পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বাংলাতে কেন এমন ফল বামেদের ৪

  • 11 June, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 444 view(s)
  • লিখেছেন : গৌতম রায়
বাংলায় বামেদের কেন এমন হতাশাজনক ফল হলো, এর থেকে বেরোনোর রাস্তাই বা কী? এই নিয়ে একটি ধারাবাহিক আলোচনা করলেন গৌতম রায়। চতুর্থ পর্ব।

বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকাকালীন তপশিলি জাতি- উপজাতিদের জন্য যেসব আন্তরিক উদ্যোগগুলি নিয়েছিলেন, তার ফলে যে অংশের মানুষ লাভবান হয়েছিলেন, তাঁদের কিন্তু একটা বড় অংশ, নিজেদের সমাজের পিছিয়ে থাকা লোকেদের দূরবস্থা দূর করার ক্ষেত্রে খুব আন্তরিক প্রয়াস কখনো নেননি। বহু ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া গিয়েছে, তপশিলি জাতিভুক্ত মানুষ , বাম আমলে, বামফ্রন্ট সরকার কর্তৃক নানা ধরনের সামাজিক উদ্যোগগুলি গ্রহণ করে নিজেদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থার অনেকটা বদল এনেছেন। কিন্তু এখানেই তাঁরা থেমে গিয়েছেন।

সেই বদলটাকে, তাঁদের সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সেভাবে উদ্যোগ কখনো নেননি। আর এই অংশের মানুষদের রাজনৈতিক ভাবে নিজেদের লক্ষ্যে প্রভাবিত করবার ক্ষেত্রে, খুব যে সক্রিয় ভূমিকা সেই সময় বামপন্থী নেতারা নিয়েছিলেন, সেটাও কিন্তু বলতে পারা যায় না। বর্ণ হিন্দুরা বামপন্থী আন্দোলনকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচালনা করেছেন। হয়তো নেতৃত্বে কখনো কখনো তপশিলি জাতিভুক্ত মানুষ এসেছেন। কিন্তু বামপন্থী দলের যে রাজনৈতিক পরিকাঠামো, সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নেতা পারেননি নিজের সমাজের মানুষজনদের আর্থ- সামাজিক - সাংস্কৃতিক উন্নয়নের প্রশ্নে, আরও বেশি কোন সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে।

একেবারে মার্কসীয় দর্শনে শ্রেণী চিন্তার বিকাশ এবং পর্যালোচনার যে কেতাবি ধারা, সেই ধারা টিকে যে নিজের দেশের, নিজের সমাজের, সামাজিক- অর্থনৈতিক- সাংস্কৃতিক, এমন কি ধর্মীয় প্রেক্ষিতেও প্রয়োগ করতে হবে, একটা নির্দিষ্ট মডেল ধরে সেই প্রয়োগ যে সেটি সম্ভব নয়, প্রয়োগের একটা ছাঁচে ঢালা মডেল যদি অনুসরণ করা যায়, অনুকরণ করা যায় তাহলে সেই চিন্তার মধ্যেও একটা রাজনৈতিক মৌলবাদী ধারণা জন্ম নিতে থাকে --এই জায়গা গুলি কিন্তু সমাজ নিয়ন্ত্রক হিসেবে যখন বামপন্থী শক্তি, সরকার পরিচালনায় ছিল, তখন খুব একটা আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

জ্যোতি বাবু যখন শারীরিক কারণে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে খানিকটা দূরে থাকছেন, কিন্তু তাঁর  মস্তিষ্ক অত্যন্ত সক্রিয়, দলকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে তখনো তিনি ক্লান্তিহীন। এইরকম সময়ে, কেবলমাত্র পারমাণবিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে প্রথম ইউপিএ সরকার থেকে বামপন্থীদের সমর্থন প্রত্যাহার -- এই গোটা ঘটনাটি যে শেষ পর্যন্ত বাম শক্তিকে কোণঠাসা করে, প্রতিক্রিয়াশীল, সম্প্রদায়িক শক্তিকে গোটা দেশ জুড়ে, এই মানুষের মুণ্ডু নিয়ে গেন্ডুয়া খেলবার সুযোগ করে দিয়েছে-- এটা যদি আজকে আমরা স্বীকার না করি, তাহলে বাস্তবকে আমরা অস্বীকার করব।সেদিন যদি পারমাণবিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে বামপন্থীরা প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এগুলো সব বজায় রেখেই কেন্দ্রীয় সরকারের উপর থেকে, ভোটের মাত্র ৬ মাস আগে সমর্থন প্রত্যাহার না করতেন, তাহলে সেই সময়ের শাসক, নানা ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে সঙ্ঘবদ্ধ করে, বামপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে এভাবে লিপ্ত হতে পারত না। প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ছিলেন । আর তারপর কি ঘটেছে , সেই ইতিহাস সকলেরই জানা। কিন্তু একটা কথা বলতে হয় যে, ভোট রাজনীতির বীজগণিত যেভাবে জ্যোতি বাবু জানতেন, সেটা কিন্তু পরবর্তী সময়ে, নতুন প্রজন্মের বামপন্থী নেতারা, সেভাবে আত্মস্থ করতে পারেননি। দীর্ঘদিন কয়েক দফায় সংসদ ছিলেন সেলিম ।তার আগেও যুব আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা হিসেবে গোটা ভারতকে তিনি প্রায় হাতের তালুর মত চেনেন । সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, ভোট রাজনীতির সময়োপযোগী সমীকরণ তৈরি করবার চেষ্টা তিনি করেছিলেন । সেই চেষ্টা ও শেষ পর্যন্ত সফল হলো না।

আসলে রক্তক্ষরণ হয়েই চলেছে। আর কোন বিশল্যকরণী দিয়েই  সেই ক্ষরণ রোধ করতে পারলেন না সেলিম। সমস্ত ধরনের তৃণমূল ও বিজেপি ভোটকে একত্রিত করবার তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে বলতে হয়, আইএসএফের ভূমিকার কথা।

নির্বাচন তখনও দূর অস্ত। কিন্তু আইএসএফ নেতা তথা বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন, তিনি ডায়মন্ডহারবারে, তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তখনও বাম, কংগ্রেস--কোনো দলের মধ্যেই কোনরকম নির্বাচনী সমঝোতা ঘিরে আলাপ-আলোচনা ও শুরু হয়নি। কিন্তু মহঃ সেলিম এবং অধীর চৌধুরী , সিপিআই(এম) এর রাজ্য সম্পাদক এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা তৎকালীন দেশের বিরোধী দলনেতা, প্রকাশেই বললেন; নির্বাচনে বাম কংগ্রেস জোট হোক বা না হোক, নওশাদ সিদ্দিকী যদি আইএসএফের প্রার্থী হিসেবে ডায়মন্ডহারবার লোকসভা কেন্দ্রে, তৃণমূলের প্রার্থী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে আমরা , আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে নওশাদকে জেতানোর চেষ্টা করব।

বামপন্থী রাজনীতিতে কখনো কোন ব্যক্তি প্রকাশ্যে কোনদিন অমুক কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব --এরকম কথা বলেন না। এমনকি দলীয় স্তরেও এ নিয়ে কোনোরকম তদ্বির তদারক ও করেন না। তাঁদের দল, নানা ধরনের বিষয় পর্যালোচনা করে প্রার্থী ঠিক করেন। কংগ্রেস দলের প্রার্থী নির্বাচনের প্রবনতা, অতীতের মতো একটা সময় যখন কেন্দ্রে একক শক্তিতে কংগ্রেস ক্ষমতাসীন ছিল, তখন দিল্লী ছিল টিকিট বন্টনের মূল উৎস।

অধীর চৌধুরী, কংগ্রেস দলের আজকের প্রেক্ষিতে সেই জায়গাগুলিকে অনেকটাই ভেঙে দিতে পেরেছেন। কিন্তু মজার কথা হলো, নওশাদ সিদ্দিকী, যেভাবে ভোটের দামামা বাজার অনেক আগেই নিজের ডায়মন্ডহারবার থেকে লড়াই করবার কথা বলছিলেন, সেই নওশাদ সিদ্দিকীই ভোট পর্ব এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে, বামপন্থীদের সঙ্গে আসন সমঝোতার প্রশ্নে একটা অদ্ভুত এবং বলতেই হয় সন্দেহজনক প্রবণতা প্রকাশ করতে শুরু করলেন ।

একটি নির্বাচনী জনসভায় এ প্রসঙ্গে সিপিআই(এম)  নেতা মহঃ সেলিম যে মন্তব্য করেছিলেন, সেটি বিশেষভাবে অনুধাবনযোগ্য ।সেলিম বলেছিলেন, নওশাদকে সালামালেকুম পাঠালাম। কিন্তু ওঁর  পক্ষ থেকে ওয়ালাইকুম সালাম আর এলো না ।

অদ্ভুতভাবে নিজের সংগঠনিক শক্তি ঘিরে একটা মনগড়া ধারণার উপর ভিত্তি করে, এমন এমন কিছু আসন নওশাদ সিদ্দিকী বামপন্থীদের কাছে  দাবি করে বসলেন,  যেখান থেকে বুঝতে পারা যাচ্ছিল, সম্ভবত কোনো একান্ত  ব্যক্তিগত কারণে তিনি তৃণমূলের যুবরাজের সঙ্গে ইতিমধ্যে একটা বোঝাপড়া করে ফেলেছেন। তাই তিনি প্রকাশ্যে ডায়মন্ডহারবারে নিজে লড়াইয়ের কথা আর বলতে থাকলেন না ।

                বিমান বসুর মত প্রবীর নেতা, নওশাদের সঙ্গে বৈঠক নির্ধারিত হওয়ার পর অপেক্ষা করে বসে রইলেন নিজের দলীয় কার্যালয়ে। কিন্তু নওশাদ আর এলেন না বিমান বসুর সঙ্গে কোন আলোচনা করতে। সি পি আই (এম) দলের  সঙ্গে যে  দ্বিপাক্ষিক কয়েকটি স্তরের আলোচনা আইএস এফ  করেছিল, সেই আলোচনাগুলিতেও কিন্তু নওশাদ কখনো আসেননি । হাজির ছিলেন তাঁদের দলের অন্যান্য নেতারা। যাঁদের রাজনৈতিক দক্ষতা কখনোই কোনোভাবে জনগণের দ্বারা পরীক্ষিত নয় ।

              এইরকম একটা অবস্থায় আলোচনা চলছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ৪২ টি আসনেই প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। বামপন্থীরা কিন্তু তখনও নওশাদকে সুযোগ দেওয়ার জন্য নিজেদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার কাজটি বেশ কিছুদিন স্থগিত রাখলেন। তারপর দফায় দফায় সেই তালিকা তাঁরা প্রকাশ করলেন। উদ্দেশ্য একটাই। যাতে কোনো অবস্থাতেই বিজেপি এবং তৃণমূল বিরোধী ভোট ভাগ না হয়ে যায় ।

বাম- কংগ্রেস জোটের সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়া  হয়ে যাওয়ার পর, বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে যখন প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হলো, শ্রীরামপুরে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী হলেন তরুণ প্রজন্মের নেত্রী দীপ্সিতা ধর,  প্রচার পর্ব পুরো মাত্রায় শুরু হয়ে গেল ,তখন নওশাদ সিদ্দিকী আসন সমঝোতা ঘিরে দাবি করলেন; সিপিআই(এম)কে শ্রীরামপুর থেকে প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিতে হবে। ওই আসনে তাঁরা  লড়বেন। ডায়মন্ডহারবারে তিনি প্রতিদ্বন্দিতা করবেন না। তাহলে তিনি মুর্শিদাবাদ কেন্দ্র থেকে দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহার করবেন। উল্লেখ করতে হয়, বিগত পঞ্চায়েত ভোটে এই মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে আই এস এফের ভোট ছিল মাত্র ০.০২ শতাংশ ।এই অবস্থা কোন্ রহস্যজনক কারণে তৈরি হলো হয়তো আগামী দিনে তা জানতে পারা যাবে। ভোটের ফল থেকে একটা জায়গা খুব পরিষ্কার, পশ্চিমবঙ্গের ৪২ টি লোকসভা কেন্দ্রের কোনো একটিতে, যেকোনো দলের প্রার্থীর জয় পরাজয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে, আইএসএফ কিন্তু কোনরকম ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেনি। আর এই জায়গা থেকে যে কথাটা খুব জোড়ের সঙ্গেই বলতে পারা যায় যে, আগামী দিনে,পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে, এবারের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রায় নিশ্চিতভাবেই ধরে নেওয়া যায়, রাজনৈতিকভাবে আইএসএফ একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল।

0 Comments

Post Comment