পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ছায়া ভূত

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : বিশ্বজিৎ সরকার
মহিম গাঙ্গুলী ব্রাঞ্চে ঢুকতেই নানান ব্যস্ততার মধ্যেও যথারীতি তাকে লক্ষ্য করল ২২ বছর ধরে কর্মরত গ্রুপ স্টাফ সুরেশ যশ।আসুন আসুন, বসুন-বলে তার দিকে এগিয়ে গেল।মহিম বাবুও ব্যস্ততার সঙ্গে বলল–“না না আজ বুসার বেশি সময় লাই,ই রাস্তা পেরিয়ে যাছিলুম ,ভাবলুম তুদের নতুন ম্যানেজার এয়েছে তাই একবার দেখাক করে যাই”।

- হঁ হঁ এইয়েছেন যখন দিখ্যাটা কর‍্যেই লিন।

মহিম ভেবেছিল সুরেশ তাকে ম্যানেজারের কাছে নিয়ে যাবে। সেরকমটাই তো হয়ে আসছে।কিন্তু এবারে সুরেশের সেরকম আগ্রহ না থাকায় একটু অবাক হয় মহিম। কিছু না বলে নিজেই এগিয়ে যায় ম্যানেজারের চেম্বারের দিকে। কিন্তু ঢোকার মুখে দেখে সামনের  চেয়ারে বসে তার পাশের গ্রামের দুজন প্রান্তিক চাষী ভুবন টুডু আর সোনাই মেটে। প্রান্তিক চাষী হলেও এরা জন মজুর।কেমন বাবু সেজে এভাবে চেয়ারে বসে থাকতে দেখে তার মনে হাসি এল,কিন্তু সেই হাসি চেপেই ঢুকল মহিম গাঙ্গুলী। এই লোকগুলো কবে ম্যানেজারের কেবিনের চেয়ারে বসেছে সে কথা মনে করতে পারল না মহিম। মহিম গাঙ্গুলী ঢুকতেই ভুবন টুডু ও সুরুল মেটে উঠে দাঁড়ায়। ম্যানেজারের চোখ অবশ্য কম্পিউটারে নিমগ্ন থাকায় মহিম গাঙ্গুলীর উপস্থিতি টের পায় না। কিন্তু সামনে বসা চেয়ারের দুই মানুষ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে একটু শব্দ হওয়াতে মুখ ফিরিয়ে বলে ওঠে- কি আপনারা উঠে গেলেন?আর ঠিক তখনই চোখ গেল এই তৃতীয় ব্যক্তি মহিম গাঙ্গুলীর প্রতি।চোখাচোখি হতেই মহিম গাঙ্গুলি বলে উঠলেন –‘নমস্কার ,আমি পঞ্চায়েত সভাপতি মহিম গাঙ্গুলী্’।মহিম গাঙ্গুলী্কে ম্যানেজার প্রতি নমস্কার করে বসতে বললেন চেয়ারে ।এতক্ষণ বুঝতে পারলেন সামনের দুজন মানুষদের উঠে দাঁড়ানোর রহস্য। এখন পাশাপাশি তিন চেয়ারে তিনজন। তিনজনই একটু অস্বস্তিতে, টের পেলেন ম্যানেজার বাবু এই অস্বস্তি কাটাতে মহিম গাঙ্গুলির উদ্দেশ্যে কথা পাড়ল ম্যানেজার- বলুন আপনার কথা, কিছু সমস্যা?

“-না,না কুনো সুমস্যা নাই। ই রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছি তাই মুনে কুরলাম একবার দেখা করেক যাই। কানে ইল আপনি কলকাতা থ্যাইকা আইছেন তবে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। বুলতে কি বাইরের কেউ তো ইখানে এখন কেউ আসতেই চাই না। এমন জায়গাটা খারাপ করে দিল না শালারা। আর বুলবেন নাই। তবে হাঁ, এখন উসব ঠাণ্ডা মশাই। দুটো একটা চীটেক ফাটেক আছে তবে আমার লোকদের কেউ ঘাঁটাতে আর সাহস করে না। বিডিও সাহেব, গ্রামীন মায়ানেজার, সুস্যাল অফিসারদের কি ভয় ছিল, আমি সে সব ভয় কাটিয়ে দিয়েছি  এই আপনার ফিল্ড অফিসার দুবেজির কী ভয় কী ভয়। আমাদের এই সুরেশ ওকে নিয়ে এল আমাদের অফিসে। বললাম -চোখ বুজা থাকুন। তো ই ব্যাঙ্কেরই কত ঘটনা, অই সুরেশের কাছে প্রতি মাসে মাসে ব্রাঞ্চে ঢুকে ঢুকে টাকা নিয়ে গেছে শালারা '’ । বিপরীত প্রান্তের মানুষটির কাছ থেকে এখনো পর্যন্ত কোন প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় এবার থামে মহিম বাবু।প্রসঙ্গে পালটে বলে -তাই আর কি ম্যানেজার বাবুর কাছে দিখাটা করিয় লিই।

