পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

টিপের আমি, টিপের তুমি --- তাই দিয়ে যায় চেনা!

  • 30 October, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 736 view(s)
  • লিখেছেন : সংবিদা লাহিড়ী
সম্প্রতি কপালের টিপ নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক। ফ্যাব ইন্ডিয়ার একটি বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে। কিন্তু কেন? এর মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে সংখ্যালঘু মানুষের অস্তিত্বকে অবৈধ ঘোষণা করার ইঙ্গিত। রয়েছে মহিলা শরীরকে ধর্মের নামে ঢেলে সাজানোর ছক। একই সঙ্গে প্রশ্ন, বিতর্কিত অ্যাড কন্টেন্টের জন্ম কোথাও এই বিতর্কগুলিকে উস্কে দেওয়ার জন্যই তৈরি হচ্ছে না তো! ফ্যাব ইন্ডিয়া বিতর্কে সমস্যার খোঁজ করলেন সংবিদা লাহিড়ী

খাস দক্ষিণ কলকাতার বেশ কিছু এলাকায় ঘর ভাড়া নিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলে ‘টিপ’ মাহাত্ম্য হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাবে। এমনকি যাদবপুর এলাকাও তার বাইরে নয়। ঘর ভাড়ার জন্য একটি মহিলা এবং একটি পুরুষ একসঙ্গে গেলে দালাল এবং বাড়িওয়ালা প্রথমেই জিজ্ঞেস করবেন ‘বিবাহিত আপনারা?’ যদি তাঁরা বলেন, হ্যাঁ। তবে মহিলার দিকে তাকিয়ে একটি অবধারিত পাল্টা প্রশ্ন আসবে, ‘না মাথায় কিছু দেখছি না, তাই জিজ্ঞেস করলাম।’

গত কয়েকদিন আগে টুইটার হ্যান্ডেল-সহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে মহিলাদের কপালের টিপ সংক্রান্ত একটি বিতর্ক উঠে পড়েছে। অবশ্য মহিলাদের কপালে টিপ থাকা বা না-থাকা দিয়ে ‘সংখ্যালঘু’ চিহ্নিতকরণ এই প্রথম নয়। ভারত-বাংলাদেশের মতো দেশগুলিতে যেখানে উপনিবেশিক ক্ষমতার হাত ধরে জাতীয়তার ধারণা তৈরি হয়েছে, সেখানেই রাজনৈতিক সংখ্যাগুরুকে বাকিদের থেকে আলাদা করে নেওয়ার বা যারা রাজনৈতিক সংখ্যাগুরুর মতাদর্শের অনুগামী নন, হতে পারেননি, বুঝতে পারেননি, তাঁদের নানা উপায়ে ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার নানা পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে।

এই নিয়ে লেখার পরিসরে এত কথার অবতারণা করার মূল কারণটি হল, কয়েকদিন আগে, ফ্যাব ইন্ডিয়া নামক একটি বস্ত্র বিপণির দেওয়ালির বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত বিতর্কের কেন্দ্রে এসে পড়ে এই বিজ্ঞাপনে উপস্থিত মহিলাদের মাথায় টিপ না থাকায় তাঁরা হিন্দু রেওয়াজকে যথাযথ সম্মান দিচ্ছেন না। উল্টে হিন্দুদের উৎসবের মূল বিশ্বাসকে লঘু করার চেষ্টা করছেন। ওই বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল লাল শাড়িতে মোড়া চার সুন্দরীর পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সুদর্শন যুবক। ছবি অনুযায়ী কোনও এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বৈঠকখানার আমেজে এই তরুণ-সহ সুন্দরীদের ছবি দেখিয়ে উর্দু ঘেঁষা হিন্দিতে লেখা হয়েছিল, জসন-ই-রিওয়াজ

