা তো বাড়িতেই থাকে না। ছ’মাস-ন’মাস অন্তর বাড়ি আসে। সেই আব্বাকে তার মনেও পড়ে না। যদিও সে জানে তার আব্বা নিজের দেশেই পড়ে থাকে তাকে পড়ানোর জন্য। সেখানে চাকরি করে। চাকরি বলতে মাস্টারি। সেখান থেকে নিয়ম করে মাসে মাসে টাকা পাঠায়।

রোজ সকালে যে-দিদিমণি সাইকেল চড়ে তাকে পড়াতে আসে, মুশকান দিদিমণি, তাকে সঙ্গে করে সন্তোষপুর মোড়ে বটগাছ তলায় যে ব্যাঙ্কটা আছে, সেখানে যায় তার মা। মাসের এক তারিখ কি দুই তারিখ। ওই ব্যাঙ্কেই তার মায়ের নামে টাকা আসে। সেই টাকা তার মা মুশকান দিদিমণিকে সঙ্গে করে ব্যাঙ্ক থেকে তুলে আনে। সেই সঙ্গে সন্তোষপুর মোড়ের গোবিন্দঘোষের দোকান থেকে কিনে আনে লাল লাল জিলাপী-সিঙ্গাড়া, নিয়ামতের মনোহারীর দোকান থেকে নিজের জন্য প্রসাধন সামগ্রী, তার জন্য হরেক রকমের খেলনাপাতি আর ‘হাজীবস্ত্রালয়’ থেকে জামাকাপড়। কিন্তু ওসব কোনও কিছুই তার মন থেকে ভয়কে তাড়াতে পারে না। দিনের বেলা বাড়িতে মেঠো-আলাদ সাপের ভয় আর রাতে রাত পরিদের ভয়। তার ওপর স্কুলের সেই পরিত্যক্ত ঘরটায় স্বেচ্ছায় সমাধিস্ত পাগলার সাংঘাতিক ভয়টা তো আছেই।

 

~দুই~

দেখতে দেখতে এইসব ভয় একদিন হামিদকে অসুস্থ করে তুলল। সত্যি সত্যি হামিদ অসুস্থ হয়ে পড়ল। এটা অবশ্য সে বুঝতে পারল না। তার মা বুঝতে পারল। সেই কখন থেকে মুশকান দিদিমণি এসে বসে আছে বারান্দার চৌকিতে, আর ছেলে কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে! মা আঙিনা ঝাঁট দিচ্ছিল, হাতের ঝাঁটা ফেলে তক্ষুণি ছুটে গেল ঘরে, “ এতোক্ষুণ ঘুমিন আছি কী করি বেটা? পহড়বি না! উঠ-উঠ-উঠ! ”

ছেলে উঠল বটে! কিন্তু রোজ কার মতো মাকে জড়িয়ে ধরল না। কেমন ঘোলাটে চোখ তার! ফ্যালফ্যাল চাহনি। মুখে কোনও কথা নেই। ছেলেকে দেখে ভয়ে মায়ের মুখের কথাও হারিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন আঁকু পাঁকু করে উঠল। সে অপেক্ষা করতে পারল না, ওই আঁকু পাঁকু বুকেই ছেলেকে জড়িয়ে ধরল, কোনও রকমে বাইরে নিয়ে এল। বারান্দায় পাতা চৌকিতে বসাল। নিজে একটু ধাতস্থ হল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “ কী হলছে বাপ? বুল কেনি? কী হইল তোর? ”

মুশকান দিদিমণি নিজেও ভয় পায়। ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করে, “ কী হয়েছে বুবু? কী হয়েছে হামিদের? ”

“ দ্যাখো তো বহিন! হামার বেটার চোখমুখ কেমুন হুন গেলছে। কুনু কথা বুলছে না। ”

“ দাঁড়ান ভাবী-দাঁড়ান! আমাকে দেখতে দেন। ”

বলে মুশকান দিদিমণি ঝটপট উঠে দাঁড়ায়। হামিদের কাছে এগিয়ে যায়। হামিদকে নেড়ে চেড়ে দেখে। হ্যাঁ- বুবু যা বলছে, একেবারে ঠিক বলছে। আর পাঁচদিনের হামিদের মতো নয় আজকের এই হামিদ। তাহলে হঠাৎ করে কী হল ছোঁড়ার? মুশকান দিদিমণিও কিছু বুঝতে পারে না। তার ভয় বাড়তে থাকে।

শেষপর্যন্ত মা আর মুশকান দিদিমণি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে হামিদকে সঙ্গে করে যায় গ্রামের ইমাম মৌলবি বরকত সাহেবের কাছে। সব দেখে শুনে বরকত ইমাম সাহেব বলেন, “ সব হাওয়া বাতাসের খেল মা! ফাগুন পড়্যাছে। ফাগুন্যা বাতাস বহিতে শুরু কর‍্যাছে। খিয়াল আছে কি তুমহাদের? বালবাচ্চার ওপর এই সময়ে নজর রাখতি হয়। তা যখুন তুমরা নজর রাখো নি তখন আর কী করা যাবে? দাঁড়াও হামি দেখছি। ” বলে ইমাম সাহেব দোয়া পড়ে হামিদের মাথায় তিন-ফুঃ দিলেন। পানি পড়ে মাথায়-শরীরে ছিটিয়ে দিলেন। তেল পড়া দিলেন রাতে শোয়ার আগে শরীরে মাখানোর জন্য। আর নিজ হাতে একটা তাবিজ বেঁধে দিলেন হামিদের কোমরে।

ইমাম বরকত সাহেব খুব ইমামদার মানুষ। রীতিমতো আমল করেন। তাই তার এইসব টোটকা খোদার আরসে কবুল হয়। আর মানুষের বালামুশিবত দূর হয়ে যায়। গ্রামের মানুষ একথা জানে। এমন কি অসুস্থ হামিদও জানত। নিজের চোখে কতজনকে ভাল হতে দেখেছে। কিন্তু এখন সেসব কিছুই মনে পড়ছে না তার। হা করে সে তাকিয়ে আছে ইমাম বরকত সাহেবের ঘরের সামনে যে বড় আমগাছটা আছে, তার একটা ডালের দিকে। যে ডালে বসে আছে একটা শালিখ পাখি। যার শরীরে ফাঁস হয়ে আটকে আছে সাদা রঙের একটা পলিথিনের ক্যারিব্যাগ। ওটার ভেতরে একটা কাগজের খালি ঠোঙাও আছে। নিশ্চয় ওটার ভেতর কিছু খাবার ছিল। যা খেতে গিয়েই শালিখটা ফ্যাসাদে পড়েছে। খাবার শেষ হয়ে গেছে কিন্তু কাগজের ঠোঙা সহ ক্যারিবাগটা তার গলায় ফাঁস হয়ে লটকে আছে। ঠোঁট আর দু’পায়ের নখ দিয়ে সেটাকে গলা থেকে ছুঁড়ে ফেলতে চাইছে, পারছে না। বরং সেটা আরও গলায় জড়িয়ে যাচ্ছে। এরকম টানাটানিতে হয়ত তার জীবনটাই যাবে!

হামিদের আশঙ্কা হয়। তাই কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে সে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ উঠে ছুটে যায় আমগাছটার দিকে। তরতর করে গাছটার ওপর চড়তে শুরু করে। যে করেই হোক, শালিখটাকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কোথায় শালিখ? গাছে উঠে আর পাখিটার হদিশ পায় না। বদলে তার চোখে পড়ে দূরে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে যাওয়া মেঠো-আলাদ সাপটাকে। সাপের পিঠটা মিশমিশে কালো। আর কী ভয়ংকর! যার ওপর জ্যোৎস্না রাতে রাত পরির  দল নাচতে নামে!

না, সেদিকে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না হামিদ। শালিখটার কথা ভুলে যায়। আর অন্তরের ভয়টাকে আবার অন্তরে অনুভব করে। সুড়সুড় করে গাছ থেকে নেমে ছুটে এসে একেবারে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এহেন ঘটনায় মা একেবারে আনন্দে আত্মহারা। ইমাম সাহেবের ঝাড়ফুঁকে তার ছেলে তাহলে ভাল হয়ে গেছে। এই তো তার ছেলে! যে ছেলেকে সে চেনে, জানে। এতক্ষণ কী হয়েছিল কে জানে! ভাগ্যিস ইমাম সাহেব ছিলেন।

ছেলেকে বুকে জড়িয়েই ইমাম সাহেবের পা ছুঁয়ে শুকরিয়া আদায় করে মা। ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। ঘরে বিছানায় শুইয়ে দেয়। বলে, “ তুমাকে আইজ আর ইস্কুল যেতি হবে না বাপ! তুমি ঘুমিন থাকো। তুমার দোস্ত মতি তুমাকে ডাকতে এলি বুলব তুমার শরীল খারাপ। আইজ তুমি ইস্কুল যাবা না। হামি রাধাঁবাড়া করছি । দুপ্পহরে উঠি খাবা একেবারে। ” বলে মা নিশ্চিন্ত হয়। তারপর সংসারের কাজকামে লেগে পড়ে।

 

~তিন~

হামিদ মায়ের কথা মতো ঘুমোনোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই তার ঘুম আসছে না। বারবার শালিখ পাখিটার কথা মনে পড়ছে। কিছুক্ষণ আগে ইমাম সাহেবের ঘরের সামনেকার আমগাছের ডালে যেটাকে দেখেছিল সে! যার গলায় ফাঁস হয়ে আটকে ছিল সাদা রঙের একটা পলিথিনের ক্যারি ব্যাগ। যার ভেতরে কাগজের একটা খালি ঠোঙা ছিল। যেটাকে পায়ের নখ দিয়ে গলা থেকে ছাড়ানোর খুব চেষ্টা করছিল! কিন্তু ছাড়াতে পারছিল না।

মা একটা কাঁথা চাপিয়ে দিয়েছিল শরীরের ওপর। হামিদ এতক্ষণে সেটার অস্তিত্ব টের পায়। আর তার হাঁসফাঁস শুরু হয়ে যায়। কাঁথাটাকে শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে, পারে না। শালিখটার মতো তারও দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সে তখন দম নেওয়ার জন্যে চিৎকার শুরু করে।

মা রান্নাশালে রান্নায় ব্যস্ত ছিল। ছেলের চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে ছুটে এল ঘরে। দেখল, ছেলে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। ছেলের শরীরের ওপর কাঁথাটা যেভাবে বিছিয়ে দিয়েছিল, সেভাবেই আছে। তাহলে ছেলের কণ্ঠে অমন করে চিৎকার করল কে? তবে কি তার কান ভুল কিছু শুনল?

হবেও বা! আজকাল চারপাশে কত রকমের আওয়াজ! উনুনে ভাত চড়ানো আছে। সেদ্দ হয়ে এল বোধহয়। বেশী সেদ্দ ভাত আবার ছেলে খেতে পছন্দ করে না। অগত্যা মা আবার রান্না ঘরেই ফিরে গেল।

এর মধ্যে হামিদ শালিখটাকে ভুলে গেছে। তবে তার স্কুলটাকে মনে পড়ছে। বিশেষ করে স্কুলের সেই পরিত্যক্ত ঘরটাকে। যে ঘরে এক পাগলা স্বেচ্ছায় আত্মসমাধিস্ত হয়েছিল কোন কালে। যেটা এখন সবুজ ঘাসে ঢাকা তাদের গোরস্থানেরই অঙ্গ। কিন্তু সেই ঘরের দরজার পাল্লা খোলা কেন? কে খুললে ওই দরজার পাল্লা? পাগলা যে বলেছিল, “ আমাকে তোরা কেউ বিরক্ত করিস না। এই ঘরই আমার কবর। এই ঘরেই আমি শুয়ে থাকব কেয়ামত পর্যন্ত। বিরক্ত করলে গাঁ-সুদ্দ সবাই মজা টের পাবি! ”

এখন কী হবে তাহলে? হামিদ বুঝে উঠতে পারছে না। প্রচন্ড গরম অনুভব করছে সে। নিজেও তো গ্রামের একজন। পাগলার মজা তাহলে তাকেও ভুগতে হবে! মজা নয় শাস্তি। মতি বলেছিল, “ গাছের ডালে চড়ে ঝুল্লু খাওয়ার মজা লয়, গলায় দড়ি পরে গাছের ডালে ঝুল্লু খাওয়ার মজা! একহাত জিভ বেরিয়ে পড়ার মজা! যে মজা টের পেয়েছিল খানুহাজীর পুত জুলুম সেখ। মুনে আছে তোর? ”

হ্যাঁ, খুব মনে আছে। খানুহাজীর পুত জুলুম সেখ তার সহপাঠী সুর্মা খাতুনকে সঙ্গে করে ঢুকেছিল ওই ঘরে। আর সেই পাগলাবাবা ঠিক মজা টের পাইয়েছিল। না, সুর্মা খাতুন কিংবা গ্রামের আর কেউ সেই মজা টের পায়নি, মজা টের পেয়েছিল শুধু একা জুলুম সেখ। গাঁ-সুদ্দ সবাই দেখেছিল গোরস্থানের ভেতর একটা কৎবেল গাছের ডালে গলায় দড়ি পরে ঝুল্লু খেয়েছিল জুলুম। এক হাত জিভ বেরিয়ে পড়েছিল।

না, ওরকম মজা সে টের পেতে চায় না। কোনো কিছু ঘটার আগে ওই ঘরের দরজার পাল্লা বন্ধ করে দিতে চায়। সেই মতো উঠে যায় সে। কিন্তু ওই ঘরের দরজার কাছে পৌছে দেখে, ঘরের ভেতর থেকে মতি বেরিয়ে আসছে। সে চমকে ওঠে। মতিকে মতি বলে মনে হয় না তার, সেই পাগলা বাবার মায়া রূপ মনে হয়। আর তার মনের ভয় যা ছিল সেই ভয় দ্বিগুণ হয়। সে চিৎকার করে ওঠে, “ কে আছো বাঁচাও হামাকে। পাগলাবাবা হামাকে মজা দেখাইছে! ”

মা রান্নাবান্না শেষ করে তখন গোসুল খানায়। একেবারে উলঙ্গ। সারাদিনের সব পাপ ধুয়ে সে পাক-পবিত্র হবে। তারপর ছেলেকে ঘুম থেকে উঠিয়ে খাওয়াবে। নিজেও খাবে। কিন্তু ছেলে আবার চিৎকার করছে কেন? কী হল?

ছেলে কী বলছে মা বুঝতে পারছে না। তবে ছেলের চিৎকার শুনে সে নিজে এমন ভয় পেল যে, ভুলে গেল তার শরীরে কোনও কাপড় নেই। ওই অবস্থায় বেরিয়ে এল গোসুলখানা থেকে। তারপর ছুটে গিয়ে ঢুকল ছেলের ঘরে। দেখল ছেলে যেমন কার তেমনি শুয়ে আছে, গভীর ঘুমে। শুধু শরীরে যে কাঁথাটা বিছিয়ে দিয়েছিল সেটা শরীরের ওপরে নেই। পাশে কুঁকড়িমুকড়ি হয়ে পড়ে আছে। তবে, ছেলের মুখমন্ডলে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। তা দেখে অভ্যাস বশত মা নিজের আঁচল দিয়ে ছেলের মুখ পোছাতে গেল। কিন্তু নিজের আঁচলটাই খুঁজে পেল না।

ওদিকে হামিদ পাগলা বাবার মায়া রূপ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য চিৎকার করতে করতে তার ঘরের জানালার পাল্লা দুটি খুলে ফেলেছে। পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় এখন তার চোখের সামনে মেঠো-আলাদ সাপটা। যার মুখটা এখন আর জঙ্গলের ভেতরে নেই, বাইরের দিকে। একবারে তার জানালার কাছে। খুব জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সাপটা। এমনই জোরে যে জানালায় শক্তপোক্ত সিক না থাকলে সাপটা হয়ত তাকে ঘর থেকে টেনে গিলে ফেলত! এতক্ষণে তার ঠাই হত সাপটার পেটে।

হামিদের খুব ভয় হয়। তবু জানালার ওই সিকগুলির ভরসায় সে দাঁড়িয়ে থাকে। সাপটাকে দেখে। সাপটার চকচকে কালো পিঠ দেখে। আশ্চর্য- সেই অচেনা সুরটা এসে ধাক্কা মারে তার কানে। সঙ্গে মাদলের বোল। আরও আশ্চর্য- সেই সুর, সেই মাদলের বোলের সঙ্গে হামিদ দেখে সাপটার মাথায় তার উলঙ্গ মাকে নাচতে।

মা কি তাহলে রাতপরি? বুঝতে পারে না। অগত্যা বাপটাকে মনে করতে চেষ্টা করে হামিদ। কিন্তু বাপকে মনে পড়ে না। কতদূরে আছে তার বাপ! কোথায় তার বাপের দেশ? কাশ্মীর না কেরালায়? তবে শালিখটাকে মনে পড়ছে। মনে পড়ছে কী, সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ওই তো শালিখটা! গলায় আটকে থাকা সাদা রঙের পলিথিনের একটা ক্যারিব্যাগ। যার ভেতরে একটা কাগজের খালি ঠোঙা। কোনও খাবার নেই তাতে। অথচ ওই কাগজের খালি ঠোঙা ভরা সাদা রঙের ক্যারিব্যাগটা কী অদ্ভুত কৌশলে শালিখটার পায়ের নখ এবং ঠোঁটের টানাটানিতে গলায় চেপে বসছে, শালিখটা টের পাচ্ছে না। কিন্তু হামিদ টের পাচ্ছে। তার ভয় হচ্ছে, ভীষণ ভয়! যদিও তার বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠছে না। কলজে ঠান্ডা মেরে যাচ্ছে না। গলা শুকিয়ে আসছে না। তবু কেন যেন সে চিৎকার করতে পারছে না। শুধু ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে দেখছে, কাগজের খালি ঠোঙা ভরা সাদা রঙের ক্যারি ব্যাগটা শালিখটার গলায় নয়, যেন তার গলাতেই আস্তে আস্তে চেপে বসছে। আর তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

 

‘জলসিড়ি’, শারদ ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত

0 Comments

Post Comment