এমনিতেই কাজের বাইরে কথা বলা তিনি বিশেষ পছন্দ করেন না । তাই আজ কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার দিনেও তার কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি । খুব অল্প কথায় সহকর্মীদের ধন্যবাদ এবং সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কমলিনী বাড়ি ফিরে এলেন।
বাড়ি বলতে ছোটখাট একটা ঝকঝকে দু কামরার ঘরে তাঁর একার সংসার । সামনে রুমাল সাইজের একফালি বাগানে পালংশাক, ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা।
অনেককাল ধরে কমলিনী একা, একেবারে নিঃসঙ্গ। তবে তাঁর জীবনে যে অভাব আছে তা নয় ।
টাকাপয়সার সমস্যা নেই, নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো দু চারজন কাজের লোক আছে । তারা নিয়ম করে এসে ঘরের কাজ করে দিয়ে চলে যায়।
নিজের প্রতি বিশ্বাস কমলিনীকে এতদূর টেনে এনেছে।
দু দুটো ভয়ঙ্কর ঝড় তাঁর জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছিল।
এমবিবিএস পাশ করার পরে যে মানুষটাকে কমলিনী ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন সেই মানুষটাই একদিন অন্য কারো ভালবাসার টান আর উপেক্ষা করতে না পেরে কমলিনীকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
ততদিনে অবশ্য দোলনায় শুয়ে থাকা ফুটফুটে একটা মেয়ে তাঁর দিনের অনেকটা সময় দখল করে নিয়েছে।
বছরখানেকের মধ্যেই আবার একটা মর্মান্তিক আঘাত কমলিনীকে একেবারে ভেঙেচুরে দিল ।
সামান্য দুদিনের জ্বরে সন্তানের মৃত্যুটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। তারপর অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের ওপর নির্ভর করেই বেশ কিছুদিন চলতে হল।
ক্রমশ ওষুধের ডোজ বেড়ে চলেছিল আর এসবের মধ্যেই কমলিনী বুঝতে পারছিলেন এবার যে করেই হোক ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ঘুরে দাঁড়ানোটা অবশ্য সহজ ছিল না।
নিজেকে ফিরিয়ে, গুছিয়ে নিতে মরীয়া কমলিনী অনেক চেষ্টার পরে দিল্লীর একটা সরকারী হাসপাতালে জয়েন করলেন। তারপর সেখানে বেশ কয়েকটা বছর চাকরী করার পরে একটা রোদঝলসানো দুপুরে তিনি যখন লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলীর মাটিতে পা রাখলেন তখন সেই শহরের তাপমাত্রা প্রায় সাতচল্লিশ ডিগ্রী।
বিকেলের এই সময়টা কমলিনী রোজই খবরের কাগজ পড়েন। তারপর কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিয়ে টেবিলে এককোণায় রাখা একটা ছবির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। ছবিটা তাঁরই তোলা। বেশ কয়েকবছর আগে। লিবিয়া থেকে দেশে ফিরে ছবিটা বাঁধিয়ে তিনি বসার ঘরের টেবিলে রেখে দিয়েছেন।
প্রথম দিকে এই ছবিটাই দেখতে দেখতে মনে একটা আশা জাগত। মনে হত, হয়ত কোনদিন, কখনো আবার ফাতিহার সঙ্গে দেখা হবে, কিন্তু আজকাল আর তেমন মনে হয় না। গোটা ব্যাপারটাই এখন একটা অর্থহীন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ।তবে ছবিটা আজও তাঁকে ঠিক আগের মতোই টানে। পুরোনো কথাগুলো রোজ মনে পড়ে। সেই নিষ্পাপ একটা মুখ, সেই বিষণ্ন বিদায় তাঁকে আজও বিমর্ষ করে।
বারো তেরো বছর আগে কমলিনী যখন লিবিয়া গিয়েছিলেন তখন জায়গাটা সমন্ধে তাঁর তেমন কোন ধারণা ছিল না । সময়টাও খুব সহজ ছিল বলা যায় না। লিবিয়ার স্বৈরাচারী শাসক মুয়াম্মার গদ্দাফিকে তার কিছুদিন আগেই হত্যা করা হয়েছে। গোটা দেশ জুড়ে তখনো বেশ থমথমে একটা অবস্হা।
