পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ফ্যাসিস্ত হিন্দুত্বের জমানায় শান্তিপূর্ণ আইন-অমান্য আন্দোলনও উগ্রপন্থা

  • 29 August, 2025
  • 0 Comment(s)
  • 407 view(s)
  • লিখেছেন : শুভজিৎ সিংহ
মহাত্মা গান্ধীর দেখানো পথে ‘আইন-অমান্য আন্দোলন’কেও বেআইনি ঘোষণা করার সংস্থান রয়েছে এই ‘মহারাষ্ট্র স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি বিল ২০২৪’ বিলে। গান্ধীর অহিংসাকে ‘আহাম্মকি’ বলে অভিহিত করেছিলেন গোলওয়ালকর । সুতরাং, গান্ধী প্রবর্তিত আইন-অমান্য আন্দোলনকে তাঁরা বেআইনি কার্যকলাপের তকমা লাগাবেন তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। রাজ্যের নতুন আইনে মহারাষ্ট্রে কোনও রকম সরকার-বিরোধিতা আর চলবে না

No praying, no sneezing
No spitting, eulogizing, kneeling
Worshiping, howling, or coughing.

No sleeping permitted in this area
No inoculating, talking, excommunicating
Harmonizing, escaping, catching.

Running is absolutely forbidden.

No smoking. No fucking.

Warnings (English Title of original anti-poem ‘Advertencias’), Nicanor Parra

 

আরএসএসের প্রাতঃস্মরণীয় গুরু এমএস গোলওয়ালকর, তাঁর ‘বাঞ্চ অফ থটস’ বইতে বলেছিলেন, ‘All activities regarding civil defence as well as alertness and watchfulness about anti-social and anti-national elements must continue in full swing so as not to give any chance to fifth-columnists aided by infiltrators to jeopardise the country`s security from within. In this regard, the Government has a special responsibility. Not only should they be extremely alert and determined to deal with all such subversive elements with an iron hand’ [সমাজবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিগুলি সম্পর্কে সদাসতর্ক ও সদাজাগ্রত দৃষ্টি এবং সেই সঙ্গে অসামরিক সুরক্ষা সংক্রান্ত সমস্ত কার্যকলাপ পূর্ণ উদ্যমে চালিয়ে যেতে হবে যাতে পঞ্চম বাহিনীরা অনুপ্রবেশকারীদের সাহায্য নিয়ে ভিতর থেকে দেশের নিরাপত্তাকে বানচাল করে দিতে না পারে। এই ব্যাপারে সরকারের এক বিশেষ দায়িত্ব আছে। তাঁদের চূড়ান্ত সতর্ক ও সংকল্পবদ্ধ হয়ে এই ধরণের সমস্ত দেশদ্রোহী শক্তিগুলিকে লৌহমুষ্টিতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে ]।

তাঁর সে উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, মহারাষ্ট্রে তথাকথিত ‘বেআইনি কার্যকলাপ’ রুখে, জন-সুরক্ষা, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, দেশে বহু ফৌজদারি আইনের সংস্থান থাকা সত্ত্বেও, রাজ্যের বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস পাশ করিয়েছেন ‘মহারাষ্ট্র স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি বিল ২০২৪’। রাজ্যের বিধানসভা ১০ জুলাই ধ্বনি ভোটে পাশ করেছে এই বিল। বিরোধিতা করে বক্তব্য রাখেন সিপিআই(এম)-এর একমাত্র বিধায়ক বিনোদ নিকোলে, আর বিরোধীদের বাকি অংশ বিলের যুক্তিগ্রাহ্য বিরোধিতা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন

আইনটির লক্ষ্য, রাজ্যে কোনও রকম সরকার-বিরোধী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করা এবং সেই সাথে, সরকারি আধিকারিকদের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দান। ‘বেআইনি কার্যকলাপে’র অস্পষ্ট, বিস্তৃত সংজ্ঞা নির্ধারণ, আদালতকে এড়িয়ে সাধারণ মানুষকে নির্বিচার গ্রেফতার, তার আবাস থেকে উৎখাত ও সম্পত্তি দখলের স্বেচ্ছাচারী সরকারী ক্ষমতায়ন, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও অন্যায়ের শিকার ক্ষতিগ্রস্তদের আদালতে সুরাহা চাওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে আনা এবং আধিকারিকদের শাস্তি রেহাই-এর রক্ষাকবচ রাখা, যাতে তাঁরা আরও স্বেচ্ছাচারি হয়ে অকথ্য নির্যাতন চালাতে পারেন, সেইসাথে, অভিযুক্তের ন্যূনতম আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থাটুকুও কেড়ে নিয়ে শাসক-নিরপেক্ষ আদালতের জায়গায় সরকার নির্ধারিত ‘উপদেষ্টা মণ্ডলী’ তৈরি করে, একটি শাসক সমর্থক সমান্তরাল বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা– এ সবই নতুন বিলের বিপজ্জনক দিক। এটাই বিজেপি সরকারকৃত, কেন্দ্র ও রাজ্যের, সমস্ত নতুন আইনের নির্দিষ্ট প্যাটার্ন।

