নেতাজিকে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ে শ্রদ্ধা করেন৷ নেতাজি ইংরেজের বিরুদ্ধে যে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন সেখানে অনেক মুসলিম জেহাদি ও মোজাহিদরা ছিলেন৷ তার মধ্যে হচ্ছে "জয় হিন্দ" স্লোগানের স্রষ্টা আবিদ হোসেন সাফরানি অন্যতম৷ নেতাজির জীবন ঘিরে অনেক মুসলিম (জেহাদি) যোদ্ধা দেশ স্বাধীনতার জন্য ছিলেন৷ এছাড়া সকল ধর্মের মানুষ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ৷ সেদিক থেকে দেখলে নেতাজি মুসলিম সমাজের কাছে ছায়ার মতো ছিলেন৷ কলকাতার পৌরসভায় বেঙ্গল প্যাক্ট মেনে নিয়োগ থেকে বিষয়টা বোঝা যায়৷ তিনি সমতার ভারত তৈরি করতে চেয়েছিলেন৷ আজকে যে রাজনৈতিক দলগুলোতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বহীন করা হচ্ছে, এই রকম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ছিলেন৷ এর জন্য তিনি হিন্দুত্ববাদীদের চোখে কাঁটা হয়ে ছিলেন৷ এবং আজও কাঁটা হয়ে আছেন৷ তার প্রতিশোধ আজকে নেওয়া হচ্ছে৷ ভারতের সরকারি 'নেতাজী পেপার্স' একটি নথিতে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা রয়েছে যে তিনি নেতাজিকে গেরুয়া পোশাক, লুঙ্গি ও ঢিলেঢালা কুর্তা পরা অবস্থায় দেখেছিলেন। আজকে বাঙালি বলতে "লুঙ্গি" নামক পোশাককে নিয়ে নাক সিঁটকানো হয় ৷ একটি কমিউনিটিকে দাগিয়ে দেওয়া হয়৷ তখন বাঙালি জাতীয় ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নেতাজিকে দেখে আমাদের বাংলার খেটে খাওয়া মানুষ, গরীব ও মজলুম মানুষের বাইরের পোশাক আর বাবুদের শোয়ার ঘরের পোশাক লুঙ্গিতে নেতাজীকে দেখা শোষিত ও মজলুমদের আপন মনে করে পরিচয়বাদ তৈরি করলাম৷ আজকে যখন বাংলায় খাঁটি সনাতনীরা ও তাদের নেতারা নেতাজিকে গুন্ডা, দেশদ্রোহী ইত্যাদি বলে চলেছেন৷ লাগাতার অপমান করে চলেছেন৷ তখন বাংলার সকল রাষ্ট্রবাদী নেতা থাকা সত্ত্বেও জেহাদি নেতা নাওশাদ সিদ্দিকী এগিয়ে এসে অপমানের বিরুদ্ধে চিঠি দিলেন৷ আর এমনি বাঙালি ও বাংলাভাষী বলে ভাগকরা হিন্দু জাতীয়তাবাদী বাঙালিরা নেতাজির অপমানেও চুপ হয়ে আছে৷ এর পরেও এরা বাঙালিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে৷ বাঙালিকে যখন বাংলাভাষা বলার জন্য পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ও বাংলাদেষী বলে কাঁটাতারের ওপারে রাতের অন্ধকারে ছুড়ে ফেলা হয়েছে৷ মহিলা ও বাচ্চাদের নো ম্যান্স ল্যান্ডস - এ বৃষ্টিতে অসহায় কাঁদতে দেখার ছবি দেখা গেছে তখন সোকলড বাঙালির বাঙালিত্ব কালিমালিপ্ত হয়নি, কারণ তারা ধর্মে মুসলমান ছিল বলে৷ তাদের বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে মুসলমান পরিচয়কে বড় করে তোলা হয়েছে ব্রাম্মণ্যবাদী মিডিয়া দ্বারা বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজে৷ এই নীরবতার জন্য আজকে নেতাজিকে অপমান করার সাহস পাচ্ছে৷ এর জন্য কবির কথায় " বলি ..
বাঙালির তরে যদি
বাঙালি না কাঁদে
চুতিয়া বলিয়া তাকে
ডাকো ভীমনাদে।”
কবি পুরন্দর ভাট-এর মুখে
নবারুণ ভট্টাচার্য
আজকের বাবু বাঙালি ও ভেতো বাঙালি সারাদিন নেতাজির নামে গাল শুনছে রাত্রে বিরিয়ানি বা ঝটকা মাংস কষা খেয়ে শুয়ে পড়ছে ৷ এদিকে নেতাজিকে নিয়ে চরম উগ্ৰ ক্ষত্রিয় ( উচ্চবর্ণীয় ) রা গালাগালি করে চলেছেন তাতেও বাঙালিত্ব জাগ্রত হচ্ছে না৷ তথাকথিত বাঙালি সাংস্কৃতির ধারক বাহক কলকাতার বাবু সমাজ ও উচ্চবিত্তরা বাংলাকে বাংলাদেশ যাতে না হয় সেই কর্মকান্ডে যুক্ত মনোনিবেশ করেছেন৷ আসলে এদের বাঙালিত্ব তৈরি উপনিবেশ কাঠামোর উপর ৷ তাই এরা লাভ ও ক্ষতি উপর জাতীয়তাবাদের পোশাক ধারন করে৷ প্রান্তিক মানুষের মতো ফসল ফলিয়ে ও গরু পালন করে বাঙালিত্বের পরিচয় আত্মিক ভাবে নির্মাণ নয়৷ পুঁজির তৈরি হওয়া জাতিয়তাবাদ কত দিন থাকে ৷ সময় বুঝে পুঁজির কাছে বিক্রি হয়ে যায় ৷ ফলে উপনিবেশী বাবুদের কাছে নেতাজির যত অপমান হোক যায় আসে না৷ তাদের কাছ বর্তমান পুঁজি হচ্ছে "সনাতন ধর্ম" রক্ষা করতে হবে, তার জন্য সনাতনী শাসককের সঙ্গে মিশে যাও৷ শাসককের বয়ানে কলম ধরো৷ এই ভাবে নিজেদের বুদ্ধিজীবী তকমাটা আ়ঁটসাঁট করে নিচ্ছেন৷ বাঙালির আইনকে লাগাতার অপমান করলেও ৷ কবি সাহেব রাত্রে বিছানায় বাঙালিত্ব নিয়ে কবিতা লিখছেন৷ সেখানে এই সংকট মুহূর্তে নেতাজি নেই ৷ বাঙালি ও বাংলাভাষী বলে যাঁরা এতদিন ধর্মীয় মেরুকরণ করেছিল ৷ তারা আজকে কোন মাতৃগর্ভে লুকিয়ে আছে? সকালে বন্দেমাতরম বলছে, বিকেলে নেতাজিকে অপমান করছে, সেই বাংলাভাষী রাজবংশীরা বিরুদ্ধে কোনো আওয়াজ নেই ৷ তারা সনাতনী বলে৷ তারা জাতপাত ভিত্তিক একবিংশ ভারতে রাজনৈতিক স্লোগান "হিন্দু হিন্দু ভাই ভাই" বলে চুপ ৷ আজকে জনজাতি থেকে কনভার্টেট হিন্দু হয়ে উগ্র ক্ষত্রিয় আসন লাভ করে সনাতনী রাজবংশীরা বাঙালিকে জাততুলে গালাগালি করছে৷ ১৫ আগস্ট -এর মধ্যে উত্তরবঙ্গ খালি করার হুমকিও দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়৷ আবার তারা রাম, কৃষ্ণ সকলের বংশধর বলে পরিচয় দিচ্ছে৷ উত্তরবঙ্গের RSS -এর উগ্ৰ হিন্দুত্ববাদী পোস্টারবয় অনন্ত মহারাজকে ব্রাম্মণ্যবাদী শাসক ও সিস্টেম বঙ্গবিভূষণ দিয়ে সম্মানিত করেছিল কারন উত্তরবঙ্গ ভাগ রুখতে পুরস্কার মাধ্যমে সান্ত্বনা দিতে৷ সেই উচ্চবর্ণীয় শাসককের শাসনামলে নেতাজীকে চরম অপমান করছে বাংলায় সনাতনীরা এবং (ক্ষত্রিয়) উচ্চবর্ণীয় সনাতনীরা ৷ গুজরাটি বা হিন্দুস্থানীরা নয়৷ খোদ সনাতনী বাঙালিরা নেতাজীকে ব্রিটিশের দালাল বলছে৷ যে শাসক একদিন নেতাজীকে নিয়ে গদগদ ভাব দেখিয়েছিলেন৷ দিল্লিতে বড় আয়োজন করে বলেছিলেন নেতাজীর সমস্ত অপ্রকাশিত নথি প্রকাশ করা হবে, বাঙালি আবেগে তখন নাগপুরীয় চাড্ডি পরে নাচতে শুরু করেছিল৷ আজকে নেতাজিকে অপমান করছে তার দলের একজন সাংসদ ৷ তিনি রাজ্যসভার একজন সদস্য৷ তবুও নীরবতা চলছে৷
আজকে নেতাজিকে সনাতনীরা যে অপমান করছে কারুর ব্যাথা না লাগুক বাঙালি মুসলিম সমাজে খুবই ব্যাথা লাগছে এবং চারিদিকে গর্জে ওঠা তা প্রমাণ করে ৷ সেই হিসেবে নেতাজি "লুঙ্গি বাহিনী" -এর কাছে বড় নেতা ৷ মহান নেতা৷ লুঙ্গি বাহিনীদের অনেকেই "আজাদ হিন্দ ফৌজ" দলে ছিলেন৷ সেই ইতিহাস আপনারা জানেন৷ নেতাজিকে লুঙ্গি বাহিনীর একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরলাম৷ আজকে শাসক অর্ডার দিয়েছেন যে রাজ্যসভায় সেবাকেন্দ্রকে নেতাজি সেবাকেন্দ্র নামে নামকরণ করা এবং নেতাজির ধুতি পরা ছবি টাঙানো হবে৷ শাসককের চলে আসা মৌলবাদী চিন্তা ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে লুঙ্গিতে আপন নেতাজিকে দেখতে চাইলাম৷ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে রাঙিয়ে নিলাম ৷ এর চেয়ে বড় ভালোবাসা আর কি হতে পারে৷ আজকে লুঙ্গি শুধু পোশাক নয়, নিপীড়িত ও প্রান্তিক শ্রেনীর পরিচয় বহন ও বাঙালি সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পোশাক৷ নেতাজির অপমানে রাষ্ট্রবাদী সাংবাদিক, নেতা, লেখক, ডাক্তার, শিক্ষক বাঙালি, যাদের রক্তে বাঙালিয়ানা নেই৷ সেই সব বাঙালি চুপ করে আছে কারণ তারা মনে মনে প্রতিশোধ নিচ্ছে নেতাজি যে শ্যামাপ্রসাদকে থাপ্পড় মেরে ছিলেন সেই ইতিহাসকে স্মরণ করে৷ শাসককের নীরবতার ভাষাও সেটাই বলছে৷