পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রোগাক্রান্ত বিচারব্যবস্থা !!!!

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 212 view(s)
  • লিখেছেন : অঞ্জন ঘোষ
দেশের শীর্ষ আদালতের দুটি সিদ্ধান্তে হঠাৎ করেই আমাদের বিবেক জাগ্রত হয়েছে। তাঁরা আরাবল্লী নিয়ে সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা করতে চেয়েছেন এবং যাবজ্জীবন শাস্তিপ্রাপ্ত খুনী ধর্ষক উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন বিধায়কের জামিনের সিদ্ধান্ত রদ করেছেন! আর এদিকে অন্যায় ভাবে বন্দী উমর খালিদ মাত্র পনেরো দিনের প্যারোল শেষ করে আবার কারান্তরালে! সত্যিই কি আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থার ঘুম ভাঙছে? তাঁদের অসুস্থতাটা ঠিক কোথায়? দুই পর্বের আলোচনার এটি প্রথম পর্ব।

দেশের সাংবিধানিক আদালতগুলি এবং শীর্ষ আদালতের দুর্বলতা বা আত্মসমর্পণ নিয়ে প্রায় মাস ছয়েক আগে তিনটি পর্বে কিছু কথা বলেছিলাম। মূল উদ্দেশ্য ছিল UAPA, PMLA, NSA ইত্যাদি দানবিক আইনগুলি দিয়ে কীভাবে নাগরিক অধিকার ধ্বংস করা হচ্ছে, কীভাবে বিনা বিচারে বছরের পর বছর চার্জ শীট পেশ না করেই, বিচারপ্রক্রিয়া শুরু না করেই দেশের নাগরিকদের জেলে বন্দী করে রাখা হচ্ছে, হয়েছে এবং রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদতে খুন করা হচ্ছে বা আটকে রাখা হচ্ছে। ফাদার স্ট্যান স্বামী, জি সাইবাবা, উমর খালিদ, সার্জিল ইমাম,ইকবাল আহমেদ, সাফুরা জারগার এবং আরো আরো আরো। এঁদের মধ্যে যাঁরা জামিন পেয়েছেন, তাঁরা কেউ কেউ পাঁচ বছরেরও বেশি কারান্তরালে ছিলেন।  তিনটি পর্ব লেখার পর লেখাটি থামাই, কারণ তার দিন দুয়েক আগেই উমর খালিদ দের জামিন নাকচ করেছেন মহামান্য দিল্লি উচ্চ আদালত আর তাঁরা দেশের শীর্ষ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন জামিনের জন্য। ভেবেছিলাম, দেখাই যাক, শীর্ষ আদালত আব্দুল গফুর ওয়াতালির মত কোনো মাপকাঠি নির্ণয় করেন কিনা?

বিগত সপ্তাহে দেখলাম, দেশের শীর্ষ আদালতের দুটি সিদ্ধান্তে হঠাৎ করেই আমাদের বিবেক জাগ্রত হয়েছে। তাঁরা আরাবল্লী নিয়ে সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা করতে চেয়েছেন এবং যাবজ্জীবন শাস্তিপ্রাপ্ত খুনী ধর্ষক উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন বিধায়কের জামিনের সিদ্ধান্ত রদ করেছেন! আর এদিকে অন্যায় ভাবে বন্দী উমর খালিদ মাত্র পনেরো দিনের প্যারোল শেষ করে আবার কারান্তরালে!

সবাই ভাবছেন হঠাৎ করেই দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালতের ঘুম ভেঙ্গেছে! কেন মনে হচ্ছে, আমার কাছে অন্তত বোধগম্য নয়। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত এবং বিভিন্ন রাজ্যের সাংবিধানিক আদালতগুলির যা বর্তমান পরিস্থিতি, সেখান থেকে হঠাৎ করে রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মত নিদ্রাভঙ্গ ঘটেছে ভাবলে, ভুল হবে। এটা ঘুম নয়, এটা স্বেচ্ছাআয়ত্ত স্লিপিং সিকনেস। বিগত এক বছর নানা জায়গায় এগুলি নিয়ে লিখে যাচ্ছি। এটা স্লিপিং সিকনেসও নয়, এটা দীর্ঘকালীন পুষে রাখা রোগ, যেখানে রোগী নিজেই চায় না রোগের উপশম।

আরাবল্লীর উচ্চতা নিয়ে কে বা কারা রায় প্রদান করেছিল? দেশের সর্বোচ্চ আদালতেরই একটি বেঞ্চ! এখন মনে হচ্ছে, রায়টি নিয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে! উচ্চতর বেঞ্চের কাছে রেফারেন্স হিসাবে তো আগেই পাঠানো যেত। বিনা বিচারে দিনের পর দিন UAPA মামলায় জামিন দিচ্ছেন না আর নাবালিকা ধর্ষণ এবং তিনটি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আসামী টাকা জমা দিয়ে জামিন পেয়ে যায়! জামিন নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কোনো নির্দেশিকা নেই? আব্দুল গফুর ওয়াতালি মামলায় তো দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত স্বীকার করেছিলেন, সময় এসেছে জামিন নিয়ে একটা নির্দিষ্ট মাপকাঠি তৈরি করার। তারপর? আজ দিল্লি উচ্চ আদালতের জামিনের রায় স্থগিত রাখতে হচ্ছে শীর্ষ আদালতকে? যাঁরা আইনকানুন নিয়ে সামান্যতম চর্চা করেন, তাঁরা জানেন, দেশের শীর্ষ  আদালতের রায় মানে আইনের পরিভাষায় ‘settled law’ অর্থাৎ দেশের অন্য উচ্চ ন্যায়ালয়গুলি সেই আদেশ মেনে চলবে।হাইকোর্টগুলিও আর শীর্ষ আদালতের রায়ের মান্যতা দিতে চাইছে না! আর কীইবা বাকি থাকল!  দেশের সাংবিধানিক আদালত গুলির মানমর্যাদার আর কিছু  বাকি আছে?

বর্তমান লেখাটিও আমি দুটি পর্বে ভাগ করেছি। প্রথম পর্বে দেশের সাংবিধানিক আদালতের অসুখের বিবরণ এবং দ্বিতীয় পর্বে থাকবে UAPA, PMLA, NSA ইত্যাদি দানবিক আইনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার কার্যক্রম।

রোগ বহুমাত্রিক।

অসুখ নং ১

সাংবিধানিক আদালত না প্রশাসনিক আদালত?

This a sign of wickedness, when a subject/deigns not to obey those placed in power above him- Menelaus ( Sophocles in his drama ‘Azax’)

সাংবিধানিক আদালতগুলো কি ক্রমেই প্রশাসনিক আদালতে পরিণত হচ্ছে? সামারি জাজমেন্ট, সামারি ট্রায়াল! পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের দাগী বদমাশদের যখন অস্ট্রেলিয়ায়

(ক্যাঙ্গারু ল্যান্ড) পাঠানো হত, তখন ওইরকমই তড়িঘড়ি বিচার করে ক্যাঙ্গারু কোর্ট তাদের ক্যাঙ্গারু ল্যান্ডে ঠেলে দিত। সাংবিধানিক আদালত, অর্থাৎ, সুপ্রীম কোর্ট বা হাই কোর্টের তো নির্দিষ্ট ভূমিকা থাকে!!!

অস্কার আর বেনাভিডেশ, ১৯৩৩ – ৩৯ পর্যন্ত পেরুর প্রেসিডেন্ট, সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুরো স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রবর্তন করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল, “For my friends anything, for my enemies Law”।  বন্ধুদের জন্য সবকুছ্‌ আর শত্রুদের জন্য আইন। তাহলে আমাদের বিচারব্যবস্থায় কী দাঁড়াচ্ছে? ওই কথাটাই একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, “For the State, anything, for the individual, Law”।  সরকারের  দরকারের জন্য দেশের সাংবিধানিক আদালত আজ প্রশাসনিক আদালতের ভূমিকায় অবতীর্ণ।

উরসুলা কে লে গুইন এর ১৯৭৪ সালের বিখ্যাত ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস, ‘দ্য ডিসপসেসড’। কিছুটা নৈরাজ্যবাদ, বিক্ষোভ, ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত রাগ ইত্যাদি। সেই উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদে যাই। কাহিনীর মূল চরিত্র, সেভেক, পদার্থবিজ্ঞানী, আবিস্কার করেছে, জেনারেল টেম্পোরাল থিওরি, যার দ্বারা অন্য স্পেস বা অবস্থানে থাকা গ্রহদের মধ্যে আলোর থেকেও দ্রুত যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারে। সেভেক পালাচ্ছে, উরাস গ্রহ থেকে তার নিজের গ্রহ আনারেস এ। তার জীবন সংশয়। তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে টেরান এর এক নারী।

সেভেক তাকে বলে, আমি তোমার সাহায্য চাই, কিন্তু তার পরিবর্তে তোমাকে দেবার মত আমার কিছু নেই।

কেন, তোমার জেনারেল টেম্পোরাল থিওরি!

সেভেক উত্তর দেয়, দাঁড়িপাল্লায় একদিকে একজন ব্যক্তি মানুষের মুক্তি আর একদিকে জেনারেল টেম্পোরাল থিওরি। কোন প্রান্তটা বেশি ভারী, সেটা আমার বোধের বাইরে। সেভেক জানে আত্মসমর্পণ আদতে মৃত্যুই। দেশের শীর্ষ আদালত  বোঝার চেষ্টা করছেন, পাল্লার কোন দিকটা ভারী। সাংবিধানিক আদালতের চরিত্র বজায় রাখব না প্রশাসনিক আদালত হব! আত্মসমর্পণ যে আদতে মৃত্যুই সেটা তাঁরা বুঝতে পারছেন না।  

১৫ ই অক্টোবর, ২০২২। বোম্বে হাইকোর্ট সেদিন UAPA আইনের খাঁচা থেকে ৬ জন বন্দীকে মুক্তি দেয়। সেই ছয়জনের একজন ছিলেন শারীরিকভাবে নব্বই শতাংশ অক্ষম, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক, তিনি এই কিছুদিন আগেই মারা গেলেন। ‘ মারা গেলেন’ শব্দবন্ধটি খুব নিরীহ শোনায়, আসলে  অন্ধ আইনের হাতে  খুন হয়েছিলেন। কী বলেছিলেন বোম্বে হাইকোর্টের বিচারপতিদ্বয়? বলেছিলেন, “State has not followed vital procedural safeguards under the UAPA”.

