পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ফেরেশতারা

  • 03 October, 2021
  • 1 Comment(s)
  • 1365 view(s)
  • লিখেছেন : শৈলেন সরকার
বিরিয়ানির খুসবু পাচ্ছে ওসমান। কিন্তু সত্যিই কি? না কি সে শুধুই ভেবে নিচ্ছে নিজের মতো করে। সে ভেবে নিচ্ছে বিরিয়ানির ফিনফিনে আর ফরসা চালের কথা। ভেবে নিচ্ছে এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ বা জাফরানের কথা। গোস্তের মশলাদার টুকরো। আলু। আর পাতের উপর থেকে মুখের দিকে উঠে আসতে থাকা গরম ভাপের কথা। শালপাতার থালায় ঢেলে দেওয়া ফিনফিনে ভাতের গা থেকে থেকে উঠে আসা ধোঁয়ার সেই উমো উমো উষ্ণতা পেয়ে ওসমান কেমন ‘আহ্‌’ করে উঠল ভাবো। আর পাশে বসে থাকা ফকির কেমন বলে উঠল, আল্লারে ডাক এখন, কাঁদাকাটা করে লাভ নাই, এখন ফেরেশতারাই— । আর ফকিরের কথাতেই চোখ খুলল ওসমানের। হায় আল্লা, এসব কী ভাবছিল সে! ওসমান তো এখন বাড়ির বারান্দায় মা হাসিনা বানুর বালিশ ঘেঁষে বসে। কাল বিকেলে দেখতে এসে মৌলবি ওমর আলি জবাব দিয়ে গেছে। বলে গেছে, ফুকে আর হবার নয় কিছু, পারলে খাজা খতম পড়া। দুআ কর। সবার দুআ আর আল্লার মেহেরবানিতে যদি— ।

একটা কাক ডাকল কোথাও। দেখতে পাচ্ছে না ওসমান। কিন্তু ডাকটা কেমন কানে লাগল না? কেমন কান্না কান্না। গম্ভীর। কাকের এমন ডাক যে খারাপ তা জানে ওসমান। হয়তো তেঁতুলের ডালের কোথাও বসে ওর মনে পড়ল কারও কথা। ডাকটা অবিকল মনে পড়ার মতোই। বা হয়তো শেষ বারের মতো কাউকে ডাকছে বলেই। তাহলে মা হামিদা বানুকেই। আশপাশে মরার মতো আর কাউকেই তো পাচ্ছে না ওসমান। কিন্তু মা যে মরবে এটা কেন ভাবছে সে? মৌলবীই তো বলল, অনেক সময় আল্লার রহমতে হয় অনেক কিছু। অনেক কিছু মানে, বেঁচেও ফিরতে পারে। কিন্তু তিনদিন ধরে ভাত তো দূর এক ফোঁটা পানিও গেলাতে পারল কেউ? কেউ মানে? কে চেষ্টা করল? ওসমান চেষ্টা করেছে? না, আমিনা করেছে। আমিনার গলা শুনেছে ওসমান। গালাগালি করা গলাই। তা আমিনার কথা বলার অভ্যাস যদি তেমন হয়ে থাকে, কী আর করতে পারে সে? গালি দেবে মা-ও। কিন্তু ক’দিন মায়ের মুখ কোথায় শুনল ওসমান? আর তাই রাতে ঘরে ফিরে ডাকল একবার মাকে। ‘মা-রে, ও মা? সাড়া নেই কেন তোর?’ আমিনাই জানাল, খায়নি ক’দিন। মানে খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। তার মানে? মা কি তাহলে—? অন্ধকারে মায়ের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে কিছু যেন বুঝতে চেয়েছিল ওসমান। কী বুঝতে চেয়েছিল? বা কী এমন বুঝে তার মৌলবী ওমর আলীর কথা মনে পড়ল? খবরও করল ওমর আলীকে। ওমর আলীকে খবর করার পর বা তার কথা ‘ফুকে আর হবার নয় কিছু, পারলে খাজা খতম পড়া’ শুনেও কেন তবু কালকের সারাটা দিন মা হামিদা বানুকে ভুলে ছিল ওসমান। মা কি তাহলে ভার হয়ে গেল তার কাছে? কিন্তু তা কেন হবে, আমিনার কাছে হতে পারে, কিন্তু ওসমান তো তার নিজের ছেলে। কিন্তু এত কিছুর পর কখন মায়ের পাশে বসল ওসমান? কখন মনে পরল মায়ের কথা? বলতে গেলে আজ, আজ দুপুরেই। তাও মাকে দেখার জন্য কি? ঠিক করে বলতে গেলে ফকিরের কথাই বলতে হবে। সে তো বেরিয়েই পড়ছিল ঘর থেকে। বেরোতে গিয়েও যে আটকে গেল, তা তো ফকিরকে এড়াবার জন্যই। ওকে এড়াবার জন্যই দুম করে বসে পড়া ওসমানের। একেবারে মা হামিদা বানুর মাথার পাশেই। আর তখনই মনে পড়ল, আরে, মা তো তিনদিন ধরে—। সরকারি চাল-গম বিক্রির দুটো পয়সা যে ঢুকেছে ওসমানের হাতে তা কী করে খবর পেল ফকির কে জানে? তা বলে দুপুরেই নেশার কথা মনে পড়বে?

