পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

জননাট্যমণ্ডলী এবং বিপ্লবী শিল্পী গদর

  • 07 August, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 1069 view(s)
  • লিখেছেন : কাঞ্চন কুমার
চলে গেলেন গণশিল্পী গদর। আজকে তাঁর কথা তাঁর কাজ দিয়েই তাঁকে স্মরণ করতে হয়। বেশ কিছু বছর আগে কাঞ্চন কুমার এই কথাগুলো লিখেছিলেন - "জননাট্যমণ্ডলী এবং বিপ্লবী শিল্পী গদর" , সেই লেখার সংক্ষেপিত অংশ এখানে প্রকাশ করা হলো। ও রিক্সাচালক রহিম ভাই, পাথর ভাঙ্গিয়ে রাম ভাই, ড্রাইভার মল্ল ভাই, কুলি কোমরম ভাই, ভারিওয়ালা মেসন ভাই, আর মজুর ভাইদের প্রতি নিবেদন অনুগ্রহ করে আমাদের কথা শুনুন- কাঁধের উপর লাল পাড় চাদর, হাঁটু অবধি লাল পাড় হলদে ধুতি, পায়ে ঘুঙুর, হাতে লাঠি নিয়ে জনগণের কাছে আবেদন রাখছেন জননাট্যমণ্ডলীর নেতৃত্বকারী শিল্পী গদর। আড়াই দশক ধরে বিপ্লবী গান গেয়ে, পালা বদলের নাটক অভিনয় করে, নৃত্যনাট্যে নেচে গেয়ে বিদ্রোহের বাণী শুনিয়ে আসছেন।

 

 


খেটে খাওয়া মানুষদের কাওয়ালী, রাখালদের নৃত্যে মাতিয়ে দিচ্ছেন গ্রামগঞ্জ। জনগণের হৃদয় আর মস্তিষ্কের কাছে আবেদন রাখছে শিল্পীদল। বিপ্লবী চিন্তাধারা এবং সংগ্রামী সংস্কৃতিকে তাঁরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দিন প্রতিদিন।

 

জননাট্যমণ্ডলী অন্ধ্র প্রদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন। এই সংগঠন গণশিল্প এবং গণসংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল পরস্পরাকে নতুন বিস্তার দিয়েছে। জননাট্য- মণ্ডলীর সবচেয়ে বড় পরিচয় এটি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (পিপলস ওয়র)-এর সাংস্কৃতিক সংগঠন। লক্ষ কোটি দলিত শোষিতকে এই সংগঠন বিপ্লবের বাণী পৌঁছে দিয়েছে। জননাট্যমণ্ডলী ও গদরের নামের সঙ্গে অন্ধ্র প্রদেশের সবাই পরিচিত।

 

গদর জননাট্যমণ্ডলীর প্রাণপুরুষ, তাঁর আসল নাম গুমড়ি বিল রাও। অন্ধ্র প্রদেশের মেদক জেলার তুপরান গ্রামের ক্ষেত মজদুর মা এবং রাজমিস্ত্রি বাবার ঘরে তাঁর জন্ম। গদরের বাবা আম্বেদকরবাদী দিলেন, পড়াশুনায় ভাল ছিলেন, ফলে ১৯৬৭ সালে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং- এ প্রবেশ পেলেন। ৭৭ শতাংশ এগ্রিগেট ছিল, কিন্তু তপশিলী জাতির হওয়ার ফলে সংরক্ষিত আসন পেলেন এবং সহপাঠী উচ্চবর্ণের ছাত্রদের কাছ থেকে তুমি তো সরকারের জামাই' এই টিপ্পনী শুনতে হ'ল।

 

১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ির সংগ্রামের লাল আগুন ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে, সেই ফুলকি শ্রীকাকুলম -এ দাবানল সৃষ্টি করল। কৃষি বিপ্লবের এই আন্দোলন লেখক, শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের আকর্ষণ করল। গদর তাঁর মুক্তির পথ খুঁজে পেলেন। সিকন্দারাবাদের চলচ্চিত্র নির্মাতা নির্দেশক নরসিংহ রাও ১৯৬৮ সালে 'আর্ট লাভাস নামে শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের একটি সংস্থা গঠন করেন; গদর তাতে শামিল হন। মার্কসবাদের প্রতি এই গ্রুপটির বিশেষ আকর্ষণ ছিল। নরসিংহ রাও তেলেঙ্গানার সশস্ত সংগ্রামের উপর গৌতম গোষের নির্দেশনায় 'মাভূমি' নামে একটি ফিল্ম তৈরী করেন। গদর তাতে গান গেয়েছিলেন এবং একটি ছোট্ট ভূমিকাতেও অভিনয় করেছিলেন।

 

ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা জর্জ রেজ্জির হত্যার প্রতিবাদে 'আর্ট লাভার্স' ‘স্মৃতি সপ্তাহ' পালন করে। এই উপলক্ষে একটি গানের বই প্রকাশ করা হয় এবং সারা শহরে বহু অনুষ্ঠান করা হয়। এই অনুষ্ঠানগুলিতে ব্যাপক সংখ্যক জনগণকে তাঁরা আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। জনগণের মধ্যে যে শিল্পরূপগুলি বিদ্যমান ছিল সেগুলিকে তাঁরা বিপ্লবের বাণী প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য অগ্রসর হলেন এবং এই বিকাশের পরিণতি হিসেবে ১৯৭৩ সালে জননাট্যমণ্ডলীর জন্ম হ'ল।

 

শ্রীকাকুলমের সশস্ত্র সংগ্রাম আগেই ধাক্কা খেয়েছে। কিন্তু নকশালবাড়ির সংগ্রামের পর থেকেই সুব্বারাও পাণিগ্রাহী এবং কিশোর তামাডা চিন্নাবাবু গণশিল্পের অগ্রদূত হিসেবে যে বিপ্লবের বাণী প্রচার করছিলেন, তাঁরা শহিদ হওয়ার পর বিপ্লব রচয়িতল সঙ্ঘম এবং জননাট্য মণ্ডলী রক্তরাঙ্গা পথ বেয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিল। ইস্টার শাখা প্রজানাট্যমণ্ডলী বহু আগে থেকেই শোধনবাদের পাঁকে ডুবে ছিল, তার বিপ্লবী দিনের উত্তরাধিকারী হিসেবে জননাট্য মণ্ডলী লোকশিল্পের বিভিন্ন শিল্পরূপের সামর্থ সম্পর্কে সচেতন ছিল। তাই ‘ওগুকথা', 'বিথি ভাগোতম' (তেলুগু নৃত্যনাট্য— যাতে নাচগান সংবাদের মাধ্যমে গল্প বলা হয়), ‘য়েল্লমা কথা' (স্থানীয় দেবীর মহিমাগাথা) ইত্যাদি শিল্পরূপ আয়ত্ত করে ‘রায়তু কুলী বিজয়ম্' (মজুর কৃষকের জয়) নামে ব্যালের জন্ম দিলেন তাঁরা। গ্রামীণ জনগণের কাছে পৌঁছানর জন্য জননাট্যমণ্ডলী গানকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসবে ব্যবহার করা শুরু করল, কারণ ব্যাপক জনসাধারণ আজও অক্ষর পরিচয়হীন, যদিও মৌখিক শিল্প পরস্পরার সঙ্গে তাঁরা ভালভাবেই পরিচিত।

 

জননাট্যমণ্ডলী জনগণের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সব রচনাই সংগঠনের সদস্যরা জনগণের সাহায্যেই লেখেন, তাঁদের সাহায্যে লেখার পরিমার্জনা করেন। এই প্রক্রিয়া ততদিন চলতে থাকে যতদিন পর্যন্ত না রচনাটি ঠিকঠাক উঠে আসে। তারপর তা ব্যাপক জনগণের সামনে উপস্থিত করা হয়। যখন কোন নতুন গান লেখা হয়, সেই গানের প্রস্তুতির জন্য বেশভূষা, ভঙ্গিমা, শব্দাবলী, বাক্যরচনা, ভাষা— সংক্ষেপে বলতে গেলে প্রদর্শনের জন্য খুঁটিনাটি সব কিছুই জনগণের কাছ থেকে তাঁরা শেখেন। প্রক্রিয়াটি এই রকম : জনগণের কোন শ্রেণীর সম্বন্ধে কিছু লিখতে হলে, জননাট্যমণ্ডলীর শিল্পীরা তাঁদের মাঝে থেকে তাঁদের জীবন যাত্রার অংশীদার হয়ে জ্ঞানার্জন করেন। 'জনগণের কাছ থেকে নিয়ে জনগণকে দেওয়া'র প্রয়োগ করেন। এই কারণেই তাদের গান সোজা, সরল ও হৃদয়গ্রাহী হয়।—

 

আগুন এ যে আগুন 

খালি পেটের আগুন

এ যে অশ্রুজলের অঙ্গার

এ যে দুখীজনের হাহাকার

দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে এ যে 

দিক থেকে দিকে ছাইছে যে এ --

 

গত আড়াই দশক ধরে অন্ধ্র প্রদেশের গ্রামেগঞ্জে, কারখানার গেটে, মিছিলে, সভায়, প্রদেশের প্রতিটি কোণায় জননাট্যমণ্ডলী হাজার হাজার প্রোগ্রাম করে লক্ষ লক্ষ লোকের কাছে বিপ্লবের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এন টি রামারাও, সত্য সাঁইবাবার উপর ব্যঙ্গ গীত এবং শহিদদের উপর লেখা 'অমর বীরলোকু জয় বোলো' অত্যন্ত লোকপ্রিয়। এছাড়া ‘গাঁও হামারা গলি হামারী’, ‘মজদুর মেরে ভাই', 'লাল সেলাম' এবং 'ভারত অপনী মহান ভূমি' গানগুলি আজ শুধু অন্ধ্রেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতের বিভিন্ন সংগ্রামী অঞ্চলের সাংস্কৃতিক দলই আজ এই গানগুলি গাইছে। জননাট্য মণ্ডলী প্রায় ৩০০ গান ‘রগল জণ্ডা' (লাল পাতাকা), 'অসম' এবং 'কাশ্মীর' নৃত্যনাট্য ও নাটকে তাদের রচনা কুশলতা এবং প্রয়োগ নৈপুণ্যের পরিচয় রেখেছেন।

 

