অন্ধকার ঘরের ভেতরেও একটা সবচেয়ে অন্ধকার কোণ থাকে। আইনের আলো সেখানে পৌঁছাতে গিয়ে প্রায়ই থমকে যায়। বেঙ্গালুরুর আইনজীবী অরুণ আগরওয়াল ঠিক সেই কোণটাতেই আলো ফেলতে চেয়েছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সহজ—দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই করা। হাতে ছিল অস্ত্র আরটিআই (RTI)। কিন্তু লড়াই শুরু হতেই দেখা গেল, কাঁচের ঘরের ভেতরের দেয়ালগুলো আসলে নিরেট পাথরের। তথ্যের অধিকার যখন প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তার দুর্গে গিয়ে আছাড় খায়, তখন জন্ম নেয় এক অন্তহীন ধোঁয়াশা। এই বিশ্লেষণ সেই ধোঁয়াশার ভেতরেই অরুণ আগরওয়ালের একলা চলার গল্প।
১. আরটিআই (RTI) এবং সুপ্রিম কোর্টের গোপনীয়তা: অরুণ আগরওয়ালের লড়াই
অরুণ আগরওয়াল চেয়েছিলেন সামান্য এক টুকরো কাগজ—একটি কভারিং লেটার। কিন্তু সেই কাগজই হয়ে উঠল রাষ্ট্রের এক দুর্ভেদ্য গোপন সম্পদ। তাঁর এই লড়াই ভারতীয় বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতার জটিল জাল উন্মোচিত করে দেয়।
ধারা ৮(১)(ই)-এর মারণফাঁস
সুপ্রিম কোর্টের জনতথ্য আধিকারিক (CPIO) সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন এই ধারাটিকে। আইনের ভাষায় এটি ‘ফিদুশিয়ারি রিলেশনশিপ’ (Fiduciary Relationship) বা বিশ্বাসের সম্পর্ক। আদালত দাবি করে, দুই বিচারপতির মধ্যে চলা চিঠিপত্র বা পরামর্শ দাতা-গ্রহীতার এক গোপন বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে। অরুণ আগরওয়ালের যুক্তি ছিল, সাংবিধানিক পদে নিয়োগ কোনো ব্যক্তিগত লেনদেন নয়, তাই এখানে ‘বিশ্বাস’ শব্দের আড়ালে তথ্য গোপন করা অনৈতিক।
ধারা ১১(১) এবং ‘তৃতীয় পক্ষ’
এই ধারাটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় যখন কোনো তথ্য তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে। আদালত বিচারপতিদের ‘তৃতীয় পক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করে তথ্য দিতে অস্বীকার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, একজন সরকারি পদাধিকারী যখন তাঁর দাপ্তরিক কাজ করেন, তখন তিনি কি আদৌ আইনের চোখে ‘তৃতীয় পক্ষ’ হতে পারেন? আগরওয়ালের মতে, এটি তথ্যের অধিকারকে পাশ কাটানোর একটি কৌশল মাত্র।
ধারা ৮(২)-এর উপেক্ষা
আরটিআই আইনের এই বিশেষ ধারাটি বলে—যদি জনস্বার্থ তথ্যের গোপনীয়তার চেয়ে বড় হয়, তবে সেই তথ্য দিতেই হবে। অরুণ আগরওয়াল বারবার এই জনস্বার্থের কথা বললেও আদালত তাকে গুরুত্ব দেয়নি। বিচারপতির নিয়োগের স্বচ্ছতা বজায় রাখা যে গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য, সেই দাবিটি এখানে ধামাচাপা পড়ে গেছে।
স্বচ্ছতার স্ববিরোধিতা
আদালত অন্যকে জবাবদিহিতার পাঠ পড়ায়। কিন্তু নিজের প্রশাসনিক নথির বেলায় কেন এই নিশ্ছিদ্র আড়াল? অরুণ আগরওয়াল এই দ্বিচারিতাকেই জনসমক্ষে টেনে এনেছেন।
প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা
সুপ্রিম কোর্টের কেন্দ্রীয় জনতথ্য আধিকারিক (CPIO) আদতে আদালতেরই একজন বেতনভুক কর্মচারী। তাঁর প্রশাসনিক বস খোদ প্রধান বিচারপতি। প্রধান বিচারপতির দপ্তর থেকে পাঠানো কোনো স্পর্শকাতর চিঠির হদিস দেওয়া তাঁর পক্ষে এক প্রকার ‘পেশাগত আত্মহত্যা’। ফলে আরটিআই আইন এখানে স্বাধীনভাবে কাজ করার বদলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ চেইন-অফ-কমান্ডের কাছে বন্দি হয়ে পড়ে।
নিজের বিচার নিজেই
অরুণ আগরওয়াল যখন তথ্য পেলেন না, তখন তাঁকে প্রথম আপিল করতে হলো সুপ্রিম কোর্টেরই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে। এটি একটি অদ্ভুত আইনি ফাঁদ—যেখানে প্রতিপক্ষ নিজেই নিজের বিচারক। যে প্রতিষ্ঠান তথ্য লুকানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানেরই অন্য এক বিভাগ সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাবে, এটি অবাস্তব। এই ব্যবস্থায় ‘স্বার্থের সংঘাত’ বা Conflict of Interest-এর বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হয়।
অন্ধকার কোণ
নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র বা ইন-ক্যামেরা প্রসিডিংস হলো বিচারব্যবস্থার সেই অন্ধকার কোণ, যেখানে তথ্যের আলো পৌঁছাতে দেওয়া হয় না। অরুণ আগরওয়াল চেয়েছিলেন কেবল একটি ‘কভারিং লেটার’—নথির ভেতরের গোপন তথ্য নয়। অথচ সেই সামান্য অস্তিত্বটুকু প্রকাশ করতেও আদালতের এই চরম অনীহা প্রমাণ করে যে, এই কোণটি কতটা অন্ধকার। আদালত সাধারণ মানুষের জন্য স্বচ্ছতার কথা বললেও নিজের ক্ষেত্রে এই অন্ধকার বজায় রাখাকেই ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা’ বলে মনে করে।
ক্ষমতার দেয়াল
এই দেয়ালটি তৈরি হয়েছে আইনের ভুল ব্যাখ্যা আর পদের অহং দিয়ে। আরটিআই আইন তৈরি হয়েছিল সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ক্ষেত্রে তা যেন কেবল একটি ‘নির্দেশিকা’ মাত্র। অরুণ আগরওয়ালের আবেদনটি যখন উচ্চপদস্থ বিচারপতিদের স্বার্থের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন আইন নয়, বরং পদের ক্ষমতা অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। এই দেয়ালটি সাধারণ নাগরিককে মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের উচ্চবর্গের জবাবদিহি আজও সাধারণ আইনের ঊর্ধ্বে।
২. বিচারপতি আদর্শ গোয়েলের আপত্তিপত্র: এক দহনকারী সত্য
অন্ধকার কুঠুরিতে যখন কোনো নাম নিয়ে কাটাছেঁড়া চলে, তখন কিছু আপত্তি নথিবদ্ধ হয়। বিচারপতি আদর্শ গোয়েলের সেই আপত্তিপত্রটি ছিল তেমনই এক বিস্ফোরক দলিল। পর্দার আড়ালে থাকা সেই আপত্তির প্রতিটি শব্দ যেন এক-একটা চাবুক। নিয়োগের উজ্জ্বল আলোর নিচে যে কতটা অন্ধকার লুকিয়ে থাকতে পারে, আদর্শ গোয়েল আঙুল দিয়ে ঠিক সেটাই দেখিয়েছিলেন।
বিচারপতি আদর্শ গোয়েলের সেই চিঠির প্রতিটি শব্দ ছিল আসলে এক-একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। বিচারব্যবস্থার অন্দরে সচরাচর এমন ‘বিদ্রোহ’ দেখা যায় না। তিনি যখন কলম ধরেছিলেন, তখন তিনি কেবল একজন বিচারপতি ছিলেন না—তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অস্বস্তিকর বিবেক।
আপসহীন কণ্ঠ
আদর্শ গোয়েল কোনো কূটনৈতিক শব্দ ব্যবহার করেননি। সরাসরি আঘাত করেছিলেন নিয়োগের মূলে। তাঁর ভাষায় কোনো ধোঁয়াশা ছিল না, ছিল কেবল নগ্ন সত্য। তিনি জানতেন এই চিঠির পর প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তিনি একঘরে হতে পারেন, কিন্তু তিনি সত্যের সাথে আপস করতে রাজি ছিলেন না।
যোগ্যতার মাপকাঠি
গোয়েল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন সিনিয়রিটির গুরুত্ব। বিচারপতি এ. কে. মিত্তলকে ডিঙিয়ে সূর্যকান্তকে বেছে নেওয়া কেন? যোগ্যতাকে যখন কৌশলে পাশ কাটানো হয়, তখন বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গোয়েলের কাছে এটি ছিল স্রেফ একপাক্ষিক পক্ষপাতিত্ব।
নথিভুক্ত দুর্নীতি
তিনি কেবল মৌখিক অভিযোগ করেননি। তিনি নির্দিষ্ট কিছু ফাইলের কথা উল্লেখ করেছিলেন যেখানে সূর্যকান্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য লুকানো ছিল। তাঁর অভিযোগ ছিল সুনির্দিষ্ট এবং তথ্যনির্ভর। তিনি বলতে চেয়েছিলেন, যা নথিভুক্ত আছে তা অস্বীকার করার ক্ষমতা কারোর নেই।
মাদকের মামলা ও রহস্যময় জামিন
মাদকের মতো গুরুতর মামলায় সূর্যকান্তের দেওয়া জামিনগুলো ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য। গোয়েলের মতে, সেই রায়গুলো আইনের কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতি মেনে দেওয়া হয়নি। বরং সেগুলোতে ছিল এক রহস্যময় অনুকম্পা। এটি কেবল একটি ভুল নয়—বিচারপতির আসন থেকে আইনের এক বিপজ্জনক অপপ্রয়োগ।
পারিবারিক ছায়া
গোয়েল ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সূর্যকান্তের ভাইয়ের ভূমিকার দিকে। বিচারব্যবস্থার বাইরে থাকা আত্মীয়রা যখন জামিন পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যম বা ‘টাউট’ হিসেবে কাজ করেন, তখন তা বিচারালয়কে কলঙ্কিত করে। পারিবারিক সম্পর্ক যখন বিচারপ্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন গণতন্ত্র বিপন্ন হয়।
তদন্তের আর্তি
গোয়েল শুধু অভিযোগ তুলে হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। তিনি চেয়েছিলেন সত্য সামনে আসুক। তিনি দাবি করেছিলেন একটি স্বাধীন তদন্তের—যাতে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা যায়। তিনি জানতেন, তদন্ত ছাড়া এই নিয়োগ হবে বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়।
আভিজাত্য বনাম সততা
সুপ্রিম কোর্টের আভিজাত্য কেবল দামী পোশাকে নয়, বরং বিচারকদের সততায়। গোয়েলের লড়াই ছিল সেই সততা বাঁচানোর। তিনি মনে করতেন, এক ফোঁটা কালি যদি একবার পড়ে, তবে পুরো পুকুরের জল বিষাক্ত হয়ে যাবে। তাঁর কাছে প্রতিষ্ঠানের সম্মান কোনো আপসের বিষয় ছিল না।
উপেক্ষিত সতর্কতা
গোয়েলের সেই সতর্কতা বার্তার প্রতিটি লাইন গুরুত্বহীন করে দেওয়া হয়েছিল। কলেজিয়াম যেন কানে তুলো দিয়ে বসে ছিল। একটি সাংবিধানিক পদ থেকে আসা এমন গুরুতর অভিযোগকে এভাবে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া কেবল অবহেলা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
ঐতিহাসিক একাকীত্ব
সেই মুহূর্তে আদর্শ গোয়েল ছিলেন বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ। তাঁর সহকর্মীরা যখন সূর্যকান্তকে আশীর্বাদ দিচ্ছিলেন, তিনি তখন তাঁর বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন। এই একাকীত্বই তাঁকে ইতিহাসে এক বিরল এবং সাহসী চরিত্রের মর্যাদা দিয়েছে।
৩. ব্যবসায়ী সতীশ জৈনের হলফনামা: এক বিস্ফোরক জবানবন্দি
ব্যবসায়ী সতীশ জৈনের হলফনামা কোনো সাধারণ অভিযোগ ছিল না। এটি ছিল নথিবদ্ধ এক বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি। যেখানে একজন ‘ইনসাইডার’ নিজেই পর্দার পেছনের নোংরা খেলাটা ফাঁস করে দিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিটি কথা ছিল সুনির্দিষ্ট, অকাট্য এবং চরম অস্বস্তিকর।
