পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

এক যাযাবরের স্বপ্নযাত্রা : মৃত্যুপুরী নেপালের দিনলিপি

  • 31 August, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 420 view(s)
  • লিখেছেন : সন্তোষ সেন
কাঠমান্ডুর 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট'–এর বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, গোটা অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে অজস্র হিমবাহ-হ্রদ। সেখান থেকেই নেপালের এই বিপর্যয়। “হিমালয় কি তবে আমাদের সতর্ক করছে? বারবার করেই জানান দিচ্ছে –বরফের শরীর বদলে যাচ্ছে, পাহাড়ের স্থিতি বদলে যাচ্ছে, নদীর আচরণ বদলে যাচ্ছে। আর আমরা এখনও উন্নয়নের পুরোনো সংজ্ঞাতেই আটকে আছি। বিপর্যয়কারী এই উন্নয়নযজ্ঞকে প্রশ্ন করছি না।

কখনও কি ভেবেছেন...

একদিন ঘুম ভেঙে দেখবেন –আপনার চেনা শহর নেই। রাস্তা নেই। বাজার নেই। বাস্তুভিটে, কৃষিজমি সব নেই হয়ে গেছে।

চারিদিকে শুধু জল আর জল। আসামের প্রবল বন্যায় ৭ লক্ষের বেশি মানুষ বিপদগ্রস্ত। হিদুকুশ হিমালয়ের এক হিমবাহ সংকুচিত হয়ে হঠাৎ ভেঙে পড়ে ice-rock avalanche flow-এর অভিঘাতে নেপাল এখন আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুপুরী। চারিদিকে শুধুই কান্নার রোল। মর্গে লাশ রাখার জায়গা নেই। ত্রাহি ত্রাহি রব।

 

আজকের গল্প

কোনো কল্পকাহিনি নয়।

কোনো ভবিষ্যদ্বাণীও নয়।

এটি এক পথিকের মর্মবেদনা।

হয়তো বা, আমাদেরই ভবিষ্যৎ।

 

আমি হাঁটছি।

ধীরে… খুব ধীরে...

হাঁটুসমান জল ঠেলে।

কোথাও...জল কোমর ছুঁয়ে যাচ্ছে।

তবুও হাঁটি। আরও এক পা। আরও এক পা...। হঠাৎ থেমে গেলাম।

এটা কি রাস্তা? নাকি… একটা খাল?

চারদিকে তাকালাম। না...এখানে তো কোনো খাল ছিল না। তাহলে? এই বুঝি… আমাদের সেই ছোট নদী…? কিন্তু, নদী কি ফিরে এসেছে? নাকি...শহরটাই নদী হয়ে গেছে?

 

ভাসতে ভাসতে শেষে পৌঁছে গেলাম নেপাল ও তিব্বত সিমান্তের এক অঞ্চলে। এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আতঙ্ক গ্রাস করে আমাকে। অনেকের সাথে কথা বলে আর দেখেশুনে যা বুঝলাম তা রাখছি সংক্ষেপে।

২৬ আগস্ট, ২০২৬ সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রাসুওয়া জেলার লেন্ডে খোলা নদী অববাহিকায় হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে বিপুল বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে আসে। এই ice-rock avalanche নদীর জলকে প্রবলভাবে স্ফীত করে এবং তার সঙ্গে মিশে একটি ভয়াবহ debris-laden flash flood তৈরি হয়। প্রবল স্রোত পরে ভোটে কোশী ও ত্রিশূলি নদী ব্যবস্থায় নেমে আসে।

কেন এমনটা হচ্ছে বারেবারে?

