পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অন্তরীক্ষের অদ্বিতীয় সম্বোধন ৫

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়
রাম দু’দিন ছুটি নিয়েছে। দোকানের মালিক আর অন্যান্য কর্মচারীদের সম্পূর্ণ ঘটনাটা জানিয়ে বৌভাতের নেমন্তন্ন করে আসে সে। পাড়াপড়শিদেরও নেমন্তন্ন করে আসে মুখে মুখে। আজ অন্তরীক্ষের অদ্বিতীয় সম্বোধন পঞ্চম পর্ব। আগের পর্বের সূত্র লেখার প্রথমে।

(১৩)

হাতে তো আর সময় নেই। একটা দিনও নেই। নইলে বৌভাতের নেমন্তন্ন কার্ড ছাপিয়ে সে উদাহরণ সৃষ্টি করেই ছাড়তো। একদিনের মধ্যেই প্যান্ডেল, ক্যাটারার সহ যাবতীয় ভোজের আয়োজন রাম একাই করলো। বাকি থাকলো শুধু মাইক। চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাছাকাছি কোথাও মাইক ভাড়ায় পাওয়া গেল না। সব বুক হয়ে গেছে।

 

এদিকে সাহাবাবু খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। ফাল্গুনের চৌদ্দ তারিখ থেকে আজ অব্দি আদরিনীর দেখা নেই। দাদার বিয়েতে তিন দিন আসবো না বলে আজ প্রায় আটদিন হল ওর পাত্তা নেই। আদরিনীর বাড়িটাও তো দেখা নেই যে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসবেন। ওর দাদার বিয়েতেও তো যাওয়া হয় নি। গেলে না হয় বাড়িটাও দেখা হয়ে যেতো। সাহাবাবু রোজ সকালে ঘর-বাহির করতে থাকেন।

 

অন্য কোনো কাজের মেয়েও তো রাখতে পারছেন না। আদরিনী তো জবাব দেয়নি। কী করে অন্য কাউকে রাখবেন। সেই বারো বছর বয়স থেকে মেয়েটা ওদের ঘরে কাজ করে। কোনোদিন কামাই করে না। কাজকর্মও বেশ পরিষ্কার। কোনোদিন একটা সূঁচও চুরি করেনি। চুপচাপ কাজ করে চলে যায়। আজকাল এমন কাজের মেয়ে পাওয়া কঠিন। এই একটা ঘরেই কাজ করে আদরিনী। তাই অন্য বাড়ি যাবার তাড়াও থাকে না। কিন্তু ওর হলটা কী!

 

লখাইকে ডাকে রাম। বলে, “দ্যাখ, কারো নেমন্তন্ন বাদ পড়েনি তো?”

 

লখাইয়ের মনে পড়ে আদরিনীর কথা। আজ সকালেই ও বলছিল, “দাদা (আজকাল ভাসুরকে দাদা বলে ডাকাটাই রেওয়াজ হয়ে গেছে) যে এমনটা করবেন, ভাবতেও পারিনি। তারপর ভয়ে ভয়ে বলেই ফেললো, “আমি যে ঘরে কাজ করতাম, তাদের নেমন্তন্ন করা যাবে কি!? ওদের ঘরে তো তিনদিন যাবো না বলে আর কোনো খবরই দেওয়া হয়নি। ওদের তো জানিয়ে দেওয়াও দরকার আমি আর কাজ করবো কি না।”

 

লখাই বলেছিল, “কাজ করবি না কেন? মাসে মাসে এক হাজার টাকা কি আর কম! তবে দ্যাখ, ওরা তোর এই কান্ড দেখে আর রাখে কি না।”

 

দাদা যখন জানতেই চাইলো কেউ বাদ পড়েছে কি না, লখাই তখন আমতা আমতা করে বললো, “ও একজনের ঘরে কাজ করতো, তাকে নেমন্তন্ন করা যাবে কি?”

