পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মিড ডে মিল: প্রয়োজন শুধু দৃষ্টিভঙ্গির বদল

  • 02 January, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 580 view(s)
  • লিখেছেন : সীমান্ত গুহঠাকুরতা
মিড-ডে মিল ব্যাপারটা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ভীষণই গোলমেলে। আমাদের রাষ্ট্রনেতারা এটাকে একটা ফালতু খরচের বেশি কিছু মনে করেন না। কারণ সহজবোধ্য। ছয় থেকে চোদ্দর বাচ্চারা ভোটার নয়। আঠারোইয় পৌঁছে ভোটার হতে হতে তারা স্কুলে কী খাবার পেয়েছিল না-পেয়েছিল সেসব ভুলে যাবে। (এ তো আর কন্যাশ্রী নয় যে আঠারোয় পা দিতেই হাতে-হাতে নগদ পঁচিশ হাজার এবং প্রতিদানে এক-একটি পরিবারের অন্তত খান চারেক ভোটের নিশ্চয়তা।) আমরা, সমাজের সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষজন মিড-ডে মিলকে দেখি গরীব ছাত্রদের জন্য নিছক একটা দয়ার দান হিসেবেই গণ্য করি।

 

মিড ডে মিল খাওয়া আমাদের দেশে কোনো স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্যই বাধ্যতামূলক নয়। প্রত্যেক শ্রেণিতেই এমন কিছু শিক্ষার্থী পাওয়া যায়, যারা মিড ডে মিল খায় না। কেন খায় না? ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এই খেতে-না-চাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা শহরের দিকেই বেশি। সেখান থেকে গত গ্রামের দিকে যাওয়া যায়, সংখ্যাটা ততই কমতে থাকে। একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামের কিছু কিছু স্কুলে সংখ্যাটা শূন্যেও নেমে আসে। তবে কি এর পিছনে শিক্ষার্থীদের আর্থিক অবস্থার কিছু যোগ আছে? অর্থাৎ যাদের নেহাতই বাড়িতে ‘ভাত জোটে না’ অথবা যাদের ‘টিফিন আনার সামর্থ্য নেই’ তারাই নিরুপায় হয়ে মিড ডে মিল খায়?

একথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই ব্যবস্থাটা প্রচলনের পিছনে যত মহৎ উদ্দেশ্যই থাকুক না কেন, আমাদের রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি মিড ডে মিল-টাকে আদতে একটা ভিক্ষা হিসেবেই দেখে। এ প্রসঙ্গে একটা মজার কথা মনে পড়ে গেল। কিছুদিন আগে, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় একজন প্রধানশিক্ষক মহাশয় বলছিলেন, বছরের শুরুতেই প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে তার মিড ডে মিল খেতে হবে কিনা এই মর্মে ডিক্লিয়ারেশন নিয়ে নেওয়া উচিত। তারপর শুধুমাত্র সেইসব ‘ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীদের’ জন্যই খাবারের ব্যবস্থা চালু করা উচিত। তাঁর যুক্তি, ‘এতে সরকারের খরচ কমবে আর আমাদেরও কাজের চাপ কমবে।’ তাঁকে বুঝিয়ে বলা গেল যে মিড ডে মিলের ব্যবস্থাটা শুধু একটা পেট ভরাবার জন্যই নয়। এর পিছনে আরও কিছু উদ্দেশ্য আছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের, বিভিন্ন আর্থিক শ্রেণির সমস্ত ছাত্রছাত্রী যখন একত্রে বসে একই খাবার সকলে মিলে খায়, তখন তাদের মধ্যে সাম্যের বোধ গড়ে ওঠে। শ্রেণিভেদ মুছে যায়। কাজেই কে খাবে আর কে খাবে না – সেই ব্যাপারে শুরুতেই পৃথকীকরণ শুরু হলে তা প্রকারান্তরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভেদকেই উসকে দেবে।

শুরুর প্রশ্নটায় আবার ফিরি, যারা মিড ডে মিল খায় না, তারা কেন খায় না? ব্যাপারটা কি শুধুই আর্থ-সামাজিক অবস্থানের সঙ্গেই জড়িত? ব্যাপারটা বোঝার জন্য সেই ছাত্রছাত্রীদেরই শরণাপন্ন হয়েছিলুম। প্রতিদিন প্রথম পিরিয়ডে স্কুলের দপ্তরি কাগজ হাতে ক্লাসে ক্লাসে ঘুরে ক’জন মিড ডে মিল খাবে সেই সংখ্যাটা জেনে যান। তারপর সেই তালিকা অনুযায়ী রাঁধুনিদের চাল-ডাল-আনাজ ইত্যাদি মেপে দেওয়া হয়। এটাই রীতি। তা সেদিন প্রথম পিরিয়ডে দপ্তরি মশাই হিসেব নিয়ে চলে যাবার পর মিড ডে মিল খেতে অনিচ্ছুক ছেলেগুলোকে দাঁড় করালাম। জানতে চাইলাম -- তারা কেন খাবে না? প্রথমে ওরা বলল, ‘আমরা টিফিন এনেছি স্যর’। পালটা প্রশ্ন করা হল, ‘স্কুলে যখন খাবার দেওয়া হয় তখন টিফিন আনার দরকার কি?’ সকলে চুপ। তখন মিড ডে মিলের উপযোগিতা, শ্রেণিবিভেদ মুছে দিতে তার ভূমিকা ইত্যাদি দিয়ে ওদের একটা ছোটখাটো লেকচার দেওয়া গেল। ওরা মন দিয়ে সবটুকু শুনল, তারপর ওদের মধ্যে ঠোঁটকাটা গোছের একটি পাকা ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘সবই তো বুঝলাম স্যর। কিন্তু আপনাকে কে বলল যে আমরা বড়লোক বলে মিড ডে মিল খেতে চাই না? রোজ রোজ এক ঘেয়ে ওই জলের মত ডাল, আর আলু-সোয়াবিনের তরকারি খেতে কার ভাল লাগে বলুন তো? বারোমাস ওই মেনু বাড়িতে হলে আমরা বাড়ি ছেড়েও পালিয়ে যেতাম।”

শুনে থমকে গেলাম। সমাজমাধ্যমে সম্প্রতি পড়া একজন হেডমাস্টারের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি তাঁর স্কুলে এক অভিনব দুর্নীতি আবিষ্কার করেছেন। তাঁর স্কুলে ফাইভ-সিক্সের কিছু বাচ্চা রোজ তাদের মিড-ডে মিলটা উঁচু ক্লাসের দাদা-দিদিদের বিক্রি করে দেয়। মিড ডে মিল তো পায় কেবলমাত্র পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির বাচ্চারা। কিন্তু ক্লাস নাইন-টেনেও এমন কিছু ছেলেমেয়ে তো থাকেই, যাদের টিফিন আনার সামর্থ্য নেই অথবা যারা সকালে বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে আসত পারে না। তারাই সচরাচর ওই খাবারের ‘ক্রেতা’ হয়ে থাকে। বাচ্চাগুলো তাদের থালা-ভর্তি ভাত-ডাল সোজা সেই দাদা-দিদিদের কাছে পৌঁছে দেয়। বিনিময়ে পায় মিল-প্রতি নগদ দশ টাকা। সেই টাকা নিয়ে তারা চিপস, কুড়কুড়ে অথবা আলুকাবলি কিনে খায়।

ইন্টারনেট খুঁজে দেখুন, শিশুদের মিড ডে মিলের পুষ্টির জন্য নির্দিষ্ট ডায়েট-চার্ট পেয়ে যাবেন। সেখানে প্রতিটি শিশুর জন্য বয়সানুযায়ী কতটা প্রোটিন, কতটা ক্যালোরি থাকবে -- তার নিঁখুত মাপ দেওয়া আছে। বরাদ্দ চাল, ডাল, তেলের পরিমাণও নির্দিষ্ট। কিন্তু মুশকিল হল, এই তালিকার সবটাই শারীরিক-পুষ্টির দিকে তাকিয়ে তৈরি। খাবারে – বিশেষ করে শিশুদের খাবারে—স্বাদেরও যে একটা প্রয়োজনীয়তা থাকে, সেকথা এই পুষ্টি-বিশারদরা যেন বেমালুম ভুলে গেছেন। যে যেন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নয়, আমার মত বুকে স্টেন্ট বসানো হার্টের রুগীর খাদ্য-তালিকা। স্কুলের মিড ডে মিলে দৈবাৎ কোনোদিন একটা ডিম দেওয়া হলে, সেদিন ছেলেমেয়েদের মধ্যে খাওয়ার ব্যাপারে যে বিপুল উৎসাহ দেখা যায়, তার পুরোটাই কি পুষ্টির লোভে? জিভ বলে কি কোনো ইন্দ্রিয় শিশুদের মুখে থাকে না?

মুশকিল হল, মিড-ডে মিল ব্যাপারটা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো ভীষণই গোলমেলে। আমাদের রাষ্ট্রনেতারা এটাকে একটা ফালতু খরচের বেশি কিছু মনে করেন না। কারণ সহজবোধ্য। ছয় থেকে চোদ্দর বাচ্চারা ভোটার নয়। আঠারোইয় পৌঁছে ভোটার হতে হতে তারা স্কুলে কী খাবার পেয়েছিল না-পেয়েছিল সেসব ভুলে যাবে। (এ তো আর কন্যাশ্রী নয় যে আঠারোয় পা দিতেই হাতে-হাতে নগদ পঁচিশ হাজার এবং প্রতিদানে এক-একটি পরিবারের অন্তত খান চারেক ভোটের নিশ্চয়তা।) আমরা, সমাজের সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষজন মিড-ডে মিলকে দেখি গরীব ছাত্রদের জন্য নিছক একটা দয়ার দান হিসেবেই গণ্য করি। (আজও অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষিকা এটাকে পঠন-পাঠন ব্যহতকারী একটা উটকো ঝঞ্ঝাট হিসেবেই দেখেন। মিড ডে মিল চালু হবার প্রায় দুই দশক অতিক্রান্ত হতে চললেও এখনও তাঁদের ধারণা -- স্কুলটা শুধুমাত্র পড়াশুনার জায়গা। সেখানে কিছুতেই খাওয়া-দাওয়া চলতে পারে না।) আর আমাদের শিক্ষা-নিয়ামকরা ওটাকে দেখেন একটা দুর্নীতির আড়ত হিসেবে। তাদের ভাবখানা এমন, যেন এ দেশের প্রতিটা স্কুলের প্রত্যেকে হেডমাস্টারমশাই মিড ডে মিলের চাল-ডাল-তেল চুরি করে স্যুইস ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট ভরাচ্ছেন। কবে, কোথায় একটা-দুটো এমন চুরির খবর পাওয়া গিয়েছিল – সেই থেকে তারা তাদের নজরদারি ক্রমশই ‘টাইট’ করে চলেছেন। এখন শুধু বাচ্চাদের খেতে দিলেই চলে না, প্রতিদিনের হিসেব একটা জাবেদা খাতায় টুকতে হয়, সেই হিসেব সরকারী পোর্টালে আপলোড করতে হয়, এস এম এসের মাধ্যমে জানাতে হয়। তারপর যখন তখন স্কুলে পরিদর্শক দল হাজির হয়, তাদের সামনেও সেই হিসেব দাখিল করতে হয়। বাকি আছে শুধু বোধহয় উপগ্রহ চিত্র অথবা ড্রোন মারফৎ নজরদারিটাই। আর যে টাকা রক্ষা করার জন্য এত ‘বজ্র-আঁটুনি’, তার পরিমাণ-টা কত? প্রাথমিক ছাত্রপিছু ৫টাকা ৪৫ পয়সা, উচ্চ-প্রাথমিকে ৮টাকা ১৭ পয়সা। একেই বোধহয় আমাদের গ্রাম্য প্রবাদে বলে ‘আট আনার ধনেপাতা, তার আবার ক্যাশমেমো!’

এতদিন মিড ডে মিল সংক্রান্ত যাবতীয় পরিদর্শনের কাজ রাজ্য সরকারের তরফেই করা হত। পরিদর্শনে আসতেন স্কুল পরিদর্শক অথবা বিডিও অফিসের কর্মীরা। সম্প্রতি খবরে প্রকাশ, এবার থেকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী দলও স্কুলে স্কুলে পরিদর্শন চালাবে। রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনি’-র ভাষা ধার করে বলতে হয়, “লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরও বিস্তর। তাহারা মাস মাস মুঠা মুঠা তনখা পাইয়া সিন্দুক বোঝাই করিল। তারা এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো মাসতুতো ভাইরা খুশি হইয়া কোঠাবালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।”

অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি, স্কুলের পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কে বিভিন্ন সময় সহকর্মী শিক্ষকদের অনেককেই বলতে শুনেছি, ‘ওরা তো শুধু খেতে আসে ইস্কুলে’। বরাদ্দ-টরাদ্দ পরে বাড়ানো যাবে, আগে মিড ডে মিল সম্পর্কে আমাদের এই ভাবনাগুলো বদলানো দরকার। পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে একেবারে স্কুলের টিচার্স রুম পর্যন্ত একে শিশুদের অধিকার হিসেবে স্বীকার করতে হবে। দায়ে পড়ে নয়, নিজের ঘরের সন্তান মনে করে খেতে দিতে হবে তাদের। শুধু পুষ্টি নয়, খাবারের স্বাদের ব্যাপারটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের পাতে বিয়ে বাড়ির ভোজ তুলে দিতে হবে না, নিজেদের বাড়ির মত খাবার অন্তত তারা যাতে পায়, সেই ব্যবস্থা করতেই হবে।

রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এমন একাধিক ইস্কুল স্বচক্ষে দেখে এসেছি, যেখানে ওই মাথাপিছু আট টাকা সতেরো পয়সায় ছেলেমেয়েদের বড় যত্নে, বড় ভালবাসায় ভরপেট খাওয়ানো হয়। হেড মাস্টারমশাই এক-একদিন ছেলেমেয়েদের সাথে বসে পড়েন খেতে। বলেন, ‘আজ রান্না কেমন হয়েছে রে? তোদের সঙ্গে বসে খেয়ে দেখি, কেমন?’ এমন ইস্কুলের কথাও জানি -- নাম বলব না -- যেখানে ছাত্রদের উপস্থিতির সংখ্যা বেশি দেখিয়ে সেই টাকায় ছাত্রছাত্রীদের পাতে নিত্যদিন সোয়াবিনের বদলে হপ্তায় দুদিন ডিম আর মাসে দুবার মাংস-ভাতের ব্যবস্থা করা হয়। আহা, সব দুর্নীতি যদি এত সুন্দর হত!

মুর্শেদ মুজতবা আলী ‘দেশে বিদেশে’-তে লিখেছিলেন, মেহমানদারী করার ইচ্ছেটা টাকা থাকা না-থাকার ওপর নির্ভর করে না। কথাটা কিন্তু মিড ডে মিল সম্পর্কেও সত্য।

 

0 Comments

Post Comment