গ্রামের এক ছোট্ট চায়ের দোকান –“গণতন্ত্র চা ঘর”। সেখানে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যে জমজমাট সভা বসে। সেখানে এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় –“কার নাম উঠলো, কার নাম উধাও হলো, কারা বেঁচে থেকেও ভূত হয়ে গেল, আর কার নাম তিনবার ঢুকলো!” সাথে এঁড়ে তর্ক, বাদানুবাদ, ফাজলামি, টোন – টিটকিরি।
মজনু মিস্ত্রি একদিন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল –“শুনেছিস, আমার নাম ভোটার লিস্টে নেই!”
পাশ থেকে সুবোধ বালক গোপাল বলে –“তা কী করে হয়? তুমি তো গত তিনটে ভোটেই তিনবার ভোট দিয়েছ!”
মজনু মাথা চুলকে বলল –“সেই জন্যই বোধহয় এবার বাদ দিল!”
সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
জ্বলজ্যান্ত ফাতেমা বিবিদের মতো অনেকেই সরকারি কাগজে মৃত। কাদম্বিনীদের এবার “মরিয়া প্রমান করিতে হইবে যে, তাহারা এতদিন জীবিত ছিলেন।” গোপাল কহিল – “তাহলে কি আমরা এখন ভূত?” এক ফিচকে ছোকরা ফিকফিক করে বলে ওঠে –“তোমরা ডিজিটাল যুগের অশরীরী আত্মা। তোমাদের অতৃপ্ত আত্মা ওদের গলা টিপে ধরবে, এই ভয়ে ডিজিটাল বাবুরা আতঙ্কিত।” সত্যি, ডিজিটালের ডিলিট ডেটার আঁচড়ে জ্যান্ত বেড়ালগুলো সব এক এক করে রুমাল হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে গ্রামের স্কুলশিক্ষক কমলবাবু বড় চিন্তায়। তাঁর নাম ভোটার লিস্টে আছে ঠিকই। তবে বয়স লেখা হয়েছে ২৪ বছর! তিনি পড়িমরি করে দৌড়ে গেলেন বিএলও-এর কাছে।
–“দেখুন, আমি ২৪ বছর ধরে পড়াচ্ছি, আর আপনারা আমাকে কিশোর বানিয়ে দিলেন? আমি কি হাঁসজারু, নাকি বকচ্ছপ?”
কাগজের পাহাড় থেকে মুখ তুলে বিএলও ম্যাডাম গম্ভীর মুখে বললেন –“দাদা, আমরা তো শুধু ‘ডেটা আপডেট’ করেছি। আপনি হয়তো মন থেকে এখনও তরুণ, তাই বয়সও কমে গেছে!”
কমলবাবু হতবাক। অন্যদিকে গ্রামের এক প্রবীণ ব্যক্তি, নবীন কাকা, হঠাৎ খুব খুশি। কারণ, তার নাম এবার ভোটার লিস্টে তিনবার এসেছে!
তিনি গর্ব করে বললেন –“দেখ, গণতন্ত্রে আমার গুরুত্ব কত বেড়েছে!” তার নাতি বললে –“কাকা, তাহলে তুমি তিনবার তিন জায়গায় ভোট দেবে?”
নিতাই কাকা চোখ টিপে বললে –“যতসব বোকা হাঁদার দল। জানিস না, গণতন্ত্রে সুযোগ এলে কাজে লাগাতে হয়?”
এদিকে বড় বিপদে পড়েছে টিনা। সে নতুন ভোটার হতে গিয়েছিল। কিন্তু ফর্ম জমা দেওয়ার পর জানতে পারল –তার নাম উঠেছে ঠিকই, কিন্তু নাম হয়েছে ‘টিনু কুমার’। সরকারি দপ্তরে সে এখন থেকে পুরুষ!
সে ক্ষুব্ধ হয়ে অফিসে গিয়ে বললে, “এইসব আবোল তাবোল হচ্ছেটা কি?”
অফিসার শান্ত গলায় বললেন –“দেখুন, কত কিছুই না হয়। এ’ও হয়, তা’ও হয়! সবই তাঁর ইচ্ছে! আমরা তো কেবল যন্ত্র।” টিনার বিরক্ত ও গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে বিরস বদনে অফিসার আবারও কহিলেন –
“আজকাল লিঙ্গ পরিবর্তন খুব সাধারণ ব্যাপার। আমরা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলছি। নাহলে তো আবার অন্য চাপে পড়ব।”
রিনা চিৎকার করে বলে –“আমি তো কিছুই পরিবর্তন করিনি!” অফিসার মিটিমিটি হাসলেন –“সেটাই তো সমস্যা! সিস্টেম নিজেই আপডেট করে নিয়েছে। যন্ত্রের বুদ্ধি বলে কথা!”
হতভম্ব টিনা রাগে গজরাতে গজরাতে পথে নামে।
ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুর থেকে, জঙ্গল সুন্দরী
ঝাড়গ্রাম, কোলাহময় কোলাঘাট, মায়াময় মায়াপুর, হাস্যময় হাসনাবাদ, চঞ্চলা চম্পানগর হয়ে জমকালো কালিয়াচক, কল্লোলিনী কোলকাতা, লাস্যময়ী লবনহ্রদ –সর্বত্র একই ছবির ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তি। একটাই বয়স্কোপ- এর টুকরো টুকরো ছবি দিয়ে যেন তৈরী হয়েছে একটা বলিউড মার্কা অবাস্তব কাহিনী। কাহিনীকার নিভৃতে বুনে চলেছে এক লোহার জাল। সেই জাল কেটে বেরোনো মহা মুশকিল।
এরপর গ্রামে মহা আলোড়ন ওঠে। অনেকেই বলাবলি করছে, কেউ বা ফিসফিস করে বলছে, আবার কেউ বা নীরবে নিভৃতে উচ্চারণ করছে –
“যাদের নাম লিস্টে নেই, তারা নাকি ‘অদৃশ্য নাগরিক’ হয়ে গেছে!”
গ্রামের এক কলেজ পড়ুয়া মেয়ে দোরে দোরে গিয়ে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করে। সে বারেবারেই বলতেই থাকে –
এই কাগজ ঐ কাগজের পিছনে মানুষকে যুতে দিয়ে, ধর্মের পিটুলি গোলা গিলিয়ে সমাজ থেকে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন করে সামাজিক মানুষকে একক ব্যক্তির ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার বিষবৎ চক্রান্ত চলছে। এই বিষবৃক্ষকে সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। নইলে আমাদের নিস্তার নেই। জীবনে শান্তি নেই। মরে, বেঁচে থাকতে হবে আমাদের।
সে আরও বলে –লক্ষ লক্ষ মানুষকে বাইরে রেখে, আগামীদিনে বেনাগরিক করে ভোটে জিততে জাল গুটিয়ে আনছে ওরা। ওদের দরকার বেগার শ্রমিকের এক বিপুল বাহিনী। যাদেরকে দিয়ে ‘দেশের স্বার্থে' যেকোন সময় যেকোন কাজ করিয়ে নেওয়া যায় অতি অল্পমূল্যে। যারা আধুনিক যুগের দাস শ্রমিক। ভোটার, আধার, রেশন কার্ড, ব্যাংক-অ্যাকাউন্ট বিহীন আমাদের এই সহনাগরিকদের ডিটেনশন ক্যাম্পে গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি করে পঁচে মরতে হয়। দেশের তরে জীবনও বলিদান দিতে হয় তাদের।
কেউ বলার চেষ্টা করছিল –এই বেশ ভালো আছি। মেনে নাও। মানিয়ে নিতে শেখো। বেশী জানতে নেই। সব জেনে গেলে পিছিয়ে পড়তে হয়। কিন্তু তার কথা মিলিয়ে যায় এক চিৎকারের ঠেলায়।
সভার মধ্যে গুঞ্জন, কলরব, কোলাহল ছড়িয়ে পড়ে। সমস্বরে সকলে জোড়ে কণ্ঠ ছাড়ে –
এসব অন্যায় অবিচার অপমানের বিরুদ্ধে মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করলেই তেঁনারা-এনারা, আইন-আদালত, পুলিশ- প্রশাসন, কেন্দ্রীয় বাহিনী, সবাই গেল গেল রব তুলে মানুষের বিরুদ্ধে তেড়েফুঁড়ে আসে। এরা গণতন্ত্র, সংবিধান ও মানবতার বিরোধী। এরা ভোট ছাড়া আর কিছু বোঝে না।
কোথা থেকে কে যেন বলে –‘ছয় না নয়’, কী একটা ফরম ইদিকে ম্যাজিক দেখাল কদিন ধরে। বানের জলে ভেসে বাংলায় এসে পৌঁছে গেল হাজার হাজার ভিন রাজ্যের ঠিকানা। কমিশনের কোলে তারা গচ্ছিত রেখে গেল তাদের নিশ্চিত ঠিকানা। কিসে কী হয়, কে জানে?
এইসব খবর শুনে মজনু মিস্ত্রি, নিতাই কাকা, টিনা, সুলতানা বেগম, হরেন বাগদীরা ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে। রাতের ঘুম উবে গেছে তাদের। গ্রামে মিটিংয়ের পর মিটিং। নো ইটিং। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয় –“এবার পথে নামতেই হবে। আর পিছনোর জায়গা নেই। আমরা আজ কোনঠাসা। লক্ষ লক্ষ মানুষকে তালিকার বাইরে রেখে ভোট হয় কীভাবে? অনৈতিক, অসাংবিধানিক এবং বেআইনি এই তালিকা আমরা মানছি না। লিস্টে সকলের নাম তুলতেই হবে। তার আগে আমরা ভোট করতে দিচ্ছি না। পলিটিক্যাল দাদা দিদিদের এখানে নো এন্ট্রি।”
তারা রাত পাহারা দেয়। নিজেদের মধ্যে কথা বলে, আলোচনা করে। তর্কবিতর্কও চলতে থাকে।
সেই ফিচকে ছোকরা আবার হাজির। সে বললে –“গণতন্ত্রে আমরা ভোট দিই, আর ভোটার লিস্ট আমাদের নিয়ে খেলা করে!” রাখাল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললে –“এটাই তো আসলী গণতন্ত্র। যেখানে নাগরিকরা লাইনে দাঁড়ায়, আর লিস্ট নিজের মতো করে হাঁটে!”
চায়ের দোকানে হাসির রোল ওঠে। কিন্তু সেই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে রইল এক গভীর মর্মবেদনা –
“আমরা কি সত্যিই লিস্টে আছি বা আদৌ থাকব শেষ পর্যন্ত? নাকি লিস্টই আমাদের নিয়ে মারণ খেলায় মেতেছে? আমাদের ভোটে এতদিন যারা জিতে এলো, তারাই এখন দেশের নাগিরিকদের ডি-ভোটার করে ছুঁড়ে ফেলতে চায় আবর্জনার স্তূপে। এর জবাব ওরা পাবেই। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।”
রাত গভীর হলে দূরে, বহু দূর থেকে পাগলা মেহের আলীর খাপছাড়া কণ্ঠ ভেসে আসে –“তফাৎ যাও, তফাৎ যাও। ইতিহাস কথা কইছে। ইতিহাস চিরকাল মানুষের কথা বলে।”
রাত শেষে ভোর হয়। ঘন অন্ধকার ভেদ করার নব রবির নব কিরণ ছড়িয়ে পড়ে দিগন্তে।
সূর্যোদয়ের রক্তিম আভা মেখে বাসা ছেড়ে বেরিয়ে আসা পাখিরা ডেকে ওঠে –ওঠো, জাগো। জাগতে রহো।