 

— “কেন যাবে না। কার বাড়িতে? তুই কি তাদের বাড়িটা দেখেছিস?”

 

— “না, আমি দেখিনি। তবে ও বলছিল, চকবাজার দুর্গা মন্দিরের পাশে সাহাবাবুদের বাড়ি।”

 

— “ঠিক আছে। আমি এক্ষুনি খোঁজ নিয়ে ওদের নেমন্তন্ন ক'রে আসছি।”

 

সাহা বাবু তো শুনে অবাক। “সেদিন দাদার বিয়ে হল। আর তার পরপরই মেয়েটা বিয়ে করে ফেললো। আমি কিছু জানলামই না। বিয়েতে আমার কাছে ওর তো কিছু পাওনা আছে। যাক গে, সে না হয় পরে হবে। কিন্তু ও কি এ বাড়িতে আর কাজ করবে না? নাহলে তো আমাকে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।”

 

তারপর সাহাবাবু ওদের বাড়ির লোকেশন জেনে নিয়ে বললেন, “অবশ্যই যাবো। দুপুরে? না কি রাতে?”

 

— ‘রাতে।’

 

— “ঠিক আছে।”

 

বৌভাতের মেনুও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যাকে বলে যথার্থ বিপিএল ভোজ!

 

১) রেশন চালের ভাত

 

২) বিরির ডাল

 

৩) সজনে শাক ভাজা

 

৪) কুদুরি খসলা (পস্তুর বিকল্প)

 

৫) তেলাপিয়া মাছ ভাজা

 

৬) হাঁস মাংস

 

৭) ধনে পাতার চাটনি

 

৮) জিলাপি

 

৯) তেলবিহীন পাঁপড়ভাজা

 

১০) খিলি পান

 

মেনু যাই হোক, কেউ তেমন বদনাম করেনি। বরং নতুনত্বের স্বাদ পেয়ে অনেকে প্রশংসাই করেছে। কেবল দু-চারজনকে বলতে শোনা গেছে, “যেমন বিয়ে তেমনি ভোজ।”

 

লখাই আদরিনী তো এটাও আশা করেনি। শুধু কি এটাই। এই বৌভাতে হাতেনাতে আরও কিছু ফল পাওয়া গেছে, যা লখাই আদরিনী স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। দাদার এই অবদান কি তারা ভুলতে পারবে কখনো!

 

কত যে গিফ্ট পড়েছে। শাড়ি, টেবিল ঘড়ি, দেয়ালঘড়ি, অ্যালবাম, কাপ-ডিস, আরও কত কী। তবে সবচেয়ে দামী যেটা পড়েছে, সাহাবাবুর দেওয়া সোনার একটা চেন। লখাইদের ঘরে এই প্রথম সোনার আগমন। ভাবা যায়।

 

ভোজবাড়ির এই হৈ-হট্টগোলের মাঝেই রামের সঙ্গে কথা বলে সাহাবাবু আদরিনীর কাজে যাওয়ার সম্মতিও আদায় করে নেন। কথা হয়, কালের দিনটা বাদ দিয়ে পরশু থেকেই আদরিনী কাজে যাবে।

 

বৌভাতে সবচেয়ে বড় যে কৃতিত্বটা রামের অবশ্য প্রাপ্য তা হল, দুটো পরিবারকে একজায়গায় করা এবং সবাইকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনা।

 

রূপেন যদিও মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারছিল না, তবুও রামের কাছে বর্তমান দিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারকে অস্বীকার করতে না পেরে শেষ অব্দি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এবং এই দিনই আলোচনা-সাপেক্ষে অষ্টমঙ্গলার দিন লখাই আদরিনীকে নিয়ে যাবার কথাও পাকা করে ফেলে। ২৬ ফাল্গুন নবদম্পতি বেদে পাড়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেবার পরিকল্পনাও করতে থাকে মনে মনে। একমাত্র রামের মহানুভবতার জন্য আজ ভয় কাটিয়ে যথার্থ বিয়ের একটা অনুভূতি পায় ওরা। খুশির ফোয়ারায় এখন তাদের অবগাহন যা ছিল কল্পনাতীত।