ঠিক সেই সময় ভারত সরকারের একটি মেডিক্যাল টিমকে লিবিয়ার তৎকালীন সরকারের অনুরোধে সেখানে কিছুদিনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। আর সেই দলের একজন ছিলেন ডাক্তার কমলিনী মিত্র ।
নিজেরা একটা অভিজাত হোটেলে উঠলেও, তাঁদের যেখানে কাজ করতে যেতে হতো সেই জায়গাটা একটু ভেতরের দিকে। একটা সরু গলির মধ্যে ছিল বাড়িটা। দিনদুপুরে যেতেই কেমন যেন শরীর ছমছম করত। পুরোনো একটা একতলা বাড়ি। নামেই হাসপাতাল আসলে একটা মান্ধাতা আমলের প্রায় ভেঙে পড়া অন্ধকার, ঘুপচি দালান বাড়ির মধ্যে পায়রার মতো খুপরি খুপরি ঘর।
আর সেই স্তব্দ্ধতা ঘিরে ধরা হাসপাতালে ঢোকামাত্র, ধুলোমাখা মেঝেতে বসে থাকা যে মানুষগুলো ডক্টর মাদার আর ডক্টর ব্রাদারদের দেখে উঠে দাঁড়াত তাদের দেখলেই মনে হতো জীবন থেকে আশা শব্দটা বাদ দেওয়ার কৌশলটা তারা আয়ত্ত করে ফেলেছে।
ফাতিহার সঙ্গে কমলিনীর যখন দেখা হয়েছিল তখন ওর বয়স বছর পনেরো - ষোলর বেশি হবে না । একদিন সকালবেলায় ভিড়ে ঠাসা হাসপাতালে ছোট্ট একটা রাউন্ড দিয়ে সবে কমলিনী নিজের ঘরে ঢুকতে যাবেন এমন সময় একটা আবছা গোঙানির শব্দ এসে তাঁর কানে এসে ধাক্কা দিয়েছিল। মুখ তুলে তাকাতেই চোখে পড়ল, লিকলিকে একটা মেয়ে কোনরকমে টেনেটুনে একজন মাঝবয়সী লোককে নিয়ে হাসপাতালে ঢুকছে। লোকটা জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, শরীরের ভার প্রায় সবটাই ছেড়ে দিয়েছে মেয়েটার ওপর। একটা পা নেই লোকটার , দেখলেই বোঝা যায় সোজা হয়ে দাঁড়াবার শক্তিটুকু পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই।
আর সেই লোকটাকে সামলাতে গিয়ে মেয়েটা টলছে। এলোপাথাড়ি পা ফেলে হাঁটছে, কোনরকমে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে লোকটাকে। মেয়েটার চেহারায় শীর্ণ রুক্ষতা, চোখের কোণায় গাঢ় কালি। দেখলে মনে হয় নিজের শরীরের হাল একেবারেই ভাল নয়। আর কিছু ভাবার সময় পায়নি কমলিনী । দৌড়ে গিয়ে লোকটাকে ধরেছিল।
“ক্যান ইউ হেল্প আস মাদার ? “ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে প্রশ্ন করেছিল মেয়েটা। আর মেয়েটার দিকে তাকাতেই এক মূহূর্তের জন্য থমকে যাওয়া কমলিনীর মনে হয়েছিল এমন বিষণ্ন মুখ তিনি আগে কোনদিন দেখেননি।
মেয়েটার মুখে ক্লান্তির ছাপ বড় বেশি রকমের স্পষ্ট। একরাশ ক্লান্তি আর ঔদাসীন্য মিলেমিশে এক অদ্ভুত নির্বিকার ভাব ফুটে উঠেছে ওর চোখমুখে। যেন পৃথিবীর কোন ব্যাপারেই তার আর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
একটু কৌতূহল হয়েছিল ঠিকই তবে তখনই সোজাসুজি কিছু জিজ্ঞেস করতে অস্বস্তি হচ্ছিল। তারপর কী ভেবে নিজেই যেচে গল্প শুরু করলেন মেয়েটার সঙ্গে।
"তোমার নাম কী ?" কানে স্টেথো গুঁজে লোকটার বুক পরীক্ষা করতে করতে মেয়েটার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখে প্রশ্ন করলেন কমলিনী ।
"ফাতিহা," নিষ্প্রাণ দুটো চোখ দিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেয়েটা যন্ত্রের মতো জবাব দিয়েছিল ।কমলিনীর বুকটা কেন জানি না দুলে উঠেছিল।
ঠিক দু বছর তিন মাসের জন্য যে মেয়েটা পৃথিবীতে এসেছিল তার মুখটা আজকাল আবছা হয়ে গেছে। শুধু দোলনায় শুয়ে থাকা সেই ছোট্ট মেয়েটার খিলখিল হাসিটা মাঝেমাঝে কানে বাজে।
কিন্তু এতকাল পরে এক নিদারুণ গ্রীষ্মের সকালে ত্রিপোলীর এই সরকারী হাসপাতালে কমলিনীর যার সঙ্গে দেখা হল তাকে সেদিন দেখে তাঁর মনে হয়েছিল জীবন থেকে একে কিছুতেই বাদ দেওয়া যায় না।
তারপর থেকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বাবাকে দেখতে দুবেলা চলে আসত ফাতিহা। ঠায় বসে থাকত বাবার পাশে। আর প্রায় নির্বাক মেয়েটাকে দেখতে দেখতে ওর জীবনটা নিয়ে কমলিনীর কৌতূহল হতো । তাই একদিন ইতস্তত করতে করতে জিজ্ঞেস করেই ফেললেন। "তুমি স্কুলে যাও না ?"
ফাতিহা এক মূহূর্তের জন্য মাথা নীচু করল । তারপর ঠান্ডা গলায় বলল , "আই ওয়াজ এ স্লেভ। অ্যা স্লেভ অফ আওয়ার গাইড।" ভীষণ চমকে গিয়েছিলেন কমলিনী। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়েছিল নিজেকে সামলে নিতে। এখানে আসার পরে তিনি গাইড শব্দটা অনেকবারই শুনেছেন। স্হানীয় লোকেরা যে গদ্দাফিকে গাইড বলে ডাকে সেটা ততদিনে তাঁর জানা হয়ে গেছে।
তারপর কেমন করে যেন ফাতিহা আর কমলিনীর সম্পর্কটা সহজ হয়ে গেল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কমলিনী নিজেই সময় বের করে নিতেন। বসে বসে কথা বলতেন মেয়েটার সঙ্গে। আর কথা বলার লোক পেয়ে বোধহয় ফাতিহা নিজেও খানিকটা স্বস্তি বোধ করত ।
একদিন কথায় কথায় বলেছিল, “জানো মাদার, আমি ছোটবেলায় রক্ত খুব ভয় পেতাম। “আর তাই বোধহয় প্রথম ঋতুকালীন ভয়টা বড় বেশি ছিল। এত ভয় পেয়েছিলাম যে দুটো দিন স্কুলে যেতে পারিনি।
মা অবশ্য ভয়টা ভাঙিয়ে দিয়েছিলেন , স্পষ্ট করে সবটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
আর তার দুদিন পরে যখন স্কুলে গেলাম তখন বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। অবাক হয়ে দেখেছিলাম আমাদের স্কুলটা পুরোপুরি বদলে গেছে ।
এই দুদিনেই কেমন যেন ভোল পাল্টে গেছে স্কুল বাড়িটার। সাজানো গোছানো ক্লাসরুম, ঝকঝক চকচক করছে চারদিক। এমনকি রাতারাতি বাড়ির দেয়ালে এলোমেলো রঙ করা হয়েছে। দেখলাম সবাই খুব খুশি, খুব উত্তেজিত ।
অবাক হয়ে সবাইকে প্রশ্ন করেছিলাম। আর তখনই জানতে পারলাম সেদিন গাইড আমাদের স্কুল পরিদর্শন করতে আসছেন। তারপর অনেক পরিকল্পনা, অনেক আলোচনার পরে, শেষমেষ আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। ঠিক হল গাইডকে স্বাগত জানিয়ে তাঁর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেওয়ার দায়িত্বটা আমাকে দেওয়া হবে। আনন্দে, উত্তেজনায় চুপ করে বসে থাকতে পারছিলাম না। কিন্তু তখন জানতাম না তার পরেই সব শেষ, সবটা অন্ধকার।
মাঝখানে মোটে একটা দিন। তারপরেই খুব ভোরে একটা হৈচৈ এর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। জানলা দিয়ে মুখ বাড়াতেই দেখলাম গাইডের সৈন্যরা আমাদের বাড়ির চারিদিক ঘিরে ফেলেছে। কারো কোন কথা শোনেনি ওরা, আমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।
আর সেদিন থেকেই আমার মুয়াম্মার গদ্দাফির হারেমে পাকাপাকিভাবে ঠাঁই হল, আরও অসংখ্য অসহায়, অত্যাচারিত কিশোরীর সঙ্গে।
সেদিন ফাতিহা অকপটে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলে গিয়েছিল।
খুব কষ্টের ছিল সেই সময়টা। দিন নেই রাত নেই, যখন তখন গাইডের ঘরে তার ডাক পড়ত। বুনো , জেদী, তেজী ঘোড়ার মতো মেয়েটাকে বাগে আনার জন্য ভীষণ হিংস্র হয়ে উঠত গাইড।
ঠিক শিকারী বাঘ যেমন করে তার শিকার ধরে সেভাবেই ফাতিহাকে চেপে ধরত গাইড। যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠা মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিত বিছানায়। তারপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ত। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসত ফাতিহার।
প্রতিবাদ করেছিল ফাতিহা। আর সেই প্রতিবাদ গদ্দাফিকে আরও ক্ষেপিয়ে তুলেছে। আরোও আরোও অনেক বেশি হিংস্র হয়ে উঠেছে লোকটা।
একবার পালাতে গিয়ে ধরা পড়েছিল ফাতিহা। হাতেনাতে ফল মিলেছে। নাকেমুখে, পেটে এলোপাথাড়ি লাথি আর ঘুঁষি সহ্য করতে করতে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটেছে, উপুড় হয়ে পড়ে গিয়েছে মেঝেতে। এক ঝটকায় গাইড তাকে টেনে তুলেছে, গাইডের হুকুমে তখন নগ্ন অবস্হায় ঘুরে ঘুরে নাচতে হয়েছে ।
তারপর জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা সারা শরীরে নিয়ে টলতে টলতে যখন ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে তখনই পেয়ে গিয়েছে খবরটা। কাটারি দিয়ে দুটুকরো হয়ে যাওয়া বাবার একটা পা ফাতিহাকে দেখতে বাধ্য করা হয়েছে। ততদিনে অবশ্য চিরদিনের মতো মাকে হারিয়েছে ফাতিহা।
কথাগুলো শুনতে শুনতে শিউরে উঠত কমলিনী। অসম্ভব কষ্টে ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেত। রাগে, আক্রোশে ফেটে পড়ত। মাঝেমাঝে মেয়েটাকে নিয়ে দেশে ফিরে যাওয়ার একটা অবাস্তব ভাবনা মনে ছোটাছুটি করত। তারপর নিজের ওপর নিজেরই ভয়ানক রাগ হত।
এভাবেই নানা ঘটনায়, হাজার ব্যস্ততায় দিন কেটে যাচ্ছিল। হাসপাতালে কাজের চাপ, অবসরে ফাতিহার সঙ্গে টুকটাক গল্পগুজব। দিনগুলো তখন বাঁধা ছকের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে।
তারপর একদিন এক নির্মেঘ বিকেলে কমলিনী যখন কাজের পাহাড় থেকে মুখ সরিয়ে টেবিলে রাখা একটা পুরোনো মেডিক্যাল জার্নাল নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন ঠিক তখনই দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিল ফাতিহা ।
"কী খবর ? আজ এত দেরী হল যে ?" কমলিনীর ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসি ফুটেছিল ।
"তোমার জন্য নিজের হাতে বানানো ডোনাট এনেছি মাদার," ফাতিহা একটা কাগজের ঠোঙা তাঁর দিকে এগিয়ে দিল।
হয়ত আরোও কিছু বলত কিন্তু তার আগেই ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকেছিলেন ডাক্তার তনুকা সারাভাই , কমলিনীর সিনিয়র।
হাঁপ ধরা গলায় বলেছিলেন , “গেট রেডি ডিয়ার। উই হ্যাভ টু লীভ নাউ। দেশ থেকে খবর এসেছে । কাল ভোরেই আমাদের দিল্লী ফিরে যেতে হবে। গভর্নমেন্ট ওয়ান্টস আস টু রিটার্ন ইমিডিয়েটলি । সিকিওরিটির আ্যাস্পেকটা নিয়ে বোধহয় কিছু প্রব্লেম হয়েছে , …”তনুকার চোখে ভয় আর উত্তেজনা।
একটা ধাক্কা খেয়েছিলেন কমলিনী। এখানে থাকতে থাকতে ভুলেই গিয়েছিলেন থাকার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। বোধহয় ফাতিহার সঙ্গ আর ওর মায়ামাখা মুখটাই একটা দখিনা বাতাসের কাজ করেছে মনে। কমলিনী আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে ফাতিহা। মুখটা ফ্যাকাশে , রক্তশূন্য।
ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল কমলিনীর। বোধবুদ্ধি কিছুই কাজ করছিল না। কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে শরীর। বুকের ভেতরে বয়ে চলা তিরতিরে এক নদীতে যেন আচমকা প্রচন্ড ঢেউ উঠেছে । জলোচ্ছাসে ভেসে যাচ্ছে চারিদিক।
অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলেন। ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই আবার চোখ পড়ল ফাতিহার দিকে। দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ফাতিহা, দুটো চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে।
কমলিনী টের পেলেন ফাতিহাকে তাঁর ছুঁতে ইচ্ছে করছে। তিনি পায়ে পায়ে ফাতিহার দিকে এগিয়ে গেলেন।
"ক্যান ইউ স্টে উইথ মি , মাদার ?" ফাতিহা হাঁটু মুড়ে কমলিনীর পায়ের কাছে বসে পড়েছে । কমলিনীর বুকের ভেতরে একটা মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছিল। ধু ধু , সীমাহীন, দিকচিহ্নহীন এক মরুভূমি।
দ্রুত বেরিয়ে গাড়িতে উঠলেন কমলিনী। মাথা নামিয়ে স্হির হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ।
তারপর গাড়িটা রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকালেন। গেটের কাছে তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল অসহায় একটা মেয়ে, যে জীবনে শুধু সুস্হভাবে বাঁচতে চেয়েছিল।
গাড়ি দ্রুত ছুটে চলেছে। রাস্তার দুপাশে দোকানপাট এখনও বন্ধ।
রাস্তার বাঁকে গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আবার মুখ বাড়িয়ে দেখলেন কমলিনী। ঝাপসা চোখে দেখলেন তখনো ঠিক একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে ফাতিহা। গাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে দম দেওয়া পুতুলের মতো তখনো হাত নেড়ে চলেছে।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। কমলিনী সামনের গোল টেবিলে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। দিনান্তের এই সময়টা তিনি সামনের বাগানে একটু পায়চারী করেন। অনেকদিনের অভ্যাস। তবে আজ আর বেরোলেন না ।
নির্মেঘ আকাশ হঠাৎই ঢেকে গেছে কালো মেঘে। চারিদিকে এখন জমাটবাঁধা, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। এখন আর বাইরে না বেরোনোই ভাল।
"তোমাকে দুটো বিস্কুট দেবো ?" কাজের মেয়েটা চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকেছে।
কমলিনী কোন কথা না বললেন না। তিনি জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিলেন।
এই মেঘলা বিকেলে একরাশ জলভরা মেঘ অজান্তেই তাঁর বুকের ভেতর তখন ঢুকে পড়েছে।
কল্পনার চোখে অনেক দূরে দেখতে চাইলেন কমলিনী। দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। শুধু মনে হল দূরে , অনেক দূরে, বহুদূরে এক অভিমানিনী মেয়ে তাঁকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে, যেন কিছু বলতে চাইছে তাঁকে।
কমলিনী কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করলেন কিন্তু শুনতে পেলেন না। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে টেবিলে রাখা ফাতিহার ছবিটার দিকে আরও একবার তাকালেন।
বুকের কাছটা খুব ফাঁকা লাগছিল। জানালাটা বন্ধ করে ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিলেন কমলিনী। জানলার ওদিক থেকে শুধু একটানা ঝোড়ো বাতাসের শব্দ ভেসে আসছে।
বাইরে তখন ঝড় উঠেছে।