সেই ১৫ ই অক্টোবর,  ২০২২ সন্ধ্যাতেই মহারাষ্ট্র সরকার তড়িৎগতিতে সুপ্রীম কোর্টে বিশেষ শুনানীর আবেদন দাখিল করে। সেই সন্ধ্যায় সুপ্রীম কোর্টে একমাত্র ছিলেন মহামান্য প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ( তখনও প্রধান বিচারপতি হননি ) চন্দ্রচূড়। সেই কোর্টে মহারাষ্ট্র সরকার এর আপীল পেশ হলে বিচারপতি চন্দ্রচূড় বলেন , “ there is no tearing hurry to list an appeal against a reasoned judgement of acquittal / discharge and nor could such a judgement be stayed for the asking”।  খেয়াল রাখতে হবে দিনটা ছিল শুক্রবার, সপ্তাহের শেষ কাজের দিন শীর্ষ আদালতে।

রাত ন’টা নাগাদ তৎকালীন প্রধান বিচারপতি উদয় উমেশ ললিত এর কাছে আবেদন পেশ করা হলে, তিনি শনিবার অতি সকালে আদালত চালুর নির্দেশ দিয়ে মামলা পাঠালেন মাননীয় বিচারপতিদ্বয়, এম আর শাহ এবং বেলা ত্রিবেদী’র বেঞ্চে। অতি সকালে কেন? সুপ্রীম আদালত যদি দেরী করে ফেলে আর সেই সুযোগে ছয় জন অপরাধী বেরিয়ে যায়! মজার কথা , মাননীয় বিচারপতি, এম আর শাহ, সাধারণত ফৌজদারী আইনের মামলা শুনতেনই না। তা সত্বেও!!!! এহ বাহ্য। সুতরাং, যা হবার ………… বোম্বে আদালতের রায় খারিজ !!!! এই হচ্ছে চরমতম প্রশাসনিক আদালতের উদাহরণ!

এটা সাংবিধানিক আদালতের ভূমিকা না প্রশাসনিক আদালতের নাটক? দেশের একটি রাজ্যের সাংবিধানিক আদালত একটি রায় দিল আর একদিনের মধ্যে সেই রায় স্থগিত। জানি, এখনি কেউ বলে উঠবেন, কেন কুলদীপ সেঙ্গার এর জামিন নিয়েই তো তাই হল, দেশের শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপেই তো জামিন স্থগিত হল! বিনয়ের সঙ্গে বলি, হত না যদি না মানুষ রাস্তায় নেমে হল্লা করতেন। তাহলে ধরে নিতে হবে, দেশের শীর্ষ আদালত এখনো পর্যন্ত জামিনের জন্য সর্বজনগ্রাহ্য কোনো মেকানিজম তৈরি করে উঠতে পারেননি, যদিও ওয়াতালি মামলায় তাঁরা বলেছিলেন, একটা কমন মেকানিজম দরকার।

জম্মু ও কাশ্মীরে, সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করার পর প্রায় গোটা উপত্যকাতেই জরুরী অবস্থা চালু, এই অবস্থায় জম্মু ও কাশ্মীরের হাইকোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি ৭৬ বছরের বৃদ্ধ মিয়াঁ আব্দুল কায়ুম কে উপত্যকার প্রশাসন গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের বিরোধিতা করে জম্মু ও কাশ্মীরের উচ্চ আদালতের কাছে জামিনের আবেদন করা হলে, আদালত সেই আবেদন খারিজ করে বলে, আটক করে রাখা যদি রাষ্ট্রের প্রয়োজনে হয়,সেখানে আদালতের হস্তক্ষেপের কারণ নেই! হাসব না কাঁদব? প্রেক্ষাপটটি আরো একটু বিস্তৃত করার দরকার। ব্যাক্তি স্বাধীনতা হরণ, বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করে রাখা এইসব নিয়ে দেশের সব থেকে কুখ্যাত রায় ছিল, ১৯৭৬ সালের এ ডি এম জবলপুর বনাম শিবকান্ত শুক্লা মামলা। মনে রাখতে হবে সেটা জরুরী অবস্থার সময়। দেশের শীর্ষ আদালতের পাঁচ সদস্যের মহামান্য বেঞ্চ(৪-১, বিচারপতি খান্না অন্য চার বিচারপতির রায়ের সঙ্গে সহমত না হয়ে ডিসেন্ট নোট দেন) রায় দেন, জরুরী অবস্থার সময় সংবিধানের মৌলিক অধিকারের দাবী প্রয়োগ করা যায় না, তাই সংবিধানের ২১ নং ধারা প্রযোজ্য নয়, অর্থাৎ রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে বিনাবিচারে যতদিন  খুশি কাউকে বন্দী রাখতে পারে। চার দশক পরে, ২০১৭ সালে দেশের শীর্ষ আদালতের নয় সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ, পুট্টাস্বামী বনাম ভারত সরকার ( K S Puttaswamy vs Union of India) মামলার রায়দানের মাধ্যমে,  এ ডি এম জব্বলপুর বনাম শিবকান্ত শুক্লা মামলার রায় খারিজ করে দিয়ে বলেন, কোনো সময়েই সংবিধানের ২১ নং ধারা স্থগিত রাখা যায় না, ওটা নাগরিকের অবিচ্ছিন্ন অধিকার, এমনকি জরুরী অবস্থার সময়েও নয়। শীর্ষ আদালতের নয় সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চের রায় মানে, settled law। দেশের সব হাইকোর্টের তা মেনে চলার কথা। তাহলে কি মিয়াঁ আব্দুল কায়ুমকে গ্রেফতার করে আটক রাখার সময় জম্মু ও কাশ্মীরের হাইকোর্টের কাছে সেই রায় জানা ছিল না? আসলে, ১৯৭৫ এর সালের জারী করা জরুরী অবস্থা চোখের দৃশ্যমান ছিল কিন্তু আজকের অলিখিত জরুরী অবস্থা দৃশ্যমান নয়, তাই হাইকোর্টগুলির এই অসহায় অবস্থা বোঝা যাচ্ছে না! এটাই সম্ভবত তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’।

শীর্ষ আদালত কি সাংবিধানিক আদালত ( Constitutional Court ) না কি প্রশাসনিক আদালত ( Executive Court )? শীর্ষ আদালত কি নিজের সাংবিধানিক ভূমিকা ত্যাগ করে প্রশাসনিক আদালত হতে চাইছে?  রাষ্ট্রের শেখানো বুলি গাইছে? আমি জানি, এরপরেই যে উদাহরণগুলো দেব অনেকেই হাঁ হাঁ করে উঠবেন। ১২ ই ফেব্রুয়ারী, ২০২৫, দিল্লীর পথবাসীদের সরকারী খরচে আবাস নির্মাণের হাল নিয়ে একটি মামলায় মাননীয় বিচারপতি গাভাই মন্তব্য করেন, সরকার আদতে একদল পরজীবি তৈরি করছে, সঙ্গে ফ্রিবিস নিয়ে আরো কিছু অসমীচীন মন্তব্য। ভারতীয় আদালতের একটা ভারী রোগ হল, ইংরেজি ভাষায় যেটাকে বলে, “ oral heavy”, সাদা বংলায় বললে কথাসর্বস্ব বিচার। খেয়াল করে দেখবেন, আদালত বা বিচার নিয়ে যেসব সিনেমা হয়, সেখানেও ঐ একই রোগের প্রাদুর্ভাব। আমাদের দেশের মাননীয় বিচারপতিরা আদালতে অনেক কথা বলেন আইনজীবিদের উদ্দেশ্য করে, যা সাধারণত রায়ে প্রতিফলিত হয় না। মাননীয় বিচারপতি গাভাই এর পরে আরো একটু এগিয়ে বলেন , তাঁদের পারিবারিক চাষের জমিতে কৃষিশ্রমিক পাওয়া যায় না এই কারণেই!! কী ভয়ঙ্কর! ঠিক এইরকম ভাষাতেই দেশের প্রধানমন্ত্রী ফ্রিবিস নিয়ে কথা বলেন না? যদিও ভোট এলেই রাজ্যে রাজ্যে ফ্রিবিস দিতে শুরু করেন তাঁর অনুগতরা। ফ্রিবিস আমার আজকের আলোচনার বিষয় নয়, নাহলে তার সমর্থনেও অনেক কিছু লেখার আছে।  

অবিবাহিত যুগলদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার একটি মামলায় উত্তরাখন্ডের উচ্চ আদালতের মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেন, যাঁরা বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে অস্বীকার করতে চান তাদের আবার সাংবিধানিক অধিকার কী? ঠিক এইভাবে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি চেতাবনী দেয় না?  

তিন নং ঘটনাটি বহু আলোচিত, রণবীর এলাহাবাদি। ইউটিবের কল্যাণে নামটা এখন সবার মুখে মুখে। ইউটিউবে একটি অনুষ্ঠানে কিছু অশ্লীল মন্তব্য করার জন্য এলাহাবাদির বিরুদ্ধে দেশের নানা প্রান্তে অনেকগুলো এফ আই আর হয়। এলাহাবাদির আইনজীবি সুপ্রীম কোর্টে আসেন একটি আবেদন নিয়ে, সবগুলো মামলা যেন মুম্বাই এর আদালতে একত্রিত ভাবে শোনা হয়। সেই মামলায় মাননীয় বিচারপতি সূর্যকান্ত, অভিযুক্তের আইনজীবির উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেন, আপনার মক্কেল বিকৃত (perverted) এবং নোংরা মানসিকতার ( dirty minds )। কেউ ভুলেও ভাববেন না, উপরোক্ত ঘটনাগুলোর পক্ষে বা বিপক্ষে আমি কোনও মন্তব্য করছি, সেটা আলাদা প্রেক্ষিত। আমার বলার উদ্দেশ্য হল, এইগুলো কি শীর্ষ আদালতের বিচার্য বিষয়? একই সঙ্গে মাননীয় বিচারপতি সূর্যকান্ত, ইউটিউব চ্যানেলটিকে নিষিদ্ধ করেন প্রাথমিকভাবে। এগুলো কী শীর্ষ আদালতের কাজ, মানে সাংবিধানিক দায়িত্ব? এগুলো দেখার কথা তো সরকারের ! নীতিপুলিশি করা কি শীর্ষ আদালতের কাজ? কে জানে?

২০১৯ এ তৎকালীন প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে একটি মামলায় প্রশ্ন ওঠে, দেশের ফৌজদারী আইনে কোথাও কণ্ঠস্বরের পরীক্ষার কোনও নিয়মাবলী নেই, কোনও স্ট্যাটুটরি অথরিটিও নেই অর্থাৎ কণ্ঠস্বরের পরীক্ষা বিষয়টি আইনসিদ্ধ হবে না। মাননীয় প্রধান বিচারপতির নির্দেশ ছিল, তাহলে সংবিধানের ১৪২ নং আর্টিকেল এর প্রয়োগ করা হোক। এটা শীর্ষ আদালত বলছে?  ১৪২ প্রয়োগ করা যায়! আইন প্রণয়ন করা তো আইনসভার দায় ও দায়িত্ব, সুপ্রীম কোর্ট কবে সেই ক্ষমতা পেল?

 

অসুখ নং ২

মাস্টার অব রোস্টার

শীর্ষ আদালতের বিরুদ্ধে সবথেকে বেশি সমালোচনা আসে এই ভূমিকাটাকে নিয়ে। পদাধিকারবলে দেশের প্রধান বিচারপতি শীর্ষ আদালতের মাস্টার অব রোস্টার, যাঁর নির্দেশে কোন সাংবিধানিক মামলা কোন বিচারপতিদের কাছে যাবে সেটা নির্ধারিত হয়। মিডিয়ার দৌলতে, নানা সভা সমিতিতে অংশগ্রহণ করার ফলে বিচারপতিদের সামাজিক অবস্থান বা মনোভাব অনেকেরই জানা, ফলত কোন মামলা কার কোন বেঞ্চের কাছে পৌঁছলে মনোমত রায় পাওয়া যাবে, সেটা দুয়ে দুয়ে চার অনেকেই করতে পারেন। এই মাস্টার অব রোস্টার নিয়ে একটা ঘটনার উল্লেখ করা যেতেই পারে, যেটা থেকে বোঝা যায়, মাস্টার অব রোস্টার কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল কিছুদিন আগেই। ২০১৩ সালের নতুন জমি অধিগ্রহণ আইনের ২৪ নং ধারা নিয়ে সুপ্রীম কোর্টে, পুনা মিউনিসিপাল মামলায় তিন সদস্যের বেঞ্চ একটা রায় প্রদান করেন। ২০১৭ সালে সুপ্রীম কোর্টেরই দু সদস্যের বেঞ্চ সেই রায়ের বিপক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্নমত প্রকাশ করে ফের তিন সদস্যের বেঞ্চের কাছে পাঠানোর জন্য মত দেয়। ভাবুন একবার! তিন সদস্যের মাননীয় বেঞ্চের রায়ের বিপক্ষে দু সদস্যের বেঞ্চ মত প্রকাশ করছে! এটা কখনও হয়েছে? নতুন তিন সদস্যের বেঞ্চ আগের পুনা মিউনিসিপাল মামলার রায় সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে ২০১৩ সালের আইনের ২৪ নং ধারার পৃথক রায় দেয়। যেহেতু আগের পুনা মিউনিসিপাল মামলা এবং নতুন ইন্দোর ডেভেলপমেন্ট মামলায়, দুটোতেই তিন সদস্যের বেঞ্চ সম্পূর্ণ বিপরীত মত প্রদান করে, তাই ফের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চের কাছে নতুন করে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। এতগুলো কথা লিখলাম, পরবর্তী অবতারণার জন্য। তিন সদস্যের বেঞ্চের রায় উলটে দিয়ে দু সদস্যের যে বেঞ্চ মত দিলেন, সেই রায় লিখলেন মাননীয় বিচারপতি অরুণ মিশ্র। নতুন তিন সদস্যের বেঞ্চের রায় লিখলেন, সেই বিচারপতি অরুণ মিশ্র !!!!! নব গঠিত পাঁচ সদস্যের যে বেঞ্চ গঠিত হল তারও প্রধান হলেন সেই বিচারপতি অরুণ মিশ্র! ভাবুন একবার! কী করছিলেন তৎকালীন মাস্টার অব রোস্টার? সুপ্রীম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন,  তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবং মাস্টার অব রোস্টারের কাছে আবেদন রাখে বিচারপতি অরুণ মিশ্রকে ঐ মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য। কোনও আবেদনেই কান না দিয়ে সেই পাঁচ সদস্যের বেঞ্চের প্রধান থাকেন বিচারপতি মিশ্রই। কোনও আলোচনায় এগুলো আসে না। ক্রমশ কি দেশের শীর্ষ আদালত অরওয়েল কোর্টে পর্যবসিত হচ্ছে? জর্জ অরওয়েল এর উপন্যাস ১৯৮৪ এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। “পার্টি তোমাকে নির্দেশ দিয়েছে, চোখ ও কানে দেখা প্রমাণ অগ্রাহ্য করতে। এটা হল সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্তিম আদেশ”। সুপ্রীম কোর্ট এবং উল্টোদিকে আমরাও সম্ভবত সেই অরওয়েল আদালতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।

এটা একটা উদাহরণ দিলাম। চাইলে আরো একশ উদাহরণ দেওয়া যায়। কেউ মুখ ফুটে বলেন না, আজকের দেশের নানা রাজ্যের সাংবিধানিক আদালতগুলি এবং দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালতের অন্যতম অসুখ হল, মাস্টার অব রোস্টার। কোন মামলা কোন মাননীয় বিচারপতির কাছে যাবে, কোন মামলা কবে শোনা হবে, কোন মামলা আপাতত শোনার দরকার নেই, সব নির্ধারিত হয় ওই মাননীয় মাস্টার অব রোস্টার এর নির্দেশমাফিক বেঞ্চের দ্বারা।

অসুখ নং ৩

জুডিসিয়াল ইভেশন বা মামলা শুনব না বা ইচ্ছা হলে শুনব।

জুডিশিয়াল ইভেশন বলে একটা কথা আছে। যেমন চলছে এই রাজ্যের কর্মচারীদের মহার্ঘ্য ভাতা নিয়ে মামলায়। কোন মামলা শোনা হবে আর কোন মামলা শোনা হবে না। এই মামলার একেবারে প্রথমদিকেই জনৈক মাননীয় বিচারপতি বলেই দিলেন, মামলাটি তিনি শুনবেন না। অন্য বেঞ্চ শুনুক। বিচারপতিদের সেই স্বাধীনতা আছে, একজন সরকারী আধিকারিকের কি সেই স্বাধীনতা আছে? কতদিন চলছে এই মামলা? চলছে সেই ২০২৩ সাল থেকে সম্ভবত। মহার্ঘ্য ভাতার মামলায় আমাদের  কারো কারো উৎসাহ আছে, তাই কিঞ্চিত খোঁজখবর আমরা রাখি।  অন্যকিছুর খোঁজ নিলে আরো আতান্তরে পড়তে হবে যে! জুডিশিয়াল ইভেশন এর উদাহরণ তো বিস্তর। ইলেকটোরাল বন্ড নিয়ে মামলা, আরম্ভ হয়েছিল ২০১৮ তে, শেষ হল ২০২৪ এ এসে। তৎকালীন মাস্টার অব রোস্টাররা কেউ বলেছেন, সময় নেই, কেউ বলেছেন, ইলেকটোরাল বন্ড তো মসৃণভাবে চলছে, কোথাও কোন বিবাদ নেই, এত তাড়াহুড়োর কী আছে? আরো আছে। ডিমানিটাইজেশন নিয়ে মামলা। আধার সংশোধনী নিয়ে মামলা। জামিন নিয়ে মামলা। CAA নিয়ে মামলা। দেশের মাননীয় শীর্ষ আদালত দেখিয়ে দিয়েছেন, কাকে বলে জুডিশিয়াল ইভেশন। একটা মামলাও সময়ে শোনা হয় নি, কেবল তারিখ পে তারিখ।

অসুখ নং ৪

বিচারবিভাগীয় প্রজ্ঞা

কী ভাবছেন? বিচারবিভাগের প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়? আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভয় বা সংশয় কাজ করে, বিচারব্যবস্থার বিপক্ষে কতটা বলা যায়? আমরা রাজনৈতিক নেতা বা দল, সাহিত্যিক, শিল্পী এঁদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলেও বিচার বা রায় বা বিচারপতিদের বিরুদ্ধে সাধারণত কিছু বলতে ভয় পাই। দেশের বিচারব্যবস্থার সবথেকে বড় সংকট বোধহয় এটাই, একেবারে প্রাথমিক সমস্যা। অবশ্য রাজনৈতিক দল বা তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে বললেও, বাড়ি বয়ে এসে ঠেঙিয়ে যেতে পারে, জল অচল করে দিতে পারে, পুলিশ দিয়ে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দিতে পারে, পারে আরো অনেক কিছুই, তবু আমরা মন্তব্য করি, কিন্তু বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে মন্তব্য করতে হলে সেইসব সাহসী লোকেরাও দুবার ভাবে। বিচারব্যবস্থায় বামুনপনার আর উচ্চবর্ণতার মত জাত বিচার, এটা বিশেষ আশঙ্কার। এটার সামাজিক কারণ অনুসন্ধান করার দরকার আছে। বিচারব্যবস্থার কাছে আশা করা এবং ঐশ্বরিক সমীহ করা, এদুটো একেবারে বিপ্রতীপ অবস্থান।

প্রজ্ঞা নিয়ে একটা উদাহরণ দেব। চাইলে আরো বেশ কিছু দিতে পারি। সবরীমালা মন্দির এর রায়দানের পর সেই রায় নিয়ে অনেক আপত্তি ওঠে, যথারীতি রিভিউ  মামলা দায়ের করা হয় সেই রায়ের বিরুদ্ধে। তারপর  মাননীয় প্রধান বিচারপতি সিদ্ধান্ত নেন ‘কান্তারু রাজিবারু বনাম ইন্ডিয়ান ইয়ং লইয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ রিভিউ মামলা  লার্জার বেঞ্চের কাছে  রিভিউ  এর জন্য পাঠানো হবে। একইসাথে দুটি রিট পিটিশন সুপ্রীম কোর্টে (আর্টিকেল ৩২ এর বিশেষ ক্ষমতা অনুযায়ী) দায়ের হয়।  একটি পার্সী দের অগ্নিমন্দিরে  পার্সী নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে এবং বোহরা মুসলিম সম্প্রদায়ের মহিলাদের জেনিট্যাল মিউটিলেশন সংক্রান্ত রিট। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সিদ্ধান্ত নিয়ে মূল মামলা অর্থাৎ সবরীমালা এবং দুটি নতুন রিট, তিন সদস্যের লার্জার বেঞ্চের কাছে প্রেরণ করেন। ভাবুন একবার! সুপ্রীম কোর্টে রিট মামলা শোনার কথা  দুই  সদস্যের বেঞ্চের। ভাবুন একবার, মাননীয় প্রধান বিচারপতি রিভিউ মামলা এবং রিট মামলা  একইসাথে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, লার্জার বেঞ্চের কাছে। সুপ্রীম কোর্টের ইতিহাসে প্রথম! এই হল আজকের দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারবিভাগীয় প্রজ্ঞার উদাহরণ! এই অসাধারণ প্রজ্ঞার পাশাপাশি যোগ হয়েছে বিচারের নামে নির্বিচারে মেটাফর বা রূপকের প্রয়োগ। আমার এক শিক্ষক বলতেন, যিনি যত কম বোঝাতে পারেন তিনি তত বেশি উদাহরণ টানেন। সেই, ‘ সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর’। দিল্লি দাঙ্গার মামলায় বন্দী সাফুরা জারগর এর জামিনের আবেদন খারিজ করে দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টের সেসন বিচারপতি বলেন, “ when you choose to play with embers, you cannot blame the wind to have carried the spark a bit too far and spread the fire”। এই হচ্ছে আমার আপনার দেশের ন্যায়ালয়! দাঙ্গার সঙ্গে যখন কোনো যোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না, তখন মেটাফর হাজির করে আটকে রাখো! কোথায় স্ফুলিঙ্গ, কোথায় হাওয়া? সব বিচারপতির কল্পনার মধ্যে?

অসুখ নং ৫

কলেজিয়াম ব্যবস্থা

এটা হল ফিয়ার সাইকোসিস অসুখ। দেশের সর্বোচ্চ আদালত, কলেজিয়াম ব্যবস্থা নামক ফিয়ার সাইকোসিসে আক্রান্ত। রোগী জানেন, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে গেলে কী কর্তব্য, কিন্তু স্রেফ কলেজিয়াম ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য নাগাড়ে আত্মসমর্পণ। আত্মসমর্পণ করতে করতে সাংবিধানিক আদালত আজ প্রশাসনিক আদালতে রূপান্তরিত হওয়ার পথে, ফ্যাসিবাদ যা চায়।

কলেজিয়াম সিস্টেম নিয়ে রাজনীতির কারবারীদের মধ্যে অনেকদিনই চাপা ক্ষোভ আছে। অথবা হয়তো চাপাও নয়, দিনের আলোর মত পরিস্কার। তাঁরা অনেকদিনই চাইছেন, ব্যবস্থাটা বিদেয় হোক। আমাদের দেশের রাজনীতিকদের লুকোচুরিটা অদ্ভুত ধরণের। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকার সরাসরিই চান কলেজিয়াম ব্যবস্থাটা অবিলম্বে মায়ের ভোগে যাক। উল্টোদিকে যে সব রাজ্যে বিরোধী দলগুলি শাসনক্ষমতায় আছেন, তাঁরা কেন্দ্রের সরকারের এইরকম প্রস্তাব আসা মাত্রই হাঁ হাঁ করে রুখে দাঁড়ান, যেন বিচারবিভাগের স্বাধীনতাই তাঁদের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। আবার রাজ্যের হাইকোর্টগুলিতে যখন রায়গুলি তাঁদের মনোমত না হয়, মহামান্য বিচারপতিদের মা বাপ করতে তাঁরা কেউ কম যান না।

এইরকম একটা দ্বিচারিতার মধ্যে ভারতীয় বিচারব্যবস্থা। একটা ব্যবস্থার দশা দাঁড়িয়েছে, প্রতিমাকে জলে বিসর্জন দেওয়ার পরের অবস্থা, কাঠামোর চারপাশে লাগানো মাটি ধুয়ে গেছে, পড়ে থাকছে পেরেক লাগানো ভাঙ্গা কাঠের টুকরোটাকরা। লন্ডন নিবাসী প্রাক্তন সলিসিটর জেনারেল হরিশ সালভে তো দীর্ঘদিন ধরেই কলেজিয়াম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মত শানাচ্ছেন,  দিল্লি আদালতের ঘুষ কাণ্ডের পর নব উদ্যোগে নেমেছেন। সালভে থাকেন লন্ডনের ভিলায়, সেখান থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে এ দেশের আদালতে লড়েন, সুতরাং তাঁরা আদতে ক্ষীর কী ভাবে বেশি খেতে পারবেন এই ভাবনায় সদাই ব্যাস্ত  থাকেন। এই সু্যোগেও নতুন করে নেমে পড়েছেন।

১৯৯৩ সালে বিখ্যাত “থ্রী জাজেস” রায় এর মাধ্যমে সম্ভবত কলেজিয়াম ব্যবস্থার গোড়াপত্তন এর আলোচনা আরম্ভ হল।(১) এস পি গুপ্তা ভার্সাস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া, ১৯৮১ (২) সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন ভার্সাস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া, ১৯৯৩ (৩) স্পেশ্যাল রেফারেন্স, ১৯৯৮। এই তৃতীয় মামলাটি আদতে দেশের রাষ্ট্রপতির তরফ হতে সুপ্রীম কোর্টের কাছে প্রেরিত মতামতের আখ্যান। বিচারব্যবস্থার তরফ হতে মূল ভাবনাটি ছিল দেশের আইনসভার / প্রশাসনিক ব্যবস্থার হাত থেকে বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবমুক্ত করা। বিচারপতিদের নিয়োগের ব্যবস্থাটিকে যদি ক্ষমতাসীন আইনসভার ( পড়ুন দলীয় রাজনীতির ) প্রভাব থেকে  বিচ্ছিন্ন করা যায় তাহলে বিচারবিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে।  একটা কথা বোঝার দরকার আছে। সে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাঁরা প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচারব্যবস্থার বিপক্ষে। ২০১৩ সালে ৯৯ তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে কলেজিয়াম ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে ন্যাশনাল জুডিশীয়াল অ্যপয়েন্টমেন্ট কমিশনের ব্যবস্থা চালু করার জন্য বিল আনা হয়, সুপ্রীম কোর্ট ২০১৫ সালে সেই বিলটি অসাংবিধানিক বলে খারিজ করে দিলেন। ফলত কলেজিয়াম ব্যবস্থাই চলছে। চলছে,  কিন্তু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এই খোঁড়ানোর পেছনে দেশের শীর্ষ আদালতের ভূমিকাও কম নয়। বিচারপতিদের একাংশ যে ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছেন, অবসরের পরে কীভাবে অন্যত্র যোগদান করা যায়, কীভাবে ক্ষমতাকে তুষ্ট রাখা যায় তখন কলেজিয়াম ব্যাবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে গলা ফাটাবার মত কোনো গ্রাহ্য উপাদান আছে কি? কলেজিয়াম ব্যবস্থার স্বপক্ষে অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু বিপরীতের দু একটা কথাও গুরুত্ব দেওয়ার মত। বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি, এটা এখন আর নতুন কোনও বিষয় নয়। বহু আলোচিত। সমস্যা যেখানে, সেটা হল মাননীয় সুপ্রীম কোর্ট কলেজিয়াম ব্যবস্থা নিয়ে নিজেই অতিমাত্রায় অসহিষ্ণু। কলেজিয়াম ব্যবস্থার যুক্তিযুক্ততা নিয়ে শীর্ষ আদালতে দায়ের হওয়া একটি মামলাও তাঁরা শুনতে চাননি। যেন বিষয়টি শোনার মতই নয়। ফলত অবিশ্বাস বাড়ছে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়।

কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে যদি বিচারবিভাগের সুস্থতার জন্যই বজায় রাখতে হয়, তাহলে দেশের শীর্ষ আদালতকে বুঝতে হবে, স্বাধীনতার জন্য তালে তালে মিলিয়ে ক্ষমতার সঙ্গে পা ফেললে হবে না, সংবিধানের নির্দেশমাফিক পা ফেলতে হবে। কলেজিয়াম ব্যবস্থার পক্ষে অনেক যুক্তি দিতে পারি, কিন্তু আজ দেব না। রাজনীতির কারবারীরা চাইছেন, সবধরণের রাজনীতির কারবারীরা, কলেজিয়াম ব্যবস্থা উচ্ছন্নে  যাক। দেশের শীর্ষ আদালত বা সুপ্রীম কোর্টকেই ভাবতে হবে , এই দুঃসময় পেরোতে হলে নিজের সিদ্ধান্তে কোন কোন অঙ্গ বাদ দিতে হবে।

ফলি নরিম্যান একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন, “Like old clocks, our judicial institutions need to be oiled, wound up, and set to true time”.

আসল কথা হল Collective Responsibility। Collective Responsibility বা সামূহিক  দায় নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে এলো। ১৭৮৭ সালে আমেরিকার পেনসিলভানিয়া শহরে Independents Hall এ ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার সংবিধানের খসড়া নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলছে। দীর্ঘ আলোচনার সমাপ্ত হওয়ার পর এবং সংবিধানের চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারিত হয়ে গেলে, Independents Hall থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন আরো অনেকের সঙ্গে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন। রাস্তার দুধারে অগুন্তি মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন । সংবিধান প্রণেতারা কী দিলেন জনগণকে? “কী দিলেন আমাদের বেঞ্জামিন”? সমবেত প্রশ্নের উত্তরে বেঞ্জামিন বলেছিলেন, “ আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের একটা সংবিধান দিলাম এবং  তাঁদের দায় থাকল এবং তাঁদের উত্তরসূরীদেরও, সেটাকে রক্ষা করার। Collective Responsibility বা সামূহিক দায়িত্বের পাশাপাশি থাকে Collective Failure বা সামূহিক ব্যার্থতা। ব্যার্থতাটাও  আদতে কালেকটিভ।

আজ মানুষ রাস্তায় নেমেছে , তাই মাননীয় শীর্ষ আদালত সিদ্ধান্ত বদল করছেন। এটা আগেই দরকার ছিল ।

দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালতগুলিতে রাজনীতি অনুপ্রবেশ করেছে, কর্পোরেট শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে ভালোমতই,সঙ্গে ক্ষমতার আকাশচুম্বী চাহিদা। জলি এল এল বি একটা সিনেমাই, তার বেশি কিছু নয়, কিন্তু সৌরভ শুক্লা অভিনীত চরিত্রের মধ্যে দিয়ে একটা ভারী কথা বলা হয়েছিল, মানুষ যখন কোথাও ভরসা পায় না, তখন বলে, “কোর্টে দেখা হবে”। এই ভারী কথাটা ক্রমশ লঘু হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা আশঙ্কার। বিচারব্যবস্থা নিয়ে অনেক টানাটানি হয়েছে , হচ্ছে সেই কংগ্রেস আমল থেকেই, এখন সেটা ক্রমশঃ দানবিক ক্ষমতার হাতে পর্যুদস্ত হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ আজ দিনের আলোর মত পরিস্কার।  সুপ্রীম কোর্টকে নামতে হয়েছিল বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন বা সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তনের বিতর্ক নিয়ে। আজ সেই বিতর্কগুলিকে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অবিলম্বে সেই বিতর্কগুলি চালু হওয়া দরকার।

দ্বিতীয় পর্বে থাকবে নাগরিকদের বিনা বিচারে বন্দী করে রাখার বিষয়ে। যেটা আসলে এই আলোচনারই সঙ্গে সংযুক্ত। কয়েকদিন পরে দ্বিতীয় পর্ব ।

 

0 Comments

Post Comment