‘ইউনাইটেড স্টেটস জিওলোজিক্যাল সার্ভে’-এর তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ঘটনাটিকে glacial collapse বা ডেবরিস ফ্লো বলেই অবিহিত করছে। ভারতীয় মহাকাশ সংস্থা ইসরোর স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণও এই তথ্য সমর্থন করেছে।

উত্তরকাশীতে ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর এবং ২০২৬-এ এখনও পর্যন্ত তিন বার। জোশিমঠ ২০২৩ –এর ভয়াবহ বিপর্যয় সবগুলো একই সূত্রে বাঁধা। আর নেপালে? ২০১৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত দশ বছরে অন্তত ১৮ বার একইরকম ভয়াবহ দুর্যোগের শিকার। এবারের ঘটনা তারই পুনরাবৃত্তি। তবে এ বার এর অভিঘাত ভয়াবহতম। তবুও, সমাজের একটা বড় অংশ এখনো নীরব নিশ্চুপ নিষ্ক্রিয়।

তিব্বত মালভূমির দক্ষিণ প্রান্তে একসঙ্গে কি সক্রিয় হয়ে উঠছে একাধিক বিপদের উৎস? জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারের হাত ধরে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বেড়েই চলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি আজ ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। ফলে দ্রুত গলছে হিমবাহ। তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্লেসিয়ার লেক। আর হিমবাহ গলে যাওয়ায় পাহাড় থেকে নেমে আসা মাটি-পলি-কাদা, পাথরের ছোট বড় টুকরো (মোরেম) মিশছে এইসব হ্রদে। হ্রদের আয়তন সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের ঢালে বাড়ছে ভূমিধস। অন্যদিকে, বরফগলা কালো জল দ্রুত নেমে এসে বাড়িয়ে দিচ্ছে হিমবাহ-হ্রদের আয়তন। প্রচন্ড চাপ বাড়ছে এইসব হ্রদের। সংকুচিত  হ্রদে জলের আয়তন বেড়ে গিয়ে যেকোন সময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গ্রাম জনপদ কৃষিজমি বাস্তভিটে সহ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, রাস্তাঘাট।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। ফলে তিব্বত মালভূমির দক্ষিণ দিক থেকে শুরু হওয়া কোনও বিপর্যয় আর ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। 'কাসকেডিং এফেক্ট'-এ তা নেমে আসছে নেপাল, ভুটান, হিমাচলপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম, ডুয়ার্স এবং সংশ্লিষ্ট বিস্তীর্ণ নদী অববাহিকায়। বদলাচ্ছে বিপর্যয়ের চরিত্রও। শুধু মেঘভাঙা বৃষ্টি নয়, কোনও বৃষ্টি ছাড়াই হঠাৎ নেমে আসতে পারে জল, কাদা, পাথর আর বরফের ভয়ঙ্কর স্রোত। সব মিলিয়ে হিমালয় অঞ্চল যেন একটা প্রাকৃতিক টাইম বোমা। যার ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়তো বা শুধুই সময়ের অপেক্ষা।

'ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অফ হিমালয়ান জিওলজি'–র ব্যাখ্যা, 'তিব্বত মালভূমি শুধু এশিয়ার নয়, গোটা পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলভাণ্ডার। এই মালভূমিতে হিমবাহের সংখ্যা ৪০ হাজারের বেশি। তার ৭৭ শতাংশ রয়েছে ৫,০০০-৬,০০০ মিটার উচ্চতায়।

তিব্বত মালভূমি আসলে পৃথিবীর ছাদ। আর তার বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বরফের রাজ্যকে বলা হয় পৃথিবীর তৃতীয় মেরু। হিমালয়, কারাকোরাম, হিন্দুকুশ, কুনলুনসহ বিস্তীর্ণ High Mountain Asia অঞ্চলে রয়েছে এক লক্ষেরও বেশি আধুনিক হিমবাহ। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলে প্রায় ১ লক্ষ ৩২ হাজার হিমবাহ রয়েছে, যাদের মোট বরফাচ্ছাদিত এলাকা প্রায় এক লক্ষ বর্গকিলোমিটার।

কিন্তু এই বরফের সাম্রাজ্য আর স্থির নেই। উষ্ণ পৃথিবীর তাপে অধিকাংশ হিমবাহ পিছিয়ে যাচ্ছে। চীনের তথ্য বলছে, গত ছয় দশকে তাদের হিমবাহের মোট এলাকা প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে এবং প্রায় সাত হাজার ছোট হিমবাহ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে।

এই বরফ শুধু বরফ নয়। এই বরফই এশিয়ার বহু মহান নদীর উৎস। সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, ইয়াংৎসে, মেকং নদীর তিরবর্তী কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই হিমবাহগুলোর ভবিষ্যৎ। তাই হিমালয়ের বরফ গলছে মানে শুধু পাহাড়ের চেহারা বদলাচ্ছে না। বদলে যাচ্ছে আগামী দিনের জলের হিসাব – নদীর চরিত্র, কৃষি, জীবিকা এবং মানুষের ভবিষ্যৎ।

মালভূমির পরিবেশে বড় পরিবর্তনের অভিঘাত আছড়ে পড়ে বহু দূরের জনপদেও। হিমালয়ের দক্ষিণ দিকের খাড়া উপত্যকা দিয়ে নেমে আসা নদীগুলো অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণে হিমবাহ-গলা জল বয়ে এনে বহু মাইল দূরেও বিপর্যয় ঘটাতে সক্ষম।

কাঠমান্ডুর 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট'–এর বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, গোটা অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে অজস্র হিমবাহ-হ্রদ। হিমবাহ সঙ্কুচিত হলে তার সামনে বা উপরে যে হ্রদ তৈরি হয়, সেগুলোই 'হিমবাহ হ্রদ (glacial lake)’ নামে পরিচিত। এই ধরনের হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে আচমকাই নীচের দিকে ছুটে আসে বিপুল জলরাশি। এই ঘটনা 'গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড' বা 'গ্লফ' নামে পরিচিত।

তিব্বত মালভূমির দক্ষিণ প্রান্তের বিপদ শুধু হিমবাহ-হ্রদে সীমাবদ্ধ নেই। ভূমিধস, বরফধস এবং নদীর গতিপথ হঠাৎ আটকে যাওয়াও নতুন বিপদ তৈরি করছে। সম্প্রতি তিব্বতের নিয়ালাম অঞ্চলের কাছে ভূমিধসে ভোটকোশির প্রবাহ আটকে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা পোইকু-ভোটকোশি এবং গিরং-ত্রিশূলি অঞ্চলের ২৮টি হিমবাহ-হ্রদকে 'অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আরও উদ্বেগের কারণ হিমবাহের ক্ষয়ের হার। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে হিমবাহের বরফ হারানোর গতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমালয় জুড়ে ইকো-ট্যুরিজমের নামে কর্পোরেটের ব্যবসার ছক। সেই ছক বেয়ে পাহাড়ে উঠে আসছে তীর্থযাত্রী নয়। শহুরে আমোদপ্রিয় ট্যুরিস্ট বাহিনী। তাদের জন্য দরকার ঝাঁ চকচকে রাস্তা, তারকাখচিত হোটেল, রেস্তোরা, ২৪ ঘন্টার জন্য বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট কানেকশন। আর এইসব সুবিধা দিতে পুঁজির মালিকরা ও সরকার বাহাদুর উঠেপড়ে লেগেছে। হিমালয় কেটে, ভেঙে, গুঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে চারধাম যাওয়ার চার লেনের ১o ফুট চওড়া রাস্তা। নদীর গতিপথ আটকে বা পাল্টে দিয়ে একের পর এক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রাস্তাঘাট, নামিদামি হোটেল সহ সমস্ত কিছু। পুঁজির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নদী পাহাড় জঙ্গল সহ হিমালয়কে পর্যন্ত বিনিয়োগ বাজার ও ব্যবসার কেন্দ্রে পরিণত করতে হচ্ছে।

অথচ বয়সে নবীন এবং এখনো ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল (fragile) হিমালয়ের বুকে এই ভারী নির্মাণকাজ কোনভাবেই বিজ্ঞানসম্মত ও যুক্তিযুক্ত নয়। এইসব উন্নয়ন যজ্ঞের দায় বহন করতে হচ্ছে হিমালয় সহ সমগ্র প্রকৃতিকে। যা শেষ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের ঘাড়ে এসে পড়ছে।

নেপালে ক্ষয়ক্ষতি কতটা?

৩০ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে –নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে প্রায় ৭০০ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। আরও মৃতদহ একের পর এক ভেসে আসছে। মৃত্যুর সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আমাদের জানা নেই। নেপালের Rasuwa ও Nuwakot-সহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বহু ঘরবাড়ি ও বসতি ভেসে গেছে, সেতু ও রাস্তা ধ্বংস হয়েছে।

কম করে ১১টি জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে এখনো আটকে আছেন অন্তত ৯০০ শ্রমিক। বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বিপর্যস্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশেষভাবে, রাসুওয়াগাধী–গ্যিরং সীমান্ত বাণিজ্যপথ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিব্বতের গ্যিরং এলাকাতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই দুর্যোগে অনেক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী নিখোঁজ হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে ৩২০ জন ভারতীয় সহ নিখোঁজ প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। নিখোঁজ এইসব মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভবনা অত্যন্ত কম বলেই উদ্ধারকারী দল জানাচ্ছেন।

বাস্তবত “নেপাল-তিব্বত সীমান্তে যা ঘটল, তা শুধু বন্যা নয়। হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের ভয়ঙ্কর স্রোত নেমে এসে নদীকে মুহূর্তে উন্মত্ত করে তুলেছিল। সেই ice-rock avalanche ও debris flow-এর অভিঘাতে তৈরি হয় বিধ্বংসী ফ্ল্যাশ ফ্লাড। ভাসিয়ে নিয়ে যায় রাস্তা, সেতু, ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মানুষের জীবন।

 

“হিমালয় কি তবে আমাদের সতর্ক করছে? বারবার করেই জানান দিচ্ছে –বরফের শরীর বদলে যাচ্ছে, পাহাড়ের স্থিতি বদলে যাচ্ছে, নদীর আচরণ বদলে যাচ্ছে। আর আমরা এখনও উন্নয়নের পুরোনো সংজ্ঞাতেই আটকে আছি। বিপর্যয়কারী এই উন্নয়নযজ্ঞকে প্রশ্ন করছি না।

এ বড় রঙ্গ জাদু। এ বড়ই রঙ্গ!

হয়ত, আগামী কয়েক বছরে এই অঞ্চলের গ্রাম ও শহরগুলিকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। হাজার হাজার মানুষ হবেন ক্লাইমেট রিফিউজি। উন্নয়নের বলি হবেন তাঁরা। কিন্তু প্রশ্ন, কোথায় যাবেন তাঁরা? তাঁদের জীবন যাপনের উৎস পাহাড়-জঙ্গল-নদী থেকে শিকড়চ্যুত হয়ে কীভাবে বাঁচবেন তাঁরা? এ নিয়ে কারোর কোন মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা শুধু ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। এর ফলে কিছু মানুষকে আগে থেকে সরিয়ে এনে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা হয়তো যাবে। কিন্তু, মূল কারণগুলি অধরাই থেকে যাবে। আর এই ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে পুঁজির নতুন ধরনের আর এক বিনিয়োগ।

 

সিকিমের তিস্তা ফেজ-৩ একই রকম সংকটের সম্মুখীন। তিস্তা ক্রমশ গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড প্রবন নদীতে পরিনত হয়েছে গত দেড় দশকে। তিস্তা ফেজ-৩ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদিবাসী লেপচা মানুষের আওয়াজ চাপা দেওয়ার সমস্ত প্রচেষ্টাই চলছে।

নিঃসন্দেহে এটুকু বলা যায় যে, উন্নয়নের ভূমনমোহিনী কার্যকলাপ মানব জাতি সহ সমগ্র প্রাণ প্রজাতি ও প্রকৃতিকে প্রাণধারণের অনুপযোগী করে তুলতে চায়।

চরৈবতি... চরৈবতি... পথ চলা থেমে থাকে না। কিন্তু সেই পথচলা তখনই অর্থবহ, যখন প্রতিটি পদক্ষেপ মানুষ ও প্রকৃতির মিলিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়।

 

কিছুটা দূরে টিনের চাল উড়ে যাওয়া ও ঘরবাড়ি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার শব্দ শুনতে পেলুম। একদিন এইসব এলাকায় মানুষ ছিল। চায়ের দোকান ছিল। স্থানীয় মানুষদের হাতে তৈরী মোমো, থুপকার ছোট ছোট দোকান ছিল। স্কুল ছিল। শিশুদের হাসি ছিল। রিকশার ঘণ্টি ছিল। সন্ধ্যায় শোনা যেত শঙ্খধ্বনি।

আর, আজ…?

কিছুই নেই। সবই অতীত। রয়ে গেছে

শীততাপ নিয়ন্ত্রিত তিনতলা মল ও হোটেল। রয়েছে প্রবল ঝঞ্ঝা। আর এক সমুদ্র জল।

আমি দেখেছি...

অনেক রাজা। অনেক পতাকা। শুনেছি অনেক প্রতিশ্রুতি। অনেক উন্নয়নের ভাষণ। দেখেছি রাজসুয় যজ্ঞ। চেয়ে চেয়ে দেখেছি –অনেক শাসন। অনেক শোষণ। অনেক লুঠপাট।

সবই… কখন যেন চলে গেছে।

রয়ে গেছি… আমরা। থেকে গেছে এই জল।

তবু...

আমি হাঁটি। হাঁটতেই থাকি। মহাকালের পথ ধরে। খাল...বিল...নদী...পুকুর...সব পেরিয়ে।

কোথায় যাচ্ছি? জানি না।

হয়তো… কোনো নতুন পৃথিবীর দিকে।

আমি যে বিশ্ব পথিক।

আমি একা নই।

আমার ডানদিকে...

একজন বৃদ্ধ।

কাঁধে একটি কাপড়ের পুঁটলি।

বাঁ হাতে নাতনির আঙুল।

বামদিকে...একজন মা।

মাথায় টিনের বাক্স।

কোলে ঘুমন্ত শিশু।

তার চোখে ঘুম নেই। শুধুই দীর্ঘ ক্লান্তি।

ডাইনে বাঁয়ে, সামনে পিছনে আমরা অনেক।

আমরা কেউ কারও নাম জানি না।

তবু...

আমরা সবাই একই পথের যাত্রী।

একই জলের নাগরিক। একই বিপর্যয়ের সম্মুখীন। আমরা সবাই সহমর্মী, সমব্যাথী।

 

কেউ ডুবছে। কেউ ভেসে উঠছে। কেউ আবার অন্যের হাত ধরে টেনে তুলছে।

বিপর্যয় মানুষকে কখনও একা করে দেয়।

আবার কখনও অচেনাকেও আপন করে নেয়।

 

হঠাৎ বাতাসের গন্ধ বদলে গেল। এক তীব্র অসহ্য পচা গন্ধ। আমি মুখ ঢাকলাম।

জলের বুক ফুলে উঠেছে। ভেসে আসছে অসংখ্য মৃতদেহ। আমার গা গুলিয়ে উঠছে।

দূরে কয়েকটি কুকুর দাঁড়িয়ে আছে।

তারা ঘেউ ঘেউ করছে না। শুধু তাকিয়ে আছে। একঝাঁক শকুন মাংসের লোভে শিকারী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।

মনে হলো –

তারা যেন আমাদেরই প্রশ্ন করছে –

"বাসযোগ্য এ পৃথিবীকে তোমরা কোথায় এনে দাঁড় করালে?"

 

উল্টো স্রোতে গিয়ে দেখলাম –কিছু মানুষ স্রোতের বিপরীতে হাঁটছে। তারা পড়ে যাচ্ছে। আবার উঠছে। আবার হাঁটছে। তাদের চোখে ভয় আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কিছু আছে….ইচ্ছাশক্তি।

 

তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম –

কোথায় যাচ্ছো? লোকটি মৃদু হেসে বললে –“যেখানে এখনও একটু মাটি বেঁচে আছে।”

তাদের কথাগুলো আজও কানে বাজে।

“আমরা লক্ষণ দেখেছিলাম। নদী বদলাচ্ছিল। বন কমছিল। গরম বাড়ছিল। হিমবাহ  ভাঙছিল। তবু, তবুও আমরা ভেবেছিলাম –আমাদের কিছু হবে না। আমরা কোনরকমে ঠিক টিকে যাবো।”

তারপর তারা বলল –

“যদি আর একবার সুযোগ পাই...

তবে শুধু ঘর বানাব না। অসুস্থ প্রকৃতিকে সুস্থ করতে আমরাও হাঁটবো। পৃথিবীকে বাঁচানোর চেষ্টা করব।"

জল ঠেলে...আরও কিছুদূর এগোলাম।

তারপর...হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলাম।দূরে –ডুবে যাওয়া একটি পাঁচতলা বাড়ি। শুধু ছাদটুকু জেগে আছে। সেই ছাদের কিনারায় একজন মানুষ। ছেঁড়া জামা। এলোমেলো চুল। দুই হাত আকাশের দিকে তুলে সে চিৎকার করছে।

 

মানুষটিকে চিনতে আমার এক মুহূর্তও লাগল না। সে, মেহের আলি। হয়তো পাগল। হয়তো বা…এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্থ মানুষ।

সে চিৎকার করে বলছে –

"ওঠো...জেগে ওঠো...মাথা তুলে দাঁড়াও...

এখনও সময় আছে...হাঁটো...হাঁটতে শেখো...।”

তার কণ্ঠ ভেসে আসছে...

জলের ওপর দিয়ে...

বাতাসের বুক চিরে...

আমার বুকের ভেতর।

 

আবার হাঁটা শুরু করলাম।

কারণ...পথ এখনও শেষ হয়নি।

জলেরও শেষ নেই। মানুষেরও শেষ নেই। দুর্যোগ, বিপর্যয়, বিপাকেরও অন্ত নেই। তবুও, আশা ভরসাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

 

আশা ভরসা টিকিয়ে রাখতে পাহাড়বাসী জনজাতির মানুষ বারবার করে এইসব দুর্যোগের বিরুদ্ধে রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন। তাঁরা বলছেন –“আমরা উন্নয়ন চাই না। আমাদেরকে আমাদের মতো করে প্রকৃতির কোলে সুস্থভাবে বাঁচতে দাও।”

 

ভরসা জাগিয়ে রেখে নেপালের ভয়াবহ  বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান উঠেছে এবার হিমালয়ের আর এক প্রান্ত থেকে।

সিকিমের দুই গুরুত্বপূর্ণ নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন সিকিম ভুটিয়া লেপচা অ্যাপেক্স কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে –হিমালয়ের এই ভঙ্গুর পরিবেশে প্রস্তাবিত সমস্ত নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা বাতিল করা হোক।

শুধু তাই নয়, সিকিমে ইতিমধ্যে নির্মিত ও চালু থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন তদন্তেরও দাবি জানিয়েছে তারা।

 

সংগঠনের আহ্বায়ক, যিনি সিকিম বিজেপির রাজ্য শাখার প্রধান উপদেষ্টাও, স্পষ্ট করে বলেছেন –তাঁদের সংগঠন উন্নয়নের বিরোধী নয়। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি পাহাড়ের পরিবেশগত ভারসাম্য, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিনিময়ে হয়, তাহলে সেই উন্নয়নকে তাঁরা মেনে নিতে রাজি নন।

কারণ, হিমালয় শুধুই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল নয়।

এই পাহাড়ের প্রতিটি নদী, প্রতিটি হিমবাহ, প্রতিটি ঢাল একটি সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ। আর সেই ব্যবস্থার সঙ্গে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের মূল্য যে কত ভয়াবহ হতে পারে, নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় যেন তারই আর একটি সতর্কবার্তা।

আর টিকে থাকতে হলে আমাকে আপনাকে, সকলকে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত করে দেওয়া প্রকৃতি পরিবেশকে রক্ষা করা ও পুনরুদ্ধারের কাজে হাত লাগাতে হবে। মানুষের জীবনে প্রকৃতির গুরুত্ব বুঝতে হবে অন্তরে মননের গভীরে। তবেই হয়তো আশা বেঁচে থাকবে। টিকে থাকবে মানব সভ্যতা।

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment