পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বাড়ির বয়স্ক মানুষদের কথা কে ভাবে?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 206 view(s)
  • লিখেছেন : ঝর্ণা পান্ডা
সন্তানরা সবাই কি কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন বলে পরিবার তথা সমাজের উদবৃত্ত এই শ্রেণির মানুষেরা এমন অসহায়? লক্ষ্য করে দেখবেন এই ধারণাটিকে খুব সচেতনভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এটি সাধারণত ‘শিক্ষিত’ শহুরে শ্রেণির সন্তানদের ফন্দি। গ্রাম উজাড় করে আমাদের পরিযায়ী শ্রমিকেরা ছড়িয়ে আছেন রাজ্য দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। তাঁরাও তো ‘কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন’- তারা এমন ফন্দি আঁটছেন?

সম্প্রতি সাংসদ সদস্য জয়া বচ্চন পার্লামেন্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন -‘বয়স্কদের হত্যা করা  উচিত’ কারণ সরকার এই জাতি নির্মাতাদের পাশে নেই। এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন ভারতের বয়ষ্ক নাগরিকরা সত্তর বছর বয়সের পর মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্স পাওয়ার অযোগ্য, তাদের ই.এম.আই-তে ঋণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হয়না। ঋণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স না দেওয়ার পক্ষে সরকারের যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে। আমাদের দেশে সংখ্যালঘু বয়ষ্কদের ঋণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স-এর সত্যিকার প্রয়োজনটি হয়’ত আমাদের অনেকের কাছে অচেনা। কিন্তু মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্স? যাদের ই.এম.আই-তে ঋণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় তাদের কাছে হয়’ত মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্সের সমস্যাটি তেমন গভীর নয়। সত্তোর্ধ্ব প্রবীণেরা স্বাস্থ্যবীমা থেকে বঞ্চিত সে প্রসঙ্গটিও সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। জন আরোগ্য যোজনায় সত্তোর উত্তীর্ন সমস্ত বয়স্কদের অর্ন্তভূক্ত করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ছয় কোটির বেশী মানুষকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু সেটি দেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ? কিন্তু বাকি প্রবীণদের কি হবে? সেদিন একটি একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যবীমা সংস্থার এজেন্ট বলছিলেন ৬০-৬৫ বছর বয়সি’দের পাঁচ লাখ টাকার বীমার জন্য বছরে ২৩০০০ টাকার বেশী প্রিমিয়াম দিতে হয়। তথাকথিত প্রথম সারির বেসরকারি বীমা সংস্থার বাৎসরিক প্রিমিয়ামের অংক আরও বেশী। ই-এম-আই’তে ঋণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স অথবা মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্স- এধরনের সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে বয়ষ্ক নাগরিকদের ‘হত্যা করা  উচিত’ যুক্তিটি খানিক দূর্বল বলেই মনে হয়। ‘হত্যা করা  উচিত’-এর মতো বিষয়টি পরিবারে প্রবীণদের অবস্থানটি দেখলে অনেক বেশী প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। চার তলা বাড়িতে একলা পড়ে থাকা বৃদ্ধের মৃত্যু না হলে সেটি খবরের শিরোনামে আসেনা, তাই বলে আমরা কি জানিনা রাজ্য জুড়ে অবহেলিত বুড়োবুড়িদের কথা? তাদের একলা যাপনের কথা? ‘সন্তানরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকে’, ‘মা নিজের বাড়ি ছেড়ে আমাদের সাথে থাকতে চায়না- এমন যুক্তি সর্বত্র এবং সন্তানদের এমন যুক্তির আড়ালে বার্ধক্যের অশক্ত শরীর নিয়ে এরা একলা বাড়িতে পড়ে আছেন। আমাদের সার্ভে টিম দূর্গাপুরে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন ডোর বেল বাজালে বার্ধক্যে ক্লান্ত অবসন্ন প্রবীণরা দরজা খুলে কাতরভাবে অনুরোধ করেছেন –‘তোমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সার্ভে করার মতো বয়সের কেউ আমাদের বাড়িতে থাকে না। তবে এসেছ যখন একটু বস আমাদের সাথে গল্প করো। মানুষের মুখ দেখতে পাইনা’। গৃহ সহায়িকারাই এদের একমাত্র ভরসাস্থল। দিনরাত গৃহ সহায়িকাদের ওপর ভরসা করার মতো এমন আর্থিক সামর্থ্য নেই সংখ্যগরিষ্ঠের। যাদের নেই তারা কার সাহায্যে দিন গুজরাণ করবেন? সব পরিবারে তো অবিবাহিত, ডির্ভোসি কিংবা বিধবা ‘পদি পিসি’রা নেই (যদি থেকেও থাকে তাদের সবার আর্থিক বা শারীরিক সার্মথ্য তো নাও থাকতে পারে) যাদের অনায়াসে বলে দেওয়া যায় ‘আমি তোমাদের আয়া নই, যে তোমাদের মায়ের দেখাশোনা করব’। অসহায় শ্বশুর শ্বাশুড়ির ক্ষেত্রে নিজেকে ‘আয়া’ মনে হলে স্বামী সন্তান গৃহপালিত জীবজন্তু্দের জন্য গৃহবধূদের ভূমিকাটিকে তারা নিজে ঠিক কীভাবে চিহ্নিত করেন সে নিয়ে আমরা প্রশ্ন করতেই পারি। ‘আয়া’ হতে চান না বলে অসুস্থ অসহায় বুড়োবুড়িদের অপমান করে বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে যারা অমানবিক নির্দয় র্নিলজ্জ, তারাই আবার ১৪ই আগষ্ট, ২০২৪ এর ‘রাত দখলে’ সামিল হয়েছেন বলে গর্বিত হন, প্রতিবেশী গৃহবধূ নারী নির্যাতনের শিকার হলে কুম্ভিরাশ্রু ফেলেন, স্বামীর বিরুদ্ধে থানায় নালিশ করার ব্যাপারে তাকে পরামর্শ দিয়ে বিপ্লবী হয়ে ওঠেন! মা বাবার জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী কিংবা পেরেন্ট’স ডে, দূর্গাপুজো উপলক্ষ্যে সাড়ম্বরে উপহার দিয়ে মুখোশের আড়ালে মুখ ঢাকেন! এমন ভন্ডামির ছবি তো সর্বত্র।

সন্তানরা সবাই কি কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন বলে পরিবার তথা সমাজের উদবৃত্ত এই শ্রেণির মানুষেরা এমন অসহায়? লক্ষ্য করে দেখবেন এই ধারণাটিকে খুব সচেতনভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এটি সাধারণত ‘শিক্ষিত’ শহুরে শ্রেণির সন্তানদের ফন্দি। গ্রাম উজাড় করে আমাদের পরিযায়ী শ্রমিকেরা ছড়িয়ে আছেন রাজ্য দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। তাঁরাও তো ‘কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন’- তারা এমন ফন্দি আঁটছেন? তাদের পেরেন্ট’স ডে পালনের প্রয়োজন পড়ে? নাকি তাঁরা ‘রাত দখলে’ সামিল হয়েছিলেন- সেটি জানানোর উদ্দেশ্যে তাদের ঢাক পেটানর দরকার হয়? ‘অশিক্ষিত’ ‘অসচেতন’ গৃহবধূ (হয়ত বা নারী নির্যাতনের শিকার) স্বামীর অনুপস্থিতিতে শ্বশুর শ্বাশুড়ি সন্তান নিয়ে ঘর গৃহস্থালী সামলাচ্ছেন। সংসার চালানোর ঝক্কি সামলাতে না পেরে মাঝেমাঝে ছেলেপুলের পিঠে যেমন দু এক’টা বেতের ঘা পড়ে তেমনই প্রবীণদের কপালেও মুখ ঝামটা জোটে কিন্তু সেসব তো আমাদের দৈনন্দিন যাপন। তারমধ্যে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার মতো অপমান অবহেলা অসম্মান নেই। অসহায়তার বোধ নেই।

দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য সন্তানের ফন্দিফিকির বেচারা বুড়োবুড়িদের বুঝতে অসুবিধে হয়। মাল্টি্ন্যাশনাল কম্পানিতে চাকুরিরত ছেলে তার মাকে নাতির বিয়েতে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিয়ে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেখানে মাকে ছেড়ে পালিয়ে এলেন। মাস তিনেক ছেলের বাড়িতে থাকার পর আশি ঊর্ধ্ব মাকে ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলার জন্য ‘catchy’ একটি ফন্দি আঁটলেন- ‘মেজদি, মা সব সময় মন খারাপ করে থাকে। পুজোর সময় মাকে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাও না। দিন সাতেক পর তোমার ভাই গিয়ে নিয়ে আসবে’। গ্রামের বাড়ি পৌঁছানর পর বোঝা গেল সন্তানের বাড়ির এক কোনে ব্যাগ প্লাস্টিকের প্যাকেটে নিজের জামাকাপড় চিরুনী পাউডার রাখার জন্য মেঝের এক চিলতে জায়গায় যে ঠাঁইটুকু জুটেছিল, উৎসবের দিনে মায়ের মন ভালো করার অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করার জন্য ‘মাকে পুজোতে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাও’-এর মতো ফন্দি আঁটা হয়েছে!

যারা এমনতর সামাজিক অপরাধের শিকার তাদের নির্যাতনের কথা অপমান অবহেলার করুণ ছবিটি বারেবারে প্রকাশ্যে নিয়ে আসার সামাজিক দায়িত্বটি আমাদের। সমাজের যে অংশে প্রবীণদের ঘিরে এমন ভয়ঙ্কর ছবিটি তার মাঝেও কখনও কখনও এক ঝলক আলোর শিখা জেগে ওঠে। চিকিৎসক বন্ধুটি বলছিলেন-‘বাড়ি ফিরে আজ শ্বাশুড়িকে যখন পেপার পড়ে শোনাব ভারি খুশি হবেন। খবরের কাগজে যেদিন তোমার লেখা প্রকাশিত হয়, চেম্বারে বেরোনর আগে আমি ওনাকে বলে বেরোই। সন্ধেটুকুর জন্য উনি সেদিন ছোটদের মতো অপেক্ষা করেন’।

সোনারপুরের এক দম্পতির মেয়ে একবার বাবা একবার মায়ের সাথে বছরে দুবার বেড়াতে যায়। সে জানে এতদিন ঠাকুমা তাদের সফর সঙ্গী থাকলেও এখন বয়স হয়েছে বলে বেড়াতে যেতে পারেন না। তাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া ও ঠাকুমাকে আগলে রাখার কাজটি বাবা মা পালা করে করেন। প্রতিবেশী প্রবীণ দম্পতিকেও এরা সফর সঙ্গী করেন।

বন্ধু সুমনের মেয়ে তিন তলা বাড়ির ছবি আঁকে। প্রবীণা ঠাকুমা দিদিমা’র জন্য একতলা’র ঘরগুলি নির্ধারিত করে।  হুইল চেয়ারে বসিয়ে বাবা তার ঠাম্মাকে পুজো প্যান্ডেলে নিয়ে গেলে সে হুইল চেয়ারের পাশে পাশে হাঁটে। পাছে ভিড়ে ধাক্কা লাগে।

আই.টি সেক্টরে কর্মরত ছেলের কাছে তার বাবা মায়ের উপস্থিতি ছোটদের জন্য কতখানি আনন্দদায়ক এমন এক স্বার্থপর সময়ে দাঁড়িয়ে সেটি দেখার অভিজ্ঞতাটিও কম নয়। দাদু ঠাম্মি আসবে সেই আনন্দে রাত জাগতে না পেরে দরজার সামনের শোফায় ভাইবোন ঘুমিয়ে পড়ে, দাদু ঠাম্মি আজ তাদের কলকাতার বাড়িতে ফিরে যাবে শুনে কান্নাকাটি করে, কথা না শুনলে ঠাম্মিকে ফোন করবে-এই বলে বাবাকে ভয় দেখায়, সপরিবারে বেড়াতে গেলে নাতি (বাবার মতো হাবভাব করে) যত্নে ঠাকুমার হাত ধরে থাকে-তুমি আমার সাথে চলো, আমি দেখিয়ে দেবো ওটা কেমন করে খুলতে হয় কিংবা বড়দের মতো চোখ পাকিয়ে ছোট্ট মিহা বলে তোমরা ডিনার করে নাও, মা আমাকে অফিস যাওয়ার আগে বলেছে ঠাম্মি যেন ডিনার করতে দেরী না করে-এমনি করেই মা বাবা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে নিঃশব্দে দৈনন্দিন যাপনের মধ্য দিয়ে ব্যাটনটি তুলে দেন। এমন করেই তো আমাদের পূর্ব পুরুষরা নিত্য দিনের স্বাভাবিক ছন্দে জেনেছিলেন অভিভাবককে যত্নে আগলে রাখার কথা। বাবা মা পরিবারের অংশ কিনা সেদিন সমাজে সে প্রশ্নের অস্তিত্ব ছিল না। উচ্চশিক্ষা, অর্থ, যশ প্রতিপত্তি-র মধ্যদিয়ে আমরা ক্ষমতা অর্জন করেছি। যার আগুনে দগ্ধ হচ্ছেন প্রবীণরা। কোথাও যেন পড়েছিলাম – ‘একটা মানুষ আসলে কেমন, সেটা বোঝার জন্য তার ভেতরে খানিকটা ক্ষমতা পুরে দাও। তারপরে দেখো, সেই ক্ষমতা তার মাথায় ওঠে কিনা। ক্ষমতার আগুন যত দাউদাউ করে জ্বলবে, তত বেশি করে সেই আগুনে তার ভেতরকার সহমর্মিতা, মনুষ্যত্বগুলি বাষ্প হয়ে উবে যাবে। ক্ষমতার গুমর যত বাড়বে, তত বেশী পরিবার, শুভানুধ্যায়ীর, আত্মীয়, বন্ধু ক্ষয়ে যাবে, ভিড় বাড়বে স্তাবকদের’। রাজনীতিবিদদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম বর্তমানে  শিক্ষিত, চাকুরীজীবি, উচ্চপদাধিকারি পুত্রকন্যা, চাকুরিরতা বধূ অথবা ক্ষমতাভোগী গৃহবধূরা সেটি হাড়ে মজ্জায় প্রমান করে চলেছেন। ক্ষমতাভোগী রাজনীতিবিদদের পতন ঘটে মানুষ তাদের প্রত্যাক্ষান করে কিন্তু আমাদের পেশা, আমাদের অর্থ, আমাদের সামজিক প্রতিপত্তি কিংবা পরিবার পরিচালনার দৌলতে প্রাপ্ত ক্ষমতার গুমোরের ক্ষয় নেই যা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে- যার আগুন প্রবীণ প্রবীণাদের দগ্ধ করে। তাদের এমন বিপন্নতার মাঝে দাঁড়িয়ে ‘বয়স্কদের হত্যা করা উচিত’-র মতো এমন একটি নির্মম সত্যের সামনে আমাদের দাঁড়াতে হয়।

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment