পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সবকা বিশ্বাসের বাকোয়াস

  • 16 December, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 384 view(s)
  • লিখেছেন : অমিত দাশগুপ্ত
মোট আয় ২৬, ০০০ টাকা কিন্তু গত দশ বছরে ভোগ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে প্রায় ১০০%। ফলে আগের খরচ বজায় রাখতে দরকার পড়ছে ৩৭,০০০ টাকা। সমস্ত হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে তাঁর। ওদিকে চিকিৎসার খরচ বেড়েই চলেছে। ওষুধের দাম বাড়ছে। নিজের ৭০ আর গিন্নির ৬৫ বছর বয়সে এটাসেটা লেগেই আছে। এতদিন পর্যন্ত টেনে টুনে চললেও আর পারা যাচ্ছে না। যখন অবসর নিয়েছিলেন, তাঁর বেতনকে কখনো কম মনে হয় নি, মনে হয়নি অবসরের পরে এমন কষ্টে পড়বেন।

প্রবীণবাবু বেশ চিন্তায় পড়েছেন, হিসেব কিছুতেই মেলাতে পারছেন না। খুবই হিসেবি মানুষ, ফিনান্সটাও বোঝেন বলে অল্পসল্প নাম ছিল। দশ বছর আগে যখন অবসর নিলেন ভেবে রেখেছিলেন কীভাবে কাটাবেন আগামী সময়টা। ভারতে বাস করে এটা জানেন যে নিয়মিত জিনিসপত্তরের দাম বাড়বে। ফলে আজকের মাসকাবারি ব্যয় আগামীকাল বাড়বে। তাই অবসরের পরে প্রাপ্ত পিএফ-গ্রাচুইটির অর্থকে নিরাপদ স্থানে এমনভাবে জমা রাখতে হবে যে নিয়মিত সেখান থেকে আয় পাওয়া যাবে। সেই আয়ের একাংশকে পুনরায় জমিয়ে রাখতে হবে যাতে ভবিষ্যতে আয় বাড়ে। এমনটা চালিয়ে যেতে হবে। পিএফ গ্রাচুইটি ও জমানো এলআইসির র থেকে পাওয়া ২৪ লক্ষ টাকা ব্যাঙ্কে ১০ বছরের স্থায়ী আমানতে রাখলেন ১০% সুদের হারে। মাসে তিনি ২০,০০০ টাকা সুদ পেতে থাকেন, এর সঙ্গে ৭৫০০ টাকা পেনশন পেতেন তিনি। সব মিলিয়ে মাসে ২৭,৫০০ টাকা, অবসরের সময়ে কেটেকুটে যা হাতে পেতেন তার প্রায় সমান। মাসে ৯,০০০ টাকা সঞ্চয়ের পরিকল্পনা করেন তিনি, যার দ্বারা পরের বছরে স্থায়ী আমানতের মাধ্যমে মাসে অতিরিক্ত ৯০০ টাকার বন্দোবস্ত থাকবে। ফলে অবসরের পরপরে যে ১৮,৫০০ টাকার মত মাসিক খরচ তার থেকে পরের বছরে অতিরিক্ত ৬০০ টাকা খরচ বাড়াতে পারবেন তিনি। জমানোর পরিমাণটাও বেড়ে মাসে ৯০০০ থেকে ৯৩০০ হবে। ফলে পরের বছর স্থায়ী আমানতের পরিমান আরো বাড়বে। সুদ বাড়বে, আয় বাড়বে বেড়ে চলা ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। একদম নিঁখুত হিসেব। স্বনির্ভর, কারুর কাছে হাত না পাতা প্রবীণবাবু বেশ নিশ্চিন্ত ছিলেন। গত ১০ বছরে ২০১২-১৪ সাল নাগাদ জিনিসপত্তরের দাম কিছুটা বেশি বেড়েছিল। ওদিকে সুদের হার কমছিল। তবে দশ বছরের মেয়াদ থাকায় মূল আমানতের সুদ কমে নি। তবে খরচ কমিয়ে ম্যানেজ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু স্থায়ী আমানতটির মেয়াদ পুরো হওয়ার পরে তাঁর মাথায় হাত পড়েছে। সুদ কমেছে তিনি দেখছিলেন। নতুন আমানতে সুদ কম পাচ্ছিলেন। বুঝতে পারছিলেন খারাপ সময় আসতে চলেছে। কিন্তু এত ভেবে চিন্তে দেশের ভালোর জন্য, এবং চিন-পাকিস্তানকে উচিৎ শিক্ষা দিতে গিয়ে যে এমন জুতসই শিক্ষা পাবেন তা বুঝে উঠতে পারেন নি। ঐ যে ভেবেছিলেন, প্রধান সেবক কিছু একটা বন্দোবস্ত করবেন তাঁর মত ভদ্রলোক হিন্দুর জন্য। মেয়াদ ফুরোনোর পরে জমা করতে গিয়ে দেখেন তিনি বয়স্ক নাগরিকদের জমা প্রকল্পে ও বয়স্কদের জন্য বীমা কোম্পানির পেনশন প্রকল্পে ৭.৪% সুদ পেতে পারেন। ফলে ওই ২৪ লক্ষ্ টাকায় মাসিক সুদের পরিমাণ ২০,০০০ টাকা থেকে কমে ১৪, ৮০০ টাকায় দাঁড়াবে। এমনিতেই আগেকার জমানো নুতন নুতন আমানতগুলিতে সুদের হার অত্যন্ত কমেছে, ফলে যা সঞ্চয় করবে বলে ভেবেছিলেন তা হয় নি। খুব হিসেব করে চলে তিনি আরো ৬ লক্ষ টাকার মত জমাতে পেরেছেন। ফলে সামগ্রিক সুদের পরিমাণ হচ্ছে ১৮,৫০০ টাকা। মোট আয় ২৬, ০০০ টাকা কিন্তু গত দশ বছরে ভোগ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে প্রায় ১০০%। ফলে আগের খরচ বজায় রাখতে দরকার পড়ছে ৩৭,০০০ টাকা। সমস্ত হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে তাঁর। ওদিকে চিকিৎসার খরচ বেড়েই চলেছে। ওষুধের দাম বাড়ছে। নিজের ৭০ আর গিন্নির ৬৫ বছর বয়সে এটাসেটা লেগেই আছে। এতদিন পর্যন্ত টেনে টুনে চললেও আর পারা যাচ্ছে না। যখন অবসর নিয়েছিলেন, তাঁর বেতনকে কখনো কম মনে হয় নি, মনে হয়নি অবসরের পরে এমন কষ্টে পড়বেন।