-আসলে কাজের চাপ, তাই এখনো সরকারি অফিসে ভিজিটে যেতে পারি নি, তবে যাব শীর্ঘ্রই।ম্যানেজারেরর কথাকে শেষ করতে না দিয়ে সভাপতি বলে – ‘ই কাজের চাপ তো আপনি নিজেই বাড়িয়ে লিচ্ছেন মায়ানেজারবাবু।সুবাই যদি আপনার চেম্বারে ভিড় করে তাহলে তো ভিজাল বাড়বেই”।ভুবন টুডু আর সুরুল মেটে এভাবে চেয়ারে বসে আছে দেখেই যে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির এমন উক্তি সেটা বুঝতে বাকি থাকে না অভিজ্ঞ ব্যাংক ম্যানেজারের’। ক্ষনিক চুপ থেকে বলে-“আসলে এটা সরকারি ব্যাংক, এখানে সকলের অবাধ প্রবেশ এবং যদি তার সমস্যা কাউন্টারের বা অফিসারের কাছে না মেটে তাহলেতো তারা ব্যাংক ম্যানেজারের কাছেই আসবে। আমি বলেছি কোন কাস্টমারের কোন অসুবিধা হলেই যেন সে সরাসরি চলে আসে। যাক সে কথা,বলুন আপনার কোন সমস্যা !আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নাম্বার কত”!

 -না আমার তো ইখানে  কুনো ব্যঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই।

 -সে কি! এত কাছে আপনাদের ব্যাঙ্ক অথচ আপনার ব্যাংক একাউন্ট নেই ! একটা ব্যাঙ্ক একাউন্ট খুলুন মশায়, বলেই ফর্মটা বাড়িয়ে দেয় সভাপতির হাতে, আর কোন কোন জায়গায় সই করতে হবে সেটাও দেখিয়ে দেয়।

-আমার তো খোদ ঝাড়গ্রাম শহরেই দুটো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট, আবার ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট”!কথাটা পেড়েও কিছুটা অনিচ্ছা সত্বেও ফর্মটা নেয় সভাপতি।

ম্যানেজার ভুবন টুডুর সমস্যার দিকে নজর দিতে সভাপতির সাথে কথা আর গড়ায় না। সভাপতি বোকা হাঁদা হয়ে মিনিট খানিক বসে থাকার পর -আজ চুলে যাই পরে দিখা হবে -বলে সিট ছাড়ে।

মোটরসাইকেলে ভুল জায়গায় ক্লিকে পা টা মেরে দিতেই মহিম গাঙ্গুলী বোঝে আরেকটু হলেই কেটে ছড়ে যেত তার পা। এরকম ভুল হয় না কিন্তু আজ এই ভুলটাই হলো কারণ এই ব্রাঞ্চটাকে আজ যেন তার নতুন লাগলো। সেই অন্যমনস্কতা থেকেই তার ভুল জায়গায় ক্লিক ।দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনীতির সাথে যুক্ত মহিম গাঙ্গুলী।যে দল ক্ষমতায় এসেছে ঠিক সেই দলে পাল্টি খেয়ে নিজের অবস্থান অটুট রেখেছে  মহামান্য গাঙ্গুলী মহাশয় । শুধু এলাকা যখন মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল হয়ে গিয়েছিল তখন দু'বছর ঝাড়গ্রামে ডেরা বেঁধেছিলেন তিনি। তারপর সেই হাওয়া একটু থিতু হতেই আবার ভিন্ন জামায় ধীরে ধীরে শের হয়ে উঠেছেন এই নেতা। এই নেতা বিভিন্ন অফিসে এমন একটা ইমেজ তৈরি করেছেন যে তিনি এই এলাকার বহিরাগত সরকারি চাকরিদের রক্ষাকর্তা। মাওবাদী রোষ আক্রমণের থেকে বাঁচতে গেলে তাকে শরণাপন্ন হতেই হবে ,আর এই ধারণাকে বদ্ধমূল করেছে বিভিন্নঅফিসের কিছু অসাধু ভীতু স্টাফেরা। দ্বিতীয় ক্লিকের স্টার্টে গাড়িতে চড়ে চকচকে কালো পীচ রাস্তা ধরে এগুতে এগুতে সে ম্যানেজারের কথা ভেবে চলেছিল।কয়েক বছর আগেও এরাস্তায় চলা দায় ছিল, এখন এখানে উন্নয়নের ঢালাও আয়োজন হিসেবে এই রাস্তার এই নতুন রূপসজ্জা।কিন্তু এই মসৃন রাস্তাতেও মহিমের গতি শ্লথ ।কেননা তার মাথাতে তখন ম্যানেজার -ম্যানেজার বেটা গভীর জলের মাছ। নিজের দর বাড়াচ্ছে, আরে বেটা এটা নিলাম বাজার নয় রে। এখানে দর কমা বেচা কেনা চলে না, বেলা বেড়ে গেলেও-- ।

কল্যাণ সেন অন্যদের থেকে আলাদা। উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য গ্রাম ভিন্দারায় তিন বছর পোস্টিং থেকে কলকাতা এসে অন্তত তিন বছর তার থাকার কথা কিন্তু এক বছরের মাথাতেই অফিস থেকে পাঠিয়ে দিল রায়গঞ্জে। এ নিয়ে অবশ্য কোন ভ্রুক্ষেপ নেই তার। কেননা সে জানে তাদের তো ট্রান্সফারেবল সার্ভিস, এনি হোয়ার ইন ইন্ডিয়া। সেই শর্ত মেনেই তো তার চাকরি সুতরাং তার অফিস তাকে কোথায় দেবে এটা তাদের ডিস্ক্রিয়েশন।তাই তার বাইরে থাকতে কোন অসুবিধা হয় না,বরঞ্চ বিভিন্ন জায়গার ঘোরার সুত্রে এক অদ্ভুত আনন্দে জীবনটাকে উপভোগ করে।বিভিন্ন জায়গার মানুষের জীবনযাত্রা তাদের ভাবনা আচার রীতি এগুলো সে খুব প্রত্যক্ষভাবে জানতে পেরে সমৃদ্ধ করে নিজের ভাবনাকে । তাই উপরিওয়ালাদের আদেশে অনবরত ট্রান্সফার নিয়ে তার কোন কষ্ট নেই।তবে সংসার ফেলে স্ত্রী এবং কন্যা পুত্রদের ছেড়ে থাকতে একটু মন খারাপ করে এই যা।কিন্তু এটাতো চাকরি তাই এটা নিয়ে শুধু শুধু মাথা ঘামায় না। যদিও তার এই ট্র্যান্সফার নিয়ে মাথা ঘামায় তার ম্যানেজমেন্ট এবং তার ইউনিয়ন।কোথায় দিলে সঠিক হয় এটা ঠিক করতে তারা যথেষ্ট সময় নষ্ট করে। তাই একবছর না কাটতে কাটতে রায়গঞ্জের টান্সফার। । কিন্তু সেখানেও কাটল না বছর। ইউনিয়ন থেকে ক্রমাগত তার নামে অভিযোগ আস্তে থাকে সার্কেল এইচ আরে। তার অপরাধ ,এই ব্রাঞ্চের সাব স্টাফকে বাধ্য করেছিল ঠিক সময়ে ব্রাঞ্চে এসে অফিস টাইম পর্যন্ত থাকতে। এই সাব স্টাফ এলাকার শাসক দলের সাথে যুক্ত থাকায় নিজেকে যেমন কেউকেটা মনে করত যেমন, তেমনি অন্যদের ও প্রভাবিত করে ব্রাঞ্চের পরিবেশকে বদলে ফেলেছিল। বর্তমান সার্কেল এইচ আর ম্যানেজমেণ্ট এ সব ঝামেলায় এখন মাথা ঘামানো সময় অপচয় ভেবে তাকে তোলার কথাই ভাবছিল। আর সেই সু্যোগটাই চলে এল খুব তাড়াতাড়ি। কারন জঙ্গলমহলের বিহুজুড়ি ব্রাঞ্চ তিন মাস ম্যানেজার বিহীন। সার্কেল এইচ আর থেকে যাকে দেওয়া হয়েছে বিহুজুড়ি ব্রাঞ্চে সে জয়েন করে নি। ভিন রাজ্যের এই ম্যানেজারের কানে ঢুকে গেছে, এখানে নাকি জঙ্গলের রাজত্ব, খুন জখম লেগেই আছে। তাই সে ইউনিয়ন ধরে অন্য ব্রাঞ্চ ম্যানেজ করে নিয়েছে। অতএব লোক পেতে আর দেরি করেনি ম্যানেজমেণ্ট। এমন জায়গায় পোস্টিং পেতে একটু অবাকই হয়েছিল কল্যাণ।যদিও এটা ম্যানেজমেন্ট এর তরফ থেকে পানিশমেন্ট ট্রান্সফার তবু তার কাছে এটা রিওয়ার্ড মনে হয়েছিল ।প্রথমত রায়গঞ্জ তার কাছে ওয়ান নাইট জার্নি, সে ক্ষেত্রে বিহুজুড়ি থেকে ঘন্টা চার পাঁচের মধ্যে চলে আসা যায় কলকাতায়। এছাড়া আছে জঙ্গলমহলের বিচিত্র জীবন পদ্ধতি, তার অরণ্যময় পরিবেশ ভূপ্রকৃতি বিস্তৃতভাবে চেনার অবকাশ ।এইসব অনুকূল পরিবেশে তাই মাওবাদী সন্ত্রাসের ছায়া তার মনে আচ্ছন্ন করেনি…।

অবশ্য জয়েন করার সাথে সাথেই এ ব্যাপারে অনেক গল্প শুনেই সে যাচ্ছে অনবরত।-“স্যার একটু সাবধানে থাকবেন। আন্দোলন শেষ হয়ে গেলেও ভেতরে ভেতরে সব আছে। যতই বলুক না জঙ্গলমহল হাসছে কিন্তু পরিস্থিতি ঠিক নয় স্যার। একটু বুঝে শুনেই চলতে হবে আমাদের” ।এক মাসের মধ্যেই বেশ কিছু কাস্টমারও শুনিয়েছে রোমহর্ষক অনেক গল্প ।তার সাবস্টাফ সুরেশ এবং একজন পুরনো ক্লার্ক নিত্যনতুন শোনায় পুরনো দিনের গল্প যা নিমিষেই ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে। কল্যাণের এসব শুনতে খারাপ লাগেনা, এও তো এক অভিজ্ঞতা- সত্য মিথ্যা ভালো-মন্দের গল্প সে বিচার করে যুক্তি বোধের অন্তরে ।অফিসের পুরো দায়িত্ব বুঝে নিতে বেশ কিছু দিন চলে যাওয়ায় সেই হিসেবে জায়গাটা সেভাবে বুঝে উঠতে পারেনি এখনো।পায়নি প্রবাহমান জীবনের রসদ ।তবে একটা জিনিস বুঝেছে মাওবাদী ভয় এখানে বেশ সজ্ঞানে অজ্ঞানে চালু রয়েছে এবং তার ফাইদা লুটতে নেমে পড়েছে অনেকেই। তার এই ব্রাঞ্চের কথাই ধরা যাক না কেন, এখানে  মধ্যেই ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায় এবং তার পূর্ণ সুযোগটা অফিসার এবং অন্য স্টাফেরা সব চেয়ে বেশি নেয় ।সবচেয়ে মজার ব্যাপার যে এন পি এ মানে অনাদায়ী ঋনের ব্যাপারে ব্যাঙ্ক সিরিয়াস সেখানে এই ব্যাঞ্চে কোটি কোটি টাকা অনাদায়ি থাকলেও সেই দিকে কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই এবং উপরওয়ালার কাছেই এভাবে প্রজেকশন করা হয়েছে যে এখানে আর কোন রিকভারি করা যাবে না, এটা সন্ত্রাসবাদী এলাকা এখানে রিকোভারি করতে গেলে প্রান সংশয়ের আশঙ্কা।অনাদায়ী ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকের ম্যানেজার ও এগ্রিকালচার অফিসারদের উপর একটা চাপ থাকে। বিভিন্ন কন্ট্রোলিং অফিস থেকে আসে ফোন কিন্তু সে দেখল এখানে সেভাবে কোন চাপ নেই, হয়তো বর্তমান পরিস্থিতিতে এরকমই এই ভেবে উপর ওয়ালাদের কিছু আল্গা ভাব।কিন্তু অবস্থা এরকম নয়, কিছু দিনের মধ্যেই তার এই উপলব্ধি। সে ভাবে  ম্যানেজার হিসেবে তার তো দায় আছে অন্যদিকে নাগরিক হিসেবেও তার মনে হয়েছে এই যে কোটি কোটি টাকা অনাদায়ী পড়ে আছে সে তো সাধারণ মানুষেরই টাকা। তার কিছু করা দরকার! অতএব রিকোভারির কাজটাই প্রধান্য দেওয়া মনে করে ।

রিকভারি !-স্টাফ মিটিংয়ে তার এই মন্তব্যে সবাই চমকে উঠে। বলে কি ম্যানেজার !রিকভারি ?অসম্ভব। এগ্রিকালচার অফিসার বলেই বসে –স্যার গলা কাটকে নদী মে ফেল দেঙ্গে। কহি জরুরত নেহি”। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের নানান যুক্তি প্রযুক্তি কুযুক্তি অর্ধসত্যর কাছে জয় হয় প্রফেশনাল দায়বদ্ধতা এবং নাগরিকবোধের শুভ চেতনা। ম্যানেজার পালা করে অফিসারদের নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে রিকভারিতে।

মূল রাস্তার দু দিকের বিস্তীর্ণ মাঠে সবুজের সমারোহ।থরে থরে সাজানো কপি ক্ষেতের সারি ,দূর থেকে দেখা যায় পাতা ঘিরে মধ্যে থাকা সাদা হলুদ ফুলকপি ।কোথাও বা লকলকে পুঁই মাটি বেয়ে এগিয়ে চলেছে। আবার রাস্তা পেরুতে পেরুতেই এসে যাচ্ছে গাছ গাছালি ঘেরা গ্রাম। গ্রাম ছাড়িয়েই সামনে পড়ছে এলায়িত কংসাবতী নদী। এই নদীর কুল ভরা জল নেই, বুকে নেই ঢেউ। এলায়িত শরীর নিয়ে ধীর গতিতে দেখে শুনে সে খুঁজে নিচ্ছে তার পথ। নদীর পাড়ে হঠাৎই ভগ্নপ্রায় দু একটা মন্দির। জৈন সংস্কৃতির প্রাচীন অবশেষ এখন তার অস্তিতবের শেষ প্রাণবিন্দুটাকে জানান দিচ্ছে।ভিজিটে বেড়িয়েই এমনই সব দৃশ্য চোখে পড়ে কল্যাণের। অদেখা কে দেখার আনন্দ আছে, ভিজিটে এসে সেই আনন্দের ছোঁয়া পায় সে। নদীর পাড় ছেড়ে গ্রামের ভেতরে ঢুকলেই অবশ্য চোখে পড়ে সম্পন্ন ঘরের দালান বাড়ি ।সেই দালান বাড়ির লাগুয়া খামারবাড়িতে ট্রাক্টর হ্যান্ড ট্রাক্টর কারো আবার চারচাকা।মোটামুটি সব গ্রামেতেই এরকম দু দশজন সম্পন্ন ধনী গৃহস্থের দেখা মেলে ।এছাড়াও মাটির ছোট বড় বাড়িও কম না।তবে মাথা গোঁজা থাকার মতো ছোট আশ্রয়ের বাড়িরই আধিক্য। এইরকম এমন একটা বাড়িতেই প্রথম ভিজিটে নিয়ে গিয়েছিল তার অফিসার। সেই কাস্টমার নাকি বেপাত্তা, তাকে নাকি মাওবাদীরা গুম করে দিয়েছে। আবার একটু ছেড়ে আর এক বাড়ি যেখানে দেখা মেলে জন্মাবধি মানসিক ব্যাধি সম্পন্ন এক যুবকের, যার বাবা  রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। যখনই বড় অফিস থেকে কেউ এসেছে ভিজিটে, বিগত তিন চার বছর শেয়াল ছানার মত এই দুটি কাস্টমারের বাড়ি দেখিয়েই চলেছে রিকোভারি ভিজিট। এই দুটি ঘর ব্যাঞ্চের পাশের গ্রামের ,অন্যান্য দূরে দূরে গ্রামের অবস্থা নাকি আরো খারাপ, এমনি চালু ধারনা। কল্যাণ কিন্তু  কয়েকদিনের ভিজিটেই জেনে ফেলেছে এটা বাস্তব নয়, এরকম অনাদায়ি খুব কম, নেই বললেই চলে। ক্ষুদ্র প্রান্তিক চাষীদের লোন এখানে খুবই কম।সম্পন্ন চাষীদেরই লোনই বেশি। লোন শোধ করার মত অবস্থা তাদের যথেষ্টই আছে কিন্তু লোন শোধ হয় না। উপরন্ত একই যৌথ পরিবার পরিবারের অন্যদের নামে পর্চা বার করে লোন নিয়েছে ।কম্পিউটার থেকে এ তথ্য বার করা একটু কষ্টসাধ্যই ।কিন্তু প্রত্যক্ষ রিকভারিতে এসে তার এই অভিজ্ঞতাই হয়েছে ।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অবস্থায় যে এমন তদারকি হবে সেটা কেউ ভাবতেই পারিনি। তাই শুরু হয়ে যায় গুঞ্জন ।গ্রামের অবস্থাপন্ন চাষীরা জট পাকাতে শুরু করে। হাত মেলায় ছোট বড় অনেক... ।

দ্রুতই শুরু হয়ে যায় ম্যানেজারের মুন্ডুছেদের পালা। আশপাশের এইসব সুবিধাভোগীরা দ্রুত তৎপর হয়ে উঠে। ছোট বড় নেতার মধ্য দিয়ে ব্যাপারটা ঘণীভুত হতে বেশি সময় লাগে না। সকলে ভিড় জমায় পঞ্চায়েত সভাপতি এর কাছে। পঞ্চায়েত সভাপতির রাগ এমনিতেই ছিল।

একে তো প্রথম সাক্ষাৎকারটা খুব একটা সুখপ্রদ ছিল না তার কাছে দ্বিতীয়তঃ সরকারি রেকোমান্ডের দুটো লোন প্রপোজাল রিজেক্ট করে দিয়েছিলেন এই ম্যানেজার। কেননা এই ম্যানেজার বাবু ভিজিটে গিয়ে দেখেছিলেন এমন ইউনিটই নেই। এতবড় আর্স্পদা!। তবে মানেজারকে কিছু বলতে সাহস পায়নি! পোড় খাওয়া পঞ্চায়েত সভাপতি জানে এই সব সরকারি অফিসার দের সরাসরি সবক শেখাতে গেলে আসে নানান-বিপত্তি। তাই ঘুরিয়ে করতে হয্‌, জনগন কে দিয়ে মানুষের নামে। সামান্যতম ভুল্ভ্রান্তিকে খাড়া করে দুর্নীতির দায়ে কালো কালির ফোয়ারা ছুটিয়ে।সেই সুযোগটাই খুঁজছিল সভাপতি।

৫ 

যারা নিজেরা কোন সু্যোগ সুবিধার ভাগ নেয় না, সততাকে যারা জীবনের মুলধন ভেবে পথ চলে তাদের হৃদয় প্রায়শই কেঁদে ওঠে অন্যদের জন্য , বিশেষ করে সহজ সরল মানুষদের জন্য। আর এর জন্য তারা বিপদে পড়ে প্রায়শই। আমাদের গল্পের ম্যানেজারের হৃদয়ও মাঝে মধ্যেই কেঁদে উঠে এই সব মানুষদের জন্য। সেদিন বেলা চারটে, অফিসের প্রাত্যহিক লেনাদেনার কাজকর্ম প্রায় শেষের দিকে, ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে। এমন সময় ঢুকলেন এক প্রৌঢ। পরনের কাপড় হাঁটু পর্যন্ত তোলা, খালি পা, মুখে বেশ কয়েকদিনের দাড়ি। সারা শরীরে কর্মঠ ভাঁজ। পরনের হাফ হাতা জামার বাঁদিকের হাতের উপরিভাগে পুরনো কাদার ছোপ।হাতে একটা জমির দলিল ।–“ম্যানেজারবাবু দশ বছর ধুরে আমাদের এই ব্যাঙ্ক থেইকে লোন লিচ্ছি, শুধ করি আবার লিই।

কিন্তু আজ বুলল আমার লোন হোবে না্‌আমি লাকি বুড়ো হয়ে গেছি! আমি বুড়ো তালে আমি সুকাল ছটা থেকে কি করে মাঠে বারোটা তক কাজ করি ! নিজের হাতে কুদাল চালিয়ে বেগুন গাছে মাটি দিই! পিঠে দশ লিটারের ড্রাম চাপিয়ে কপি ভুঁইএ স্প্রে করি! বুড়ো হয়ে গেলে কি ইসব হুতো “!- এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম ছেড়ে সে তার কর্মঠ দুটো হাত তুলে ধরে কল্যাণ্যের সামনে। কল্যাণের চোখ যায় তার সবল বাহুর দিকে। রক্তের স্বাভাবিক চলাচলে পুরষ্ট সেই বাহু। এখনো বেশ শক্তপোক্ত চেহারা ।অথচ ভোটার কার্ডের বয়স অনুযায়ী তার লোন পাওয়ার কথা না এমনই হুকুমনামা তার অফিসারের ।তাই দশবছর ধরে ব্যাঙ্কে জমা রাখা দলিলটাও ফিরিয়ে দিয়েছে। প্রৌঢের মাথায় হাত। এক বিঘা জমির আলু চাষ চাট্টিখানি কথা না, অনেকগুলি টাকা দরকার সেই টাকা না পেলে জমি হয়তো পড়েই থাকবে। কল্যাণ ধীর ভাবে কথা বলে বুঝল, সমস্যাটা একটু জটিল কেননা প্রৌঢের কোন ছেলেপুলে নেই। মেয়েদের বিবাহ হয়ে গেছে তাই কোন গ্যারান্টারও নেই ।বিভিন্ন ধরনের লোনেরই একটা বয়স সীমা থাকে সেই বয়স ছুঁয়ে গেলে তিনি আর সেই লোনের যোগ্য নন। এখানে অবশ্য নামে বেনামে প্রচুর লোন ,সেই সব লোন দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী ।সেই হিসেবে এটা নগণ্য ,কোন নিয়ম ভাঙ্গা নয় কারচুপি নয় একেবারে প্রকৃত চাষীর কাছেই কৃষিঋনের সুবিধা দিতে হবে এমনই ব্যাঙ্কের গাইডলাইন, আর সেই বার্তাই তার অফিসারকে দিয়েছে কল্যাণ। তাই ভদ্লোককে লোন না দিয়ে অফিসার ফেরত দিয়েছে তার দলিল।

কল্যান কম্পিউটার থেকে পুরনো রেকর্ড দেখে বোঝে, এই প্রৌঢ ব্যাংকের একজন প্রকৃত কাস্টমার যে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করে চলেছে। তার মাথায় কখনোই উঁকি মারে না টাকা মেরে দেওয়ার ধান্দা।কম্পিউটার থেকে দেখল তিনি শুধু সুদ মিটিয়ে দিয়ে রিনুয়াল করেন না্‌, তিনি মেয়াদ শেষের কিছু আগেই প্রায় সবটাই শোধ করে দেন এবং তার পর আবার নেন। প্রৌঢের এই  করুন আর্তি কল্যানের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। একজন প্রকৃত চাষী, জীবনভর মাটি আর ফসলের গন্ধেই যার জীবন, জীবনের বেশি সময় যে মাঠেই কাটায় এবং এখনো মাটি যার প্রাণ, সরকারি আইনের গাঁটে এখন যেন তার মাটি থেকে নির্বাসনের ফতোয়া। এই ভদ্রলোক দেখেন নি তার বয়সের হিসেব কেননা মাটি তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে তার বয়স। কিন্তু আজ সে জানতে পেরে কি দুরের মৃত্যুকেও কী উপলব্ধি করছে, এও মৃত্যু ভয়ও কি তার রক্তস্রোতে প্রবাহিত ! এই আর্তির মধ্যেও কি সে ভয়ের ক্ষীন সুর !মরমী আত্মবান কল্যানের মাথায় এই সব ভাবনা বাসা বেঁধে ওঠে দ্রুত। একদিকে হৃদয়ানুবৃত্তি অন্যদিকে পেশাগত নিয়ম শৃঙ্খলাবোধ এই দুই সত্তার ডানা ঝাপটাতে লাগল তার মনে। হৃদয়ানুভুতির ভাবোচ্ছাসের প্রাবল্যে ভেঙে গেল তার পেশাগত শৃঙ্খলা বোধের শৃঙ্খল। নিয়ম ভেঙ্গেই লোনটা দিতে মনস্থ করল কল্যাণ।পরের দিন লোনটা দিয়েও দিলেন।এক বছরেরর মধ্যে তো লোন শোধ হয়ে যাবে এর মাঝে ইনসপেকশন এলে বোঝানো যাবে- এই ভাবনাটাও কাজ করল তার মনে। তবে অফিসারকে আর জড়ালেন না, তার সই বাদ দিয়ে  হল এই লোন। কিন্তু অফিসার কে না জড়ালেও এই ঘটনাটি সুন্দর রং চড়িয়ে বাইরে যেতে দেরি হল না। এই শুভক্ষণটির জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন সভাপতি।

স্টেজ ও অভিনেতারা সব প্রস্তুত ছিল, শুধু দিনক্ষণই বাকি ছিল। সেই শুভ দিন যে এত তাড়াতাড়ি চলে আসবে এটা ভাবতে পারে নি সভাপতি। তাই লোনের তিন দিনের মাথায় শুরু হল সেই শুভক্ষণ। ব্রাঞ্চ খোলার এক ঘণ্টার মধ্যেই ব্রাঞ্চের চারদিকে ভিড় জমে গেল। এই ভীড়ে আছে অসংখ্য অনাদায়ি লোনী, অনেক ছোট বড় নেতা আর ব্যাঙ্কের সাথে সম্পর্ক বিহীন বেশ কিছু ছেলে ছোকড়া। অনেকের হাতে প্ল্যাকার্ড, তাতে কালো কালিতে লেখা - 'দুর্নীতি গ্রস্ত ম্যানেজার দূর হটো’। নিয়ম ভেঙে লোন দিয়ে জনগনের টাকা নিয়ে ছিনি মিনি খেলা চলবে না’ “কৃষি ঋন মুকুব করতে হবে’। “ঋন আদায়ের নাম করে প্রকৃত গ্রাহকদের হেনস্থা করা হচ্ছে কেন জবাব দাও” ইত্যাদি।

প্ল্যাকাডে লেখা এই সব শ্লোগানে মুখরিত হল চত্বর। এমনকি হঠাৎ এক মস্তানগোছের মধ্য যুব নেতার মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এল শ্লোগান –‘মাওবাদী প্রশ্রয়কারী ম্যানেজার নিপাত যাক’ ।কল্যাণ তার জানলার ফাঁক দিয়ে লক্ষ্য করতেই খেয়াল করল শ্লোগান উত্থান কারীরা শ্লোগান শেষে বেশ বিরতি নিয়ে রাস্তার দিকে লক্ষ্য রাখছিল কারো আসার প্রতীক্ষায় ।যেন আরো কেউ আসবে এমন ।ঠিক তাই হল।শুরু হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে এলেন সভাপতি ,সঙ্গে একজন যুবক যার হাতে ছিল একটা ডি এস এল ক্যামেরা। জেলা সংবাদদাতার রিপোটার। রিপোটার ফাটাফট ছবি খিঁচতে লাগলেন । সভাপতি তড়াক করে ব্রাঞ্চের গেটের উঁচু সিঁড়িতে উঠে বলতে শুরু করলেন –‘বন্ধুগন আপনাদের ই রাগ আমরা বুঝি, কিন্তু মনে রাইখবেন এ ব্যাঙ্ক আপনাদের লিজস্ব, আপনারা শান্ত হুন, আপনারা কইয়েকজন আসুন, আমরা কথা বলি ভেতরে’। কথা বলার লোক আগে থেকেই ঠিক হয়ে ছিল। তাই বলা মাত্রই তিনজন গটগট করে এগিয়ে এল। তিন জনকে নিয়ে সভাপতি চলে গেল ম্যানেজারেরর কাছে  –“জনগন খেপেই গ্যাছে আপনার বিরুদ্ধে, আপনি না ডেকেছেন পুলিশ না দিয়াছেন আমাদের খবর। ই ব্যাঙ্ক আপনার লয়, আর ই সম্পত্তি যদি জনরোষে লষ্ঠ হয়ে যায় তখন কি আপ্নার মজা হবে ! অদ্ভুত ঢ্যাডা তো আপনি। –তার কথাকে শেষ করতে দিল না কল্যাণ –দেখুন ব্যাঙ্কের বাইরে মানুষ শান্তিপুর্ণ ভাবে বিক্ষোভ জানাচ্ছে, এটা তাদের গনতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। আর তা ছাড়া আমাদের প্রহরী গেটে সব নজর রাখছে, এখুনি পুলিশ ডেকে উত্তেজনা সৃষ্টির মানে নেই”। কথায় ছেদ পড়ল একটা ফোন আসাতে। সভাপতির ফোনটা বেজে ওঠায় শোনা গেল ও প্রান্তের গলা -স্যার আমি যাই তাহলে।সভাপতি বলতে থাকে –হাঁ হাঁ যাও যাও তাহলে –তবে দিখো জিলায় যেন না যায়, মিনে ঢোকানোর ব্যবস্থা করো’। কল্যাণ এ কথার ধরতাই খুঁজে পায় না। তবে আলোচনা চলতে থাকে।

জেলায় নয়, প্ল্যাকার্ডের ছবি সহ তার ব্রাঞ্চের বিক্ষোভের খবর একেবারে মুল পত্রিকার রাজ্যের পাতায়।সাত সকালের খবরের কাগজে দেখতে পেয়েই কালকের সভাপতির ফোনের ওই কথার মানে পরিষ্কার হয়ে যায় কল্যানের কাছে।তার মানে জেলার পাতায় এলে সে খবর তাদের বড় সাহেবেদের নজরে নাও আসতে পারে।তাই এই সাবধানের ব্যবস্থা ।যথারীতি খবরটা সারকেল এইচ আর সহ কলকাতার অফিসের অনেক বড় কর্তার নজরে এল ।এইচ আর এ আলোচনা শুরু হয়ে যায় -সত্যিই আর পারা যায় না।কিন্তু কোথায় দেওয়া যায় একে!না পাওয়া গেছে! সুন্দরবনের ছোটমল্লাখালির অদুরে বাওখালির ম্যানেজার অনেক দিন মেডিক্যাল গ্রাউণ্ডে।দেরি না ’অতএব পরদিনে্র মেলেই কল্যাণ পেয়ে যায় ইমিডিয়েট ট্রান্সফারের অর্ডার।

মোটর সাইকেলের পিছনে বসে কল্যাণ ,আর পিছে তার মিডল সাইজ আমেরিকান টুরিস্টের ব্যাগ। বেশ কষে বাঁধা ।চালকের জায়গায় তার পুর্বতন ব্রাঞ্চের রান্নার ছেলে সমীর ।পূর্বতনই কেননা মেলে অর্ডার আসার পরই সে গতকাল বিকালে রিলিভ হয়ে গেছে ।আজ সাত সকালেই বেড়িয়ে পড়েছে কলকাতার উদ্দেশ্যে। তার সাথী হয়েছে সমীর । সে তার স্যার কে পৌঁছে দিতে চলেছে ঝাড়গ্রামে ।এখানে বাস নেই বল্লেই চলে,তাও আবার ঘন্টা দুয়েকের ব্যাপার ,অথচ নদী পেরিয়ে বাইকে গেলে মোটামুটি ৩০-৩৫ মিনিটে যাওয়া যায়।তাই সে স্যারের সঙ্গী হয়েছে। কল্যাণ মানা করেছিল, সে শোনেনি ,বলেছে পৌঁছে দিয়েই সে ১০টার আগেই চলে আসবে। ।১০ মিনিটের মধ্যে কংসাবতীর চরে এসে পড়ে তাদের দু চাকার যান। তার পর নদীর চরে সামান্য বালি ঠেলে বাঁশের সাঁকো। বাঁশের সাঁকোতে গাড়িটা ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে সমীর। তার পিছনে কল্যাণ। শেষ হেমন্তের সকাল নটা, সাঁকোর বাঁশে দু এক বিন্দু শিশির তখনও জমে। সরু বাঁশের দুই ফাঁকের মধ্যবর্ত্তী জায়গায় তাদের ক্ষীন অস্তিতব চোখে পড়ছে কল্যাণের। সকালের কিরণ রশ্মি এখনো শুষে নিতে পারে নি সব বিন্দু ।নিচে নিস্তেজ জলোচ্ছাস, কেবল যেন প্রাণের স্পন্দন নিয়ে মৃদু মন্দ শব্দে এগিয়ে চলেছে কংসাবতীর ঢালু গাবাল ধরে। কল্যাণের চোখ চরের মধ্য হলুদ হয়ে যাওয়া কাশের স্তুপের দিকে। ভাদ্রের কাশের ঝোপ এই কার্ত্তিকেও এখনো নিচের পলি থেকে রস নিয়ে প্রাণের শেষ লড়াইয়ে উপস্থিত। দূরের কূলের দিকে তাকাতে তাকাতে তার মনের মধ্যে গতকালের শ্লোগানটা হঠাৎ মনে পড়ে যায়। একটা শ্লোগান কে মেলাতে পারছিল না সে, মাওবাদী প্রশ্রয়কারী বলে শ্লোগানটা কেন দিল! গতকাল রাতেও বেশ কয়েকবার ভেবেছে কিন্তু তার কোন কারণ খুঁজে পায় নি। এই ভাবনা তে ছেদ পড়ে সমীরের কথায় –“স্যার আপনার পার্সোনাল নুম্বর থেকে ইকবা্র কল করে দিইন, ঢুকাইয়া লিই আমারটাতে’। সমীরের কথাতে কথা পাতে কল্যান - বল তো ওরা আমাকে মাওবাদী প্রশ্রয়কারী কেন বলল। “স্যার এটা তো সুজা ব্যাপার। এখন এটাই ইখানের রেওয়াজ স্যার -গাইনে গাইনে সুর না মেলালেই বনপাটি। আরো ইকটা কথা আইছে- উ লুকটার মানে যার লোন হুলো, তার মিজ জামাই তো মাওবাদী হয়ে পুলিশের সাথে লড়াইয়ে মরে গ্যাইছে। ই কথাটা আপনি জানেন না বটে কিন্তু উরা তো জানে, তাই বুলল ।তবে মরে গিলে কি হবে স্যার, উহাদের বড় মাওবাদী ভুতের ভয়। “ফাসির গাবালে” মানে আমরা যিখানে নদীতে নামলাম, সাঁজ সন্ধ্যেই এখান কার পোধান কে নাকি ভূত হয়ে আটকেছিল অউর মিজ জামাই”  কল্যাণ ফিক করে হেসে উঠল।  

 

0 Comments

Post Comment