 

(১৪)

 

এ যুগে রামের মতো মানুষ আর কজন আছে। ঘরে বাইরে সর্বত্রই সকলেই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

 

মুখ্যু হতে পারে কিন্তু তার চালচলন, আচার আচরণে শিক্ষিতরাও হার মেনে যায়। আর এইসবের জন্যই বৌভাতে তার সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেকেই। রেশন ডিলার সমস্ত চালটাই যোগান দিয়েছিল স্বেচ্ছায়। মুদি দোকানের মালিক ভোজের যাবতীয় মশলাপাতি পৌঁছে দিয়েছিল বিনামূল্যে।

 

শুধু কিছু ভুঁইফোঁড় নেতা তার নাম নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতো যখন তখন।

 

কেউ কেউ ঐ নামটাই মুখে আনতো না। কারণটা বিস্ময়কর।

 

রামের পুরো নামটা ছিল, রামলাল। মহা ফ্যাসাদ। 'রাম' বলতেও আপত্তি, আবার ‘লাল' বলতেও ঘেন্না। যেন কতবড় নেতা স! অথচ ওদের পেটে রাজনীতির ‘র’টাও নেই।

 

সেসব নিয়ে ভাববার পাত্র নয় রাম। নিন্দা চর্চা তার না-পসন্দ। সারাদিন কাজেই ব্যস্ত থাকে সে। কেউ অপছন্দের কথা বললে মুচকি হেসে এড়িয়ে যাওয়াটাই ছিল তার জীবনের শিক্ষা।

 

সেই রাম সুকৌশলে ভাইয়ের এহেন বিয়ের বৌভাত কেমন নির্বিঘ্নেই পার করে দিলো, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

 

২৩শে ফাল্গুন। সকাল সকাল ঘর ঝাড় দেওয়ার পর চা বানিয়ে ঘরের সবাইকে দিয়ে আদরিনী নিজেও চটপট চা খেয়ে হলুদ পাড় লাল শাড়িটা গুছিয়ে পরে নিয়ে সিঁথিতে বেশ চওড়া করে সিঁদুর পরে নেয়। কপালে লাগিয়ে নেয় একটা ডাগর লাল টকটকে টিপ। তারপর চুলটা ঠিকমতো আঁচড়ে একটা খোঁপা বেঁধে ক্লিপ আটকে নেয়। আয়নায় একবার দেখে নেয় নিজেকে। সবশেষে ঘোমটা টেনে চপ্পল পায়ে বেরিয়ে পড়ে সাহাবাবুর ঘরের দিকে। কানে সোনার দুল দুটো পরাই ছিল- সাহাবাবুর দেওয়া সেরা গিফ্ট।

 

সে কী লজ্জা। কী লজ্জা! পায়ে আলতা, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে টিপ, কানে সোনার দুল আর এই লাল-হলুদ শাড়িটা পরে বিয়ের পর তার এই প্রথম সাহাবাবুর বাড়িতে যাওয়া। আনন্দ আর লজ্জামিশ্রিত মনটাকে নিয়ে সে যখন সাহা বাবুর সদর দরজায় কলিং বেলটায় আঙুল ছোঁয়ালো, অমনি একটা শ্রুতিমধুর আওয়াজ পৌঁছে গেলো সাহাবাবুর ড্রয়িং রুমে।

 

সাহাবাবু তাঁর একমাত্র মেয়ে বিউটিকে বললেন, “দ্যাখ্ তো, কে এসেছে।”

 

দরজা খুলেই “ও মা!আদু পিসি” ব'লেই বিউটি একদৌড়ে মায়ের কাছে— “মা। যাও যাও দ্যাখো, আদু পিসি এসেছে! কেমন লাগছে, যাও দ্যাখো!”