জন-সুরক্ষা, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অজস্র আইন থাকা সত্ত্বেও, নতুন বিল আনার অপরিহার্যতা সম্পর্কে, এমন একটি প্রবল বিতর্কিত দমনমূলক বিলের মুখবন্ধে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু, [না কি] বাম চরমপন্থী সংগঠন বা অনুরূপ সংগঠনের বেআইনি কার্যকলাপের জন্য সে রাজ্যে জন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে, সরকারী কাজকর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে, এজন্য রাজ্যে ওইসব অতি-বাম সংগঠনের বেআইনি কার্যকলাপ কার্যকরীভাবে রুখতে আনা হয়েছে এই বিল’। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ অনুভাগে বলা হয়েছে, ‘শহরে থাকা নকশালদের ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশনগুলোর কার্যকলাপ বন্ধ করা এবং তাদের জন্য শহরের নিরাপদ আশ্রয়, সহানুভূতি ও আর্থিক উৎস খতম করতে এই বিল কার্যকরী ভূমিকা নেবে। নকশালবাদের বিপদ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনগুলি অকার্যকর এবং অপর্যাপ্ত’।

মহারাষ্ট্র বিধানসভায় বিলটি গত বছর ডিসেম্বরেই পেশ করা হয়েছিল, কিন্তু বিভিন্ন সংগঠন নানান আপত্তি তোলায় সেটি তখন সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানো হয়। রাজস্ব মন্ত্রী ও রাজ্য বিজেপির সভাপতি চন্দ্রশেখর বাওয়ানকুলের নেতৃত্বে ২৫ সদস্যের সিলেক্ট কমিটির ৫টি সভা শেষে ১০ জুলাই বিধানসভায় পেশ করা হয় বিলটি এবং বিপুল সংখ্যা গরিষ্ঠতা থাকায় সহজেই ধ্বনি ভোটে পাশ হয়ে যায়। রাজ্যের বাম দলগুলো, মানবাধিকার সংগঠন পিইউসিএলসহ ৭৯টি বিভিন্ন গণসংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং বহু নাগরিকের পক্ষ থেকে প্রায় বারো হাজার আপত্তি আসে সিলেক্ট কমিটির কাছে। সব আপত্তি উড়িয়ে দিয়ে, তাঁরা সরকারের সুবিধার্থে তিনটি সংশোধনী আনেন। যেগুলো আরও কঠোর এবং ফৌজদারি মামলার ন্যায়-বিচারের ন্যূনতম নৈতিকতা, সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী করে তুলেছে আইনটিকে।

অপরাধের সংজ্ঞা– বিমূর্ত, বিস্তৃত

আইনটিতে প্রথমেই ‘বেআইনি কার্যকলাপে’র সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলে দেওয়া হয়েছে [Sec.2(f)(I-VII)], যেকোনো নথিভুক্ত বা অনথিভুক্ত সংগঠন বা কিছু মানুষের গোষ্ঠী বা জোট বা দলের অপরাধমূলক হামলা, হিংস্রতা ছাড়াও এমন যে কোনও কাজকে আইনবিরোধী কার্যকলাপ বলে ধরা হবে, যা জন-শৃঙ্খলা, শান্তি, স্থিতাবস্থা ব্যাহত করে, কোনও সরকারী প্রশাসন বা সংস্থার এবং তাতে নিযুক্ত কর্মীর কাজে সমস্যা সৃষ্টি করে, আইনবিরুদ্ধ বল প্রয়োগ করে বা করার হুমকি দেয়, কোনওভাবে রেল, রাস্তা, জলে সাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করে বা করার পরিকল্পনা করে, সরকারী কর্মী, বাহিনীর কাজে অসুবিধার সৃষ্টি করে, এমন কি যে কোনও রকম আইন-অমান্য করতে উৎসাহ দেয় বা প্রচার করে, তা কোনও মাধ্যমে প্রকাশ করে, কোনও প্রতীক, অঙ্গভঙ্গি, অথবা চাক্ষুষ উপস্থাপনা করে, বা এমন কোনও কাজের জন্য অর্থ বা অন্য কোনও জিনিষ সংগ্রহ বা বিতরণ করে। বেআইনি কার্যকলাপের এই বিস্তৃত সংজ্ঞার ফলে, কোনও প্রতিবাদ মিছিল, জমায়েত, ডেপুটেশন, বিক্ষোভ সভা, বক্তব্য রাখা, এমন কি শান্তিপূর্ণভাবে আইন-অমান্য আন্দোলনকেওবেআইনি কার্যকলাপ’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সুতরাং কোনও রকম সরকার-বিরোধী প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, ধর্না দূরস্থান, সরকার থেকে ন্যায্য সুরাহা, দমনমূলক কাজের / অত্যাচারের কোনও রকম প্রতিবাদ করা যাবে না। এই আইন বলে, অংশ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের বেআইনি কার্যকলাপে’ যুক্ত থাকার জন্য শাস্তি প্রাপ্য হবে। এমন কি, কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন তাঁদের কাজকর্ম বন্ধ করেছেন বলে যদি ঘোষণাও করেন, তাহলেও জেল যাত্রা থেকে নিষ্কৃতি মিলবে না।

আদালতের স্থলে উপদেষ্টা মণ্ডলী

অন্যতম উল্লেখ্য বিষয়, আদালত নয়, সরকারের আধিকারিকরাই ঠিক করবে কোন সংগঠন, গোষ্ঠীকে কখন বেআইনি ঘোষণা করা হবে। তবে কেন সরকার এই সিদ্ধান্ত, জনস্বার্থে সে তথ্য জানাতে বাধ্য নয় সরকার। এই ঘোষণা জারি হওয়ার পর, সেই সংগঠন, গোষ্ঠী, জোট আদালতে নয়, সরকারের কাছে অথবা সরকার গঠিত একটি ‘অ্যাডভাইসরি বোর্ডের’ কাছে সরকারের নির্দেশিকার বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারবে। বোর্ড ব্যক্তিগত শুনানিতে ডাকবে, এরপর তাদের বেআইনি তকমাটি স্থায়ী হবে বা প্রত্যহৃত হবে [Sec. 3 – 7]। সরকারের মনোনয়ন করা তিন সদস্যের বোর্ডে, একজন হাইকোর্টের বিচারপতি হবেন (চেয়ারম্যান), দ্বিতীয়জন অবসরপ্রাপ্ত জেলা বিচারক এবং তৃতীয় সদস্য হবেন হাইকোর্টের রাজ্য-সরকারী প্লীডার, যিনি সরকারী বেতনভোগী কর্মচারী ছাড়া আর কিছুই নন। সুতরাং, এটা পরিষ্কার, সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এই বোর্ড। অ্যাডভাইসরি বোর্ডকে দেওয়ানি আদালতের সমতুল্য ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে [Sec.6(5)]। সরকারের পদক্ষেপকে বোর্ড পর্যালোচনা করে নিশ্চিত করবে (যা সরকারের মতানুসারে হওয়াই স্বাভাবিক)।  

দণ্ড বিধান

আধুনিক দণ্ডব্যবস্থার মূলগত ধারনায়, শাস্তি তখনই ন্যায্য যদি তা সর্বাধিক সংখ্যকের জন্য সর্বাধিক কল্যাণ বয়ে আনে। এক্ষেত্রে, অপরাধের সংজ্ঞাতেই রয়েছে স্বচ্ছতার অভাব। সুতারং, তার শাস্তি বিধানেও প্রতিফলিত হয়েছে স্বেচ্ছাচার।

আদালত নয়, সরকার কোনও সংগঠন, সমিতি, জনজোটকে বেআইনি ঘোষণা করবে। ঘোষিত বেআইনি সংগঠন, সমিতি, জনগোষ্ঠীর সদস্য বা সদস্য নয় এমন ব্যক্তি তাদের কার্যকলাপে যুক্ত আছেন, কোনও ভাবে তাদের সাহায্য করেছেন, চাঁদা দিয়েছেন বা দিতে চেয়েছেন, তাদের সভায় ছিলেন বা করতে উৎসাহ/সমর্থন যুগিয়েছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, এমনকি তাদের সভায় যাবেন / কার্যকলাপে থাকবেন পরিকল্পনা করেছেন, সকলেই অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন। শাস্তির পরিমাণ হবে দুই থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর এবং জরিমানা হবে দুই থেকে পাঁচ লক্ষ [Sec. 8 (1-4)]। অপরাধটি গণ্য হবে কগনিজিবল এবং নন-বেইলেবল অর্থাৎ ওয়ারাণ্ট ছাড়াই গ্রেফতার করতে পারবে পুলিশ এবং থানা থেকে জামিন পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। বেআইনি ঘোষিত সংগঠন, গোষ্ঠীর অফিস বা যে স্থানে তাঁরা বেআইনি কার্যকলাপ করেন বা ব্যবহার করেন, সরকারের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সেটি দখল করবেন, তা যদি বাসস্থান হয় এবং সেখানে কোনও মহিলা বা শিশু অবস্থান করেন, তাহলে তাঁদের ন্যূনতম সময় দেওয়া হবে সেই স্থান থেকে সরে যাওয়ার জন্য [Sec. 9(1-3)]। আধিকারিক এবার, ওই স্থানে বা গৃহে যা কিছু অস্থাবর সম্পত্তি (অর্থ, জমানত, অন্যান্য যাবতীয় সম্পত্তি) পাবেন তার দখলে নেবেন, তার মালিক যেই হোক না কেন। সংশ্লিষ্ট আধিকারিক যদি মনে করেন, ওই সব সম্পত্তি বেআইনি ঘোষিত সংগঠনের কাজে লাগতে পারে, তাহলে সেসব কিছু সরকার বাজেয়াপ্ত করবেন [Sec.10(1-8)]। সাধারণভাবে, তল্লাশি করতে আদালতের আদেশ লাগে, এক্ষেত্রে, তদন্তকারীকে দেওয়া উর্ধতন কর্তৃপক্ষের আদেশনামাই ওয়ারাণ্ট বলে বিবেচিত হবে [Sec.11(5)]।