কাকটা ডাকল ফের। ঠিক ওই দুঃখী গলাতেই। ঠিক কারও কথা মনে পড়লে যেভাবে কষ্ট হয় মানুষের। কিন্তু কষ্ট হবে কেন? কাক দূরের কথা, মা কোনও দিন কাউকে নিজের হাতে কিছু খেতে দিয়েছে বলে মনে করতে পারছে না ওসমান। আমানুল্লার আব্বার মরার সময় আশপাশের কুকুরগুলি কেঁদেছিল খুব। তাহলে কি কাঁদল কাকটাও। কিন্তু কাঁদবে কেন? আমানুল্লার আব্বার মরার সময় কুকুরগুলির কান্নার তবু যুক্তি ছিল। লোকটা খেতে দিত কুকুরগুলিকে। বিস্কুটের প্যাকেট কিনে একটা একটা করে— ।

আমিনা নেই সকাল থেকেই। পানি টানতে গেছে শেখবাড়িতে। শুধু তো পানি টানা নয়, আছে বাসন ধোওয়া, ফাই-ফরমাশ খাটা কুটুমদের। কিন্তু ওর কি উচিত ছিল যাওয়া? শাশুড়ি আর মায়ে তফাৎ কী? এই যে ওসমানের মা তিনদিন হল বিছানায় শুয়ে, এই যে তিনদিন হল একদানা ভাত নিল না গলায়, তাকে ছেড়ে বিরিয়ানির লোভে— । ক’ টাকা দেবে? বড়জোর দু’ বেলা খাইয়ে পঞ্চাশটা টাকা। শেখদের কি চেনে না ওসমান? কিন্তু পাড়ার লোকজন জানল কীভাবে? কীভাবে জানল যে, ওসমানের মা হামিদা বানুর জন্য পৃথিবীর কোথাও আর এক দানা খাদ্যও নেই। হ্যাঁ, আল্লাহ তালাহর হুকুমে আসা চার ফেরেশতার প্রথমজন তো তাইই বলবে। বলবে, ‘আসসালামু আলাইকুম হামিদা বানু’। বলবে, ‘আমি তোমার ভাত জোগানোর কাজে নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু এখন পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত খোঁজ করেও তোমার জন্য এক দানা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারলাম না। সুতরাং বুঝলাম তোমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে।’ কথা শেষ করার আগে জানিয়ে দেবে, ‘পৃথিবীতে তুমি আর বেশীক্ষণ থাকবে না।’ হ্যাঁ, কথাগুলি শুনতে হবে মাকে। কিন্তু ওসমান কি শুনতে পাবে মায়ের সঙ্গে? ফেরেশতা যে আসবে বা কী বলবে, মা যদিও জানে আগে থেকেই, শুনেছে নিজের কানেই। মসজিদবাটির জলসায়। শুধু মা বা ওসমান কেন, শুনেছে সবাই। কিন্তু সবাই কি মনে রেখেছে? বা মা হামিদা বানুও কি মনে রেখেছে মাঘের জলসায় মৌলবী মিজানুর রহমানের সাহেবের দেওয়া সেই ওয়াজ। মায়ের জন্য পৃথিবীর পুব-পশ্চিম ঢুঁড়ে কোথাও এক দানা ভাত পাবে না ফেরেশতা। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে যদি আর আট-দশটি বাড়ি ছাড়িয়ে— । হ্যাঁ, শেখবাড়ির কথা কেউ যদি মনে করিয়ে দেয় ফেরেশতাকে, সে কি অত সহজে ভাত না পাওয়ার কথা বলতে পারবে? আবার সেই ফিনফিনে সাদা ভাতের কথা মনে পড়ল ওসমানের, আবার সেই ঘ্রাণ। মা কি বলতে পারবে ফেরেশতাকে? হ্যাঁ, ভাতের কথাই। ফেরেশতারা সবই জানে তো। জানে, মা হামিদা বানুর পেটে এক দানাও ভাত যায়নি ক’দিন ধরে। নিয়ে যাওয়ার আগে ক’দানা ভাত যদি— । ওরা আল্লাহপাকের হুকুমই পালন করবে শুধু। ওরা নাকি পুরুষ নয়, আবার নারীও নয়, ওদের নিজেদের নির্দিষ্ট শরীর নেই কোনও। ওদের খিদে নেই, তৃষ্ণা নেই। নুর বা ঐশী জ্যোতি থেকে তাদের সৃষ্টি সব শরীর, শরীর আছে অথচ শরীরের টান নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘...ফেরেশতারা তা অমান্য করে না, যা আল্লাহ তাদের আদেশ করেন। তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তা-ই করে।’

মা হামিদা বানুর শরীরের কথা ফকিরের জানার কথা নয়। সে এসেছিল নেশা করবে বলে। একেবারে এ-ক্লাস মাল আছে নাকি ওর সন্ধানে। এবার মা হামিদা বানুর মরণ টেনেছে দেখে চক্ষুলজ্জা হোক বা যাই হোক বসে গেছে। ও অবশ্য বলল, তোর আমার আর ভেবে কী হবে বল? আল্লা যা করার— । ফিসফিস করে জানতে চেয়েছিল, ‘ঘরে ভাত নেই, খাবি না কিছু? তোর বউ বললি শেখবাড়িতে, তোর ছেলে? ননো?’ আর তখনই ওসমান সুযোগের কথা ভেবেছে, ফাঁকে যাওয়ার নাম করে শেখবাড়িটা একবার ঘুরে আসলে কেমন হয়? না, বিরিয়ানির কথা বলবে না ওসমান, কিন্তু আমিনাকে বললে একটু ভাত আর গোস্ত কি হবে না? কিন্তু ফকির যেতে চাইলে? ফকির যদি বলে, আমিও ফাঁকে যাব, চল। যদি বলে, পাড়ার এত লোক থাকতে, তোর পাশের বাড়ির বোন বা ভাবিরা থাকতে দেখার লোকের অভাব কোথায়? এখন মালাকুল মউত এসে আত্মাটাকে বের করবে শরীর থেকে, জান কবজ করবে। মালাকুল মউত চোখের পলকে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে— । ফকির যদি বলে, এ সব তোর আমার টের পাওয়ার কথা নয়, তার চেয়ে চল— । কিন্তু গন্ধটা? এই গন্ধটাই যেন বিপদ বাড়িয়েছে। গন্ধটা নাকের ভিতর দিয়ে একেবারে পেট পর্যন্ত গড়িয়ে গিয়ে খিদেটাকেই চাড়িয়ে দিচ্ছে। ফকিরও কি বিরিয়ানির গন্ধ পায়নি? ঠিকই পেয়েছে। হয়তো ভাবছে বিরিয়ানি আর এ-ক্লাস মাল ভাল জমবে। ও নির্ঘাত এমন কোনও কিছু ভেবেই বসে থাকবে? হয়তো বলবে, কতকাল বিরিয়ানি পেটে পড়েনি বল তো!

মা কি টের পাচ্ছে কিছু? সাবেরার মা গিয়াসের নানিকে জিজ্ঞেস করল কী যেন। উঠোনের ডানদিকের সবেদা গাছে একটা শালিক। ওর সঙ্গী হয়তো আছে ধারে কাছেই। বাতাসে শব্দ উঠল হঠাৎ করে। তেঁতুলের ডালপাতাতেই হবে। আবার চুপ একেবারে। বাতাসের এমন হঠাৎ করে চুপ করে যাওয়া ভাল নয় মোটেই। ঝড় আসতে পারে। ঝড়ের কথা বলছে অবশ্য অনেকেই। ঝড়ের সঙ্গে কিছু পানি। কিছু অন্তত পানি এলেই এ জমি-ও জমির কোথাও না কোথাও রোয়ার কাজ পাবে সে। কাজ মানেই কিছু অন্তত পয়সা। না, ব্যবসার আশা আর করে না ওসমান। মহাজন আর তাকে বিশ্বাস করবে না কোনও দিন। কম টাকা তো নয়। ‘কিন্তু ননো, গেল কোথায়? ও সাবেরার মা, দেখ তো একটু। আশিখ— ।’ উঠোন লাগোয়া ডোবাটার জন্যই চিন্তা ওসমানের। আমিনা পইপই করে মনে করিয়ে গেছে, ‘চোখে চোখে রাখবা, ননোর কিছু হলে— ।’ সত্যি কথা বলতে কি, পঞ্চাশটা টাকাই বা কে দেয়? পঞ্চাশ টাকা আর পেট ভরা খাবার।

খরা লেগেছে আকাশে। পানি নেই। শুধু রোদ। আচ্ছা এমন খরখরে রোদ কি আগে দেখেছে কেউ? বা খরা লাগা আকাশ। রোয়ার কাজ যে জুটবে তার আর ভরসা কোথায়? সরকারের দু’ টাকার চাল আর তিন টাকার গম এগারো টাকায় বিক্রী করে যা দু’টো পয়সার মুখ দেখা। চার-চারটি প্রাণীর পেট বলে কথা। এ তোমার ফেরেশতা নয়, আলো দিয়ে তৈরি শরীর নয়, যে টান থাকবে না শরীরের। আল্লাহের নিজের হাতে এ একেবারে পৃথিবীর মাটি দিয়ে তৈরি শরীর। কথাটা মনে আসতেই ঘাবড়ে গেল ওসমান। এ সব কী ভাবছে সে? সে কি কাফির হয়ে যাচ্ছে? আল্লাহর নুর থেকে তৈরি ফেরেশতাদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলছে নিজেদের। ইমান হারাচ্ছে নাকি সে? হায় আল্লা!

সাবেরার মা বলল, আশিখ মইদুলদের ঘরে। ভাত খাচ্ছে। বলল, তোমরাও খেয়ে নাও। আমিনা কি করে গেছে কিছু? ফকির উঠে পড়ল জায়গা ছেড়ে। বলল, রোদ কমেছে যখন, প্লাস্টিক পেপারটা খুলে দিই। হাওয়া আসুক একটু। ভাগ্যিস ঘরটা করেছিল ওসমান। পিলার দিয়ে মাথায় অ্যাসবেসটাস। তাতেই পঞ্চাশ হাজার শেষ। কিন্তু শুধুই কি ঘর? আর কিছু ছিল না সেখানে? ফকির ছিল, দিলবাহার ছিল। দেশির সঙ্গে বিলিতিও ছিল, ছিল বিড়ির পালটা সিগারেট। মহাজন লোক পাঠাত, কাজের খবর জানতে চাইত, বা টাকা। মহাজনের সঙ্গে ওসমানের ব্যবসা অনেক দিনের। তবু, গণ্ডগোলটা করল সে। পঞ্চায়েত ঘর দেবে ঘর দেবে হতে হতে জানা গেল নামই যায়নি তার। তবে সামনের লটে যাতে হয়ে যায় দেখবে। ‘আর দেখতে হবে না তোদের’ — ভেবে জুয়োই খেলল ওসমান। ইট আর সিমেন্ট কিনল, আতাহারকে বলল, ছ’টা ‘পোস্টার’ আর মাথায় অ্যাসবেসটাস। মেঝে না হয় পরে— । কিন্তু বাকি টাকা গেল কোথায়? ছ’টা পোস্টার, অ্যাসবেসটস আর মাটি ফেলে মেঝে উঁচু করায় পঞ্চাশ হাজার শেষ? ফকির আর দিলবাহারের ওপর রাগ ওঠে খুব। তোরা না বন্ধু, বারণ করবি না? ফকিরের কথায়, ‘আমরা চুরি করছি না ডাকাতি? বোঝা তোর বউকে। খরচ-খরচার কী এমন জানে তোর বউ? নেশা করেছি একটু। তোর মহাজন তো ডাকাত, মৃত্যুর সময় ওর কী অবস্থা হয় দেখবি, মালাকুল মউত ওর গলায় হাত ঢুকিয়ে আত্মাটাকে কীভাবে টেনে বের করবে।’