সতীশ জৈনের হলফনামাটি ছিল আসলে বিচারব্যবস্থার অন্দরে একটি চিৎকার। এটি কোনো উড়ো চিঠি ছিল না, ছিল নথিবদ্ধ এক বিপজ্জনক স্বীকারোক্তি। একজন মানুষ যখন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি সর্বোচ্চ আদালতের একজন বিচারপতির দিকে আঙুল তোলেন, তখন সেই অভিযোগের গুরুত্ব আর পাঁচটা সাধারণ ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।
ভেতরের মানুষের জবানবন্দি
সতীশ জৈন কোনো অজ্ঞাত পরিচয় শত্রু ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিচারপতির একদম অন্দরমহলের মানুষ। ড্রয়িংরুমের সেই গোপন আলোচনাগুলো তিনি জানতেন। তাই তাঁর অভিযোগগুলো ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত এবং তথ্যবহুল। যখন ঘরের লোকই সাক্ষ্য দেয়, তখন সেই অভিযোগের অভিঘাত হয় মারাত্মক।
বেনামী সম্পত্তির গোলকধাঁধা
জৈন হিমাচল প্রদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত এক বিস্তৃত সম্পত্তির হদিস দিয়েছিলেন। নহান রোডের ফার্মহাউস থেকে শুরু করে অভিজাত আবাসন—সবই ছিল ছদ্মনামে। এই গোলকধাঁধাটি তৈরি করা হয়েছিল যাতে প্রকৃত মালিকের নাম কখনো প্রকাশ্যে না আসে। জৈন সেই জালের প্রতিটি সুতো ধরে টান দিয়েছিলেন।
নগদ টাকার পাহাড়
হলফনামায় দাবি করা হয়েছে, কোটি কোটি টাকা ব্যাগের মাধ্যমে হাতবদল হয়েছে। কোনো ব্যাংকিং ট্রেইল না রেখে নগদে লেনদেন করা ছিল এই প্রক্রিয়ার প্রধান অংশ। বিচারপতির স্ত্রীর উপস্থিতিতে এই নগদ টাকা আদান-প্রদান হওয়ার দাবিটি ছিল বিচারব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তির ওপর এক চরম কুঠারাঘাত।
অঙ্কের চাতুরি
দলিলে দেখানো হচ্ছে দেড় কোটি, অথচ আসল দাম সাড়ে তিন কোটি। এই যে দুই কোটির ব্যবধান—তা আসলে স্ট্যাম্প ডিউটি ফাঁকি দেওয়ার এক নির্লজ্জ কৌশল। ন্যায়ের রক্ষক নিজেই যখন রাষ্ট্রকে কর ফাঁকি দেওয়ার বুদ্ধি দেন বা নিজে সেই পথে হাঁটেন, তখন আইনের শাসন এক উপহাসে পরিণত হয়।
ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত
জৈন নিজেই বাড়ির সংস্কার করেছিলেন। কিন্তু ১৯ লাখের বিলের জায়গায় ৬ লাখ দিয়ে তাঁকে বিদায় করা হয়। এই ব্যক্তিগত বঞ্চনাই কি তাঁকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল? হতে পারে। কিন্তু তাঁর দেওয়া তথ্যগুলো ছিল এতটাই নিখুঁত যে, তাঁর ব্যক্তিগত রাগের চেয়ে সেই তথ্যের সত্যতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আইনজীবীর উপস্থিতিতে হলফনামা
তিনি কেবল অভিযোগ করেননি—তিনি হলফনামা দিয়েছিলেন। এর অর্থ হলো, তিনি জানতেন আদালত তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে। মিথ্যা সাক্ষ্যের দায়ে তাঁর জেল হতে পারে জেনেও তিনি নিজের বক্তব্যে অনড় ছিলেন। এটি তাঁর অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
প্রভাবশালী বিক্রেতাদের যোগসূত্র
জয়পুরের রাজপরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে এই কেনাবেচার সম্পর্ক ছিল। জৈন প্রতিটি নাম এবং স্থান উল্লেখ করেছিলেন। এই হাই-প্রোফাইল যোগসূত্রগুলোই প্রমাণ করে যে, এই লেনদেনগুলো কোনো সাধারণ মানুষের বিষয় ছিল না—ছিল ক্ষমতার অলিন্দে চলা এক অভিজাত বাণিজ্য।
নথিভুক্ত প্রমাণের পাহাড়
চেক নম্বর, ব্যাংকের শাখা, নির্দিষ্ট তারিখ—জৈন সব দিয়ে দিয়েছিলেন। এটি কোনো বিমূর্ত কথা ছিল না। ব্যাংকিং রেকর্ড চাইলেই তাঁর দাবির সত্যতা মিলত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অকাট্য প্রমাণগুলো থাকা সত্ত্বেও কোনো বড়সড় তদন্তের পথে হাঁটেনি প্রশাসন।
ভয়হীন প্রতিবাদ
একজন ক্ষমতাশালী বিচারপতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা মানে হলো নিজের ক্যারিয়ার এবং জীবনের ওপর ঝুঁকি নেওয়া। সতীশ জৈন সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিবাদ ছিল এক চরম সাহসের পরিচয়। তিনি হয়তো জানতেন, সিস্টেম তাঁকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তবুও তিনি সত্যটুকু নথিবদ্ধ করে যেতে চেয়েছিলেন।
৪. নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা: একটি রহস্যময় কালপঞ্জি
বিচারপতি সূর্যকান্তের নিয়োগের সেই সন্ধিক্ষণটি ছিল এক রহস্যময় কুয়াশায় ঢাকা। আদর্শ গোয়েলের আপত্তিপত্র আর সতীশ জৈনের হলফনামা যখন ফাইলে বন্দি, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে বদলে গেল সব সমীকরণ। এই অধ্যায়টি আসলে নিয়ম মানার নয়, বরং নিয়মকে সুকৌশলে পাশ কাটানোর এক ধ্রুপদী উদাহরণ।
১০ মাসের স্তব্ধতা
২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর—এই দীর্ঘ সময় ফাইলটি কেন ধুলো জমিয়েছিল? এটি কেবল আমলাতান্ত্রিক দেরি ছিল না। আদর্শ গোয়েলের করা গুরুতর অভিযোগগুলো তখন হিমাচল প্রদেশের আকাশে মেঘের মতো জমে ছিল। মনে হয়, প্রশাসন অপেক্ষা করছিল এক অনুকূল সময়ের, যখন প্রতিবাদের শব্দগুলো ক্ষীণ হয়ে আসবে। এই স্তব্ধতা আসলে ঝড়ের আগের সেই নিস্তব্ধতা।
মুহূর্তের নাটকীয়তা
৩রা অক্টোবর, ২০১৮। দিনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রঞ্জন গগৈ ভারতের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন এবং ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই সূর্যকান্তের নিয়োগের সবুজ সংকেত মিলল। এই টাইমিং কোনো কাকতালীয় ব্যাপার হতে পারে না। এটি ছিল অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিকল্পিত একটি পদক্ষেপ, যাতে নতুন প্রশাসনের সূচনালগ্নেই পুরনো বিতর্কগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া যায়।
বন্ধ দরজার আলোচনা
কলেজিয়ামের সেই গোপন আলোচনার কার্যবিবরণী আজও কুয়াশাচ্ছন্ন। আদর্শ গোয়েলের চিঠিতে যে আগ্নেয়গিরি ছিল, তাকে কীভাবে এক নিমেষে জল ঢেলে নেভানো হলো? বন্ধ দরজার ওপাশে কোনো যুক্তি কাজ করেছিল, নাকি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটে সত্যকে পিষে দেওয়া হয়েছিল? এই রহস্য আজও বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে বিদ্ধ করে।
বন্ধুর হাত
তৎকালীন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের সাথে সূর্যকান্তের ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়ন নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সখ্য যখন সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে ‘বন্ধুত্ব’ নয়, বরং ‘স্বজনপ্রীতি’ বলা ভালো। এই বিশেষ আনুকূল্যই কি সূর্যকান্তের পথকে নিষ্কণ্টক করেছিল?
আইবি রিপোর্টের রহস্য
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে কি আদর্শ গোয়েলের অভিযোগগুলোর কোনো সারবত্তা ছিল না? সাধারণত আইবির একটি নেতিবাচক রিপোর্ট যেকোনো বড় নিয়োগ ভেস্তে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই রিপোর্ট কি প্রভাব খাটিয়ে বদলে দেওয়া হয়েছিল? নাকি আইবির চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল সতীশ জৈনের মতো চাক্ষুষ প্রমাণের পাহাড়?
দ্রুত উত্তরণ
হিমাচল প্রদেশের প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর তাঁর সুপ্রিম কোর্টে আসার গতি ছিল বিস্ময়কর। সিনিয়রিটির লম্বা তালিকা থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে এত দ্রুত সর্বোচ্চ আদালতে টেনে আনা হলো? এই দ্রুত উত্তরণ প্রমাণ করে যে, একটি বিশেষ মহলের কাছে তাঁর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম এবং তারা তাঁকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বসাতে মরিয়া ছিল।
উপেক্ষিত ভেরিফিকেশন
আদর্শ গোয়েল নিজেই চেয়েছিলেন অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত বা ভেরিফিকেশন হোক। কিন্তু সেই দাবিকে স্রেফ উপেক্ষা করা হয়েছে। ভেরিফিকেশন না হওয়ার অর্থ হলো—অভিযোগগুলোকে ভয় পাওয়া। সত্যকে যাচাই না করেই ক্লিনচিট দেওয়া আসলে দুর্নীতির প্রতি এক প্রাতিষ্ঠানিক প্রচ্ছন্ন সমর্থন।
সরকারের নীরব ভূমিকা
সরকার সাধারণত বিচারপতির নিয়োগে খুঁত খুঁজে বের করতে পারদর্শী। কিন্তু সূর্যকান্তের ক্ষেত্রে তাদের এই দীর্ঘ নীরবতা আর শেষ মুহূর্তের সক্রিয়তা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। সরকার আর বিচারব্যবস্থার শীর্ষবিন্দুর মধ্যে কি কোনো গোপন ‘কুইড প্রো কো’ (Quid pro quo) বা পারস্পরিক সমঝোতা হয়েছিল?
প্রতিষ্ঠান বনাম ব্যক্তি
শেষ বিচারে এই যুদ্ধে হেরে গেল সুপ্রিম কোর্টের মতো এক মহান প্রতিষ্ঠান। জয়ী হলেন একজন ব্যক্তি, যাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আজও মেঘের মতো ঝুলে আছে। নিয়ম-নীতি যখন ব্যক্তির স্বার্থে বিসর্জন দেওয়া হয়, তখন সেই ক্ষত শুকাতে কয়েক দশক সময় লাগে। সূর্যকান্তের নিয়োগ সেই গভীর ক্ষতেরই এক জলজ্যান্ত চিহ্ন।
৫. বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা: খাদের কিনারে গণতন্ত্র
অতীতের ধোঁয়াশা যখন বর্তমানের রায়ে ছায়া ফেলে, তখন বিপন্ন হয় ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়টুকু। বিচারপতি সূর্যকান্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিতর্ক কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং ভারতীয় বিচারব্যবস্থার নৈতিক কাঠামোর এক চরম সংকটের প্রতিচ্ছবি।
বিবেকের সংকট
যাঁর নিজের নিয়োগের ভিত্তিই অস্বচ্ছতা আর দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ, তাঁর হাতে যখন দেশ বা দশের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব থাকে, তখন তাকে ‘ন্যায়বিচার’ বলা কঠিন। বিবেকের এই সংকট কেবল বিচারপতির নয়, বরং গোটা সিস্টেমের। মানুষ যখন বিচারালয়ে যায়, তখন তারা শুধু আইন নয়, বরং নৈতিকতার আশ্রয় খোঁজে। যখন সেই আসনের পবিত্রতাই ক্ষুণ্ণ হয়, তখন প্রতিটি রায় সন্দেহের তালিকায় চলে আসে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষত
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বা সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে যখন মামলাগুলো তাঁর এজলাসে আসে, তখন আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হয়। ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে তিনি কি পারলেন রাজ্যের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করতে? না পারেননি। পারতে চাননি হয়তো। ৯১ লক্ষ লোকের নাম বাদ রেখে ভোটকে এলাও করা বা ম্যাপড ২৭ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার ক্ষুণ্য করে ভোটটি যে হতে চলেছে, সেই লড়াইটা কি কেবল আইনি লড়াই ছিল? বরং বাংলার মানুষের ভোটাধিকারের নিরাপত্তার প্রশ্ন ছিল।
পাপেট জুডিশিয়ারি
অরুণ আগরওয়ালের তোলা প্রশ্নগুলো আসলে এক গভীর অসুখের সংকেত। বিচারব্যবস্থা কি তবে স্বাধীন? নাকি তা সরকারের একটি অদৃশ্য হাত বা ‘পাপেট’ হিসেবে কাজ করছে? যখন শীর্ষ আদালতের সিদ্ধান্তগুলো বারবার একপাক্ষিক বলে মনে হয়, তখন ‘স্বাধীন বিচারব্যবস্থা’ কথাটি স্রেফ কৌতুক মনে হয়। প্রতিষ্ঠান যখন ব্যক্তিত্ব হারায়, তখন তা কেবল আজ্ঞাবহ দপ্তরে পরিণত হয়।
Quid pro quo-র আতঙ্ক
অতীতের সেই নিয়োগের সময় সরকারের রহস্যময় নীরবতা কি আজকের কোনো বিশেষ রায়ের অগ্রিম কিস্তি? এই পারস্পরিক সুবিধাদানের আতঙ্ক সাধারণ মানুষকে কুরে কুরে খায়। যদি বিচারকের রায় কোনো পুরনো ঋণের প্রতিদান হিসেবে আসে, তবে সেই বিচার আসলে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ। এই সন্দেহ গণতন্ত্রের শিকড় আলগা করে দেয়।
জনগণের আস্থা
সুপ্রিম কোর্টের মূল শক্তি তার দালান বা ক্ষমতা নয়, বরং সাধারণ মানুষের অগাধ বিশ্বাস। কিন্তু সূর্যকান্তের এই পুরো ইতিহাস সেই বিশ্বাসের আয়নায় এক বিশাল ফাটল ধরিয়েছে। মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে যে আদালত আর নিরপেক্ষ নয়, তখন তারা আইনের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। আস্থাহীন বিচারব্যবস্থা একটি দেশের অরাজকতার প্রথম ধাপ।
মৌনতার মূল্য
প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা অন্যান্য বিচারপতিরা যখন এই বিষয় নিয়ে নিশ্চুপ থাকেন, তখন সেই নীরবতা কি সম্মতির লক্ষণ নয়? সত্য জানার পরেও যখন বিচারবিভাগের শীর্ষবিন্দুরা চুপ করে থাকেন, তখন সেই মৌনতার মূল্য চুকাতে হয় সাধারণ মানুষকে। এই ‘ভাই-ভাই’ সংস্কৃতি বিচারব্যবস্থাকে শোধরানোর বদলে আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে।
ভবিষ্যতের অন্ধকার
যদি প্রশ্নাতীত নিয়োগ আর অস্বচ্ছ পদোন্নতিই নতুন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সততার পাঠ কোথায় পাবে? মেধাবী এবং সৎ আইনজীবীরা কি তবে বিচারপতির আসনে আসার স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেবেন? সূর্যকান্তের এই দৃষ্টান্তটি বিচারব্যবস্থায় এক বিষাক্ত উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েক প্রজন্মকে ভোগাবে।
বিশ্বগুরুর পরিহাস
আমরা যখন বিশ্বমঞ্চে ‘গণতন্ত্রের জননী’ বা ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার দাবি করি, তখন আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের এই দশা আসলে এক চরম পরিহাস। বাইরে থেকে আধুনিকতার চটক থাকলেও ভেতরের ঘুণ ধরা নিয়োগ প্রক্রিয়া আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করে। এই বৈপরীত্য আমাদের জাতীয় গৌরবের ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন।
আম্বেদকরের কান্না
ড. বি.আর. আম্বেদকর যখন সংবিধান লিখেছিলেন, তখন তিনি চেয়েছিলেন বিচারব্যবস্থা হবে শোষিতের শেষ আশ্রয়। কিন্তু আজ যখন সেই আশ্রয়ই প্রশ্নের মুখে, তখন তা বাবাসাহেবের সেই স্বপ্নকে অপদস্থ করার সামিল। রক্ষকই যখন নিয়ম ভাঙার দায়ে অভিযুক্ত, তখন সেই সংবিধান কি কেবল মৃত কিছু অক্ষরের সমষ্টি? এটি আসলে আমাদের সাংবিধানিক নৈতিকতার এক নীরব বিলাপ।
শেষ কথা,
ন্যায়বিচারের দাড়িপাল্লাটা কি তবে আজ ক্ষমতার ভারে নুয়ে পড়েছে? অরুণ আগরওয়ালের সেই নাছোড়বান্দা আরটিআই আবেদনটি কেবল তথ্যের সন্ধান ছিল না—তা ছিল আসলে এক মৃতপ্রায় ব্যবস্থার নাড়ি টিপে দেখার সাহস। আমরা যখন সুপ্রিম কোর্টের গম্বুজের দিকে তাকাই, তখন সেখানে শুধু আইন দেখি না, দেখি শেষ ভরসার এক আকাশ। কিন্তু বিচারপতি সূর্যকান্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ধোঁয়াশা সেই আকাশে এক বিশাল কালো মেঘের মতো জমে আছে।
প্রশ্নটা কেবল একজন ব্যক্তির নয়—প্রশ্নটা সেই কাঠামোর, যা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে প্রশ্নকর্তাকে আড়াল করতেই বেশি আগ্রহী। আদর্শ গোয়েলের সতর্কতা আর সতীশ জৈনের হলফনামা কি তবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই রয়ে যাবে? যদি রক্ষকই রহস্যের চাদরে নিজেকে ঢেকে রাখেন, তবে সাধারণ মানুষ ন্যায়ের আলো খুঁজবে কোথায়?
হয়তো একদিন সব নথি সামনে আসবে, হয়তো আসবে না। কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়ায় এই অধ্যায়টি চিরকাল এক অস্বস্তিকর স্তব্ধতা হয়ে রয়ে যাবে। দিনের শেষে গণতন্ত্রের জয়গান গাওয়া সহজ, কিন্তু সেই গণতন্ত্রের শিকড়ে যখন ঘুণ ধরে, তখন নীরব থাকাটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। আম্বেদকরের সংবিধান আজও কাঁদছে, কারণ তার রক্ষকরাই আজ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে এক অলিখিত ‘রাজতন্ত্র’ কায়েম করেছেন। এই লড়াই কেবল তথ্যের জন্য নয়—এই লড়াই আসলে আমাদের বিচারব্যবস্থার হারানো মেরুদণ্ড ফিরে পাওয়ার। রাস্তার লড়াই ছাড়া আর তা পাওয়া সম্ভব নয়, কোনওভাবেই নয়। তাই সুজাপুরের বা মোথাবাড়ির আন্দোলন অবশ্যই একটা পথ দেখায়, যদিও সব রাজনৈতিক দলই প্রায় এই বিষয় নিয়ে নিশ্চুপ যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার পক্ষে যেন এক সহমত পোষণ। তাই আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে অন্ধকারের অলিন্দে ন্যায়বিচার এখনও বহুদিন খুঁজতে হবে।