এই সরকারকে খুব ভরসা করেছিলেন তিনি। গত বছরও দ্বিতীয়বারের জন্য ভোট দিয়েছিলেন আরেকবার নমো-র জন্য। গোড়ায় যদিও সব দেখেশুনে অন্যরকম ভাবছিলেন, তবে পুলওয়ামা-বালাকোটের পরে আর দ্বিতীয়বার ভাবেন নি। নমো কম ভোট বেশি আসন পেয়ে জেতার পরে সবকা সাথ সবকা বিকাশ সবকা বিশ্বাস বলার পরে আশ্বস্ত হয়েছিলেন যে এবার বোধহয় বয়স্কদের জন্য কিছু ভাববেন প্রধান সেবক। তাতো নয়, উল্টোটাই হয়েছে। গত দেড় বছরে সাত সাতবার স্টেট ব্যাঙ্ক আমানতের উপর সুদের হার কমিয়েছে, অন্যান্য ব্যাঙ্কও। বার তিনেক পোস্ট অফিসে সুদের হার কমেছে। এমনকি কোভিড ১৯এর জন্য লকডাউনের মধ্যেও দুবার সুদের হার কমেছে। ওদিকে স্যানিটাইজার, হ্যান্ডওয়াশ, মাস্ক কিনতে কিনতে জেরবার, সাথে ভিটামিন ডি, সি, এ টু জেড ও যুক্ত হয়েছে। কেবল কী তাই প্রেসার, সুগার, ইউরিক এ্যাসিড, থাইরয়েডের ওষুধের দাম ২০-২৫% বেড়েছে। ফলে সবকা বিকাশের অর্থ বুঝতেই পারা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওই বিকাশ ওষুধ কোম্পানি, সাবান-স্যানিটাইজারের ব্যবসায়ীদের ঘরেই পৌঁছচ্ছে। এদিকে নমো সবকা সাথ বলতে আম্বানি-আদানিকে সাথ বুঝিয়েছেন বোধহয়। ওনারাই ওনার সব। তাই ব্যাঙ্কের ব্যবসায় যাতে ওদের হাতে যায় তার জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একটি পরামর্শদাতা গোষ্ঠি প্রস্তাব করেছেন। আদানিতো এদেশের আকাশ (এয়ারপোর্ট), জল (পোর্ট), জমি (কয়লা খনি), জঙ্গল, বিদ্যুত সর্বত্রই থাবা বসিয়েছেন; আম্বানিদের বড়টাও বাস্তব (পেট্রোলিয়াম) থেকে ভার্চুয়াল (টেলিকম) সবখানেই নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছেন। এখন ব্যাঙ্কের ব্যবসায় ঢুকতে পারলেই সোনায় সোহাগা। এদিক সেদিক করে আমানতগুলি নিজেদের কব্জায় আনতে পারলেই সব কর্তৃত্ব হাতে পৌঁছায়। কিছু টাকা পিএমকেয়ার্স আর শাসকের নির্বাচনী বন্ডে দিয়ে দিলেই চলবে। কিন্তু প্রবীণবাবুর আর্থিক সমস্যা মেটার কোন সম্ভাবনা তো তাতে দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু যেটুকু তিনি বুঝেছেন জেনেছেন, বয়স্কদের জন্য যেসব ছাড় রেল ভাড়ায় ছিল সেসব লোপাট হয়ে গেছে, কোভিড অতিমারির ছুতোয়।

সব মিলিয়ে প্রবীণবাবুর হাতে রয়ে গিয়েছে পেন্সিল, নিকুচি করেছে বিশ্বাসের ।

0 Comments

Post Comment