আরে পানি পড়ল না দু’ ফোঁটা? সত্যিই। ঠাণ্ডা হাওয়া। একটু আধটু মেঘও। ডোবার হাঁসগুলি কেমন পানির আঁচ পেয়ে একেবারে দল বেঁধে প্যাঁক-প্যাঁক করে উঠল দেখ! এবার এই ঠাণ্ডা হাওয়া মাকে আরাম দেবে। চারপাশে বসে থাকা কেউ উঠে পড়ছে। ঝড়ের কথা ভাবছে সবাই। কাপড়-জামা তুলতে হবে। গরু তুলতে হবে গোয়ালে। তারপর হাঁস-মুরগী। কিন্তু ফেরেশতা তো বাতাসের অভাবের কথা বলতে পারবে না। বাতাস আসছে। সবেদার ডালগুলি একেবারে ঘনঘন মাথা নাড়াচ্ছে। সড়সড় শব্দ উঠছে তেঁতুলের ডালপাতায়। ডোবার ধারে দাঁড়িয়ে কে যেন ডাক পাড়ছে, ‘আয় আয় চৈ চৈ—।’ কিন্তু ফেরেশতারা কি এসে গেছে? আশিখের কথা মনে পরল। ‘ননো—, আশিখ?’ শারুখ সাড়া দিল। বলল, ‘আমাদের ঘরে চাচা।’ কিন্তু হাঁস-মুরগীগুলি আনতে হবে তো। গরু নেই ওসমানদের। আমিনাও চায় না। ওর কথায়, এ বাড়ি ও বাড়ি করে কাজের পর, আর নাকি পারবে না। না, স্বামীর ওপর ওর ভরসা নেই কোনও। কাজের কথাও বলে না আর। ‘আসসালামু আলাইকুম’। শুনেই চমকে উঠল ওসমান। কে? বারান্দা প্রায় ফাঁকাই। লুঙি পরা বেশ লম্বা মতো একটা লোক। না, ফেরেশতা নয়, বদ্দি পাড়ার আসরাফ। নামাজ পড়ে ফিরছিল, যাওয়ার পথে দেখে গেল। ওসমান অবশ্য আর এক ফেরেশতার কথাই ভাবছিল। ‘হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার পানীয় সরবরাহের জন্য নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু এখন তোমার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র অন্বেষণ করেও এক ফোঁটা পানি সংগ্রহ করতে পারলাম না। সুতরাং আমি বিদায় হলাম।’ মা, শুনতে পাচ্ছে কিনা কে জানে? বা আদৌ এসেছে কি কেউ? প্রথম ফেরেশতার পরপর ভাতের পর পানির কথা বলা। পানির কথা মানে, মা হামিদা বানুর জন্য পৃথিবীর পুব থেকে পশ্চিম বা উত্তর থেকে দক্ষিণ পানির খোঁজে হন্যে হয়ে— । বলবে, ‘হামিদা বানু, পৃথিবীতে থাকার সময় তোমার শেষ হয়ে গেছে।’ কিন্তু সত্যিই কি শেষ হয়ে গেছে। কয়েক ফোঁটা পানি পড়তে শুরু করল না? সবেদা পাতার গায়ে ফোঁটা পড়ছে পানির। মা হামিদা বানুর পাশে থাকার মধ্যে ওসমান আর ফকিরকে বাদ দিয়ে বড়জোর জনা চার। এই চারজন এখনও আশায় আছে। একটি মৃত্যুকে তারা দেখতে চাইছে। কীভাবে একের পর এক ফেরেশতা, কীভাবে শেষমেশ মালাকুল মউত মা হামিদার গলায় হাত ঢুকিয়ে—, মায়ের রূহ তখন কোথায় পালাবে? মাথা থেকে পা, ডানদিক থেকে বাঁ দিক। কিন্তু যাবে কোথায় তুমি? তোমার ফুসফুস থেকে হলেও তোমার আত্মাকে ঠিক খুঁজে বের করবে। এমন কষ্ট পাবে, যেন জ্যান্ত ছাগলের গা থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নিচ্ছে কেউ। কিন্তু তা তো কাফেরের মৃত্যুকালে হতে পারে। মুমিনের মৃত্যুতে? না, মা নিশ্চয়ই মুমিন হতে পারবে না, তবু কাফের তো নয়। অবশ্য মৃত্যুর আগের মুহূর্তে মা যদি একবার কোনও মতে ‘লা ইলাহু ইল্লালাহু—’ বলে উঠতে পারে, ওসমান নিশ্চিন্ত হতে পারে। যন্ত্রনাকে খুব ভয় মায়ের। একবার তরকারি কাটতে গিয়ে কীভাবে কীভাবে বুড়ো আঙুলে—, সে কী চিৎকার তার। কী গালি আমিনাকে। আমিনা অবশ্য নিজেই সেবার পুরনো শাড়ির পাড় ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। আর গালও দিয়েছে একই সঙ্গে। দিয়েছে মা-ও। কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলেনি।

মোটামুটি বাতাস শুরু হতেই ফকির হাল ছাড়ল। বলল, ‘যাই রে ওসমান, কিছু হলে খবর দিবি।’ তার মানে, কিছু হতে না দেখে সে যেন হতাশ। কিন্তু কী হত কিছু হলে? জানাজা হত, গোসল, কাফন-দাফন, কবর। খানাও থাকত হয়তো। ‘হয়তো’ এ কারণেই, যে ওসমানের কী আর ক্ষমতা খানার ব্যবস্থা করার। সে হাত গুটিয়েই নিত। কিন্তু মাতব্বররা কিছু একটা ব্যবস্থা করতোই। এ বাড়ি-ও বাড়ি করে ভাত আর পাঁচ-সাতটা মুরগী ঠিকই হয়ে যেত। যাওয়ার সময় ফকির বলল, ও নাকি শুধু নেশা করবে বলে আসেনি। একটা কথাও ছিল। মহাজন নাকি বলে পাঠিয়েছে। বলেছে, পঞ্চাশ হাজার মোটেই কম টাকা নয় যে ছেড়ে দেবে। টাকা না দিতে পারলে বাস্তুভিটেই—, হ্যাঁ, পাড়ার মাতব্বরদের সঙ্গে নাকি মহাজনের কথা হয়ে গেছে। কথা বলতে পার্টির লোকদের সঙ্গে কিছু টাকা পয়সার লেনদেনও নাকি পাকা। একেবারে বড়রাস্তার কাছাকাছি ওসমানের কাঠাদেড়েকের বাস্তুভিটা একেবারে ফ্যালনা তো নয়। এবার একেবারে হঠাৎ করেই শোঁ-শোঁ আওয়াজ। একেবারে দক্ষিণ থেকে উত্তর বা পুব থেকে পশ্চিমও হতে পারে। না, মাকে কি সে ঘরে নিয়ে যাবে? কিন্তু ঘরে নিয়ে গেলে ফেরেশতারা কি খুঁজে পাবে? আবার জিব কাটল ওসমান। সে কি সত্যিই কাফির হয়ে যাচ্ছে? আল্লাহর নূর থেকে তৈরি ফেরেশতারা পৃথিবীর পুব থেকে পশ্চিম বা দক্ষিণ থেকে উত্তর যেখানেই থাকো— । কিন্তু এখনও তো আছে, ওসমানের কাঠাদেড়েকের এই বাস্তুভিটা আছে তো এখনও। সেই তৃতীয় ফেরেশতা এসে সালাম করে যদি বলতে চায়, ‘হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার পদযুগলের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র ঘুরেও তোমার জন্য একটিমাত্র পদক্ষেপের স্থান পেলাম না। সুতরাং আমি বিদায় নিচ্ছি।’ ওসমান মনে করিয়ে দিতে পারবে, বলতে পারবে, ‘এখনও এই কাঠাদেড়েকের মতো বাস্তুভিটে, এখনও এই পিলারের ওপর তোলা অ্যাসবেসটাসের ঘর— । হোক মাটির মেঝে, আমাদের শরীরও তো আল্লাহ এই মাটি দিয়েই— ।’

আশিখের গলা না? ‘ননো—?’ হ্যাঁ, আশিখই তো। একা পানির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে। চাচি একা ছেড়ে দিল তোকে? একেবারে ভেজা শরীর। বৃষ্টির সঙ্গে এবার হাওয়া। ওসমান দেখে সাবেরার মা বা গিয়াসের নানি কেউই নেই আর। বারান্দার ঢালের জন্যই বাতাস থাকা সত্বেও পানির হেঁচলা আসতে পারছে না মায়ের শরীর পর্যন্ত। ‘মা শীত করছে তোমার? ঠাণ্ডা লাগছে?’ এ সময় কি আর শীত-গ্রীষ্ম বোধ থাকে মানুষের? শরীরের এখন আর আছেটা কী? ভাত নেই, পানি নেই। ভাত আর পানি ছাড়া আর কী থাকে শরীরের? এ তোমার ফেরেশতাদের শরীর তো নয়, যে শুধুই নূর, শুধুই আলো। কোনও পুরুষ নয়, মেয়ে নয়, কোনও খিদে নয়, তেষ্টা নয়। মা হামিদার মানুষের শরীর। মাটির। মাটি দিয়ে তৈরি। সুতরাং খিদে তেষ্টা, রাগ বা হিংসা, লোভ বা লালসা, পুরুষ বা নারী— মোট কথা, যা কিছু থাকতে পারে মাটির, সব, সবকিছুই তো থাকবে হামিদা বানুর।

প্লাস্টিকের পেপারের দরজা থাকার সুবিধাটা হল, আটকানোর দরকারই নেই কোনও। ওই টেনে দিয়ে ছেড়ে দিতে পারো। ইচ্ছে করলে যে কেউ একেবারেই না বলে কয়ে হুড়মুড় করে উঠোন বা উঠোন ছাড়িয়ে বারান্দা, চলে আসতে পারো যেখানে খুশি। ‘আসসালামু আলাইকুম’ শুনে সত্যিই চমকে উঠেছিল ওসমান। বাতাস আর জলের ঝাপটায় দু’ আড়াই বছরের আশিখ একেবারে জড়োসড়ো হয়ে জাপটে ধরে রয়েছে তাকে। না, অন্য কেউ নয় আলাউদ্দিন চাচা। এই ঝড়-জলেও মসজিদে যাচ্ছে নামাজে। যাওয়ার পথে একবার খোঁজ নিয়ে যাওয়া। অথচ ওসমান কেমন ফেরেশতার কথাই ভেবেছে। যেন চার নম্বর ফেরেশতা আল্লাহের আজ্ঞা নিয়ে হাজির হয়েছে। এবার চতুর্থ ফেরেশতা এসে সালাম করে বলবে, ‘হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখার কাজে নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু আজ পৃথিবীর এমন কোনো জায়গা খুঁজে পেলাম না যেখানে গিয়ে তুমি মাত্র এক পলকের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে পার। সুতরাং আমি বিদায় নিচ্ছি।’ এই ঝোড়ো বাতাসের মধ্যে বলতে পারবে এ কথা? এই বাতাসের অভাবের কথা। আজ কতদিন পর ঝড়, এই পানি! আজই তোমার মা হামিদা বানুর কথা মনে পড়ল? এই ঝড়-পানির হুল্লোড়ে কোথায় যাবে ওসমান? কাকে খবর দেবে? আমিনা আসলে নাহয় হত। কিন্তু এই মুহূর্তেই কিছু হলে, যদি কিরামান ও কাতেবিন ফেরশতারা এসে সালাম করে বলতে শুরু করে, ‘হে আল্লাহর বান্দা! আমরা তোমার পাপ-পূণ্য লেখার কাজে নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু এখন দুনিয়ার সব জায়গা সন্ধান করেও আর কোনো পাপ-পূণ্য খুঁজে পেলাম না। সুতরাং আমরা বিদায় নিচ্ছি।’ কী করবে তখন ওসমান? কোলে জাপটে ধরে রাখা আশিখের দিকে একবার তাকায় সে। সাবেরার মা তখন বলল, ভাত খাচ্ছে মইদুলদের ঘরে। মানে ওর পেটে ভাত আছে কিছু। কিরামান ও কাতেবিন ফেরশতারা কি আমিনা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? তার উপর কিরামান ও কাতেবিন ফেরশতারা যদি কালো রঙের লিপি বের করে দিয়ে বলতে শুরু করে, ‘হে আল্লাহর বান্দা! এর দিকে লক্ষ্য কর।’ আর সে লিপি পড়তে না চেয়ে মা হামিদা যদি ডানে বামে বার বার চোখ ফেরাতে থাকে। ‘কী লেখা থাকতে পারে ওই লিপিতে’ ভেবে মা হামিদা বানু ভয় পাবে তা পড়তে। কিন্তু মা কি পড়তে পারবে? মা তো অক্ষরই চেনে না। হয়তো পড়তে না পারার জন্যই অহেতুক ভয় পাবে। হয়তো মায়ের জন্য তেমন কোনও খারাপ বার্তাই নেই সেখানে। অথচ ভয় পেয়ে শুধুশুধু ছটফট করতে থাকবে মা। একা ওসমান কি তা সহ্য করতে পারবে?

এবার সত্যিই ঢুকল কেউ। প্লাস্টিকের পেপারের দরজাটা আস্তে করে ঠেলে—। অর্থাৎ খুব চেনা কেউ। এমন কেউ, যে চেনে সবকিছু। পৃথিবীর সব পথ, সব ঘাট, সব ঘরবাড়ি। তার মানে মালাকুল মউত। তার ডান পাশে রহমতের ফেরেশতা এবং বাম পাশে আযাবের। এবার জান কবজ হবে মা হামিদা বানুর।

আশিখও যেন বুঝতে পারল কিছু। আরও জোড়ে জাপটে ধরল না! বেশ হালকা একটা বাতাস যেন বয়ে গেল।

—নাও ধরো এটা।

—কী?

—বিরিয়ানি। একেবারে গামলা ভর্তি। ঝড়বৃষ্টিতে আসেনি তো অনেকেই। সবাই মিলে—।

আমিনা জাগাতে বলল আশিখকে। ওসমান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো স্বরে ভাতের কথা বলল। বিরিয়ানির কথাই। বলল, ‘ননো, তোমার জন্য মা কী নিয়ে এসেছে দেখ।’

ভুরভুর গন্ধ ভাসছে জাফরানের। আমিনা আলোর কথা জানতে চাইল। বলল, ‘লম্ফ জ্বালাওনি?’ ওসমান তেলের কথা বলল। এই ঝড়পানিতে কে যাবে বাইরে? মাকে দেখবে কে? আর কী আশ্চর্যের কথা ভাব, বারান্দার পড়ে থাকা শরীরটা নড়ে উঠল যেন একটু। যেন আওয়াজও বেরোল। যেন কেউ বলছে কিছু।

—যাব কেরোসিন আনতে? আলো লাগবে না?

আমিনা বারণ করল। বলল, ‘না, থাক, জেনে যাবে সবাই, বিরিয়ানির লোভে চলে আসবে। বরং আকাশের আলোয় একটু দেখে দেখে—।’

—বউ, ও বউ, কী খাস তোরা, গন্ধটা কীসের?