আদালতের ভূমিকা

সঙ্কুচিত করা হয়েছে ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে আদলাতের ভূমিকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই আইনে সরকারী আধিকারিকের দেওয়া সমস্ত নোটিশ, নির্দেশের বিরুদ্ধে, মহকুমা বা জেলা আদালত নয়, ন্যূনতম হাইকোর্টে যাওয়া যেতে পারে [Sec.12]। এর মাধ্যমে করা সরকারী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে, উচ্চ আদালত বা শীর্ষ আদালত কোনও স্থগিতাদেশ দিতে পারবে না, দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনও আধিকারিককে ডেকে পাঠাতে পারবে না এবং পুলিশ অফিসার বা অন্য আধিকারিকদের বিরুদ্ধে, স্বেচ্ছাচারী কাজের জন্য, আদালতে যাওয়া যাবে না অর্থাৎ তাঁদের জন্য দায়-মুক্তির আইনি সুরক্ষা থাকবে [Sec.14 ও 15]। এই আইন প্রয়োগ করা হবে একজন ডিআইজি পদমর্যাদার আধিকারিকের অনুমতিতে, অথচ, আদালত মামলাটি গ্রহণ করতে পারবে একমাত্র এডিজি পদমর্যাদার আধিকারিকের রিপোর্ট পাওয়ার পরেই [Sec.16]।

বিলটির বিপজ্জনক দিক

সরকারের উদ্দেশ্যই যখন যেকোনো সমালোচনা, বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা, তখন অপরাধের সংজ্ঞা হয় বিমূর্ত, শাস্তি নির্ধারিত হয় নীতিহীন স্বেচ্ছাচারী আর লক্ষ্য হয় অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা প্রয়োগে বিরোধীকে কয়েদ করার জন্য। ফলে, আইনটি নিয়ে প্রবল বিক্ষোভ হচ্ছে সে রাজ্যে। কেন এত বিপজ্জনক এটি। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন স্তরে, বিজেপি সরকারগুলোর করা নতুন নতুন আইনগুলোর বিশেষ প্যাটার্ন রয়েছে। এই আইনটিতে সেটি আরও বেশি করে প্রকট।  

এক) বিলটির আনার জন্য যুক্তিগ্রাহ্য কারণ / আবশ্যিকতা–  আইনি পরিভাষায় যাকে বলা হয় Doctrine of Necessity, তা করা হয়েছে কয়েক লাইনের দায়সারা বিবৃতির দিয়ে। বিলের ‘Statement of Objects and Reasons’ অংশে বলা হয়েছে মহারাষ্ট্রে নকশালবাদের হুমকি, মাওবাদী উগ্রপন্থীদের শহরের আশ্রয়, সহায়তা ধ্বংস করতে, তাদের মতাদর্শ প্রচার বন্ধ করতে, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে [না কি] এমন আইনের অপরিহার্যতা রয়েছে। একটি রাজনৈতিক মতবাদ কেন হুমকি, কেন তারা জনশৃঙ্খলা ব্যাহত করছে, যদি সমস্যা হয়, তাহলে কি সেই সমস্যা, যা সমাধান করতে [না কি] প্রচলিত কোনও আইনই কার্যকরী নয়। উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ সুনির্দিষ্টভাবে দেখানো দরকার, বিদ্যমান আইনগুলো দিয়ে কেন উদ্ভুত জটিল সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। না আছে তার ব্যাখ্যা, না তার উদাহরণ, কিংবা সংখ্যাতত্ত্বের নমুনা। সেসবের প্রয়োজনীয়তা মনে করেনি সরকার।   

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের (UDHR) অনুচ্ছেদ ২, ১৮ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত সনদের (ICCPR) অনুচ্ছেদ ১৮ অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের কোনও রাজনৈতিক মতামতে বিশ্বাস রাখার স্বাধীনতা এবং অলঙ্ঘনীয় অধিকার রয়েছে। সুতরাং, কোনও একটি মতবাদে বিশ্বাস রাখা এবং প্রচার করা বেআইনি বলা যায় না।  

দুই) অপরাধের সংজ্ঞা অনির্দিষ্ট, অস্পষ্ট, বিস্তৃত– ফৌজদারি আইনশাস্ত্রের প্রাথমিক এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতি, ল্যাটিন ভাষায় Nullum crimen sine lege, Nulla poena sine lege, অর্থাৎ আইনে অপরাধের সংজ্ঞা হতে হবে স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট, কোনও রকম ধোঁয়াশা, একাধিক ব্যাখ্যা থাকা চলবে না, সাধারণ মানুষের বোধগম্য হতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট নিষিদ্ধ কাজের (অপরাধের) জন্য সুনির্দিষ্ট, স্পষ্ট শাস্তি ব্যাখ্যায়িত থাকতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগ থেকে নাগরিকের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। শুধু তাই নয়, যে কোনও আইনকেই আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হতে হবে, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়নি এমন কাজের জন্য কোনও ব্যক্তিকে শাস্তির সম্মুখীন না করা নিশ্চিত করতে হবে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, নতুন এই আইনটিতে অপরাধের সংজ্ঞা একেবারেই অনির্দিষ্ট, অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ এবং বিস্তৃত। কর্তৃপক্ষ কোন কোন কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করবেন তা তাঁদের বিবেচনার [আসলে মর্জির] উপরে নির্ভর করছে। সরকার-বিরোধী বা কোনও আধিকারিকের দুষ্কর্ম, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও কোনো প্রতিবাদ জানানো অর্থাৎ মিছিল, মিটিং, পথসভা, জমায়েত, অবস্থান, ধর্না, যা কিছু শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রকরণ বা সেজন্য যে কোনও মাধ্যমে মত প্রকাশ বা বক্তব্য রাখলে, প্রচার করলে, প্রতিবাদের জন্য যে কোনও বস্তু বহন করলে অর্থাৎ ব্যানার, পতাকা, লিফলেট, প্রচারপত্র, মাইক, বহনকারী যান ইত্যাদি, সেজন্য অনুদান সংগ্রহ করলে বা দিলে– সবই বেআইনি কাজকর্মের সংজ্ঞার আওতায় পড়বে। বিশেষত, এমন কিছু কাজকে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে যা ভারতের সংবিধানের মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দেশের যেকোনো স্থানে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা এবং জমায়েত, সংগঠন করার অধিকার (অনু- ১৯) উল্লঙ্ঘন করছে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ ১৯ (দেশ নিরপেক্ষভাবে, বাধাহীনভাবে প্রতিটি মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বক্তব্য রাখার এবং যেকোনও মাধ্যমে মতামত ও তথ্য বিনিময়ের স্বাধীনতা), অনুচ্ছেদ ২০ (প্রতিটি মানুষের শান্তিপূর্ণ জমায়েত করার অধিকার) লঙ্ঘন করে।

তিন) আদালতকে প্রতিস্থাপিত করেছে আপাত-নিরপেক্ষ উপদেষ্টা পর্ষদ– আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম স্ট্যাটিউট (অনুচ্ছেদ ৪০) অনুযায়ী  বিচারপতিকে অবশ্যই নিরপেক্ষ, সর্বসময়ের জন্য হতে হবে, এমন কোনও কাজে / পেশায় যুক্ত থাকবেন না, যা তাঁদের নিরপেক্ষতায় প্রশ্ন উঠতে পারে।

এই বিলে, সরকার গঠিত অ্যাডভাইসরি বোর্ডই, সরকার-নিরপেক্ষ আদালতের বদলে, সরকারের পাঠানো অভিযোগের (নোটিশের) বিচার, পর্যালোচনা অর্থাৎ জুডিশিয়াল রিভিউ, স্ক্রুটিনি করবে। দেওয়ানি আদালতের সমতুল্য ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এই বোর্ডকে। উপদেষ্টা পর্ষদ কখনই আদালতের সমতুল্য ক্ষমতা নিয়ে নিরপেক্ষ আদালতকে প্রতিস্থাপিত করতে, অভিযুক্তের ন্যায়-বিচারের সুযোগকে খর্ব করতে পারে না। আইন নির্দিষ্ট শাস্তির বিচার-পর্যালোচনার দায়িত্বও নিতে পারে না। তার কাজ পরামর্শ দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকা দরকার। অ্যাডভাইসরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভিযুক্তকে বন্দি করার অর্থ, আদালতে বিচারের সুযোগ বঞ্চিত করে অভিযুক্তকে নিবর্তনমূলক আটক করা। সংবিধানের ২২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নিবর্তনমূলক আটকের জন্য, হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়েই উপদেষ্টা পর্ষদ গঠিত হতে পারে। অথচ, এক্ষেত্রে নিবর্তনমূলক আটকের জন্য গ্রেফতার করা হচ্ছে না এবং একজন হাইকোর্টের বিচারপতির সঙ্গে, অবসরপ্রাপ্ত জেলা বিচারক এবং সরকারী উকিলকেও রাখা হয়েছে বোর্ডে। ফলত, এই বোর্ডের মনোনয়ন হবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং সেটি থাকবে শাসকের নিয়ন্ত্রনে, আদতে তাদের রাবার স্ট্যাম্প হবে মাত্র। এই আইনে, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য সরকারী আধিকারিকদের ডেকে পাঠানোর এক্তিয়ার নেই হাইকোর্ট বা সুপ্রিমকোর্টের, এমন কি স্থগিতাদেশও দিতে পারবে না, সরকারী নোটিশের উপর। এডিজি পদমর্যাদার আধিকারিকের রিপোর্ট ছাড়া মামলা গ্রহণই করতে পারবে না আদালত। আইনসভার স্বেচ্ছাচারী ও বেপরোয়া ক্ষমতার বলে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, সংবিধান সম্মত শাসক-নিরপেক্ষ আদালতের এক্তিয়ারকে খর্ব করা হয়েছে। যখন ন্যায়বিচারের অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে জোরালোভাবে সওয়াল করছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ, সে সময় সাধারণ মানুষের নিরপেক্ষ আদালতের সামনে ন্যায়-বিচার পাওয়ার অধিকারকে (Right to access Justice) নির্লজ্জভাবে হরণ করা হয়েছে।  

চার) শাসক-নিরপেক্ষ আদালতকে এড়িয়ে যাওয়া– একটি সমাজের মধ্যে ন্যায্যতা, সমতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, যা আইনের শাসনের (Rule of Law) অন্যতম মূলনীতি। নিরপেক্ষ ন্যায় বিচারের সর্বজনীন নীতি, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের (UDHR) ১০ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের পূর্ণ সমানাধিকারের ভিত্তিতে নিজের অধিকার ও দায়বদ্ধতা নির্ধারণের জন্য, তাঁর বিরুদ্ধে আনীত কোনও ফৌজদারি অভিযোগের বিষয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারকমণ্ডলীর সমনে ন্যায়সঙ্গত ও প্রকাশ্য শুনানির অধিকার আছে। ভারতীয় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার নীতি অনুযায়ী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সরকারের আনা অভিযোগের বিচারের দায়িত্ব সরকার-নিরপেক্ষ বিচারবিভাগের। তাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে, একটি সমান্তরাল শাসক-সমর্থক, একপেশে বিচার-ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের হাতেই অভিযুক্ত ব্যক্তির বা সংগঠনের বিচার এবং অপরাধী সাব্যস্ত করার এক্তিয়ার তুলে দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা পর্ষদের বকলমে, অভিযুক্তের / বন্দির ন্যায়-বিচার পাওয়ার সুযোগটুকুও ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর [বলা ভালো মর্জির উপর] নির্ভর করে থাকবে। সরকারের এবং [শাসকের রাবার স্ট্যাম্প] বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে, হাইকোর্ট যেতে পারবে অভিযুক্ত। সুতরাং, দরিদ্র মানুষকে ন্যায়-বিচার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

পাঁচ) সরকারী আধিকারিকদের জবাবদিহিতার দায় মুক্তি– বিলটিতে যেমন রয়েছে অপরাধের এবং অপরাধীদের অনির্দিষ্ট, অস্পষ্ট ও বিস্তৃত সংজ্ঞা, সেই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলাস্তরের সরকারী আধিকারিকদের এক্তিয়ারে থাকছে অনিয়ন্ত্রিত, প্রশ্নাতীত ক্ষমতা। খুব সহজভাবেই বলা যায়, এই আইনের প্রভূত অপব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। অপরপক্ষে, বিলে সরকারী আধিকারিকদের দায়-মুক্তি এবং শাস্তি রেহাই-এর আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। আধিকারিকের নির্দেশ বা কাজ আদালতে ভুল প্রমাণ হলেও, সেজন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জেলযাত্রা, সম্মানহানী, বাজেয়াপ্তকৃত সম্পত্তির হানী, অন্যান্য চূড়ান্ত ক্ষতি ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেও, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও দেওয়ানি এবং ফৌজদারী মামলা করা যাবে না। কারণ, আধিকারিকদের করা সমস্ত কাজই সরল মনে (in good faith) করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। সংঘটিত ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধের জন্য রাষ্ট্রের আধিকারিকদের দায়মুক্তি (impunity for crimes), প্রতিটি জাতির মূল্যবোধ এবং সামাজিক সংহতির পক্ষে গভীর ক্ষতিকর, বলেছিলেন রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনার মিশেল ব্যাশেলেত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের৬ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রত্যেকেই আইনের সমান এবং কোনও রকম বৈষম্য ব্যতিরেকে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। ভারতের সংবিধানে আইনের চোখে সবাই সমান (অনুচ্ছেদ ১৪) হলেও, সরকারী কর্মীদের বিচার প্রক্রিয়া থেকে ছাড় দিয়ে, অভিযুক্তের মৌলিক অধিকারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এই নৃশংস আইনের মাধ্যমে।  

ছয়) প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ‘অভিযুক্তের নির্দোষিতার’ সর্বজনীন নীতি উপেক্ষিত– ফৌজদারি আইনশাস্ত্রের প্রাচীনতম এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতি, ‘দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে নির্দোষ ধরে নিতে হবে’ (ল্যাটিন ভাষায়, “Ei incumbit probatio qui dicit, non qui negat”), তদনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে (অনুচ্ছেদ ১১) স্পষ্টভাবে উল্লিখিত রয়েছে, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রত্যেকেরই ন্যায়বিচারে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য করার অধিকার রয়েছে। সংগঠনকে বেআইনি ঘোষণা করে, আদালতে অভিযোগের যথেষ্ট প্রমাণ না দিয়ে, কোনও আইনি পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে কোনও ব্যক্তিকে স্বেচ্ছাচারীভাবে গ্রেফতার, সরাসরি সংবিধানের মৌলিক অধিকার (অনু. ২২) লঙ্ঘন করে। এই বিলে সে বন্দোবস্তও করা হয়েছে।   

সাত) সংবিধান সম্মত মৌলিক অধিকার নির্বিচার উল্লঙ্ঘন– সংবিধান নির্দিষ্ট মৌলিক অধিকারকে (অনুচ্ছেদ ১৪– আইনের চোখে সবাই সমান, অনুচ্ছেদ ১৯– মতপ্রকাশের, শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশিত হওয়ার, সমিতি/সংগঠন করার, অনুচ্ছেদ ২১– জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার, অনুচ্ছেদ ২২- অভিযোগের ভিত্তি অবহিত না করে, আইনি পরামর্শ করতে না দিয়ে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা যাবে না) সরাসরি লঙ্ঘন করে এই বিল।

একুশের আইনের আসল মতলব খনিজ সম্পদের দখল

মহারাষ্ট্রের খনিজ সমৃদ্ধ গারচিরোলি জেলায় বিস্তীর্ণ অরণ্য ধ্বংস করে, খনিজ সম্পদের দখল নিয়ে কর্পোরেটদের হতে তুলে দিতে জুন (২০২৫) মাসে সে রাজ্যে পাশ হয়ে গেছে ‘গারচিরোলি ডিসট্রিক্ট মাইনিং অথরিটি অ্যাক্ট ২০২৫’। এলাকার দ্রুত দখল নিতে, বংশানুক্রমে বসবাস করা অরণ্যবাসীর জীবন, বসতি ধ্বংস করে চালানো হবে যদৃচ্ছ উচ্ছেদ। তাই, বেপরোয়া সরকারী কর্মীদের কেশাগ্রও যাতে ছোঁয়া না যায়, সেজন্য সে আইনেও, একই রকম ‘জবাবদিহিতার ও অপরাধের দায় মুক্তি’র বিধান রাখা আছে। আদিবাসী উচ্ছেদ ও জীববৈচিত্র ধ্বংস যজ্ঞের ব্যাপক আয়োজনের বিরুদ্ধে, রাজ্যে প্রথাগত সংসদীয় রাজনীতির বাইরের বিপুল বিরোধী কণ্ঠস্বর, তথা সরকারকে প্রশ্ন তোলা শান্তিপূর্ণ, নিরস্ত্র, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বিরুদ্ধতাকে নির্মূল করতে, উপরোক্ত আইনটির পরিপূরক হিসেবে, আনা হয়েছে বর্তমান বিলটি। মহারাষ্ট্রে ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সংখ্যা ৬৪ ছুঁয়েছে। প্রথাগত দলীয় রাজনীতির বাইরের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন– ছাত্র, মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক, দলিত অধিকার, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, আইনি সহায়তা ইত্যাদি সমস্ত ধরণের সরকার সমালোচক সংগঠনই, বিজেপি সরকারের মতে, নকশালবাদীদের ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশন, যারা না কি, গরিব মানুষের মধ্যে সামাজিক উন্নয়নের অছিলায় কাজ করে থাকে। আদিবাসী উন্নয়নের জন্য সাড়া জীবন কাজ করে যাওয়া, পঞ্চায়েত এক্সটেনশন অফ সিডিউলড এরিয়াজ অ্যাক্ট-এর নির্মাতা প্রখ্যাত বি. ডি. শর্মা (আইএএস) প্রতিষ্ঠিত ‘ভারত জন-আন্দোলন’ কয়েক দশক ধরে কাজ করে যাওয়ার পর নকশালবাদীদের ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বহু আম্বেদকরপন্থী দলিত অধিকার সংগঠন (রিপাবলিকান প্যান্থার্স জাতিয়াঞ্চি চলঅয়াল ইত্যাদি), সিপিডিআর, সিআরপিপির মতো মানবাধিকার সংগঠন, উইমেন এগেন্সট সেক্সুয়াল ভায়লেন্স অ্যান্ড ষ্টেট রিপ্রেশন, ছাত্র ভারতী বিদ্যার্থী সংগঠন ইত্যাদিও এর আওতায় পড়েছে। মহারাষ্ট্র সরকারের মতে, এই ধরণের সংগঠনগুলি প্রচলিত আইন লঙ্ঘন না করেও সাংস্কৃতিক, সামাজিক, শিক্ষামূলক বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আড়ালে মাওবাদীদের দর্শন প্রচার করতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাদের কাজের হদিশ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াও সমস্যাদায়ক। বিজেপির চক্ষুশূল এই সব সংগঠনই তো ২০২০ সালে দেশ জোড়া প্রবল আলোড়ন তোলা সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিল। কিন্তু, এই সমস্ত সংগঠনকে স্তব্ধ করার কোনও রকম আইনগ্রাহ্য তথ্য-প্রমাণ, সুযোগ সরকারের কাছে ছিল না। তাই, এদের নিয়ন্ত্রণ করতে বিপুল গরিষ্ঠ বিধানসভার বলে বলীয়ান হয়ে সম্পূর্ণ সংবিধান বিরোধী, ন্যায়বিচারের বিশ্বজনীন নীতিকে নস্যাৎ করে এমন এক ‘একুশে আইন’ আনা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রাজ্যে নকশালবাদ রোখাই এই বিলের উদ্দেশ্যে হলেও, আশ্চর্যের ব্যাপার, পুরো বিলটির কোথাও কিন্তু নকশাল সংগঠনের এমনকি বামপন্থীদের সঙ্গে অভিযুক্তদের যোগাযোগ থাকার প্রমানের / সূত্রের দরকার, এমন উল্লেখ মাত্র নেই। অপরপক্ষে, হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন, আরএসসের অজস্র সশস্ত্র গুণ্ডামি করা শাখা সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক হিংস্রতা রুখবার কোনও ব্যবস্থা নেই এই বিলে।