 

কথাটা সাহাবাবুর কানেও গেলো। উনি একটু ধীরস্থির মানুষ। কথা খুব কম বলেন। ডি এফ ও (ডিসট্রিক্ট ফিসারি অফিসার) ছিলেন। এই তো মাস চারেক আগে নভেম্বরে অবসর নিয়েছেন। স্ত্রী সরমা প্রাইমারি টিচার। আর বছর দুয়েক চাকরি আছে তাঁর। এক ছেলে বিডিও অফিসের ক্লার্ক। কী নাম যেন। ও হ্যাঁ, তন্ময় সাহা। 'বাংলার মুখ' নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করে। সেই সুবাদে ওদের বাড়িতে মাঝেমধ্যে সাহিত্যের আড্ডাও বসে। বিউটি পড়ে নাইনে। দারুন ছড়া লেখে। দাদার কাগজে দেয়। ব্যস, এই পর্যন্তই। অন্য কাগজে লেখা দেওয়ার কোনো আগ্রহ নেই তার। ঘরে সাহিত্যের আড্ডাতেও বসে না। প্রচারবিমুখ মেয়ে একটা।

 

তা আদু পিসিকে অনেকদিন পর দেখে এবং একেবারে অন্য রূপে দেখে তার সে যে কী আনন্দ। মাকে খবরটা দিয়েই টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে সোজা আদু পিসির সামনে- “আদু পিসি। ঠিক্ করে দাঁড়াও তো। একটা ছবি তুলবো।”

 

আদরিনী লজ্জা পায়। বলে, “না না, ছবি নিয়ো না। পরে নিয়ো।”

 

— “না। এক্ষুনি নেবো। একটা নেবো ঘোমটা মাথায় আর একটা খোলা মাথায়। কী সুন্দর লাগছে পিসি! এ ছবিটা আমাকে নিতেই হবে। তুমি সোজা হয়ে দাঁড়াও তো।”

 

তা আদরিনী কিছুতেই ছবি তুলতে দেবে না। দু’হাতের চেটো দিয়ে মুখ ঢেকে নেয়। বিউটি তন্ময়কে ডাকে, “দাদা আয় তো, আদু পিসির একটা ছবি তুলে দে।”

 

— “তুই তুলতে পারছিস না?”

 

— “আমাকে তুলতে দিচ্ছে না। তুই আয় না!”

 

তন্ময়ের সাথে আদরিনী কোনোদিন একটা কথাও বলেনি। ওকে ভীষণ ভয় করে আদরিনী। আর সে কারণে তন্ময়ও আসতে চায় না ছবি তুলতে। কিন্তু বোনের আবদার। আসতেই হল শেষ পর্যন্ত। এসেই বোনের হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে বললো, “যা, তুইও দাঁড়া। দুজনের একসাথে একটা ছবি নিই। তারপর ওর আলাদা ছবি নেবো।”

 

ঠিক সেই সময় সাহাবাবুর স্ত্রী সরমা দেবী সামনে এসে দাঁড়ান।

 

সরমা দেবী উঠোনে নেমেই তন্ময়কে বলেন, “থাম থাম। আমিও ওদের দুজনের মাঝে দাঁড়াই। আদু তো আমার মেয়ের মতোই। দুই মেয়ের মাঝে আমারও একটা শট নে।”

 

অতঃপর একটা দুটো তিনটে করতে করতে কতো যে শট নেওয়া হ'লো!

