এবারে আসা যাক বামেদের কথায়। আমি এখানে সকল ধারার বামেদের কথাই বলছি। আলাদা করে কাউকে ‘প্রকৃত বাম’ বা কাউকে ‘মেকি বাম’ বলে চিহ্নিত করার পক্ষপাতী আমি নই। প্রথম কথাই হল, রাজ্যের এই পালাবদলে বামপন্থীদের উল্লাসের কোনো কারণ আছে কি? যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষই বলবেন —- ‘না নিশ্চয়ই নয়।’ তবুও কিছু বামপন্থীকে দেখা যাচ্ছে বিজেপির জয়ে বেজায় খুশি। বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না এরা ভুলে যাচ্ছেন গত নির্বাচনে বামপন্থীদের কাঁধে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল —- সেটা হল ফ্যাসিবাদীদের প্রতিহত করা —- যা তারা করতে পারেন নি। রাজ্যের মসনদে যাতে বিজেপি বসতে না পারে এই দায়িত্ব তৃণমূলের নয়, বামপন্থীদের কাঁধেই ইতিহাস অর্পণ করেছিল তা বোঝার ক্ষেত্রে যদি সমস্যা থাকে তাহলে বুঝতে হবে সেই বামপন্থার গোড়ায় গলদ আছে। এই ব্যর্থতা সকল ধারার বামপন্থীদের কাছেই যে নিদারুণ তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। দরকার ছিল এই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করা। এবং তার ভিত্তিতে সামনে এগোনোর রাস্তা তৈরি করার চেষ্টা করা। কিন্তু ব্যর্থতার বোধটা না থাকলে অনুসন্ধান হবে কীভাবে? আর হবেই বা কেন? আমি কারুর মধ্যেই কোনো রিভিউ করার প্রচেষ্টা এখনও দেখি নি। হয়ত ভবিষ্যতে এইসব পর্যালোচনা সামনে আসবে।
এর মধ্যে আমি CPIM পলিটব্যুরোর একটি বিবৃতি (১১.০৫.২০২৬) দেখলাম। সেখানে তারা কয়েকটি প্রাথমিক কথা বলেছেন। বলেছেন — “The victory of the BJP in West Bengal is a major blow and has been achieved on the basis of a communal, divisive and vitriolic hate campaign, the huge amount of money it spent, and the gross misuse of central agencies, including the Election Commission of India (ECI) and the SIR exercise. The BJP is also benefited from the strong anti-incumvancy against the corrupt and authoritarian government.” একদম সঠিক বক্তব্য, সন্দেহ নেই। আমাদের পার্টির মূল্যায়ণের সাথে খুব কিছু ফারাক নেই। কিন্তু এই বিবৃতিতে কেরালায় পার্টির ব্যর্থতার উল্লেখ থাকলেও (এবং তার পর্যালোচনা করা হবে বলা হলেও), পশ্চিমবঙ্গে পার্টির ব্যর্থতার কোনো উল্লেখ নেই। হয়ত ভবিষ্যতে তারা তা করবেন।
আমি আগের পর্বগুলিতে, বিশেষ করে প্রথম পর্বে, বলেছি SIR ছিল বিজেপির বাঙলা দখলের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কিন্তু SIR নিয়ে বামপন্থী মহলে বিভিন্ন ধরণের ভ্রান্ত ধারণা ছিল এবং আছে। বামপন্থীদের মধ্যে অনেককেই দেখেছি তারা শুধু SIR-এর দ্বিতীয় পর্বে তথাকথিত logical discrepancies-র কারণে বাদ পড়া লোকেদের কথাই বলেছেন। সেই হিসাবেই বিভিন্ন অঙ্ক করেছেন। অর্থাৎ, তারা SIRএর প্রথম পর্বে বাদ পড়া লোকেদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনছেন না। CPIMও তাই করেছে। তাদের প্রাথমিকভাবে ধারণা ছিল SIR-এর মধ্যে দিয়ে ভোটার লিস্টে ঢোকানো ভুয়ো নাম বাদ পড়বে। তাই তারা “সঠিক SIR”-এর পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এই ব্যাপারে শুধু CPIM কে দোষ দেওয়া অন্যায় হবে। একই কাজ অন্য অনেকেও কাজ করেছেন। যুক্তি কী? যুক্তি হল প্রথম পর্বে যে ৬৩ লক্ষ লোকের নাম বাদ গেছে তারা সব মৃত, স্থানান্তরিত এবং একাধিক জায়গায় নাম থাকা ব্যক্তি। নির্বাচিন কমিশনও তাই বলেছে। বামপন্থীদের এই অংশ রাষ্ট্রের প্রতি তাদের কুসংস্কারগত আনুগত্য দেখিয়ে ECI এর এই বয়ানকে মেনে নিয়েছেন।
Logical Discrepancy ভারতের অন্য কোথাও হয় নি। এটা শুধু পশ্চিমবঙ্গেই হয়েছে। তাহলে কি বলতে হবে যে, অন্যান্য রাজ্যে SIR সঠিক পথেই চলেছে? রাহুল গান্ধী একটার পর একটা সাংবাদিক সম্মেলন করে বিভিন্ন রাজ্যে ECI কিভাবে ভোট চুরি করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ প্রমাণসহ হাজির করেছেন। তারপরেও আমাদের বামপন্থীদের একাংশ SIR-এ বাদ পড়া প্রায় অর্ধেক মানুষের ওপর অন্যায় হয়েছে, ভোট চুরি হয়েছে, সরকারি উদ্যোগে নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক রিগিং হয়েছে, Special Intensive Revision যে Special Intensive Rigging -এ পর্যবসিত হয়েছে তা বলতে পারেন নি। এই বলতে না পারার কারণ রাজনৈতিক। SIR-এর প্রকৃত উদ্দেশ্যগুলি সম্পর্কে স্বচ্ছতার অভাব বামপন্থীদের মধ্যে রয়েছে। এই স্বচ্ছতার অভাবও আবার আকাশ থেকে পড়ে নি। আসলে ভারতীয় ফ্যাসিবাদের চরিত্র এবং কর্মপদ্ধতি নিয়ে ধারণার ভ্রান্তিই এর জন্য দায়ি। তাই তারা বলতে পারেন নি –--- “জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন এই নির্বাচন কমিশনের কোনো পদক্ষেপই আমরা মানি না কারণ এই প্রতিটি পদক্ষেপ ভারতে ফ্যাসিবাদের কব্জাকে দৃঢ়তর করার লক্ষ্যেই নেওয়া।” আমার আগের লেখায় আমি বলেছিলাম মমতা SIR-এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ তৈরি করতে পারেন নি। এর সাথে এটাও যুক্ত করতে হবে যে, বামপন্থীরাও এই কাজে ব্যর্থ হয়েছেন। এইটা বামপন্থীদের প্রথম গুরুতর দুর্বলতা।
আবার বামপন্থীদের যে অংশগুলি SIR-এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিরোধিতার অবস্থান নিয়েছিলেন তারা বলতে শুরু করলেন, যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তারা সব বিশ্বাসঘাতক। তাদের মতে SIR -এর সর্বাত্মক বিরোধিতা করে সকল রাজনৈতিক দলের ভোট বয়কট করা উচিত ছিল। এনারা SIR শুরুর আগে জনগণের উদ্দেশ্যে বলছিলেন —- ‘কাগজ দেখাবেন না।’ কিন্তু লোকে যখন SIR প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করে দিল তখন এনারা হতাশ হলেন। আর তারপরেই যখন SIR- এ দলে দলে লোককে বাদ দেওয়া হতে লাগল তখন এরা চাইলেন রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন বয়কট করুক।
এই গোটা চিন্তাপ্রক্রিয়াটাই একধরণের নৈরাজ্যের ইঙ্গিত দেয়। প্রথমত, micro level-এ, অর্থাৎ, ঘরের দুয়ারে ব্যক্তিমানুষের দ্বারা SIRকে ঠেকানো সম্ভব ছিল না। SIRকে ঠেকানো সম্ভব ছিল একমাত্র বৃহৎ গণ-আন্দোলনে। সুতরাং, রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি যে সমালোচনাটা সঠিক হত সেটা হল তারা এই গণ-আন্দোলন তৈরি করার ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ করছেন না। কিন্তু সমালোচনা তার থেকেও বেশি হতে থাকল কেন তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এই যুক্তিতে। একদিকে SIR নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির ভ্রান্ত ধারণা অন্যদিকে SIR ঠেকানোর রাস্তা সম্পর্কে নির্বাচন বহির্ভূত বাম অংশের ভ্রান্ত ধারণা —- এর মধ্যে দিয়ে SIR প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নেই এগোতে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে একটা বড় সমস্যা হল নির্বাচনে যে রাজনৈতিক দলগুলি (মূলত বামপন্থীদের কথাই বলছি) অংশ নেয় আর নির্বাচন বহির্ভূত বাম অংশ —- এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সংলাপ নেই। উভয় পক্ষই অপরের সম্পর্কে এক ধরণের ছুৎমার্গ, অসূয়া এবং বিদ্বেষ পোষণ করে। কেউ কারুর ছায়াও মাড়ায় না। ফলে এই ফাটল দিয়ে উভয়েরই ব্যর্থতার লাভাস্রোত ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে কোনো সম্ভাবনাকে প্লাবিত করে দিতে থাকল। আমি আগে দেখিয়েছি তৃণমূল কীভাবে SIR নিয়ে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার পথে অন্তরায় হিসাবে কাজ করেছে। কিন্তু কমিউনিষ্টদের বা বামপন্থীদের সামনে বাধা তো থাকবেই। বাধা ঠেলে সরিয়ে এই গণ-আন্দোলন যে গড়ে তোলা গেল না তার পেছনে উভয়পক্ষেরই ভাবনাগত নৈরাজ্য দায়ি।
দ্বিতীয়ত, বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন বয়কট করলে কী হত? বিজেপি ওয়াক ওভার পেয়ে নির্বাচন জিতত। অনেকেই ভেবেছেন এতে করে নির্বাচন ব্যবস্থাটার বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে যেত। এমনকি SIR বন্ধও হয়ে যেত। তারা বুঝছেন না, এটা একমাত্র তখনই হত যদি SIR বিরোধী একটা ব্যাপক গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা যেত তাহলেই। যদি SIR-এর বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামানো যেত এবং তার অনুষঙ্গে বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন বয়কটের ডাক দিত তবেই গোটা প্রক্রিয়াটাতে একটা গুরুতর আঘাত করা সম্ভব হত। কিন্তু রাস্তায় কিছু নেই, এদিকে বিরোধীরা নির্বাচন বয়কট করে বসে আছে, তাতে করে SIR কেন্দ্রীক নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রশ্নচিহ্নের সামনে তো পড়তই না, বরং প্রশ্ন উঠত বিরোধীদের ক্ষমতা নিয়েই। নির্বাচনে হেরে যাবার ভয়ে বিরোধীরা ভোট বানচাল করতে চাইছে —- এটাই দাঁড়িয়ে যেত।
কিন্তু তার পরেও কেউ বলতে পারেন, ভোটে লড়েই বা কী হল? বিজেপিকে কি ঠেকানো গেল? সেই তো ওরাই জিতল। ঠিকই। গণ-আন্দোলনহীন নির্বাচনে বিজেপিকে ঠেকানো গেল না। কিন্তু সেটাই সব কথা নয়। নির্বাচনী সংঘাতটা হল বলে অনেকগুলো জিনিসই জনগণের প্রগতিশীল অংশের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রথমত, SIR যে ভোটার তালিকাকে ‘'স্বচ্ছ এবং শুদ্ধ” করার কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং বিজেপির অনুকূলে ভোটার লিস্টকে পরিবির্তিত করার একটা হাতিয়ার তা জনগণের এই অংশের কাছে যতটা পরিষ্কার তা নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে ছিল না। তখন যে গণ-আন্দোলনটা গড়ে তোলা গেল না তার অনেক কারণের মধ্যে এটাও তো একটা কারণ। দ্বিতীয়ত, ভারতের বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে নিরপেক্ষ কোনো সংস্থা নয়, বরং কেন্দ্রের শাসক দলের একটি উপাঙ্গ —- এটিও জনগণের একটা বড় অংশের কাছে প্রমাণিত হল। তৃতীয়ত, বামপন্থীদের মধ্যে ভারতে ফ্যাসিবাদ যে কোনো গল্পকথা নয়, অমূলক আশংকা নয়, বরং ঘোরতর বাস্তব —- এই নিয়ে যে সমস্ত সংশয়, দ্বিধাজড়তা ছিল তাও এই SIR ভিত্তিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া অনেকটাই কাটিয়ে দিয়ে গেল। মানুষ যেমন নেতাদের ভাষণ শুনেই রাজনীতি সচেতন হয় না, হয় তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে, রাজনৈতিক কর্মীরাও তেমনই বিমূর্ত আলোচনা বা বিতর্কে সবটা বুঝে উঠতে পারে না, বোঝে বাস্তব রাজনৈতিক কর্মকান্ডে। এই বোঝাবুঝিগুলোতে যত ফাঁকি থাকবে ততই ভবিষ্যতে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলার সম্ভাবনা বন্ধ হয়ে যাবে। অতীতে এই ফাঁকিগুলির কারণেই তো বামপন্থীরা তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারলেন না। এই নির্বাচনী সংঘাত অনেক বিতর্কেরই বাস্তব মীমাংসা করে গেল।
(চলবে)