(২২)
ট্যাঙ্কে করে জল আসে লখাইয়ের দুয়ারে। আগের দুয়ার তো দাদার সীমানায়। নতুন সীমানা-পাঁচিলের ঠিক কোনায় দাদার সদর দরজার পাশেই ইতিমধ্যে বিশাল গেট খুলে তাতে লোহার বেশ শক্তপোক্ত একটা গ্রিল বসিয়ে দিয়েছেন বটব্যালবাবু। ফলে বাইরে যাতায়াতের কোনো অসুবিধাই বুঝতে পারলো না লখাই। তবে তা সাময়িক। অ্যাপার্টমেন্ট হয়ে গেলে ওই গেট আর লখাই ব্যবহার করতে পারবে না। ওটা একমাত্র ফ্ল্যাট ব্যবহারকারীদের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। লখাইকে অন্য দরজা খুলতে হবে, কোঠাঘর থেকে আসা-যাওয়া করার জন্য।
লখাইয়ের তো শুধুমাত্র কোঠাঘরটুকুই। জলের কোনো ব্যবস্থা নেই। বাইরে টাইমকল থেকে জল এনে কাজ চালাতে হয়। সেই কলটি আবার ফ্ল্যাটের গেট আর রামের সদর দরজার মাঝামাঝি জায়গায়। আর এই কলতলাই হচ্ছে কিছু খলনায়িকাদের এক উপযুক্ত প্রচারমাধ্যম।
এখানেই আদরিনী এখন জল আনতে যায়। কোনো কোনো দিন কলে জল না এলে একটু দূরে একটা কুয়ো থেকে জল আনতে হয়। এই টাইমকলে সৌদামিনীও জল নিতে আসে। দু’জনের দেখা হলেই একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। আবার দুজনের একজন হাজির না থাকলে নামকরা কিছু খলনায়িকারা কানফুসফুসি দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যায়। তবে আদরিনীর কাছে ওরা নাক গলাতে পারে না। একবার কাটখোট্টা জবাব পেয়ে ওরা বুঝে গেছে আদরিনী অন্য ধাতুতে গড়া। তাই আদরিনী গেলে ওরা যেটুকু গুজগুজ করে, সেটাও বন্ধ হয়ে যায়।
তবু আর শেষ রক্ষা হল না। একজন তো রাম আর আদরিনীর অবৈধ সম্পর্কের রঙিন বানানো গল্প বলে সৌদামিনীর মনে সন্দেহের বীজ বুনেই ফেললো। সেই আবার আদরিনীকে দেখে, না দেখার ভান করে আর এক খলনায়িকাকে লখাই আর সৌদামিনীর প্রেমের গল্প ফাঁদলো এমনভাবে, যা আদরিনীর কানে না পৌঁছে উপায় নেই।
আদরিনী সেসব গুজবে কান না দিলেও সৌদামিনী কিন্তু ওই বানানো কান্ড শুনে রাগে ফুঁসতে থাকে। ফলত জল নেওয়া নিয়ে শুরু হয় নিত্য নতুন গোলযোগ। অবশেষে অবৈধ প্রেম নিয়ে সৌদামিনী আর আদরিনীর মধ্যে বচসা এবং প্রায় হাতাহাতি হবার উপক্রম। আর সেইসময় খলনায়িকারা নির্বাক দর্শকের ভূমিকায়।
ক্রমে সেই কথা রাম ও লখাইয়ের কানে পৌঁছায়। রাম ও লখাই অবশ্য এই প্রচারকে আমল না দিয়ে নিজ নিজ স্ত্রীকে সংযত হওয়ার অনুরোধ করে। কেননা, এটা এমন একটা বিষয় যা ছড়াতে একটুও সময় লাগেনা। যাকে বলা যায় দাবানল সংবাদ। এবং এক্ষেত্রে পাড়ায় সবারই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া ছাড়া আখেরে কোনো লাভ হয়না।
নিজেদের মধ্যে একটু কথা কাটাকাটি ব্যতিরেকে বিষয়টা এবারের মতো এখানেই থেমে যায়। আর এগোয় না। তবে সেই থেকে আদরিনী আর ওই কলমুখী হয়নি। সামনের একটা হ্যাঁচকা কল (টিউবওয়েল) থেকে জল এনে ঘরের যাবতীয় কাজকর্ম সারে। প্রথম প্রথম জল খাওয়ার একটু অসুবিধা হলেও ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়ে যায় ওরা।
(২৩)
বটব্যালবাবু প্রোমোটার হলেও মানবিক, পরোপকারী। তিনি লক্ষ্য করেছেন লখাইয়ের আর্থিক দুর্দশা। অথচ লখাই খুব হাসিখুশি। তার অভাব-অনটনের কথা একটিবারের জন্যও সে বটব্যালবাবুর কাছে প্রকাশ করেনি। তার এই আচরণে মুগ্ধ হয়ে বটব্যালবাবু একদিন লখাইকে বললেন, 'কিছু মনে না করলে তোমাকে একটা কথা বলি।'
— “বলুন। মনে করবো কেন!”
— “আমি তো দেখছি তোমার কোনো রোজগার নেই। আমি যদি তোমার একটা কাজের ব্যবস্থা করি, করবে তো?”
— “'কী কাজ বলুন। সম্ভব হলে নিশ্চই করবো।”
বটব্যালবাবু বললেন, “এই বাউন্ডারীতে রোজ দু'বেলা জল দেওয়ার কাজটা যদি তোমাকে দিই, পারবে তো?”
ইতস্তত করে লখাই বলে, “তা তো পারতাম। কিন্তু বাউন্ডারীর ওপাশে তো দাদার বাড়ি। দাদা যদি কিছু বলে! খামোখা ঝামেলা বাড়বে। আপনি অন্য লেবার দিয়েই করান। আরো অন্য কোনো কাজ থাকলে বলবেন। তখন না হয় করা যাবে।”
বটব্যালবাবু বললেন, “কাজ তো অনেক আছে। এই ধরো, আমাকে তো গাড়ি গাড়ি ইট, বালি, গিটি, সিমেন্ট, রড, নানারকম মেশিন এখানে এনে স্টক করতে হবে। সেসব দেখভাল করার জন্যও তো জনা তিনেক গার্ড চাই। তো, তুমি যখন আছো, তখন তুমিও তো সেগুলো দিনরাত দেখাশোনা করতে পারবে। কাজটা একজনকে দিয়েই হয়ে যাবে। তিনজনের আর দরকার হবে না। কী, পারবে তো?”
মনে মনে লখাই তো খুব খুশি। বলে, “তা পারবো বৈকি।”
ঠিক হয়, আগামী কাল থেকেই মাল নামানো শুরু হবে এবং কাল থেকেই গার্ডের কাজে বহাল থাকবে লখাই। এই কাজ বাবদ মাসে আট হাজার টাকা মাইনে দেওয়ার কথা জানিয়ে দেন বটব্যালবাবু। আর তাতেই রাজি হয়ে যায় লখাই।
কথাটা আদরিণীকে জানাতেই আদরিণী কপালে দু’হাত ঠেকিয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করে। বিকেলে বাজার থেকে একটা অন্নপূর্ণার ফটো এনে কুলুঙ্গিতে রাখে লখাইপত্নী।
এবার আদরিনীর ঘরকন্নার কাজে একটুআধটু রদবদল হয়ে গেলো। বেলা দশটার মধ্যোই লখাইয়ের জলখাবার তৈরি করে দিতে হবে তাকে। কাল থেকে লখাই কাজে যাবে যে! একটা খুশির আমেজ বইতে থাকে লখাই-আদরিনীর জীবনে।
ফ্ল্যাটের কাজ এগিয়ে চলেছে তরতরিয়ে। আদরিণী সকাল সকাল সাহাবাবুর ঘরে কাজ সেরে সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে ফিরে এসে টিফিন বানায়, দুজনেরই।
দুপুরে খাবার খাওয়ার পর চটপট বাসনমাজার কাজ শেষ করে বিকেল চারটের মধ্যে তাকে আবার যেতে হয় সাহাবাবুর ঘরে। ফিরে এসে দায়িত্ব না থাকলেও মিস্ত্রী-মজুর ফ্ল্যাটের কাজ সেরে ফিরে যাবার পর সে ফ্ল্যাটের মেঝেতে ঝাড়ু দিয়ে ময়লা সাফ করে আসে। তারপর আবার সংসারের কাজে নেমে পড়ে।
প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে লখাই, আদরিনীর কথামতো কোঠাঘরের দেয়াল কেটে একটা দু'পাল্লার দরজা বসায়। অ্যাপার্টমেন্টের কাজ শেষ হলে কোঠাঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার তো একটা রাস্তা চাই। তাই আগেভাগেই ওরা ব্যবস্থা করে নেয়।
এদিকে লখাইকে না জানিয়েই আদরিনী কোঠাঘর আর ফ্ল্যাটের মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গায় কয়েকটি পেঁপে বীজ পুঁতে দেয়। “বিনা যত্নে যদি কিছু পাওয়া যায়, মন্দ কী”—এরকমটা ভেবে আদরিনী লখাইকে না জানিয়েই এ কাজটি সেরে ফেলে।
নির্মীয়মান ফ্ল্যাট পরিষ্কার রাখার জন্য বিনা পারিশ্রমিকে আদরিনীর এই প্রয়াস দেখে বটব্যালবাবু হতবাক। অনেক ফ্ল্যাট তিনি নির্মাণ করেছেন এই শহরে। কিন্তু এরকম নিঃস্বার্থভাবে অন্যের কাজে নিজেকে সঁপে দেওয়া তাঁর চোখে পড়লো এই প্রথম। কিছুদিন পর লখাইকে তিনি মহিলা শ্রমিকদের সাথে আদরিনীকে কাজ করার প্রস্তাব দিলে লখাই আদরিনীর সাথে আলোচনা করে রাজি হয়ে যায়। তবে এই ফ্ল্যাট ছাড়া অন্য কোথাও সে যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। সেই শর্ত মেনে নেন বটব্যালবাবু। দৈনিক আড়াইশো টাকা মজুরিতে আদরিনী কাজ শুরু করে। সাহাবাবুর বাড়িতে বিকেলে কাজে যাওয়ার সময়টা একটু এদিক ওদিক হয়ে যায়। এবং তাতে সাহাবাবু কোনো আপত্তি জানায় না।
লখাইয়ের সংসারে ক্রমে রোজগারের অঙ্কটা বাড়তেই থাকে। আদরিনী রোজ ভোরে স্নান সেরে মা অন্নপূর্ণার পূজা করে তবেই ঘরের কাজে হাত লাগায়। লখাই কাজ পাওয়ার পর এটা তার নবতম সংযোজন। যতদিন এই কাজ চ'লবে ততদিনতো এই রোজগার থাকবে। তারপর? আদরিণী সব মা অন্নপূর্ণার ভরসায় ছেড়ে দেয়!
(২৪)
বেসমেন্টের কাজ তো কবেই শেষ হয়ে গেছে। পাইপ লাইনের কাজ চলছে সুবিধামত। পাশাপাশি চলছে ক্যাসিংয়ের কাজও। চলছে দরজা জানালা সহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ। তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টে প্রতিটি ফ্লোরে ২ বি এইচ কে-র দু’টি করে ইউনিট নিখুঁতভাবে বানানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে মুর্শিদাবাদের জনা চারেক রাজমিস্ত্রি। মেঝেতে টাইলস বসানোর জন্য টাইলসও এসে গেছে ইত্যবসরে। প্রতিদিন যেন উৎসব চলছে অ্যাপার্টমেন্টের অন্দরে।
শ্রাবণের সাতাশ থেকে যে অ্যাপার্টমেন্টের কাজ শুরু হয়েছিল তা প্রায় ছ'মাস অতিক্রান্ত। এখনো অনেক কাজই বাকি আছে। নাজানি আরও ক'মাস সময় লাগবে। অবশ্য যত দেরি হবে, লখাইদের ততই মঙ্গল। শেষ হলে ওদের রোজগারও বন্ধ হয়ে যাবে। লখাই চিন্তা করে, “কোঠাঘরটা ভাড়ায় দিলে আর কতই বা টাকা পাবে। খুব জোর হাজার দুয়েক। তাতে কি সংসারের এই স্বাচ্ছন্দ্য বজায় থাকবে?”
ইদানীং রামের মনমেজাজ অনেক পাল্টে গেছে। সদাশিব মানুষটা কেমন যেন খিটখিটে হয়ে গেছে। সৌদামিনীর সাথে প্রায়ই সামান্য কারণেই কথা কাটাকাটি শুরু হ'য়ে যায়।
সৌদামিনী ভাবে ঠাকুরপো তো কোনোদিন দাদার অবাধ্য হয়নি। শুধু বিয়েটাই করেছে না জানিয়ে। সে তো আজকাল সব ঘরেই হচ্ছে। আলাদা করে দেওয়াটা ঠিক হয়নি। তার মতে, “ঈশ্বর ঠাকুরপোর সহায় বলেই এমন সুযোগটা সে পেয়ে গেলো। একটা ফ্ল্যাট তো পেলোই, আর মাটির ঘরটাও বাড়তি থাকলো।” কিন্তু ওদের তো তেমন কোনো আয় নেই। তাই লখাইদের দেখে ঈর্ষা করার মতো কোনো কারণ সে খুঁজে পায় না।
রাম এখন ভাড়াটিয়া খুঁজছে। একতলাটা সে ভাড়ায় দেবে। নিঃসন্তান সৌদামিনীর সঙ্গে দুটো কথা বলারও তো কাউকে দরকার। খুঁজতে খুঁজতে একটা ভাড়াটিয়া জুটেও গেলো। স্বামী-স্ত্রী, দু’জনই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। একটি বছর পাঁচেকের মেয়ে। আর মেয়েটাকে দেখাশোনার জন্য একজন বছর আঠারোর কাজের মেয়ে আছে। কাজের মেয়েটি ওদের কাছেই থাকে দিন-রাত্তির। ওপরতলায় মাসিক পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় চুক্তি হয় এবং তারপরই ভাড়াটিয়া ভদ্রলোক তার ঘরের কিছু আসবাবপত্র পৌঁছে দিয়ে দু-চার দিনের মধ্যেই আসবার কথা জানিয়ে যান।
(২৫)
— “লখাই আছিস নাকি? লখাই...লখাই”
সাতসকালে দাদার গলার আওয়াজ শুনে লখাই আশ্চর্য হয়ে যায়। তড়িঘড়ি ঘরের দরজা খুলে বেরিয়েই দেখে দাদা দাঁড়িয়ে। বেশ গুরুগম্ভীর ভাব।
— “দাদা! হঠাৎ কী হ'লো! বৌদির কিছু হয়নি তো?”
— “না না। সেসব নয়। আমি এসেছি গাছগুলো নিয়ে কথা বলতে।”
— “হঠাৎ গাছ নিয়ে কী হলো?”
— “গাছগুলো আমি আর রাখবো না। সব কেটে ফেলবো। সেটাই তোকে বলতে এসেছি।”
— “কাটবে কেন?”
— “আমার জায়গাটা অমন ঝোপজঙ্গল করে রাখবোই বা কেন? তোর অংশের গাছগুলো কাটিয়ে নিয়ে আসবি। সেটাই বলতে এলাম।”
লখাই দাদার মতলব কিছু বুঝতে পারে না। বলে, “দাদা! আমার তো জায়গা নেই। ডালপালাগুলো কোথায় রাখবো!”
রাম সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, “সেটা তোর ব্যাপার। আমি কী করবো?”
কিছুক্ষন ভেবে লখাই জিজ্ঞেস করে, “কবে কাটবে?”
— “কাল থেকেই শুরু করবো।”
লখাই বলে, “তবে আমার ভাগেরগুলো কিছুদিন তোমার ঘরেই রেখে দিয়ো। দেখি কী করতে পারি। আর মজুরের যা খরচ সেটা আমি তোমাকে দিয়ে দেবো।”
— “শোন্ লখাই। আমি আর তোর কোনো দায়দায়িত্ব নেবো না। না আনলে রাস্তার ধারে ফেলে দেবো। তখন কিছু বলিস না।”
লখাই শান্তভাবেই বলে, ”একবার ঘরে এসো। একটু চা তো খেয়ে যাও।”
“আমার সময় নেই”, বলে গটগট করে চলে যায় রাম।
ঘরে ঢুকেই আদরিনীকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা বললো লখাই। আদরিণী তখন সাহাবাবুর ঘরে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বললো, “পরে বিস্তারিত শুনবো। তোমাকে ভাবতে হবে না।”
লখাই হাসতে হাসতে বলে, “ভাববো কেন! আমার ঘরে তো সর্বমঙ্গলা আছে।”
আজকের দিনটিই সময়। কাল থেকেই তো গাছকাটা শুরু হয়ে যাবে। অতএব যা ব্যবস্থা করার আজকের মধ্যেই করতে হবে। আদরিণীর পরামর্শে বটব্যালবাবুকে সব ঘটনা খুলে বললো লখাই। শুনে বটব্যালবাবু বললেন, “গাছের গোড়া ডালপালা সব এই ফ্ল্যাটের বেসমেন্টে এনে রেখে দিয়ো। দু’চারজন লেবারকে নিয়ে গিয়ে ওগুলো আনা করাবে। আমি বলে দিচ্ছি।”
তারপর বললেন, “কাঁচা কাঠ তো। ওই কাঠে এখন দরজা জানালা হবে না। পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ও নিয়ে ভেবো না।”
গাছকাটার লোকের যা মজুরি তার অর্ধেক দিতে হবে লখাইকে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই লখাইয়ের, অন্তত এই মুহূর্তে। ফলে এভাবেই নির্বিঘ্নে পেরিয়ে গেলো গাছকাটা আর ভাগবাটোয়ারার পর্বটি।
বটব্যালবাবুর বেসমেন্ট কাঠ ডালপালাতে ভর্তি হয়ে গেল। তারমধ্যে পশুখাদ্য হিসেবে অনেকেই ডালপালা নিয়ে কিছুটা সমস্যার সমাধান করে দেওয়ায় কিছুটা জায়গার সাশ্রয় হলো। অন্যদিকে, বটব্যালবাবুর প্রচেষ্টায় ডালপালাগুলো কাঠের আড়তে বিক্রি করে লখাইয়ের বেশ কিছু টাকাও এলো হাতে। সেই টাকা আদরিনীর অ্যাকাউন্টে জমা রাখলো লখাই।
লখাইয়ের ওপরে যেন সব দেবতাদের আশীর্বাদ ঝরে ঝরে পড়ছে। আপাতত কোনো বিঘ্নই তাকে স্পর্শ করতে পারলো না।
(২৬)
মজুরদের দিয়ে পুরো এলাকাটা পরিষ্কার করিয়ে নেয় সৌদামিনী। রাম তো সকাল সকাল কাজে বেরিয়ে যায় আর আসে দুপুরে, একবার খেতে। ঘন্টাখানেকের জন্য। তারপর সেই রাত দশটা। স্বভাবতই ঘরের যাবতীয় কাজ সৌদামিনীকেই করতে হয় কিম্বা লোক দিয়ে করাতে হয়।
এরই মাঝে যথাসময়ে ভাড়াটিয়া দম্পতিও এসে হাজির। ঘরের পরিবেশটাই পাল্টে যায়। বিশেষ করে ওই বাচ্চা মেয়েটার জন্য পুরো বাড়িটায় যেন সবসময় চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল সকাল ঘর থেকে বেরিয়ে যায় রাম। বেরিয়ে যায় ভাড়াটিয়া দম্পতিও। বাচ্চাটা থাকে ওই কাজের মেয়ে কাজলের তত্ত্বাবধানে। সৌদামিনও মাঝেমধ্যে মেয়েটাকে নিজের কাছে এনে আদর করে, খেলায়।
সামনেই দুর্গাপূজা। চারদিকে সাজ সাজ রব। বাড়ি বাড়ি জামাকাপড় কেনার ধুম। রাম সৌদামিনীর জন্য কিনে আনে একটা তাঁতের শাড়ি আর ম্যাচিং করা দুটো করে সায়া আর ব্লাউজ। সেইসঙ্গে ওই পুচকি মেয়েটার একটা ফ্রক। নিজের জন্য একটা লুঙ্গি আর গেঞ্জি। সৌদামিনী প্রায় জোর করে রামের জন্য একটা ফুলসার্ট আর একটা ফুলপ্যান্ট কেনায়।
পুজোর বোনাস পেয়ে ভাড়াটিয়া দম্পতি বাজার থেকে নিয়ে আসে দামী দামী পুজোর পোশাক। এনে সৌদামিনীকে দেখায়। খুব খুশি হয় সৌদামিনী। বলে, “তোমাদের চয়েস খুব সুন্দর। আমার তো খুব পছন্দ হ'য়েছে।”
দু’জনেই চাকরি করে। অভাব তো নেই। দামী দামী জিনিস তো কিনতেই পারে, সৌদামিনীর সেজন্য কোনো আফসোস নেই। সে ভাবে, “অর্থের অভাব থাক বা না থাক, কিছু যায় আসে না। মনের অভাব না থাকলে সেটাই পরম তৃপ্তি।” সেই পরম তৃপ্তি কি পেয়েছে সৌদামিনী? পেয়েছে কি তৃপ্তির প্রাচুর্য্! নাকি কোথাও একটা অতৃপ্তি কাজ করছে তার মনের গহনে।
সবকিছু মিলিয়ে দুটো সংসার বেশ মিলেমিশেই থাকে। কে বলবে ওরা বাড়িওলা-ভাড়াটিয়া! মাঝেমধ্যে সদর দরজায় তালা দিয়ে সৌদামিনী ওদের সঙ্গে কখনো পার্কে, কখনো আবার বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে।
এইভাবে চলছিল ভালোই। এর তরকারি ওর বাড়িতে, ওর তরকারি এর বাড়িতে, মানে ঘনিষ্ঠতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। যদিও রাম আর সৌদামিনী জানে এই মেলামেশা বেশিদিন স্থায়ী হবে না।
রমেশবাবু আর মনীষা ম্যাডাম এই বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে তিন কাঠা জমি কিনে বাড়ি বানানো শুরু করেছেন। স্বভাবতই বাড়ি সম্পূর্ণ হলেই তাঁরা নিজের বাড়িতে চলে যাবেন। এবং সেটা সম্ভবত মাস ছয়েকের মধ্যেই হয়ে যাবে।
রমেশবাবু বলেছেন যাবার আগে তিনি অন্য ভাড়াটিয়া ঠিক করে দিয়ে তবেই যাবেন।
“অন্য ভাড়াটিয়া কি এদের মতো হবে”,সৌদামিনী ভাবে।
সেসব ভুল ভাবনা। ভাড়াটিয়া আসবে যাবে। তা নিয়ে মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই।
কালের নিয়মে পেরিয়ে গেলো দুর্গোৎসব। অতিক্রান্ত শ্যামাপুজোও। বাতাসে শীতের গুঞ্জন। আর এমনিই একসময় রমেশবাবুরা বাড়ি ছাড়লেন। সেই করুণ স্মৃতি সৌদামিনীর মনকে প্রায়শই উদাস করে তোলে।
নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে বটে, তবে ওরা বেশি মিশুকে নয়। স্বামী-স্ত্রী দুজনের সংসার। স্বামী মাছের ব্যবসা করে। স্ত্রী গৃহিণী। ঘরেই থাকে। বিনা প্রয়োজনে বের হয় না। অথচ দেখতে অপরূপ সুন্দর। সে সৌন্দর্য চার দেয়ালের মধ্যেই আবদ্ধ রাখতেই পছন্দ তার। স্বামী ঠিক তার উল্টো। যেমনি ভুঁড়ি তেমনি তার কালো মিশমিশে গায়ের রং। গাট্টাগোট্টা।
রমেশবাবু গৃহপ্রবেশের দিন টোটো পাঠিয়ে সৌদামিনীদের নিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরবার সময় এক ভাঁড় রসগোল্লা সৌদামিনীর হাতে দিয়ে মনীষা বলেছিল, “দিদি। সময় পেলে আসবেন।”
সৌদামিনী চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছিল, “আপনারাও যাবেন।”
-— “আমাকে 'আপনি' ব'লবেন না। আমি আপনার বোনের মতো।”
সৌদামিনী চোখের জল আর আটকাতে পারলো না। 'ঠিক আছে' বলে রামের সঙ্গে টোটোতে উঠে বসলো। গাড়ি ছাড়তেই রাম 'আসছি' বলে রমেশের সাথে করমর্দন শেষে টোটোতে উঠলো তারপর ধীরে ধীরে ওরা অন্ধকারে হারিয়ে গেলো।
(২৭)
এদিকে অ্যাপার্টমেন্টের কাজ প্রায় শেষের দিকে। মেইন গেটের মাথায় জ্বলজ্বল করছে বাংলা হরফে মার্বেল পাথরে খোদাই করা সবুজ রঙের 'অভিষিক্তা' লেখাটি। রাত্রি হলেই সেটি ইলেকট্রিক আলোয় ঝলমল ক'রতে থাকে। নীল রং করা অ্যাপার্টমেন্ট, আশেপাশের ঘরগুলোকে ম্লান করে দেয়। পয়লা বৈশাখ উদ্বোধন হবে, সেইমতো প্রস্তুতি চলছে।
চৈত্রের দাবদাহে মাটির সেই সাবেকি ঘরে লখাইদের বড্ড কষ্ট করে থাকতে হয়। এখানে সেরকম আলো-বাতাস তো আসে না। বাড়িটা আলো-বাতাসের রাস্তায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরটির তিনপাশে তিনফুটের প্যাসেজ মাত্র। ফলে আলো-বাতাস আর আগের মতো আসা-যাওয়া করতে পারে না। “এইরকম ঘরে কি আর ভাড়াটিয়া আসবে!” —লখাই এই সমস্যার কথা বলে আদরিনীকে।
আদরিণী বলে, “তুমি তো দাদার মতো ভাড়াটিয়ার কথা ভাবছো। দাদার ঘরে তো বাথরুম আছে, ল্যাট্রিন আছে। আমাদের আছে? ওরা কি আমাদের মতো পুকুরে যাবে স্নান বা আরও আনুষঙ্গিক কাজ সারতে? তারচেয়ে অন্য কিছু ভাবলেও তো হয়।” তারপরই বলে, “আচ্ছা, ঘরটা যদি বিড়ি ফ্যাক্টরি হিসাবে ব্যবহার করি? কিছু শ্রমিক দিয়ে বিড়িবাঁধার কাজ করানো যায় দিনমজুরি দিয়ে, মন্দ হবে কি! সেই বিড়ি প্যাকেট করে হোলসেলে বিক্রি করতে পারলে দেখবে ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি রোজগার হবে।”
“এমন তো ভাবিনি”— লখাই বিস্ময় প্রকাশ করে। কিন্তু বিড়ি কেন! লখাই একটু থমকে যায়। এত সুন্দর একটা বিল্ডিং। আর তার পাশে একই বাউন্ডারীতে বিড়ি তৈরি হবে! বেমানান লাগবে না! তাছাড়া শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর একটা নেশার ব্যবসা অন্যের তো বটেই, নিজেদেরও মারণ রোগ ডেকে আনবে। লখাইয়ের মন সায় দেয় না।
লখাই কোনো বাড়তি ঝুঁকি নিতে চায়না। ব্যবসা মানে তো লাভ-ক্ষতি, দৌড়ঝাঁপ, মজুর নিয়ে ঝুট-ঝামেলা–কত কী। তারচেয়ে ভাড়া দেওয়াই উত্তম। লখাই চিন্তা করে, “যেমন ঘরই হোক্, সেরকম ভাড়াটিয়াও তো আছে। ঠিক জুটে যাবে।” কথাটা আদরিণীকে বলতেই আদরিনী হাসে। “তোমার কত যে চিন্তা! আগে তো ফ্ল্যাটে যাও, তারপর না হয় ভাববে! ঘরটা কিছুদিন তালাবন্ধ থাকলেই বা কী যায় আসে?”
তারপর লখাইয়ের পিঠ চাপড়ে বলে, “তোমার আদু আছে। আদু যাদু জানে। বুঝলে। সব গুছিয়ে দেবে তোমার সংসারের। তুমি বিন্দাস থাকো।”
লখাই ওর হাতটা টেনে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে বুকের কাছে এনে বলে, “তুই বেহুলা, আমি লখিন্দর।”
লখাইয়ের কাঁধে মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে আদরিণী বলে, “দারুন বললে তো।”
কথাটা সবসময় যেন আদরিনীর কানের কাছে বাজতে থাকে। বেহুলা-লখিন্দর। আহা।
কী সুন্দর নাম! কী করে যে মাথায় এলো লখাইয়ের। কথাটা মনে পড়লেই আদরিনীর অন্তরে একটা খুশির ঢেউ খেলতে থাকে। নামটা যেন সংসারের উত্থান-পতনে হারিয়ে না যায়—তাই লখাইকে দিয়ে 'বেহুলা-লখিন্দর' নামাঙ্কিত একটা নেমপ্লেট টিনের পাতে বানিয়ে এনে মাটির ঘরের সদর দরজায় পেরেক মেরে আটকে দেয়।
সেই নেমপ্লেট ওদের আসল নামগুলোকেই জনমানস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সবাই জেনে যায় লখাইয়ের প্রকৃত নাম লখিন্দর আর ওর বৌয়ের নাম বেহুলা।
যাদের কাছে এই নামের রহস্য অগোচরেই থেকে গেছে, তারা লখাইকে তাদের ইচ্ছেমতো সম্বোধন যুক্ত করে ডাকতে থাকে। যেমন, লখিন্দরদা, লখিন্দর কাকু–এইসব। আর আদরিণী হয়ে যায় বেহুলাদি, বেহুলা মাসি–এরকম।
সংসারের পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওদের নামগুলোও পরিবর্তনের আবর্তে হাবুডুবু খেতে থাকে।
নিভৃতে এই নাম নিয়ে তাদের মধ্যে মাঝে মাঝেই একটা মজাদার পরিবেশ সৃষ্টি হয় এই ছদ্মনামের রহস্য কোথাও উন্মোচন করবে না বলে একটা মৌখিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয় লখাই-আদরিনীর মধ্যে।
ওদের নাম যখন ছদ্মনামেই প্রচার হতে থাকে ঠিক সেই সময় একদিন সদর দরজা ভেতরের দিকে এক কোনে কাকতালীয় ভাবে একটা শঙ্খচিতি সাপ কুন্ডলি পাকিয়ে বসে থাকতে দ্যাখে আদরিনী। ঠিক ভোরবেলায়, ঝাড়ু দেওয়ার সময়।
আদরিনী খুব সন্তর্পনে সেখান থেকে বেরিয়ে লখাইকে ডেকে সাপটা দেখায়। এবং সাপটাকে বিরক্ত না করে সরে যায়। দু’জনের আলোচনায় ঠিক হয়, আজই রাতে এই ঘরে মা মনসার পূজা করাবে। সেইমতো লখাই পূজারী ঠিক করে।
চটপট সাহাবাবুদের ঘরে কাজ সেরে এবং সামান্য কিছু রান্না চুকিয়ে আদরিনী লখাইকে সঙ্গে নিয়ে পুজোর বাজার করতে বেরিয়ে পড়ে। যাবার আগে বটব্যালবাবুকে ঘটনাটা জানিয়ে আজ কাজে গরহাজির থাকবে বলে অনুমতি চেয়ে নেয় লখাই।
বাজারে দশকর্মা ভাণ্ডার থেকে পুজোর জন্য মধু, ঘি, দই, তিল, হরিতকি, ধুপ, প্রদীপ, লোহা, শাঁখা, সিঁদুর, এবং নানাবিধ নৈবেদ্য; ফুটপাথে বসে থাকা এক ফুলবিক্রেতার কাছে করবী, পদ্ম, মালতী ফুল আর সেইসঙ্গে বেলপাতা, তুলসী ও দুর্বা; আর পাশে বসে থাকা এক ফলওয়ালার কাছ থেকে একডজন পাকা কলা কিনে ওরা ঘরে ফেরে।
আদরিণী আজ জলস্পর্শ পর্যন্ত করেনি। একেবারে নির্জলা উপবাস। বাজার থেকে ফিরে ওরা দেখে, সাপটা যেখানে ছিল সেখানেই আছে। থাক। দুজনেই কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করে সরে যায় তৎক্ষণাৎ, নিঃশব্দে।
পুজোর জায়গাটা পরিষ্কার করে আলপনা আঁকে আদরিণী। কোথেকে সীজবৃক্ষের ডাল এনে পূজাস্থলে রেখে দেয়। বটব্যালবাবু শঙ্খ আর ঝাঁঝরের ব্যবস্থা করে দেন। পুজোতে তিনি আসবেন বলেও জানিয়েছেন। অ্যাপার্টমেন্টে যারা কর্মরত, তারাও সবাই আসবে। মোটকথা, ভিড় একটু ভালোই হবে বোঝা যাচ্ছে।
রাতে পুজো আরম্ভের প্রাক্কালে আদরিনী লক্ষ্য করে, সাপটা কুণ্ডলি থেকে মুখ বের করে পূজাস্থলের দিকে তাকিয়ে আছে আর মাঝেমধ্যে লকলকে জিভটা বের করছে। লখাইয়ের ভয় করে। আদরিনী সাহস যোগায়, “মায়ের কৃপা আছে। নইলে সাপটা তো চলে যেতে পারতো। মা মনসা স্বয়ং এসেছেন। একে তাড়িয়ে দিলে বা মেরে ফেললে ঘোর অমঙ্গল হবে। ভয় পেয়ো না। বরং ভরসা রাখো।”
লখাই প্রণাম করে।