 

সাহাবাবুর বাড়ির এমন কেউ নেই যার সাথে আদরিনীর ফটো নেই। তন্ময়েরও। এবং প্রত্যেকটি ছবিই সাহাবাবু ল্যামিনেশন করিয়ে রেখেছেন। এছাড়া আদরিনীর স্বামীকেও তাদের বাড়িতে ডেকে এনে নবদম্পতির যুগল ছবি তুলে দু-চার দিন পর সেই ছবিকে ফুল সাইজ করে বাঁধিয়ে আদরিনীর হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “ছবিটা ঘরের দরজার বিপরীত দিকে টাঙিয়ে রাখিস।”

 

পরের দিন দুপুরে সাহাবাবুদের বাড়িতেই নবদম্পতির খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।

 

কে বলবে, আদরিনী তাদের বাড়ির কাজের মেয়ে। একেবারে ঘরের মেয়ের মতোই ছিল তার চালচলন, কাজকর্ম, কথাবার্তা, সবকিছুই। কোনো কোনো দিন রাগ হলে সে সাহাবাবুদের এমন সব কথা শোনাতো, যার উচ্চারণে থাকতো আত্মীয়তার টান। সাহাবাড়ির কেউই সে সব কথা গায়ে মাখতো না। যেমন বিউটির কথা কেউ ধরে রাখতো না, অবিকল সেইরকম।

 

বিয়ের পর আদরিনীকে ফিরে পেয়ে সারা ঘরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বয়ে গেল।

 

(১৫)

 

২৬শে ফাল্গুন। আদরিনীর অষ্টমঙ্গলা। সেই অষ্টমঙ্গলা আর জাঁকজমক করে হলো কই! রূপেন বেঁকে বসায় আদরিনীর স্বামীর সঙ্গে বাপের বাড়ি যাওয়টুকুই সার হলো। রূপেনের বক্তব্য— “বিয়েটাকে মেনে নিয়েছি ঠিক আছে। কিন্তু সেজন্য এখানে কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না। যেহেতু আদু অনুষ্ঠান করে বিয়ে করেনি।”

 

স্বভাবতই মনে আঘাত নিয়ে সেই দিনই লখাই আর আদরিণী বিকেল বিকেল ফিরে এলো লখাইদের ঘরে।

 

সেই মাসে সাহাবাবু আদরিনীর বেতন স্বেচ্ছায় একহাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে দেড় হাজার টাকা করে দিলেন। মনে মনে খুব খুশি হয় আদরিনী।

 

ঘরে (শ্বশুর ঘর) গিয়ে সৌদামিনীর হাতে টাকাটা দিয়ে সে বললো, “দিদি! এই টাকাটা রাখো। এমাস থেকে ওরা দেড় হাজার করে দিচ্ছে।”

 

সৌদামিনী টাকাটা নিতে চাইছিল না— “তুমি খাটবে আর আমি টাকাটা নেবো। তা হয় নাকি! এটা তুমিই রাখো। আমাকে দিতে হবে না।”

 

আদরিনী জোর করে জায়ের হাতে টাকাটা গুঁজে দিয়ে বললো, “তোমরা থাকতে আমার টাকার কী দরকার! রাখ তো!”

 

রাম কাজ থেকে ফিরে আসতেই সৌদামিনী তার হাতে আদরিনীর দেওয়া টাকাটা দিতেই রাম টাকাগুলো নিয়ে লখাইকে ডাকলো। বললো, “টাকাগুলো তোদের কাছেই রাখ। সংসার পেতেছিস। আনুষঙ্গিক অনেক খরচ আছে। সেসব চালানোর জন্য দাদার কাছে হাত পাতবি কেন। তোর তো তেমন কিছু রোজগার নেই। এর গাছে ওর গাছে চড়ে কিছু ফল পেড়ে বিক্রি করে আর কতই বা আয় করিস। তাছাড়া ওভাবে চুরি করে টাকা রোজগার করা ভারি অন্যায়। এতদিন যা করেছিস সেসব ভুলে যা। এবার সৎভাবে রোজগার করার চেষ্টা কর। আদরিনীর টাকাটা রাখ। কাজে লাগবে।”

 

—”কী কাজে লাগবে? তুমি আছ তো।”

 

— “তা তো আছি। কিন্তু কতদিন আর এভাবে চলবে। তোকেও তো এবার সংসারে মন দিতে হবে। টাকাটা বরং আদরিনীকেই রাখতে বল।”

 

লখাই দাদার কথা কাটতে না পেরে টাকাটা ফিরিয়ে নেয়। আদরিনীকে দাদার সেইসব কথা বলে টাকাটা তুলে দেয় ওর হাতে।

 

এভাবেই সুন্দর চলছিল দু’ভাইয়ের এক হাঁড়িতে খাওয়াদাওয়া। লখাই কোনো টাকা পয়সা না দিলেও রাম কিছু বলতো না। বরং বলতো, “টাকা জমাতে শেখ। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।”

 

(১৬)

 

এভাবে পেরিয়ে গেল বছর খানেক। কারোর কোনো সন্তান-সন্ততি নেই। মাত্র চারজনের একসঙ্গে থাকা-খাওয়া। তারপর একদিন—

 

কোন এক রোববার। রামের ছুটি। বিকেলবেলা লখাইকে ডেকে রাম তাদের বাগানবাড়িতে একটা কাঠের গুঁড়িতে গিয়ে বসে।

 

দশ কাঠা বাস্তবাড়ির এক প্রান্তে দু’কাঠার ওপর ওদের কোঠাঘর। বাবার আমলে তৈরি। বাকি আট কাঠা জমির বেশ কিছুটা উঠান। আর একদিকে নানারকম গাছ। আম, পেয়ারা, কাঁঠাল, কুল, জাম, সজনে, কাঁচা কলা, পেঁপে আর একটা ডুমুর গাছ। আর এই গাছগুলোই লখাইকে ছোটবেলা থেকে গেছো বানিয়ে ছেড়েছে। সারাদিন শুধু গাছে গাছে ঘুরে বেড়ানো।

 

তো, সেই বাগানে রাম লখাইকে পাশে বসিয়ে বলে, “দ্যাখ্ লখাই, আজ তোকে একটা কথা বলছি। কিছু মনে করিস না।”

 

— “না না। বলো কী বলবে?”

 

— “বলছি, এতদিন তো দেখাশোনার কেউ ছিল না তোর। এখন তো বৌ হয়েছে। এবার নিজের সংসারটা মনের মতো করে গুছিয়ে নিলে হয় না? অসুবিধা হলে আমি তো আছিই। সমস্যা হতে দেবো না।”

 

লখাই যেন আকাশ থেকে পড়লো — “দাদা আমাদের পৃথক থাকতে বলছে! কাঁধে বোঝা চাপিয়ে দিতে চাইছে! আর কিছুদিন সময় দিলে হতো না! আমার তো কোনো রোজগার নেই বললেই চলে। আদুর দেড় হাজার আর লক্ষ্মীর ভান্ডারের পাঁচশো টাকাতে কি দিন চলবে!”—লখাই মনে মনে ভাবে এইসব।

 

তারপর বলে, “দাদা। এ তুমি কী বলছো! পৃথক যদি করবেই, অন্তত কিছুদিন সময় দাও। আমি রোজগারের একটা ব্যবস্থা করি। ততদিন তোমাদের কাছে থাকলে অসুবিধা হবে?”

 

— “নারে বোকা। তুই ভুল বুঝছিস। আমি তোদের মঙ্গলের জন্যই বলছি। এখন আমি আছি। অসুবিধা হলে আমি দেখতে পারবো। আমি চলে গেলে তখন কে তোদের পাশে দাঁড়াবে, বল!”

 

তারপর বললো, “তুই তো ভাগে পাঁচ কাঠা পাবি। এই ঘরটা তোরই থাকবে। আমি নাহয় একটা ঘর বানিয়ে নেবো। ততদিন আমরা একসঙ্গেই থাকবো। সে তো কমপক্ষে মাস ছয়-সাত লাগবেই। এর মধ্যে দ্যাখ না কোথাও যদি কাজ যোগাড় করতে পারিস। আমিও না হয় দেখবো। এভাবে বসে থাকলে তোর বৌ-ই তো একদিন নানারকম কথা শোনাবে। সেদিকটা কি ভেবে দেখেছিস!”