তাহলে মৌলবী ওমর আলীর কথাই ঠিক। আল্লার রহমতে কী না হয়। সবার দুআ আর আল্লার মেহেরবানিতে— । কিন্তু কেউ কি দুআ করেছিল হামিদা বানুর জন্য? সেই সাবেরার মা, গিয়াসের নানি বা চাচা আলাউদ্দিন। ফকির নিশ্চয়ই গালিই দিয়েছে মা হামিদা বানুকে। একেবারে এ ক্লাস মালের আশা করে দুপুরেই হাজিরা দিয়েছিল ওসমানের বাড়ি। স্রেফ মা হামিদার মরার কথা ভেবেই সব কিছু ছেড়ে—। আমিনা? আমিনা তো শেখবাড়িতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বুড়ির মৃত্যুকামনাই করে গেছে। তবে? তবে কি ওসমানের দুআতেই? মানে সে নিজে? কিন্তু ওসমান কি মনে রেখেছিল ওমর আলীর কথা, মানে মা হামিদা বানুর জন্য দুআর কথা। কে তবে দুআ করল মা হামিদার জন্য? ওসমান অবাক হল খুব। গামলাটা মা হামিদা বানুর মুখের কাছে নিয়ে আমিনা বলল, ‘বুড়ির মরনও নাই, কবে যে— ।’ আর মা হামিদা বানুও ছাড়ার লোক নয়। আমিনার দলা করা বিরিয়ানির ভাত গিলতে গিলতে শুরু করল, ‘মাগী— ।’

ওসমান ঠিকই ধরেছিল। একের পর এক ফেরেশতারা এসেছে মা হামিদার কাছে। একের পর এক ওরা মা হামিদাকে তার জন্য পৃথিবীতে ভাত, পানি, থাকার জায়গা বা বাতাসের না-থাকার কথা জানিয়ে, তাকে যে এবার পৃথিবী ছাড়তে হবে, জানিয়েছে। মা হামিদা বানুর পৃথিবীতে এমনকী আর পাপ বা পূণ্যেরও কিছু বাকি নেই। কিরামান ও কাতেবিন ফেরশতারাও তাদের কালো রঙের লিপি দেখিয়ে গেছে। আর মা হামিদা বানুও কী না জানি লেখা আছে সেখানে ভেবে ভয়ে উথাল-পাথাল করেছে। অস্থির হয়েছে ঘেমে-নেয়ে। এমনকী জান কবজের জন্য ডান পাশে রহমতের ফেরেশতা এবং বাম পাশে আযাবের ফেরেশতা নিয়ে হাজির হয়েছে মালাকুল মউতও।

বারান্দায় মাঝে মধ্যেই ঝাপটা ঢুকছে বাতাসের। সঙ্গে গুঁড়িগুঁড়ি পানিও। অন্ধকারে বিরিয়ানির গামলাটাকে ওদের হাত কীভাবে খুঁজে পাচ্ছে কে জানে? ওরা জানতেও পারছে না, আল্লাহর হুকুম মেনে মা হামিদার জান কবজ করতে এসে ডান পাশে রহমতের ফেরেশতা এবং বাম পাশে আযাবের ফেরেশতা নিয়ে মালাকুল মউত মাটি দিয়ে তৈরি মানুষগুলির একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। কতদিন পর আহ্‌ ,কতযুগ পর ফিনফিনে চাল, জাফরানের ঘ্রাণ, মশলাদার গোস্ত। হামিদা বানুকে নিজের হাঁটুর উপর টেনে নিয়ে আমিনা কিছুটা করে বিরিয়ানি দলা করে করে শাশুড়ির মুখে তুলে দিচ্ছে, আর বলছে, ‘তোর কি আর মরণ হবে না মা?’ মা হামিদা খাওয়ার ফাঁকেই জবাব দিচ্ছে, ‘সত্যি করে বল তো মাগী, গামলাটাশুদ্ধই চুরি করলি, নাকি—।’ ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ওর ঘুমন্ত মুখে মশলাদার গোস্তের টুকরো গুঁজে দিতে দিতে ওসমান বকে ওঠে, ‘কথা না বলে আগে খেয়ে নে তো মা, তোর জন্য মালাকুল মউত— ।’ আল্লাহের ইবাদতে মগ্ন থাকা ঐশী জ্যোতি দিয়ে তৈরি ফেরেশতারা অবাক হয়ে তাকিয়ে মাটির মানুষগুলিকে দেখছে। দেখছে সেই ছয় পোস্টারের ঘরের মাথায় অ্যাসবেসটসের ছাউনির নীচে কেমন আলো জেগে উঠছে। আল্লাহর হুকুম ভুলে দেড় কাঠা জমির সেই বাস্তুভিটের বারান্দা থেকে আশমান পর্যন্ত শতশত, সহস্রসহস্র ফেরেশতারা ঠায় দাঁড়িয়ে। ওদের অবাক করে দিয়ে মাটি দিয়ে গড়া মানুষগুলির শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া আলো কেমন ঐশী জ্যোতিকে ম্লান করে চরাচর গ্রাস করছে।

1 Comments

Upal Mukhopadhyay

03 October, 2021

Darun. Typical Sailenda. Amar priyo lekhak.

Post Comment