এই গানগুলির জনপ্রিয়তার প্রমাণ এই যে ১৯৭৮ থেকে আজ পর্যন্ত 'জননাট্য- গুলীর গান' বইটির প্রায় সাড়ে চারলাখ কপি বিক্রি হয়েছে। লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে জননাট্যমণ্ডলীর বিভিন্ন প্রোগ্রামে-র অডিও ক্যাসেট। এই শিল্পীদের লোকপ্রিয়তা এত বেশী যে তেলুগু ফিল্মের গীতিকাররাও তাঁদের নকল করে গান লিখছেন। পিপলস্ ওয়র-এর রাজনীতি আজ অন্ধ্র প্রদেশে বা শুধুমাত্র দণ্ডকারণ্যেই সীমাবন্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়ছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে, সেই সঙ্গে জননাট্যমণ্ডলীরও দায়িত্ব বাড়ছে এবং তাঁরা তাদের বহু গান হিন্দী, মারাঠি, কন্নড়, উড়িয়া, গুজরাতী, তামিল এবং অন্যান্য আদিবাসী ভাষায় অনুবাদ করে অনুষ্ঠান করছেন।—

 

জাগোরে জাগোরে জাগো জাগো

দুনিয়ার মজদুর এক হও 

দুনিয়ার দুশমন আমেরিকা জাপান 

তাদের দালাল ঐ টাটা-বিড়লা 

ওদের গোলাম এই দেশের নেতা 

তাদের চামচা হ'ল গ্রামের শোষক

 

জাগোরে জাগোরে জাগো জাগো 

পুঁজিপতিরা কি করছে 

মজদুরদের রক্ত চুষছে 

সারা দুনিয়াকে দুঃখ দিচ্ছে 

জাগোরে জাগোরে জাগো জাগো।

 

 

বিপ্লবী সাংস্কৃতিক সংগঠন হওয়ার অপরাধে জননাট্যমণ্ডলীকে শ্রেণী-শত্রুর আক্রমণের সামনে পড়তে হয়েছে। ভূস্বামী ও তাদের গুণ্ডারা এবং সরকার বহুবার জননাট্যমণ্ডলীর প্রোগ্রাম ভেঙ্গে দিয়েছে—শিল্পীদের উপর আক্রমণ করেছে। পুলিশ শিল্পীদের প্রেপ্তার করেছে; তাঁদের বেধড়ক পিটিয়েছে, বিভিন্ন সময়ে জেলে পুরেছে। গুন্টুর জেলার র‍্যাডিক্যাল ইয়ুথ লীগের প্রতিষ্ঠা অধিবেশনের প্রচার অভিযানের সময় ১৯৭৫ সালে পুলিশ জননাট্য মণ্ডলীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করে। গদরকে পুলিশ বেশ কিছুদিন বেআইনীভাবে তাদের হেফাজতে আটক রাখে, শারীরিক যন্ত্রণা দেয়। পরে উনি জামিনে মুক্ত হন এবং জননাট্যমণ্ডলীর অন্য সদস্যদের সঙ্গে আণ্ডারগ্রাউণ্ডে চলে যান। কানাড়া ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে পার্টি এবং জননাট্যমণ্ডলীতে পুরোপুরি সক্রিয় হন। জরুরী অবস্থায় গদর মোষপালকের বেশে গ্রামে ঘুরেছেন, এই সময় জননাট্যমণ্ডলী তেলেঙ্গানায় অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

 

‘একমাত্র নকশালপন্থীরাই দেশভক্ত' ধ্বনি তুলে তেলুগু দেশমের নন্দমুড়ি তারক রামারাও অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু পায়ের নীচে একটু জমি পেয়েই ১৯৮৫ সালে অন্ধ্রের বিপ্লবী আন্দোলনের উপর বর্বর দমন আরম্ভ করেন। জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দিয়ে জননাট্যমণ্ডলীর গণগায়ক, কবি, শিল্পী ও সারা ভারত বিপ্লবী সাংস্কৃতিক লীগের কার্যনির্বাহী সমিতির সদস্য কমরেড গদরের স্বর ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁকে রামনগর ষড়যন্ত্র মামলায় জড়ানো হয়। পুলিশ সেই সময় সেকেন্দ্রাবাদ শহরের প্রান্তে গদরের বেঙ্কটাপুরমের বাড়িতে হানা দিয়ে ঢোল, নূপুর, কাঠের বন্দুক যা কিছু জননাট্যমণ্ডলীর অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হত, সবই তুলে নিয়ে যায়— বইপত্রও। গদর তখন জঙ্গলে দলমের সঙ্গে। যখন এই খবর তাঁর কাছে পৌঁছল তখন তাঁর পত্নী বিমলাকে একটি চিঠিতে লেখেন : 

 

সর্বত্র এখন নিস্তব্ধতা বিরাজমান

পরিবেশ আতঙ্কজনক 

নূপুরের ঝঙ্কার নেই কোথাও 

কোথাও ঢোল বাজছে না 

কোন প্রেরণাপ্রদ গানও নেই;

 

শিঙ্গা বাজিয়ে

কেউ ঘুম ভাঙ্গায় না তোমার 

জনমের হৃৎ স্পন্দনের 

নেই কোন প্রতিধ্বনি 

গান নেই, নাচ নেই, তাল নেই 

কিন্তু না, 

এ নিস্তব্ধতা চিরকাল থাকবে না 

মেঘের আড়ালে ঢাকা সূর্য 

ছাই ঢাকা আগুনের বলয় 

তা হ'ল ঘুমন্ত সমুদ্র 

যখন সময় হবে 

আগুন আর মহাসাগর 

উঠে দাঁড়াবে লক্ষ লক্ষ ঢেউয়ে

 

 

পাঁচ বছর অবধি গুপ্তজীবন যাপনের পর ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সালে হায়দ্রাবাদের প্রেস ক্লাবে পত্নী বিমলা, কন্যা কেল্লা (চাঁদনী) ও দুই পুত্র সূর্যকিরণ ও চন্দ্রকিরণের সঙ্গে গদর আবার সাধারণ জীবনে ফিরে এলেন। এই ফেরার পর জননাট্যমণ্ডলী যখন প্রথমবার প্রোগ্রাম করেন তা দেখতে দু' লাখ লোক এসেছিলেন। ১৯৯০ সালের ৫ই এবং ৬ই মে ‘রায়তু কুলী সঙ্ঘম' (ক্ষেত মজদুর সঙ্ঘ)-এর তৃতীয় রাজ্য সম্মেলনে এক সাক্ষাৎকারে গদর বলেন, ‘পুলিশ এবং শাসকদলের বক্তব্য হ'ল সি.পি.আই. (এম.এল) (পিপলস্ ওয়র) শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা জীবনমরণ পণ করে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। লক্ষ লক্ষ লোক আমাদের সঙ্গে রয়েছেন — জনগণের এগিয়ে যাওয়া কেউ - রুখতে পারবে না।' এটা কিন্তু ফাঁকা আওয়াজ ছিল না, ছিল কৃষি বিপ্লবের বাস্তব ছবি।

 

সারা ভারত বিপ্লবী সাংস্কৃতিক লিগের অংশ হিসেবে জননাট্যমগুলী বিপ্লবী সংস্কৃতির প্রচারকল্পে ভারত ভ্রমণের পরিকল্পনা নেয়। জননাট্য মণ্ডলীর জনপ্রিয়তায় আতঙ্কিত কর্ণাটক সরকার খবর পাওয়ার পরই জননাট্যমণ্ডলীর কর্ণাটক প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে। ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাসে মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় জননাট্যমণ্ডলীর ১৪টি সফল অনুষ্ঠান করে। এর ফলে ৬ই অক্টোবর, ১৯৯০ সালে ভিলাই-য়ে গদর সহ জননাট্যমণ্ডলীর ২৫ জন শিল্পী এবং কবি ওয়র ওয়র রাওকে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার গ্রেপ্তার করে এবং ১২ ঘণ্টা বেআইনীভাবে পুলিশ হেফাজতে রাখে। পরে পুলিশ ভ্যানে করে সকলকে অন্ধ্রের সীমার মধ্যে ছেড়ে দিয়ে যায়।

 

১৯৯১-এর জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে জননাট্যমণ্ডলী মুম্বাই শহরে তিনটি অনুষ্ঠান করে। জননাট্যমণ্ডলীর পরের প্রোগ্রাম ছিল নাগপুরে। নাগপুর জেলার শাসক জি আর বেদগে জেলায় গদর এবং জননাট্যমণ্ডলীর প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারী করেন। মুম্বাই হাইকোর্টে এই আদেশের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলা হয় এবং ঐ আদেশ খারিজ করা হয়। তা সত্ত্বেও ১৩ই ফেব্রুয়ারি নাগপুরের জননাট্যমণ্ডলী এবং আহ্বান নাট্যমঞ্চ অনুষ্ঠান শুরু করতেই পুলিশ শিল্পীদের উপর এলোপাথাড়ি লাঠি চালাতে থাকে।

 

জননাট্যমণ্ডলীর শিল্পীদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং জবরদস্তি তাঁদের এ পি এক্সপ্রেসে বসিয়ে দেয়।

 

এই পুলিশী দমনের বিরোধিতা করে গদর বলেন, 'যদি তুমি আমাকে গ্রেপ্তার কর তাহলেও আমি গাইব। তুমি যদি আমার জিভ উপড়ে নাও, তাহলেও আমি টেবিলে হাত চাপড়িয়ে আওয়াজ তুলব। যদি আমার হাত কেটে নাও, তাহলেও আমি পা দিয়ে আওয়াজ বের করব। যদি আমার পা কেটে নাও, তাহলেও আমি আমার শরীরকে মাটিতে লুটোপুটি খাওয়াব। যদি আমায় ফাঁসিতে ঝোলাও, তাহলেও আমি ‘রক্তগীতম’- এর মাধ্যমে বিপ্লবের বার্তা জনগণকে পৌঁছে দেব।”

 

এ কথাগুলো গদরের মুখ থেকে বেরলেও এ হ'ল জননাট্যমণ্ডলীর সাধারণ অভিব্যক্তি। শহিদের রক্তে রাঙা পথের প্রেরণা নিয়ে জননাট্যমগুলী নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

তাদের জনগণের কাছ থেকে আলাদা রাখার জন্য, তাদের প্রোগ্রাম বন্ধ করার জন্য সরকার যত উঠে পড়ে লেগেছে, জনগণ ততই তাঁদের প্রতি আকর্ষিত হয়েছেন। আজ প্রতি গেরিলা স্কোয়াড বা দলমের সঙ্গে রয়েছে একটি জননাট্যমণ্ডলী—যাঁরা শুধু গায়ক নর্তক অভিনেতাই নন বিপ্লবী কর্মী ও গেরিলাও। অস্ত্র দণ্ডকারণ্যের বিস্তীর্ণ অরণ্য অঞ্চলে দলমের সঙ্গে সঙ্গে জননাট্যমণ্ডলী ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। তাদের রোখার শক্তি আর কারোরই নেই গ্রামে। গ্রামে আজ তাদের মনমোহিনী আওয়াজ শোনা যাচ্ছে—

 

রেলারে...রেলারে...

