পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অন্য পুজোতে আপনাকে চাই

  • 11 October, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 1038 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
‘যাঁরা মহরম এবং পুজো একসঙ্গে সংগঠিত করতে পারেন, তাঁদেরকে কি পরাজিত করা যায়?’ এই কথাগুলোই বলেছিলেন দু বছর আগে দুর্গাপ্রতিমার মুর্তির সামনে তাজিয়া তৈরী করতে করতে, সালাউদ্দিন। ঝকঝকে যুবক, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করেন, বলছিলেন, ‘এই বছর খুব খারাপ অবস্থা, যৌনকর্মীদের রোজগার প্রায় নেই, তাই আপনাদের সাহায্য ছাড়া পুজোর খরচ তোলা মুশকিল’। সেই খিদিরপুরের ফাইভ স্টার ক্লাবের পুজো নিয়ে লিখলেন সুমন সেনগুপ্ত।

পুজো আসছে, সারা বাংলায়, সমস্ত মানুষের কাছে এই উৎসব যেন আবার নতুন কোনও বার্তা নিয়ে আসছে। সারা কলকাতায় সাজো সাজো রব। এই করোনা আবহাওয়াতেও রাস্তা ঘাটে মানুষের ভীড় চোখে পড়ছে। নীল সাদা প্রলেপ পড়ছে, ফুটপাথ থেকে উড়ালপুল, সর্বত্র। অনেক মানুষ অনেক অসুবিধার মধ্যেও এই উৎসবে মেতে উঠবেন, ভুলে যেতে চাইবেন, কাজ হারানোর যন্ত্রণা। এখনো লোকাল ট্রেন চালু হয়নি, পুরোদমে। যে ট্রেন চলছে, তাতে যথেষ্ট ভীড় হচ্ছে। গড়িয়াহাট থেকে হাতিবাগানের ভীড় দেখে মনে হচ্ছে, করোনা বলে কোনও অসুখ কোনওদিনই ছিল না। উদ্দীপনা দেখে বোঝার যো নেই যে কত মানুষ তাঁদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন। বাঙালীর অন্যতম উৎসবের জন্য সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কিন্তু এই উৎসবে, কি সমস্ত ধর্মের বা সমস্ত ভাষাভাষীর মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারে? মানে আমরা কি অন্য ধর্মের বা অন্য ভাষার মানুষদের আপন করে নিতে পারি? আমরা কি খবর রাখি, এই কলকাতার মধ্যে এমন অনেক পুজো আছে, যা মুসলমান মানুষদের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে? আমরা কি তাঁদের যথেষ্ট ‘বাঙালী’ মনে করি? আমরা কি আপন করে নিতে পারি সেই মানুষদের, যাঁরা ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে পারেন, অনেক নিয়ম কানুন, রীতি নীতি না মেনেই এমনকি ভিন ধর্মের হয়েও বাঙালীর এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতে চান? আমরা কি হেঁটে দেখতে চাই, সে কলকাতাকে, যে কলকাতার বাস আমাদের পরিচিত কলকাতার মধ্যেই? আমরা কি জানতে চাই বা চিনতে চাই সেই মানুষদের?

আমাদের শহরের একটা জায়গার নাম খিদিরপুর। যে অঞ্চলের কথা কলকাতার নামী দামী পরিচালক থেকে শুরু করে অনেকেই নানান ভাবে তাঁদের ছবিতে এনেছেন। দেখানোর চেষ্টা করেছেন এই অঞ্চলটি অপরাধপ্রবণ, এই অঞ্চলটিতে মূলত মুসলমান মানুষজন থাকেন, এই অঞ্চলটি মূলত দুষ্কৃতিদের অঞ্চল। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, এই অঞ্চলের একটি পুজোর কথা। যে পুজোর চাঁদা তোলা থেকে পুজোর আচার আচরণ নীতিনিষ্ঠ ভাবে পালন করে থাকেন মূলত মুসলমান মানুষজন। অঞ্চলটি একটি যৌন পল্লী, লকডাউনে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে পেশার মানুষজন তাদের মধ্যে এই মহিলারা পড়েন। অন্যন্যবার এই মহিলারাই পুজোর খরচের একটা বড় অংশ দিতেন, কিন্তু গত দু বছর ধরে আর পারছেন না, অনেকেই বাধ্য হয়েছেন বাড়ি ফিরে যেতে। বন্দর এলাকায় জাহাজ আসা যাওয়া কমে যাওয়াতে, মানুষের আসা যাওয়াও কমেছে, ফলে খদ্দেরও কম। তার ওপরে করোনার আতঙ্ক। সব মিলিয়ে খুব খারাপ অবস্থা। এই কথাগুলোই বলছিলেন শ্যামলী ( নাম পরিবর্তিত) যে পুজোতে একটা সময়ে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য, সেই পুজোতে আর তাঁরা সেভাবে থাকতে পারেন না। তাঁদের বাড়ির বাচ্চাদের নতুন জামা বা নিজেদের জন্য একটা নতুন শাড়ি কেনারও ক্ষমতা নেই আজ। বাচ্চাগুলো তাই ছুটে আসে, যখনই খবর পায়, কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাদের জন্য বা তাদের মায়েদের জন্য শাড়ি নিয়ে এসেছে।

বিকাশ সিংহ, বলবন্ত সিং, মহম্মদ লতিফ, মহম্মদ সালাউদ্দিনরা বেশ কয়েকবছর ধরেই এই খিদিরপুর, ফাইভ স্টার ক্লাবের পুজোর সঙ্গে যুক্ত আছেন। শেখ জাহাঙ্গীর যিনি পুজোর আগে, নবরাত্রি পালন করতেন, গত দু বছর ধরে আর নেই। মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়েই বাকিরা এখনো এই পুজোকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। যে বছর, আমরা কয়েকজন বন্ধুরা মিলে এই পুজোর খবর পাই, সে বছর মহরম এবং বিসর্জনের দিন প্রায় কাছাকাছি ছিল। প্রশাসন থেকে সাম্প্রদায়িক অশান্তি এড়াতে বিসর্জনের দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রচুর বিরূপ প্রচার করা হয়েছিল, এবং তার রেশ এখনো চলে। হোয়াটসঅ্যাপে এখনো নানান প্ররোচনা ও উস্কানিমূলক মেসেজ পাঠানো হয়, সংগঠিত ভাবে যে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নাকি মুসলমানদের একটি পরবের জন্য, হিন্দুদের দুর্গা ঠাকুরের বিসর্জন স্থগিত করে দিয়েছেন। অথচ, এই ফাইভ স্টার ক্লাবের সামনের অভিজ্ঞতা কিন্তু সম্পুর্ণ অন্যরকম। মহরমের দিন, তখনো ক্লাবের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়নি, মণ্ডপের সামনেই মহরমের তাজিয়া বাঁধা চলছিল, যৌন পল্লীর শিশু থেকে আশেপাশের অঞ্চলের ছেলেছোকরারাও জুটে গিয়েছিল সেই তাজিয়া সাজাতে। তখনও শেখ জাহাঙ্গীর বেঁচে ছিলেন, তিনিই বলছিলেন, দুর্গাপুজোয় যে চাঁদা উঠেছে, বিভিন্ন মানুষজন যে টাকা দিয়েছেন, তা থেকে টাকা বাঁচিয়ে, মহরমের দিন নিরামিষ খিচুরী আর সরবতের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যে কেউ এসে খেতে পারেন। তাজিয়া নিয়ে মিছিলে যেমন সালাউদ্দিন এবং মহম্মদ লতিফেরা থাকবেন, তেমনি বলবন্ত সিং এবং বিকাশরাও থাকবেন। সেদিনই জেনেছিলাম, এই সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে কোনো বিভেদকামী শক্তি হারাতে পারবে না। ‘যাঁরা মহরম এবং পুজো একসঙ্গে সংগঠিত করতে পারেন, তাঁদেরকে কি পরাজিত করা যায়?’ এই কথাগুলোই বলেছিলেন দু বছর আগে দুর্গাপ্রতিমার মুর্তির সামনে তাজিয়া তৈরী করতে করতে, সালাউদ্দিন। ঝকঝকে যুবক, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় যৌনকর্মীদের নিয়ে কাজ করেন, বলছিলেন, ‘এই বছর খুব খারাপ অবস্থা, যৌনকর্মীদের রোজগার প্রায় নেই, তাই আপনাদের সাহায্য ছাড়া পুজোর খরচ তোলা মুশকিল’।

প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই মুহুর্তে দেশের বা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিরকম? যা উত্তর পাওয়া গেল, তা চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমরা যাঁরা নিজেদের অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন মনে করি, আমরা যাঁরা মনে করি, আমরা সমস্ত কিছু বুঝি, তাঁদের জন্যেই যেন, মহম্মদ লতিফ আর বলবন্ত সিং রা তৈরী করেছেন তাঁদের উত্তর। উল্টে, প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, ভবানীপুরের একটি ওয়ার্ড তো খিদিরপুরের একটি অংশও, তাহলে যে বিভিন্ন চ্যানেল এবং স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও জেতার পরে বললেন, ‘ভবানীপুরে, বাঙালীরা থাকেন, অবাঙালীরা থাকেন এমনকি মুসলমানেরা থাকেন, তাহলে কি মুসলমানেরা বাঙালী নয়?’। শুধু তাই নয়, আরও যোগ করলেন, ‘সংখ্যাগুরু মানুষের এই স্বেচ্ছাবৃত্ত অজ্ঞতাই আসলে হিন্দু মুসলমান বিরোধ সৃষ্টি করে। মুসলমানদের অপর বানানোর প্রক্রিয়া আসলে অনেক ছোট বয়স থেকে শেখানো হয়। এই মানসিকতা একদিনে তৈরি হয়না, খুব সচেতনভাবে আজকের ভারতবর্ষে ছোট ছোট শিশুদের মনে প্রবেশ করানো হচ্ছে, এবং তা শুধুমাত্র আরএসএস পরিচালিত ‘ একল বিদ্যালয়’ দিয়ে নয়, ছড়ানো হচ্ছে এনসিইআরটির ছোটদের বইএর মধ্যে দিয়েই। সাধারণ দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি বইতে পরিষ্কার লেখা, ঈদের দিনে ‘ওরা’ নিজেদের আলিঙ্গন করে, গণেশ চতুর্থীতে ‘আমরা’ আনন্দ করে থাকি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শুধু ‘আমরা-ওরা’ নয়, সুক্ষ্মভাবে বাঙালী- অবাঙালীও করছে। আসলে ওঁদের হিন্দি-হিন্দু- হিন্দুস্তানের মন্ত্র, ওঁরা এতো ছোট বয়স থেকে প্রবেশ করাচ্ছে, এতো ছোট বয়স থেকে সব ধরনের মাধ্যম দিয়ে এই ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে এবং তার শিকড় এতো গভীরে প্রবেশ করে যাচ্ছে, যে তখন বিজয় শঙ্কর বনিয়া বা শম্ভুলাল রেগার হওয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো পথ থাকছে না।‘ প্রশ্ন করলেন বিজয় শঙ্কর বনিয়া আর শম্ভুলাল রেগারকে চেনেন তো? একজন তো নাকি সরকারী চিত্রগ্রাহক, যিনি মইনুল হকের মৃতদেহের ওপর নেচেছিলেন, যে দৃশ্য সারা ভারত দেখেছে। শম্ভুলাল রেগারকে ভুলে গেছেন? আরে, ঐ যে আফরাজুল বলে মালদহের এক পরিযায়ী শ্রমিককে কুপিয়ে হত্যা করে, তারপর পুড়িয়ে মারার ঘটনাটা ভুলে গেছেন নাকি?

মনে হলো, লতিফ, বিকাশ, বলবন্তরা এতো পরিষ্কার করে কি করে বোঝেন? বোঝেন বলেই, হয়তো সমস্ত সাম্প্রদায়িকতার ঊর্দ্ধে উঠে, একসঙ্গে মিলে মিশে পুজো করতে পারেন। বিজয় শঙ্কর বনিয়ারা আসলে কখন যে আমাদের অজান্তে আমাদের পরিবারে প্রবেশ করে গেছে, তা আমরা জানতেও পারিনি। আমাদের চারপাশের যতো হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে, তার দিকে একবার চোখ ফেরালেই দেখা যাবে, যে বিভিন্ন পারিবারিক বা কলেজের বা স্কুলের গ্রুপেও এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা জেনে অথবা না জেনে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক বিভিন্ন লেখা, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করে থাকেন। আসলে এই মানুষগুলোও যাঁরা এই মেসেজ ফরোয়ার্ড করেন জেনে অথবা না জেনে তাঁরাও এই প্রোপাগান্ডা বা বিকৃত প্রচারের শিকার। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন ফাইভ স্টার ক্লাবের সদস্যরা। আরও অমোঘ প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আচ্ছা পুজোর সময়ে তো ফুটপাথ থেকে উড়ালপুলে নীল সাদার প্রলেপ পড়ছে, তথাকথিত হিন্দু মানুষজন, কি কোনোদিনও খোঁজ নিয়েছেন, ঈদের সময়ে ‘ওঁদের’ পাড়ায় রাস্তাঘাটে নতুন রঙের প্রলেপ পড়ে কি না? নাকি সেটা যদি হয়, তাকে তোষণ বলা হবে?’। আমি নির্বাক শ্রোতা। শুধু এটুকু বললাম, আগের বছরে, যতটুকু পাশে থেকেছি, এবছর সেইরকম বা আরও বেশী পাশে থাকার বার্তা দেওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই। শুধু আরও বেশী মানুষের কাছে যদি কবির বলা কথাগুলো, ‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আর একটা কলকাতা, হেঁটে দেখতে শিখুন’ পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটুকুই কাজ।

0 Comments

Post Comment