মহাত্মা গান্ধীর দেখানো পথে ‘আইন-অমান্য আন্দোলন’কেও বেআইনি ঘোষণা করার সংস্থান রয়েছে এই বিলে। গান্ধীর অহিংসাকে ‘আহাম্মকি’ বলে অভিহিত করেছিলেন গোলওয়ালকর১০। সুতরাং, গান্ধী প্রবর্তিত আইন-অমান্য আন্দোলনকে তাঁরা বেআইনি কার্যকলাপের তকমা লাগাবেন তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। এর ফলে, শাসকদল পরোক্ষে স্বীকার করেই নিয়েছে, একমাত্র বামপন্থী, গণতন্ত্রপ্রিয়, প্রগতিবাদীরাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুঃখ-দুর্দশা নিরসনে, সামাজিক ও শিক্ষার উন্নয়নে এবং সরকারের তথা রাষ্ট্রের অন্যায় আচরণ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে থাকেন, তাঁদের মতো সভ্যতা বিরোধী, দেশ-বিরোধী, দ্বেষপ্রেমীরা নয়।

ফ্যাসিস্তদের চারিত্রিক বিশেষত্ব অনুযায়ী, দেশের এবং রাজ্যের বিজেপি সরকারগুলির স্পষ্ট লক্ষ্য, জনকল্যাণ নয়, জনসুরক্ষা এবং দেশের সীমা-সুরক্ষার নামে, জনগণের উপর নিরন্তর নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ এবং ভয়ের বাতাবরণ সৃষ্টি করে যে কোনও রকম সরকারী বিরুদ্ধতার কণ্ঠরোধ করা। যাদের পূর্বসুরীরা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের দালালি করতেই ব্যস্ত ছিল, যারা, স্বাধীনতা আন্দোলনকে ধ্বংস করতে, আন্দোলনকারীদের ধরিয়ে দিতে অত্যাচারী ব্রিটিশদের নানান রকম সহায়তা দিয়ে গেছে, দখলকারী ব্রিটিশদের মতোই, তারা দেশের নাগরিককের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করাকে অগ্রাধিকার দেবে তাতে আর আশ্চর্য কি। এটা নিশ্চিত, আগামী দিনে এ রাজ্যেও বিজেপি ক্ষমতা দখল করলে, এমন একুশে-আইন অবশ্যম্ভাবী। ত্বরান্বিত হবে প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজের Civil Death.  

সূত্র:

১) p. 319, Meeting the Challenge, Nation at War (Chapter 25), Rousing National Consciousness(A), The Path to Glory (Part Three), Bunch of Thoughts, M.S. Golwalkar, Pub: Vikrama Prakashan (1966)

২) Maharashtra Special Public Security Bill, 2024

৩) What Maharashtra’s ‘urban Maoism’ Bill says, The Indian Express, 12 Jul 2025

৪) Opposition Did Not Deal Well Enough With Maharashtra Bill Against ‘Urban Naxalism’: Sharad Pawar, The Wire, 15 Aug 2025

৫) The Constitution of India [https://legislative(dot)gov(dot)in]

৬) Universal Declaration of Human Rights [https://www(dot)ohchr(dot)org/en/human-rights/universal-declaration/translations/english]

৭) International Covenant on Civil and Political Rights [https://www(dot)ohchr(dot)org/en/instruments-mechanisms/instruments/international-covenant-civil-and-political-rights]

৮) “Impunity for crimes that may have been committed by agents of the State was profoundly damaging to the core values and social cohesion of every nation.  No police officer or any other agent of any State should ever be above the law.  This was, after all, the basic premise of the rule of law” – Michelle Bachelet, High Commissioner for Human Rights, Council concludes general debate on the Vienna Declaration, Press Release 19 March 2021, Human Rights Council [https://www(dot)ohchr(dot)org/en/press-releases/2021/03/high-commissioner-human-rights-impunity-violence-police-and-other-law]. 

৯) Maharashtra: Top Cop Accuses Decades-Old Cultural, Rights Orgs of Working as 'Naxal Fronts', The Wire, 15 Feb 2023

১০) p. 249, Non-Violence of the Imbecile, The Elixir of National Life (XXII), The Path to Glory (Part Three), Bunch of Thoughts, M.S. Golwalkar, Pub: Vikrama Prakashan (1966)

 

 

0 Comments

Post Comment