এই বিজ্ঞাপনটি ভারতের বিভিন্ন মেট্রোপলিসের রাজপথের মোড়ে মোড়ে উপযুক্ত আলো দিয়ে টাঙানো হয়েছিল। বিজ্ঞপনের নান্দনিকতায় কম-বেশি সকলেরই ভালো লেগেছিল। কিন্তু গোল বাধল অন্যত্র। তেজস্বী সুরিয়া, এক বিজেপি সাংসদের টুইটার পোস্টে জসন- ই-রিওয়াজ- কে বলা হল, হিন্দু উৎসব দেওয়ালিকে অ-ব্রাহ্মণীকরণ করা হচ্ছে। ওই সাংসদের এই মন্তব্যের পাশাপাশি টুইটারে বিজ্ঞাপন উপস্থিত সুন্দরীদের কপালে টিপ নেই কেন, তাহলে তাঁরা হিন্দু নন – এ জাতীয় প্রশ্নও উঠে পড়ে।

আপামর হিন্দু সমাজে কপালে লাল সিঁদুরের টিপ সধবাদের একটি বিশেষ চিহ্ন। হিন্দু ধর্মের বহু গোষ্ঠীতে সিঁদুরের সঙ্গে কপালে লাল টিপ পরার চল সাজের একটি বিশেষ অঙ্গ। অবিবাহিত হিন্দু মেয়েরা সিঁথিতে সিঁদুর না পরলেও লাল বাদে অন্যান্য নানা রঙের টিপ পরে থাকেন। আবার হিন্দু বাড়ির বিধবাদের কপালে কোনও রঙের টিপ ওঠে না। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষিত কর্মরত বহু হিন্দু মহিলা বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও কপালে টিপ বা মাথায় সিঁদুর পরেন না। অনেকেরই সিঁদুর পরার ইতিহাস অনুধাবন করার পর সিঁদুর ব্যবহারে ইচ্ছে কমেছে। আবার অনেক হিন্দু বাড়ির কন্যারা ধর্ম- বর্ণ-জাত নির্বিশেষে বিশেষ বিবাহ নিবন্ধনী আইনে বিয়ে করায় সিঁদুর পরা বিষয়ে সতর্ক। না পরার কারণে বিশ্বাসী। এই সংখ্যাটি সামান্য। হাতে গোনা, মূলত শহর-মফস্বলে সীমাবদ্ধ।

এখন, বিজেপি সাংসদের টুইট, এবং সেই নিয়ে সরকারি পদক্ষেপের নানা ওঠা-পড়ায় ফ্যাব-ইন্ডিয়া এই বিজ্ঞাপনটি বাতিল করতে বাধ্য হল। যদিও হাল-আমলের শাসনে বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক ফ্যাব ইন্ডিয়ার আগে দেখা গিয়েছে। তানিশক নামের একটি হিরের গয়না প্রস্তুতকারী কোম্পানি সম্প্রীতির দিকে ইঙ্গিত করে বিজ্ঞাপন করায় তাঁদের বিজ্ঞাপন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। দিন চারেক আগে, ডাবর কোম্পানির ফ্যাশন ব্র্যান্ড ফেম কারোয়া চৌথ ব্রত পালনের রেওয়াজ অবলম্বন করে একটি বিজ্ঞাপন বানিয়েছে, যেখানে সমকামী প্রেমে কারোয়া চৌথ উদযাপন দেখানো হয়েছে। সেই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

দেখা যাচ্ছে বড় বড় কোম্পানির বিজ্ঞাপনে তথাকথিত নিও-লিবারেল রাজনৈতিক মননকে ধরতে চেয়ে যে ধরনের অ্যাড কন্টেন্ট বানানো হচ্ছে, তা নিয়ে আপত্তি উঠছে এবং কন্টেন্টগুলি প্রায় বাতিল করার দিকে এগোচ্ছে। তার ফলে, ফ্যাশন দুনিয়ার একাংশ বিজ্ঞাপনের ওপর অযথা নজরদারির অভিযোগ তুলছেন। অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে সংখ্যালঘুকে নির্মাণ করার নতুন তরিকা। এই নিয়ে মোটের ওপর সংক্ষিপ্ত পরিসরে দুটি বিষয় ভাবা দরকার।

একঃ ভারতে এই মুহুর্তে ‘সংখ্যালঘু’ নির্মাণ করার প্রক্রিয়াটিতে সব থেকে বেশি তাগিদ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু নির্মাণের দিকেই এখন সবচেয়ে বেশি নজর। তার পাশাপাশি চলছে রাজনৈতিক বিশ্বাস, মতাদর্শের পার্থক্যে বা জাত-পাতের চুলচেরা ভেদ-বিভেদ তৈরি করে আঞ্চলিক থেকে জাতীয় স্তর পর্যন্ত নানা প্রকারে মানুষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা, ভীতি নির্মাণের চেষ্টা। বিজ্ঞাপনের ছবি ও তার তলার ক্যাপশন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে হিন্দু মহিলার সিঁদুর বা কপালের টিপ ব্যবহারের প্রসঙ্গটি আরও গাঢ় ভাবে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা। সংখ্যার বিচারে পোশাকের প্রশ্নে উদার মহিলাদের লঘিষ্ঠের দলে ফেলে দিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামিকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা।

এখন, রাষ্ট্র মাত্রই সে তার বিষয়ীকে একভাবে আইনের পাঠ দেবে, তাতে সন্দেহ নেই। আইন প্রণয়নের মধ্যে দিয়েই বিষয়ীকে নিজ ক্ষমতার উপযুক্ত মানদণ্ডে বেঁধে নেওয়ার চেষ্টাও চালাবে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও এর ব্যত্যয় ঘটবে না, এও জানা কথা। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি দেশে ‘লোকতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার দাবিতে, আইন পাঠ দেওয়ার নাম করে নিজের বিষয়ীদের মূলত ভয় দেখায়, প্রতিবাদের গলা টিপে মারতে চায় অথবা সংখ্যালঘুর নিত্য নতুন মাপকাঠি নির্মাণ করে তার প্রতর্কে কখনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু, কখনও মহিলা কখনও সমকামিকে অবদমন করাই একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে যায়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য আর আদৌ গণতান্ত্রিক থাকে কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে পড়ে। মহিলাদের পোশাক সাজগোজ নিয়ে অলিখিত মানদণ্ড তৈরি করার চেষ্টা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থারই এক অসহ পরিণতি।

দুইঃ বিজ্ঞাপন দুনিয়ায় বহু দিনের অভ্যাস নারী শরীর ব্যবহার করার মধ্যে দিয়ে প্রোডাক্ট জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা। কিন্তু নিও-লিবারেল শহুরে নাগরিকের মন কাড়তে বিজ্ঞাপনের দুনিয়া নিও-লিবারেল এথিকসকে ব্যবহার করতেও পিছপা নয়। তাতে নজর-কাড়া সীমা লঙ্ঘনকারী অ্যাড কন্টেন্ট বানিয়ে বিতর্ক উস্কে দিচ্ছে ঠিকই। কিন্তু তার পরিণতি নিয়ে বিজ্ঞাপন দুনিয়া অবগত নয়, এ হেন সরল বিশ্বাস নিশ্চয় আমাদের নেই। কারণ, আমরা জানি বিতর্ক অনেক সময়ই বিক্রি বাড়ায়। কারণ কৌতূহল বিক্রি বাড়াতে সাহায্য করে।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এই বিতর্কিত অ্যাড কন্টেটগুলি বিতর্ক সৃষ্টি করার মধ্যে দিয়ে পুনরায় নারী শরীর, সেই শরীরের চিহ্নিতকরণ, সমকামী প্রেম বা দুই ধর্মের সম্প্রীতির বিষয় নিয়ে এমন কন্টেন্ট তৈরি করছে, তাতে মানুষের মনের মধ্যে এই বিষয়গুলি নিয়ে কোনও উদার ধারণা তৈরি হচ্ছে না। উল্টে, নিষ্পেষণের প্রক্রিয়ায় কন্টেন্টগুলির পিছু হঠার উদাহরণ তৈরি হওয়ায় এই বিষয় সম্পর্কে আপামর মন আরও সঙ্কুচিত হচ্ছে। উদারতার প্রতি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পথ দেখাচ্ছে।

ফ্যাব ইন্ডিয়া বা তার বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গে টিপ কোনও তেমন বড় বিষয় নয়। একুশ শতাব্দীর মিডিয়া সম্প্রসারণের যুগে এসব খবরের ভিড়ে অচিরেই তলিয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামির রেশ সহজে মুছবে না। গোঁড়ামির বাইরে বাঁচতে চাওয়া, যুক্তিবাদী হতে চাওয়া তরুণ প্রজন্মকে আরও অনেক বেশি অকারণ সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে, এই যা।

0 Comments

Post Comment