পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অনুতাপ

  • 25 February, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 422 view(s)
  • লিখেছেন : পিওনা আফরোজ
বাবা মারা যাওয়ার পর এক ঝড়ের রাতে কে যেন আমার মায়ের ঘরের দরজায় কড়া নেড়েছিল। তখন আমি মায়ের পাশেই শুয়েছিলাম। বয়স কত ছিল, ঠিক মনে নাই। মা চৌকির নিচ থেকে দা নিয়ে দরজার কাছে গিয়ে বলল, ‘কে রে? এত রাইতে কি চাস?’

‘দরজা খোল। কাম আছে।’

‘এত রাইতে কি কাম? আপনে কেডা?’ গলার স্বরটা মায়ের পরিচিত মনে হলো। তাই সম্বোধনও বদলে গেল।

‘তোর অতো কিছু জানার দরকার নাই। দরজা খুলতে কইছি, খোল! তোরে মেলা কিছু দিমু। কতা বাড়াইস না আর। নাইলে খুব খারাপ অইবো কইলাম।’

‘আপনার কাম থাকলে দিনে আইবেন। অহন আমি খুলুম না।’

 ‘তুই কিন্তু কামডা ঠিক করতাছোস না।’

মা কী জানি কী ভেবে তখন বলেছিল, আপনে যাইবেন, না আমি চিল্লায়া মানুষজন ডাকুম! তখন অন্ধকার রাতে বিছানায় বসে ভয়ে আমি কাঁপছি।

পরদিন সকালেই আমার মায়ের নামে শালিস বসল। চেয়ারম্যানের কাছে বলা হলো, মা নাকি ঘরে পরপুরুষ নিয়ে ছিল। সবাই তাকে অসতী, চরিত্রহীন বলে অভিযুক্ত করল। মা তখন গ্রামের চেয়ারম্যানের কাছে হাত জোড় করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, আমি নির্দোষ। এসবের কিছুই আমি জানি না। কিন্তু আমার মায়ের গগনবিদারী সেই কান্না চেয়ারম্যান সাহেবের মনে খানিক করুণারও উদ্রেক করল না। উল্টো তিনি জোরালো গলায় বললেন, এরকম চরিত্রহীন মহিলার এই গ্রামে কোনও ঠাঁই হবে না।

চেয়ারম্যানের এই কথার পর সেদিনই এক কাপড়ে আমার হাত ধরে মা গ্রাম ছাড়লেন।

 

কিন্তু এতকিছু ঘটে যাবার পর আর এতগুলো  বছর পেরিয়ে গেলেও, তবু কেন এভাবে চলে এলাম, জানি না। সেই পুরনো ঠিকানায়া! কিসের আশায়? সকালের স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে জড়িয়ে ভাবলাম আরেকবার।

গতকাল রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি। ছায়ায় ঘেরা একটা পুরনো বাড়ি। সেখানে কেউ একজন বসে কাঁদছিল। গোঙানির মতো শব্দ। অনেকটা ভুতুড়ে কান্নার মতো কানে বেজেছে। তারপরই ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু কে কাঁদছিল? কান্নার শব্দটা পরিচিত মনে হয়েছিল তখন। ঘুম ভাঙার পর কিছুতেই আর মনে করতে পারিনি। জেগে উঠবার পর থেকেই কেন যেন বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছিল। 

 

ভাবছি সামান্য একটা স্বপ্ন আমায় এতদূর নিয়ে এলো! মনের আলপথে কত শত কথা উঁকি দিতে দিতে পথ প্রায় ফুরিয়ে এলো। স্টেশনে যখন নামলাম, তখন রাতের ঘন অন্ধকার সরিয়ে সকালের আলো উঁকি দিচ্ছে। কতদিন পর এই শহরে এলাম! সেই চেনা দোকানপাট, সিনেমা হল, গার্লস স্কুলের গেইট, বাস কাউন্টার সব ঠিক আগের মতোই আছে। মতি কাকার মিষ্টির দোকান ‘মামণি মিষ্টান্ন ভান্ডার’ এখনও আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে।

চেনা শহরটাকে আবার নতুন করে দেখতে দেখতে একটা রিকশা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলাম। পরিচিত ক্ষতবিক্ষত রাস্তায় এদিক ওদিক দুলতে দুলতে ভারসাম্যহীন হয়ে রিকশা চলছে। রাস্তার দু’পাশ জুড়ে কড়াইগাছের সারি। হেমন্তের ঠান্ডা বাতাস যেন শীতের আগাম বার্তাই দিয়ে যাচ্ছে। শরীর জুড়ে তখন দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি। রিকশা ধীরে ধীরে বাড়ির কাছের মেঠোপথ ধরে এগোচ্ছে। ডানদিকের পথে বাড়ির সামনেই একটা গন্ধরাজ ফুলের গাছ। এখনও আগের মতোই আছে। কী সুন্দর ফুল ফুটেছে গাছে! দেখতে দেখতে রিকশা একেবারে ঘরের সামনে এসে থামল। কাঁধের ব্যাগটা সামলাতে সামলাতে বাড়ির ভিতর এসে ঢুকলাম।

বড় চাচাকে দেখলাম জলচৌকিতে বসে উঠানে রোদ পোহাচ্ছেন। সময়ের সাথে সাথে বয়স বেড়েছে বড় চাচার। আগের চেয়ে শুকিয়েও গিয়েছেন। গলার নিচের হাঁড়গুলো যেন চামড়া ভেদ করে বের হয়ে আসছে। চোখেও ঠিকভাবে দেখেন না মনে হলো। আগের মতো শরীরের সেই জোরও আর নেই। সেই দরাজ গলাও নেই। অথচ একসময়  গ্রামের লোকজন তাঁর ভয়ে কাঁপতো।

তিনি চোখ বুঁজে তসবি গুণছেন। আমি তাঁর পাশে বসে ডাকলাম, চাচা, চাচা।

 চমকে উঠলেন তিনি। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে তুমি? কোত্থেইকা আসছ?’

‘বড় চাচা, আমি রুমেল । ঢাকা থেকে আসছি।’

‘তুই রুমেল?’

‘জি চাচা।’

‘কত বড় হয়ে গেছিস! এতদিন পর মনে পড়ল আমাগো কথা!’ আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন তিনি।

‘মনে পড়ে চাচা। বাবা, দাদা, দাদি সবার কথাই মনে পড়ে।’

‘তোর মায়ে কেমন আছে?  ভালো আছে তো?’

‘হ্যাঁ চাচা। মা ভালো আছে। হঠাৎ বাড়িতে আসবার জন্য মনটা কেমন ছটফট করতেছিল। আর বাবার কবরটাও দেখতে ইচ্ছে হইতেছিল।’

‘আইসা ভালোই করছোস।’

‘জানেন চাচা, সেদিন স্বপ্ন দেখেছি, ছায়ায় ঘেরা একটা পুরনো বাড়ি। সেখানে কেউ একজন বসে কাঁদছে। দরজা-জানালা সব বন্ধ। ঠিক তখনি ঘুম ভেঙে যায়। কান্নার শব্দটা পরিচিত মনে হয়েছিল তখন। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর আর কিছুই মনে করতে পারছি না।’

কথা শেষেই বড় চাচা জলচৌকি থেকে উঠে আমার হাত ধরে বাবার ঘরে নিয়ে গেলেন। একটি চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন। তিনিও আমার পাশেই চকিতে বসলেন। আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে  জানতে চাইলাম,

‘চাচা, ঘরে আর কেউ নেই?’

