২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের থেকে ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনের একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২১ এর সেই নির্বাচনে বিজেপি বাংলা দখলের মুখে দাঁড়িয়েছিল। এইবার ২০২৬ এর নির্বাচনে বিজেপির তরফে মেরুকরণের অজস্র চেষ্টা সত্ত্বেও তাদের পালে সেই বাতাস লাগে নি। ফলে এইবারের নির্বাচন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিন্তভাবে লড়তে পারছে।
এটা ঠিক যে ২০২১ থেকে ২০২৬ এর মধ্যেই তৃণমূলের চাকরী দুর্নীতির বড় কেলেঙ্কারিগুলো সামনে এসেছে, যা সারদা নারদা থেকে গুণগতভাবে আলাদা। অন্যদিকে এইসময়ে অভয়া হত্যাকাণ্ডর প্রেক্ষিতে ফেটে পড়া অভয়া আন্দোলন তৃণমূলের বিরুদ্ধে সার্বিক ক্ষোভকে যে মাত্রায় ভাষা দিয়েছে, তা আগে দেখা যায় নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল এইসব ক্ষোভকে বেশ খানিকটা প্রশমিত করে ফেলতে পেরেছে। কয়েকটি আসনের উপনির্বাচনে বিপুল জয় হাসিল করেছে এইসবের প্রভাবকে অতিক্রম করে।
উল্টোদিকে বিজেপি এমন কোনও আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে নি, এমন কিছু ন্যারেটিভ সেট করতে পারে নি, যা তৃণমূলের বদলে তাকে ভোটারদের প্রথম পছন্দের দল করে তুলবে। বরং তীব্র মাত্রার সাম্প্রদায়িক প্রচার মুসলিম ভোটকে আরো বেশি সংগবদ্ধ করে তৃণমূলের দিকে এগিয়ে দিয়েছে। সেই ভোট এই রাজ্যে প্রায় পঁচিশ তিরিশ শতাংশ এবং তার সবটাই এককাট্টাভাবে তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে চলে গেলে বিজেপির পক্ষে বাংলা বিজয় কার্যত অসম্ভব, যদি না হিন্দু ভোট আশ্চর্যজনক কোনও রসায়নে অতিমাত্রায় সংগবদ্ধ হয়। মিম বা হুমায়ুনকে দিয়ে মুসলিম ভোটে ফাটল ধরানোর যে চেষ্টা বিজেপির আছে, তা দু একটি জায়গার বাইরে কোথাও খুব একটা সাফল্য পাবে বলে মনে হচ্ছে না। হিন্দু ভোট বিপুল মাত্রায় এককাট্টা হবে, এমন সম্ভাবনাও চোখে পড়ছে না।
সি বি আই, ইডি প্রভৃতি কেন্দ্রীয় সংস্থার ধরপাকড় দিয়ে বিজেপি শিবির একদা আলোড়ন ফেলতে পারলেও তৃণমূলের সেই সব নেতা মন্ত্রীরা জামিন পেয়ে বাইরে চলে এসেছেন এবং একে ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করে চলেছেন। এই পরিঘটনা থেকে বিজেপির মাঝারি স্তরের নেতা থেকে তৃণমূল স্তরের কর্মী সমর্থকরা পর্যন্ত ভাবছেন তাঁদের দলের সর্বোচ্চ নেতারা তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতাদের সঙ্গে সেটিং করে ফেলেছেন। এখানে রাজনীতি কম্প্রোমাইজড হয়ে গেছে কীনা এই সংশয় নিয়ে তাঁরা তাঁদের পছন্দের দলের হয়ে সেভাবে ঘাম রক্ত ঝরাতে আর এবার প্রস্তুত নন। এস আই আর সুবিধে দেওয়া দূরে থাক, বিজেপিকে নির্বাচন কমিশনের বকলমে যেভাবে অস্বস্তিতে ফেলেছে রাজ্যের সর্বত্র, তাতে নির্বাচনের মুখে বিজেপি কর্মীদের বেশ খানিকটা হতোদ্যমই দেখাচ্ছে।
বামেরা সাধ্যমতো লড়বেন। তবে গ্রাম ও গরীব মানুষের মধ্যে তাদের পুরনো ভিত্তি কিছু মাত্রাতেও পুনরুদ্ধার করতে না পারা তাদের দুশ্চিন্তাতেই রাখছে। বামেরা শিক্ষিত বেকারদের ইস্যুকে যতটা জোরের সঙ্গে তুলেছে, কৃষি সঙ্কট বা গ্রামীণ সঙ্কটকে সেভাবে প্রচারে আনতে পারে নি। সেখানে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে নি। শুধু শিক্ষিত বেকারদের ক্ষোভকে পুঁজি করে, চাকুরী দুর্নীতি বা অভয়া আন্দোলনকে সামনে রেখে প্রচারে বামেদের আসন জুটবে না। গ্রাম, কৃষক, গরীব মানুষের মধ্যে সংগঠন আন্দোলন বাড়াতে না পারলে এই রাজ্যে বাম পুনর্জাগরণ সম্ভব হবে না।