 

জুম্বক জুম্বক জুম্বকওয়ালা জুম্বক জু.... এরপর বহু বছর কেটে গেছে। রবিবার ৬ই এপ্রিল, ১৯৯৭। সময় ছটা দশ। নিজের ঘরে বসে সান্ধ্য খবর শুনছিলেন কমরেড গদর। সেই সময় এক অচেনা ব্যক্তি গদরের সঙ্গে দেখা করতে চায়। বিমলা দরজা খুললে, সে নিজেকে করিমনগরের বাসিন্দা বলে পরিচয় দেয় এবং বলে যে একটা জমির ব্যাপারে 'আন্নারা' (বড় দাদারা- সাধারণত পি ডব্লু-র কমরেডদের বোঝায়) তাকে হয়রান করছে। সে এমন ভাব দেখায় যে গদর চাইলে তার সমস্যার সমাধান হতে পারে। ইতিমধ্যে আরও দু'জন ভিতরে ঢুকে পড়ে এবং কি হচ্ছে গদর বা বিমলা এটা বোঝার আগেই একজন গদরের উপর গুলি চালাতে থাকে। প্রথম গুলির উত্তরে গদর বলেন, 'বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক'। দ্বিতীয় গুলির সঙ্গে বলেন, “শহিদদের লাল সেলাম'। এক বছর দণ্ডকারণ্যে থাকাকালীন শত্রুর আক্রমণ থেকে কিভাবে আত্মরক্ষা করতে হয় তা শিখেছিলেন—সেই চেষ্টা করতে করতে গদর সেখানে পড়ে যান। গুলির আওয়াজ শুনে তাঁর ছেলে সূর্যম ও মেয়ে বেনল্লা ঘর থেকে বেরিয়েই দেখলো, একজন লোক উচ্চতায় ছ' ফিটের কাছাকাছি লম্বা, তাদের বাবার উপর গুলি চালাচ্ছে।

 

এই আক্রমণকারীদের বয়স ২২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তাদের পিছু পিছু দৌড়ে বেনন্না দেখলো একটা সাদা এ্যাম্বাসাডার কারে করে তারা পালিয়ে গেল। গাড়ির নম্বর ১৭১৮ বা ১৭৮৮।

 

গদরকে প্রথমে কাছের এক প্রাইভেট নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে গান্ধী হাসপাতালে। সেখানকার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ডাক্তার পরিমালা জানান যে গদরের দেহে পাঁচটি গুলি লেগেছে। প্রথমটি বুকের ডান দিকে, দ্বিতীয়টি বাম জঙ্ঘার সন্ধিস্থলে, তৃতীয়টি পেটে, চতুর্থটি ডান কাঁধের পেছনের দিকে, পঞ্চমটি স্পাইনাল কর্ডের কাছাকাছি। নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত গদর পুরোপুরি শান্ত ও সচেতন ছিলেন। স্টাফদের কাছে এক গেলাস জল চান এবং বলেন, “পুলিশ আমার উপর গুলি চালিয়েছে।”

 

গান্ধী হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট-এর ডাক্তাররা যখন ক্ষতস্থানগুলিতে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দেন, তাঁর অবস্থা সুস্থির ছিল এবং অপারেশনের প্রয়োজন ছিল; তাই রাত ন'টার পর তাঁকে নিজামস ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এন আই এম এস–নিমস) এ নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে যখন তাঁকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সে সময় নিউজ টাইমস'-এর সংবাদদাতাকে গদর বলেন “আমি এখনও কমিউনিস্ট”।

 

ডাক্তাররা চারটি গুলি বের করে দেন; একটি গুলি তাঁর মেরুদণ্ডের শিরার কাছে আটকে রয়েছে এবং তাঁর ফুসফুসের একাংশ ফাটল ধরিয়া দিয়েছে। ডাক্তাররা যদিও গদরকে বিপদমুক্ত বলছেন, কিন্তু ডাক্তার রামকৃষ্ণের অভিমত, “প্রতিটি গুলির আঘাতই বিপজ্জনক, সেই হিসেবে যতক্ষণ শরীরের শেষ গুলিটি অস্ত্রোপচার করে বের করে দেওয়া না হয়, ততক্ষণ গদর বিপদমুক্ত নন।” যেহেতু গদর রক্তচাপ এবং বহুমূত্রের রোগী, সেইজন্য ডাক্তাররা অপারেশনের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

 

অন্ধ্র প্রদেশের বিপ্লবী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ও সমর্থকদের প্রতি তেলুগু দেশম সরকার যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ছড়িয়েছে গদরকে হত্যার চেষ্টা তারই অংশ। হায়দ্রাবাদ শহরে এবং তার আশেপাশে দক্ষিণ ও উত্তর তেলেঙ্গানাতে ২৩ জন কর্মীকে নকশাল বিরোধী পুলিশ গ্রে হাউণ্ডস্ “ভূয়া সংঘর্ষে মৃত” ঘোষণা করেছে। কমরেড গদর, বিরসম, এ আই পি আর এফ, ও এ পি সি এল সি, দলিত এবং অন্য গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলি মিলে ‘ভূয়া সংঘর্ষে মৃত্যু'র বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন এবং মৃত ব্যক্তির দেহ কর্মীর আত্মীয়স্বজনদের ফিরিয়ে দেবার দাবী করেন।

 

১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭ তে সি পি আই (এম এল) (পিপলস ওয়র)-এর শহর কমিটির সম্পাদক গোরগুলা রামেশ্বর ওরফে সুরেশ এবং হায়দ্রাবাদ শহর কমিটির সদস্য এম রাজু ওরফে বিজয় ওরফে রাজমকে পুলিশ শহরে ধরে, তাঁদের উপর বর্বর অত্যাচার করে এবং গুলি করে তাদের দেহগুলিকে মেদক জেলার নরসাপুরের কাছে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে সংঘর্ষে মৃত্যুর কাহিনী প্রচার করে। কমরেড গদর, এ আই পি আর এফ এবং এপি সি এল সির কর্মীরা মিলে তাঁদের মৃতদেহ মৃতের মা বাপের হাতে অর্পণ করার জন্য যখন যেখানে পৌঁছলেন তখন পুলিশ তাড়াহুড়ো করে মৃতদেহগুলো জ্বালাতে যাচ্ছিল। গদর এবং তার সঙ্গীরা তাদের লাশ জ্বালানোয় বাধা দিলে, সেখানে উপস্থিত শতাধিক অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ তাঁদের দিকে বন্দুক তাক করে। কিন্তু ততক্ষণে আশেপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার লোক সেই লাশ জ্বালানো বন্ধ করার জন্য এসে গেছেন। উচ্চ আদালতের আদেশানুসারে সব পরীক্ষা করা হয়। সুরেশের দেহ সরকারী শবাগারে নিয়ে যাওয়া হ'ল। পুলিশের হাত থেকে তাঁদের দেহ রক্ষা করার জন্য হাজার খানেক গ্রামবাসী সেখানে পাহারায় থাকলেন। শেষে তৃতীয়দিনে এম রাজুর দেহ কমরেড গদর ও ওয়র ওয়ররাও গ্রহণ করেন। চোখে জল আর হৃদয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে জনগণের এক দীর্ঘ মিছিল শহিদ কমরেডদের নামে জিন্দাবাদ ধ্বনি তুলে, সংঘর্ষের নামে হত্যাকারী পুলিশের বিরুদ্ধে ধিক্কার দিতে দিতে এগোলো। পঞ্চমদিন নরসাপুরেই হায়দ্রাবাদের বিশেষজ্ঞরা আবার শব পরীক্ষা করেন এবং উচ্চ আদালতের আদেশানুসারে সুরেশের মৃতদেহ তাঁর মা এবং ভাইকে নিয়ে দেওয়া হয়। আবার বহুলোক হায়দ্রাবাদের সুরেশের অন্তিম সংস্কারে সামিল হওয়ার জন্য সুরেশের পৈত্রিক বাড়িতে একত্রিত হন।

 

২২ শে মার্চ কমরেড গদর এ পি সি এল সি'র সাতজন কর্মীর সঙ্গে একই ধরনের কাজে পিপলস ওয়র এর ডেপুটি স্কোয়াড লিডার এলাঙ্কী মারৈয়ার (বয়স তিরিশ বছর) মৃতদেহ তাঁর স্ত্রী ও পিতার পক্ষ থেকে গ্রহণ করার জন্য নালগোণ্ডায় যান। একদিন আগেই এক “ভূয়ো সংঘর্ষে” মারৈয়া মারা যান এবং হায়দ্রাবাদ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে নালগোণ্ডায় কাছে নারায়ণপুর মণ্ডলের রচকোণ্ডা পাহাড়ীতে তাঁর দেহ ফেলে দেওয়া হয়। এবারও হাজার হাজার লোক জড়ো হন। আবার গতবারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে এই ভয়ে পুলিশ মিথ্যা অভিযোগে কমরেড গদর ও তাঁর সাতজন সঙ্গীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ হেফাজতে রাখে।

 

তাদের অভিযোগ ছিল : (১) মারৈয়ার দেহ চেয়ে তারা উৎপাত করেছিল; (২) মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডি জি পি ও পুলিশের আই জি কে গালাগাল দেয় এবং ভূয়া মৃত্যুর জন্য দায়ী করে; (৩) নিষিদ্ধ পিপলস ওয়রকে খোলখুলি সমর্থন করে।

 

ইতিমধ্যে এই বেআইনী গ্রেপ্তারের বিরোধিতা করে কয়েকটি গণসংগঠন ২৩ শে মার্চ মুখ্যমন্ত্রী নিবাসে গিয়ে প্রতিবাদ জানায়। মুখ্যমন্ত্রী মামলা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু পরদিনই তিনি তা অস্বীকার করেন। যাই হোক, ২৪ শে মার্চ নালগোণ্ডায় জামিনের জন্য আবেদন করা হয় এবং তা স্বীকৃতও হয়। কিন্তু গদর জামিনে মুক্ত হতে অস্বীকার করেন, যেহেতু এই মামলা মিথ্যে এবং যে কোন গণতান্ত্রিক রীতির বিরোধী এবং সেজন্য মামলাগুলি নিঃশর্তে তুলে নেওয়ার দাবী করেন। গদরকে হায়দ্রাবাদ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গদরের মুক্তি চেয়ে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হলো এবং সরকারকে মিথ্যে মামলা তুলে নিয়ে তাঁকে নিঃশর্ত মুক্ত করতে হল।

 

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কয়েকটি গণসংগঠন “সংঘর্ষে” মৃতদের দেহ দাবী করার জন্য একটি সমিতি গড়ে তোলেন। গদর সেই সমিতির আহ্বায়ক হন। এই সমিতির কাজ প্রতিটি মৃতদেহের সঠিক শব পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের দেহ তাদের আত্মীয়স্বজনদের বা বন্ধুদের হাতে তুলে দেওয়া। এই প্রক্রিয়াটি এতকাল রাজ্য পুলিশ মানছিল না।

 

পুলিশ আর সরকার, বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী ও গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলির মুখ বন্ধ করার জন্য নতুনভাবে সন্ত্রাসমূলক কাজকর্ম শুরু করে। নালগোণ্ডায় কমরেড গদর এবং, এপি সি এল সি কর্মীদের গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হওয়ায় তারা গদরকে হত্যার পরিকল্পনা নেয় বলে অনেকে আশংকা করেছেন। পয়লা এপ্রিল নিজামাবাদ জেলার কামারেড্ডীর নকশালপন্থীদের 'শিকার' পরিচয়ে

 

দুটো বাস ভর্তি একশ লোককে পুলিশ একত্র করে গদর এবং কন্নবিরাণের বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাঁদের উত্যক্ত করে। গদরকে গালাগাল দিয়ে তারা বলে, তাদের সম্বন্ধে তিনি কিছু বলেন না কেন? বিমলা বলেন, “গদরের উপর যারা মারাত্মক আঘাত করে তারাও ঐ দলে ছিল। সেদিনকার ঘটনা ৬ই এপ্রিলের রিহার্সাল।” গদরের উপর গুলি চালানোর অর্থ হ'ল সরকার এবং পুলিশী সন্ত্রাস জারী থাকবে।

 

পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল সিভিল লিবার্টিস (পি ইউ সি এল)-এর রাষ্ট্রীয় সভাপতি কে জি কন্নবিরান বলেন, “বিভিন্ন আদালতে এবং রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার আয়োগের তরফ থেকে অতীতে কয়েকবার নির্দেশ সত্ত্বেও রাজ্য পুলিশ সংঘর্ষে হত্যাকে কখনও নরহত্যা বলে স্বীকার করেনি। এই প্রথম পুলিশকে এখন তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হচ্ছে এবং ব্যাপারগুলি তারা লিপিবদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। এইসব কিছুর ফল হ'ল গদরের উপর বর্বর হামলা।”

 

নাগরিক অধিকার কর্মীদের উপর এই প্রথম হামলা হচ্ছিল এমন নয়, এখনও পর্যন্ত এ পি সি এল সি-র গোপী রাজন্না, জপা লক্ষ্মা রেড্ডি, এ আর রামনাথম ও নরা প্রভাকর রেড্ডির মত চারজন নেতৃস্থানীয় কর্মী অজ্ঞাত হত্যাকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন। এ পি সি এল সি-র সাধারণ সম্পাদক ডঃ কে বালগোপালকে অপহরণ করা হয়। “তার ফলে সারা দেশে যে বিক্ষোভ দেখা দেয় সেজন্য পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।”

 

কন্নবিরাণ বলেন, “কোন রকমের রাজনৈতিক বিরোধকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য সরকার পুলিশকে বল্গাছাড়া করে দিয়েছে। এইসব ঘটনাগুলি তারই ফল।”

 

কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। দেহে এতগুলো গুলি নিয়েও গদর বেঁচে রয়েছেন। গদরকে যখন গান্ধী হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তখন হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দু'ঘণ্টা দারুণ উত্তেজনা ছিল। গদরের হাজার হাজার সমর্থক সেখানে জমায়েত হয়ে পুলিশ-বিরোধী ধ্বনি দিচ্ছিলেন এবং পুলিশের বিরুদ্ধেও লড়ছিলেন। পুলিশ-রাজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর পদত্যাগপত্র চাওয়া হচ্ছিল। গদরকে যখন NIMS-এ নিয়ে যাওয়া হল, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাধব রেড্ডি আসায়, তাঁর বিরুদ্ধে ধিক্কার ধ্বনি দেওয়া হতে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যাতে হাসপাতালে ছেড়ে না যেতে পারে সেজন্য কিছু লোক তাকে আটকানোর চেষ্টা করে।

 

হাসপাতাল প্রাঙ্গণ দখল করে পুলিশ। সাংবাদিকরা যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেন যে সাধারণ লোকের এই ধারণাই হয়েছে যে এই হত্যাপ্রয়াস পুলিশেরই, বিশেষ করে যখন মেদক পুলিশের ডাইরেক্টর জেনারেল এইচ জে দোরা ও মেদক জেলার পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট বিজয়কুমার গদরকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই প্রশ্নের কোন উত্তর দেননি। জনগণ তাকে সতর্ক করে দেন যে এর ফল ভাল হবে না।

এ পি সি এল সি-র সাধারণ সম্পাদক কে বালগোপাল, পিপলস ওয়রের ভূতপূর্ব সম্পাদক কোণ্ডাপল্লী সীতারামেয়া এবং কে জি সত্যমূর্তি বলেন এই হত্যা প্রচেষ্টার পেছনে সরকার এবং পুলিশের হাত রয়েছে। বিমলা এফ আই আর-এ এই ঘটনার জন্য পুলিশকে দায়ী করেন।

 

এ পি সি এল সি সহ ১৯টি গণসংগঠন ৭ই এপ্রিল হায়দ্রাবাদ-সেকেন্দ্রাবাদ বন্ধের ডাক দেয়। ঐদিন জনগণের মধ্যে একটি লিফলেট বিতরণ করা হয় যাতে সমস্ত বড় বড় তেলুগু কাগজের সম্পাদক এই হত্যা প্রচেষ্টার নিন্দা করেছিলেন। বন্ধ পুরোপুরি সফল না হলেও—ছাপ রাখে।

 

৭ই এপ্রিল সকালের খবরের কাগজে সারা দেশে এই খবর ছড়িয়ে দেয়। দিল্লীর বুদ্ধিজীবী, কবি, শিল্পী, শিক্ষক, ডাক্তার, ট্রেড ইউনিয়ন, ছাত্র মহিলা সংগঠন, উকিল এবং এ আই পি আর এফ-এর একটি দল একটা থেকে চারটা অবধি অন্ধ্রভবন তাঁদের দখলে রাখেন। রেসিডেন্ট কমিশনারের অফিসের দেওয়ালে কমরেড সদরের ছবি এঁকে “কমরেড গদর দীর্ঘজীবী হোন,” “পুলিশ মুর্দাবাদ” লেখা হয়; এছাড়া (১) উচ্চ আদালতের কোন বিচারপতিকে দিয়ে গদরের উপর হামলা বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবী করা হয়। (২) এ কাজকে তাঁরা পুলিশের হত্যা- প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তার নিন্দা করেন। অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হোক এবং তার শাস্তি হোক। (৩) ভূয়া সংঘর্ষে মৃত্যু বন্ধ হোক—একটি দাবী সনদ কমিশনারকে দেওয়া হয়।

 

সারা দেশে শিল্প সাহিত্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এর বিরোধিতা করতে এগিয়ে আসেন। লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী, ফিল্ম নির্মাতা গোবিন্দ নিহলানী এবং সঙ্গীত পরিচালক ভূপেন হাজারিকা এই ঘটনার নিন্দা করেন। গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম নির্মাতা দাসরী নারায়ণ রাও জোর গলায় বলেন “এই ঘটনার পেছনে পুলিশের হাত রয়েছে” এবং সরকারী ফিল্ম পুরস্কার বিতরণ সভা থেকে বেরিয়ে আসায় সরকারকে লজ্জিত হতে হয়। হায়দ্রাবাদ, কলকাতা, দিল্লী, মুম্বাই সর্বত্র প্রতিবাদ সভা হয়—সাক্ষর অভিযান চলে।

 

হাসপাতালে ভারভারা রাও যখন গদরের সঙ্গে দেখা করতে যান তখন তিনি “গ্রে হাউণ্ডস” উচ্চারণ করেন। কবি, লেখক, শিল্পী এবং সাংবাদিকদের একটি র‍্যালি রাস্তায় নেমেছিল। সেই র‍্যালিতে বিভিন্ন বক্তারা এই ঘটনার পেছনে গ্রে হাউণ্ডস-এর ইনস্পেক্টর জেনারেল অরবিন্দ রাও এবং পুলিশের ডাইরেক্টর এইচ জে দোরাকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করেন।

 

গদরের উপর আক্রমণের এক সপ্তাহ পর গ্রীন টাইগার্স নামে এখনো পর্যন্ত অজ্ঞাত একটি সংগঠন এই কাজের দায়িত্ব স্বীকার করে। তেলুগুর বিপ্লবী কবি এবং সারা ভারত বিপ্লবী সাংস্কৃতিক লিগের সম্পাদক ওয়র ওয়র রাও বলেন, “পুলিশ যে গদরকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল, আমাদের এই অভিযোগকে, এই দাবী আরও শক্ত করেছে। প্রত্যেকটি ভূয়া সংঘর্ষের জন্য গদর পুলিশকে দায়ী করার ফলে জনগণ যেভাবে হৈ চৈ করেন তাতে পুলিশ অসহায় হয়ে যায়।” 

 

("গদর" সীমাহীন গানের খনি , পুস্তক থেকে নেওয়া। প্রকাশক : রাডিক্যাল)

 

0 Comments

Post Comment