‘না, পোলাপাইন সবাই যার যার কামে ব্যস্ত। যার যেখানে সুবিধা সে সেইখানে থাকে। আমার খোঁজ নেওয়ার সময় তাগো নাই। যাও তোমার চাচি খোঁজ খবর নিত, সেও আমারে থুইয়া  গোরস্থানে যাইয়া হুইয়া রইছে। তাও মেলাদিন অইয়া গেছে।’ বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপরই আচমকা আমার হাতটি ধরে চাচা বললেন, ‘তোদের সাথে আমি অনেক বড় অন্যায় করছিরে বাপ।’ বলতে বলতেই চাচার চোখ থেকে পানি ঝরছিল। ধীরে ধীরে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে বড় চাচার গায়ে পরা পাঞ্জাবির বুকের কাছটা ভিজে উঠছিল।

‘চাচা আপনি কাঁদছেন কেন? কী হয়েছে?’ অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।

চাচা দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘অনেক বড় অন্যায়রে! অনেক বড় অন্যায়। লোভে পড়লে মানুষ আর মানুষ থাকে না। তোর বাবা মইরা যাবার পর ভাবছিলাম, তোর মারে সরায়া দিলে তোদের এতগুলা জায়গা-জমিন ভোগ করবার মতো কেউ আর থাকব না। তুই তখন অনেক ছোট। তোর মা না আইলে তুইও আর আইবি না ভাইবা লোভে পইড়া গেলাম। নিজের সন্তানদের সুখ শান্তির কথা ভাইবা তোর মার নামে মিথ্যা বদনাম দিয়া তারে বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিছিলাম।’

 

আমি বিস্ময় নিয়ে চাচার কথা শুনছিলাম। বড় চাচা একটু থামলেন। খানিক দম নিয়ে আবার বললেন, ‘তোদের ওপর এত বড় জুলুম করা ঠিক হয় নাই। একসময় মনটা আউলা ঝাউলা হইয়া গেল। মনে অইলো—কামটা ঠিক করি নাই। অনেক বড় গুণাহ করছি। তোর মায়েরে আইতে কইয়া খবর পাঠাইছিলাম। কিন্তু সে আইলো না। আর আইবোই বা ক্যান? অরে কি কম কষ্ট দিছি? নিজে যে তাঁর কাছে যামু, তাও পারি নাই। বয়স অইছে। একলা একলা গাড়িতে উঠতে পারি না। রাস্তাঘাট চিনি না। ঠিকমতো চোখেও দেখি না। তখন তোগো লগে যোগাযোগের আর কোনো উপায় না পাইয়া প্রত্যেকদিন নামাযের বিছানায় বইসা আল্লার কাছে ফরিয়াদ করছি, তিনি য্যান একটাবার তোর মায়ের লগে আমারে দেখা করার সুযোগ কইরা দেন! অন্তত একবার য্যান তোদের কাছে মাফ চাইতে পারি। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করছেন, তিনি তোরে আমার কাছে পাঠাইছেন।’ বলেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রম্ন হাতের উল্টোপাশ দিয়ে মুছে নিলেন।

 

আমি অবাক চোখে চাচার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, মানুষের জীবনের গল্পগুলো নাটকের চেয়েও অধিকতর নাটকীয়। চাচা আমার পাশ থেকে উঠে গিয়ে ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে লাল কাপড়ে মোড়ানো কিছু একটা বের করে এনে চৌকির উপরে রাখলেন। তারপরই হাত দিয়ে লাল কাপড়টি সরিয়ে আমার সামনে মেলে ধরলেন কয়েকটি দলিল। বললেন, ‘এইগুলা তোদের সম্পত্তির দলিল। ভালোমতো দেইখা নে। আর এইগুলা নিয়া তোর মা’র হাতে দিস। কইছ, আমারে য্যান মাফ কইরা দেয়।’

 

কথাগুলো বলেই বড় চাচা ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির পিছনের পারিবারিক কবরস্থানের দিকে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আমি ঘরের ছাদযুক্ত দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর চলে যাওয়া দেখছিলাম।

 

 

 

 

প্রকাশ: দৈনিক কালের কণ্ঠ

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment