পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অপঘাত

  • 01 May, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 291 view(s)
  • লিখেছেন : আয়েশা খাতুন
আমি চুপ করে আছি। ওরা বললো আমাদের এখন একমাত্র শত্রু ওই যে স্বজাতি হয়ে, সমবয়সী হয়ে, সব সত্য জানার পরেও আমাদের এই জায়গা করে দিয়েছে সেই এখন একমাত্র পিপাসা আমাদের। বললাম সামনে কি দেখেছো শুধু তোমার না গোটা মুসলমান সমাজেরই না গোটা বাঙালির শত্রু এবং চরম শত্রু সে তোমাদের দিকেই তেড়ে আসছে। এখন এই মুহুর্তে একটি তিতুমীর যদি হতে। সম্ভব না, বাঙালির শত্রু ভেবে নবাব সিরাজকে মারতে যে পথ নিয়েছিলো বাঙালি তার নিয়তি আমরা এ প্রজন্ম ভোগ করিনি তাই এহেন এক মুসলমান গ্রামে নিদ্রার চেয়ে নামাজ শ্রেয় এমন ধ্বনির উচ্চারণ করতেই আপন ধ্বংসের বীজ বপনের মহড়া আজ দেখলাম।

কি আনন্দে ভোটার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভোট দেবার উৎসব পালন করে। তখন ভোর চারটে হবে, সেহেরির সময় পেরিয়ে গেছে। ঘোষণা হয়েছে মসজিদে, ঘুম অপেক্ষা সালাত উত্তম। তার পরবর্তী সময়টাই ভোর চারটে। পশ্চিম বঙ্গে যে ম্যারাথন ভোট চলছে আজ তার শেষ দিন। আগে পাঁচ ছয়টা গ্রাম মিলে একটা বুথ হতো, থাকতো হারিক্যানের আলো। সেই সব নিয়োনো আলো চলে গেছে। এসেছে বিজলিবাতি। বিজলিবাতির নানা তীব্রতায় চোখ ঝাঁঝিয়ে যায়। যাই হোক এই ভোট করার জন্য এসেছে কেন্দ্রীয়বাহিনী। যেমন লুটে নেওয়া শপিং মল বিশ্বাস করে না যে খরিদ্দার তাদের লক্ষী। তারা কাস্টমার বলে আর ভাবে এরা সকলেই তাদের চকচকে মালামাল চুরি করে নিতে পারে তাই সকল কাস্টমার কে চোর ভেবে তাদের ব্যাগ জমা নেয় ব্যাগের চ্যানে তালা দিয়ে ঝাড়াকুড়ো নিয়ে তবেই শপিং করতে দেয়। যাই হোক আমরা কোম্পানির এই মনোভাবকে ভালোবেসেই মেনে নিয়েছি। ঠিক তেমনি কেন্দ্রীয়বাহিনীর পুলিশ বন্দুক হাতে গ্রাম থেকে গ্রামের রাস্তা টহল দিয়ে যাচ্ছে কয়েকদিন ধরেই। সকালে সন্ধ্যায় কুচকাওয়াজ দেখিয়ে যাচ্ছে গ্রামের খেটেখাওয়া মানুষদের মুনিষদের। এবারের এই টহলদারি দেখে মনে হচ্ছে দেশের ব্যাটা দেশই বটে। ভোটারদের আগলবাঁধ সাংঘাতিক। এই ভাবনা থেকে গ্রামের মানুষ বেশ বুঝে নিতে পারে আগের দিনে যে নেতারা তাদের ভালোর জন্য পাখিপড়া করে গেছে তা ডাঁহা সত্যি। ভোটার আগলাতে এসেছে এই খবরে আহাল্লাদিত ভোটার। কোচবিহারে শীতল কুচিতে যে পাঁচজন তরতাজা ভোটারকে গুলি করে তড়পিয়ে মারার সুখ নিতে যে কেন্দ্রীয়বাহিনি এসেছে সে কথা এ ভোটারদের কে বোঝাবে! কারণ আমরা মেনেই নিয়েছি শপিং মলের কোম্পানি খরিদ্দারকে চোর ভেবে ভালোই করেছে, ঠিক তেমনি কেন্দ্রীয়বাহিনী গুলি করছে ঠিকই করছে।

যাই হোক ধান ভানতে শিবের গীত না হলেই ভালো। এতো শুধু আমার চোখে দেখা কানে শোনা বাকবিতন্ডা। বিজেপি এহেন মুসলমান নিধন এবং মুসলমানদের ভারত থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকাবার যে নিদান হেঁকেছে তা একবার না লক্ষবার। সংবিধানে যারা পেচ্ছাপ করে দেয় যাদের একমাত্র পিপাসা মেটে মুসলমানদের রক্তে সেই বিজেপিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে নিমন্ত্রণ করেছে অনেক মুসলমানদের মতো এই গ্রামের মুসলমান যুবকেরা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেনো এই মুসলমান নিধনকারিদের মুসলমানদের এক বড়ো অংশ ডেকে আনছে?

দেশের স্বাধীনতার কুড়ি বছর পর থেকে শুরু হয়েছে দেশের স্বাধীনতা কে না মানার এক লুকোচুরি প্রক্রিয়া। এ বঙ্গ তা থেকে আলাদা না। অন্যদিকে দেশভাগের যে নতিজা তার পুরোটাই ভোগ করেছে এ বঙ্গের গরিব সম্প্রদায়। আবার মেতে উঠেছে এই গরিব সম্প্রদায়। মাঝে ৩৪ বছর মেতেছিলো। আন্তরিকভাবেই সর্বহারার মহান নেতারা যা বলেছিলো তা তারা করেছিলো। নিজেদের পরিবার ভেঙে দেওয়া, গ্রামে গ্রামে দেওবান্দ বেরিলি নিয়ে বিভাজিত হয়ে দুটো মসজিদ গড়া, ভাই হয়ে ভাইকে গুলি করা, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা থেকে প্রজন্মকে বঞ্চিত করা। সরকারি সমস্ত সুযোগ থেকে বঞ্চনা মেনে নেওয়া, দল নিয়ে দলীয় দাঙ্গা সবেতেই এই গরিব অংশ নিয়েছিলো।

নেতাদের বাঁচাতে নঈমরা বুকচিতিয়ে গুলি খেয়েছে। গুলি কিন্তু গরিব বড়োলোক দেখে পুলিশে চালায়নি। তবে সেগুলি কোনোদিন জ্যোতিবসু, বিমান,সূর্য্য,নিরুপম দের দিকে অনুপম হয়ে যেতে সাহস পায় নি। গুলি গিয়েছে নঈম, ইব্রাহিম, খলিল জব্বার, রহমতদের দিকে। এর পরে গরীব ভাবলো তারা চরম ঠকেছে। ফিরলো মাটির টানে। মাটিতে রাসায়নিক সার বিষ মিশে স্লোগান পালটে গেলো তাজমহল, এই তাজমহল কার মাথার সিথানে ? মমতাজ বেগমের। সুতরাং গরিব এবার জেগে উঠল ধরমের ঢাকঢোলে। আহা কতদিন মতুয়া, ডোম, বাউরি, বাগদি, ঢুলি, চাড়াল, সাপুই ইত্যাদি ইত্যাদি আর টুডু, বেসরা, সরেন, হাসদা, কিস্কু ইত্যাদি ইত্যাদি জাতে ওঠেনি জনম জনম ধরে। তাদেরকে শেখানো হলো 'গরবসে বোলো হ্যম হিন্দু হ্যায়।' এ যেন বাঁধ ভাঙা জলের উচ্ছাস। কি আনন্দ! সে এক অনাবিল আনন্দ তাদের কপাল থেকে ঝরে যাচ্ছে গাল থুতনি বেয়ে। এক লাফে বামুনের পোঁ তার পরে তার পোঁ তার পোঁ করতে করতে সেই তাদের মাথায় পা রেখে বামুনের পা ধোয়া জল প্রবাহিত হবার ড্রেন আর তার কীটের জাগায় ডিটেন হবার সেকি উচ্ছাস!

এবার শালা মুসলমানকে দেকে লোবো। শালা দ্যাশের ভাগ লিয়েচিস, শ্যালারা পাকিসতান চ্যোলে য্যা, ব্যাংল্যাদ্যাশ চ্যোল্যে য্যা। শালাদের কাড়নে উন্নয়ন হয় না দ্যাখো। এই বেটিনে দ্যাখে লুব্যো। মাইকে আজানের চিঁচ্যান্যিত্যে ক্যানের প্যোঁক্যা মর‍্যে যেচে। এতদ্দিনে ক্যেয়খে এমুন আল্লাদ করে বল্যোতে শ্যুনিনি। জি আমড়া নাকি হেঁদুর একটো খুঁট। শালাড়া চাট্টে কড়ে বে কড়বে চাড় আটে বত্তিশট ছ্যালে লিবে,ছ্যালে কতো গো শুয়োড়ের গোওল। কি নুংড়্যা ছ্যেঃ ঘেণ্ণা কড়্যি।আর এস এস এর সিলেবাসের চ্যাপ্টারটা গীতার বানীর মতো মনে গেঁথে নিয়েছে। সান দিচ্ছে রামনবমীর উপহার পাওয়া তরবারিতে। ভাগ হয়েছে ম্যাপ। কোন আদিবাসী কোন মুসলমান গ্রাম কার বাড়িঘর পাবে, কার জমি পুকুর বাঁশঝাড় কোন ডোম পাবে কোন বাড়ুই কোন পাকা বাড়ি পাবে শুধু এই ম্যাপ চোখের সামনে ঘুরছে যদি বিজেপিকে ভোট দিয়ে বাংলায় আনতে পারো তো ও নেড়েদের সম্পদ তোমাদের। সুতরাং লড়কে লেঙ্গে লুঙ্গিস্থান।

শুধুমাত্র শোনা নয় নিজে চোখে দেখা, জলধর বাড়ুই একটা মুসলমান গ্রামে এসে তার আগামীতে প্রাপ্য ঘরটা ভিজিট করে গেলো সে বাড়িতে জনখাটতে এসে। এসব বাজে কথা নয়, এ সব ঘটে যাচ্ছে আমাদের খুব কাছাকাছি অঙ্গনে।

প্রশ্ন করেছিলাম আগেই, কেনো এই মুসলমান গ্রাম গুলোর বিজেপি আর এস এস এর পক্ষে তরবারি ধরার এতো হিড়িক? কেনো বন্ধুকের নল নিজের বুকের দিকে তাক করেছে কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে, কার প্রতি প্রতিশোধ নিতে? কারণ একটা সেই নিরাপত্তাহীনতা সেইবহু কাঙখিত ভোটের গরিবি। তারা যে যতই অনুদান পাক কিন্তু সেই সুত্রের বাইরে যেতে পারে না,যে দান অনুদান খয়রাতি গরিবি ঘুচাতে যেমন পারেনি তেমনি বেশিরভাগ মুসলমানের আঙিনায় ঘাস জমতে দিতে পারে না । তাই সেখানে ঘাস ফুল ফোটেনি। দুয়ারে সরকার না বরং এসে দাঁড়িয়েছে দুয়ারে সেই বাজীকরের অশ্বমেধের ঘোড়া। কিচ্ছু করার নেই। কারন পালটে যাওয়া উলটে যাওয়ার যে চরচা, চাচা নিজের জান বাঁচার যে চরচায় আমরা তেল মেরেছি তার ফল কি করে বিফলে যায়!

এই মুসলমান গরিব যুবা ভেবেছিলো ভালো রেজাল্ট করলে সরকারি চাকরি পাবো,কিন্তু হলো না, সবই টাকার অঙ্কে বিক্রি হলো। ভাবলো তাহলে কন্ট্যাক্টটারি করি, পারলো না সেটাও তারাই করবে,ভাবলো নদীর বালি,পাথর খাদানে যাবে না সেখানে সিণ্ডিকেট, ভাবল স্কুলের সেক্রেটারি, না তাও বন্ধ করা হলো,প্রধানের জামাই বাবুরা সেজাগায় আছে। ভাবলো বিরোধী দল, সেখানে দিলো মাওবাদী, গাঁজা,এট্যাম্পট টু মার্ডার ৩০৭ আজীবন কেসের দোলক করে ঝুলিয়ে দিলো।

তাহলে আর কি ভাবে বাঁচা যায়??? বলুন আমাদের।

আমি চুপ করে আছি। ওরা বললো আমাদের এখন একমাত্র শত্রু ওই যে স্বজাতি হয়ে, সমবয়সী হয়ে, সব সত্য জানার পরেও আমাদের এই জায়গা করে দিয়েছে সেই এখন একমাত্র পিপাসা আমাদের।

বললাম সামনে কি দেখেছো শুধু তোমার না গোটা মুসলমান সমাজেরই না গোটা বাঙালির শত্রু এবং চরম শত্রু সে তোমাদের দিকেই তেড়ে আসছে। এখন এই মুহুর্তে একটি তিতুমীর যদি হতে।

সম্ভব না, বাঙালির শত্রু ভেবে নবাব সিরাজকে মারতে যে পথ নিয়েছিলো বাঙালি তার নিয়তি আমরা এ প্রজন্ম ভোগ করিনি তাই এহেন এক মুসলমান গ্রামে নিদ্রার চেয়ে নামাজ শ্রেয় এমন ধ্বনির উচ্চারণ করতেই আপন ধ্বংসের বীজ বপনের মহড়া আজ দেখলাম।

কোনো কশুর নেই তাতে। শুধু নীতি কথার সেই গল্প মনে পড়ল- একটা পাখির দুটো ঠোঁট। মিষ্টি ফল খাওয়ার আস্বাদ নিতে আজীবন বিরত। তার চেয়ে মরণ শ্রেয়। খাও বাঙালি বিষ ফল খাও। মনে রেখো তুমি নীলকন্ঠ নও, তুমি নীল থেকে কালো হয়ে গলে ঝরে যাবে।

0 Comments

Post Comment