 

কিছুক্ষণ চুপ থেকে লখাই বলে, 'ঠিক আছে, আদুর সাথে কথা বলে দেখি। পরে তোমাকে জানাবো।”

 

আদরিণীর সাথে কথা বলার সময় তো সেই রাত্রিবেলা। সারাদিন আর সুযোগ কোথায়! সৌদামিনী তো সারাদিন ঘরেই। আর লখাইয়ের তো কোনো পরিবর্তন নেই। সূর্য উঠলেই চা খেয়ে সেই গাছের সঙ্গে আলিঙ্গন। ফল পেড়ে মোড়ে গিয়ে পাইকারের কাছে বেচে ঘরে ফেরা। এবং খাওয়া চান করার সময়টুকু বাদে আবার যথা পূর্বং তথা পরং। অতএব রাত ছাড়া উপায় নেই।

 

সেইদিনই রাত্রে বিছানায় গিয়ে লখাই চুপচাপ শুয়ে পড়ে। অন্যরাতের মতো সেই চনমনে ভাব কোথায় উবে গেছে। আদরিনী আঁচ করতে পারে। কিছুক্ষন অপেক্ষার পর সে জিজ্ঞেস করে, “কী হল। আজ তোমাকে অন্যরকম লাগছে।”

 

— ‘হুঁ’।

 

— “কেন।কী হয়েছে?”

 

— “একটা অঘটন ঘটতে চলেছে।”

 

— “কী, বলবে তো।”

 

— “দাদা আমাদের পৃথক থাকতে বলছে।”

 

প্রথমটায় কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না আদরিনী। পরে অনেক ভেবেচিন্তে বললো, “দেখো, এই বছরখানেক দাদাকে যেরকম দেখছি তাতে মনে হয় না দাদা তোমাকে বিপদে ফেলতে চাইছেন। নিশ্চই কিছু ভালো দিক উনি ভেবে দেখেছেন। দেখো, তুমি যখন বিয়ে করেছো, তখন তো জানোই যে সংসারের দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। দুনিয়ায় তো এমনটাই হয়ে আসছে। তো ভাববার কী আছে। সবাই যেভাবে বেঁচে আছে আমরাও সেভাবেই বেঁচে থাকবো। ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমি আছি। ভেবো না। তবে গাছের নেশাটা তোমাকে ছাড়তে হবে। বড্ড বাজে নেশা। তুমি অন্য কোনো কাজ করো।”

 

মুশকিল তো এখানেই। লখাই কি আর গাছ ছাড়তে পারবে। সে মনে মনে বলে, “খেজুর পেড়ে তাড়ি বানিয়ে বিক্রি করার যে কী আনন্দ তা আদু বুঝবে কেমন করে। তালপাতা কেটে পাখা বানানোর কাজটা বরং আদুকে শিখিয়ে দিতে হবে। ওতেও কম রোজগার হয় না। পাকা কুল শুকিয়ে কুলের কুঁড়ো তৈরি করেও তো বাজারে বিক্রি করা যায়। গাছ থেকে কি কম ইনকাম।” এইসব ভেবে লখাই আদুকে বলে, “তুই চিন্তা করিস না। অন্যের বশে থেকে নয়, নিজের পায়েই নিজেকে দাঁড় করাতে হবে। তুই দেখে নিস, কেমন করে রোজগার করতে হয় লখাই দেখিয়ে দেবে।”

 

আদরিনী লখাইয়ের ঠোঁটটা টিপে বলে, “এটাই তো শুনতে চাইছিলাম। আলাদা থেকে দেখোই না কত মধু আছে নিজের সংসারে। কারো বোঝা হয়ে থাকবো কেন। দাদা যখন বলেছেন, তুমি তাঁর কথা অমান্য কোরো না। শুধু বলবে, অসুবিধা হ'লে তুমি পাশে থাকবে তো?”

 

বিষয়টি নিয়ে রাম সৌদামিনীর সঙ্গে আলোচনা করেই লখাইকে তাদের মনোভাবের কথাটা জানিয়েছিল। সৌদামিনীর সোজাসাপ্টা কথা, “দেখো, তোমাদের দু’ভাইয়ের ব্যপার। আমি আর কী বলবো। তবে মনোমালিন্য যেন না হয়। দু’ভাই রাজি থাকলেই ভালো। নইলে কারো মনে কোনো দুঃখ দিয়ে কাজটা কোরো না। পাড়ায় তোমাদের একটা সুনাম আছে। ঠাকুরপোর বিয়েটাই একটু খুঁত লাগিয়ে দিয়েছে, যা।”

 

অবশেষে রামের প্রস্তাবকে মান্যতা দিয়ে পৃথক হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। হপ্তাখানেকের মধ্যেই আমিন এসে পাঁচ কাঠা করে জমি মেপে দাগ কেটে দিয়ে যায়। কথা হয়, দাগ বরাবর কোনো দেয়াল তোলা হবে না। দু চারটা ছোটো ছোটো পিলার বসিয়ে চিহ্নিত করা থাকবে।

 

গাছগুলো রামের চৌহদ্দির মধ্যে পড়ায়, ঠিক হয়, লখাইয়ের যেহেতু কোনো কাজ নেই, তাই গাছের সমস্ত ফল লখাই পাবে আর গাছগুলো দুজনের সমান সমান প্রাপ্য থাকবে। বিক্রি হলে বিক্রয়ের টাকাও সমানভাবে বণ্টন করা হবে। গাছ কাটলে তাও দুই অংশে ভাগ করা হবে। এবং কথা হয়, যতদিন না রামের নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে, ততদিন দুজনের সংসার একসঙ্গেই থাকবে।

 

মাসখানেকের মধ্যেই শুরু হলো রামের নতুন বাড়ি তৈরির কাজ। রাম তো কাজে বেরিয়ে যায়, তাই দেখভালের দায়িত্বটা লখাইকেই নিতে হলো।

 

বেশ উৎসাহের সঙ্গেই কাজটা দেখাশোনা করছিল লখাই। মাঝেমধ্যে সৌদামিনী আর আদরিনীও দেখে যাচ্ছিল সব কর্মকাণ্ড। তারপর যখন রড, বালি, গিটি এবং সিমেন্ট এলো ট্রাক্টরে লোড হয়ে, লখাই মনে মনে একটু আঘাত পেলো। “দাদা থাকবে পাকা বাড়িতে আর আমাদের মাটির ঘর।” মনটা ভেঙে গেল তার। আদরিনীকে বললো তার অন্তর্দাহের কথা।

 

আদরিণী সান্ত্বনা দিয়ে বললো, “দেখো, দাদা এতদিন ধরে কাজ করছেন। টাকা জমিয়েছেন। পাকা বাড়ি তো করবেনই। আমাদের এই তো সবে শুরু। দেখবে, তোমার ইচ্ছেও একদিন পূরণ হবে। এ নিয়ে দাদার সাথে মন কষাকষি কোরো না। দাদা পাশে থাকলে তোমার অনেকটাই সাহস থাকবে। নইলে আমাদেরই সর্বনাশ। তুমি দাদার বাড়িটা ঠিকঠাক দেখে যাও। দাদার আশীর্বাদ পাবে। আর সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় পাওনা।

 

আদরিনীর কথাটা লখাইয়ের মনে দাগ কাটলো। ঠিক তো। হিংসা করে ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয় না।

 

লখাইয়ের বাইরে বেরোনো অনেকটাই কমে গেলো। সকাল থেকেই মিস্ত্রি মজুর নিয়ে শশব্যস্ত। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববার আর সময় কোথায়! যদিও তখন দু'ভাইয়ের একসঙ্গেই থাকা-খাওয়া চলছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment