১৬ অক্টোবর ২০২৬, দিল্লির কনট প্লেস ও সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা হাতে মানুষের জমায়েত শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না। এর মধ্যে আছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—যে দেশে জাতীয় পতাকা স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতীক, সেই দেশে পতাকা হাতে শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নামতে গেলেও কি নাগরিককে পুলিশের অনুমতি, আটক ও নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হবে? জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান কি কেবল সরকারি মঞ্চে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এবং শাসক দলের রাজনৈতিক সমাবেশে প্রকাশ করা যাবে, নাকি সরকারের নীতির বিরোধিতা করতে গিয়েও একজন নাগরিক সেই পতাকা তুলে ধরতে পারবেন?
দিল্লির এই প্রতিবাদের তাৎপর্য এখানেই। কারণ, বিষয়টি শুধু কয়েকজন ছাত্র-যুব বা রাজনৈতিক কর্মীর গ্রেফতারি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রতিবাদের অধিকার, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক, জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং ভোটাধিকার নিয়ে ওঠা গুরুতর অভিযোগের প্রশ্ন। যে রাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে পরিচয় দেয়, তার কাছে এই প্রশ্নগুলির উত্তর চাওয়া কি কোনও রাষ্ট্রবিরোধী কাজ? বরং গণতন্ত্রকে সত্যিকারের গণতন্ত্র করে তোলার জন্যই এই প্রশ্ন জরুরি।
এই প্রতিবাদের তাৎক্ষণিক সূত্রপাত কয়েক দিন আগে যন্তর-মন্তরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। সিজেপি-র দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার বিরুদ্ধে ব্যারিকেড ভেঙে জাতীয় পতাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়। এই গ্রেফতারির প্রতিবাদেই ১৬ অক্টোবর দিল্লির কনট প্লেসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও তিরঙ্গা মার্চের ডাক দেওয়া হয়। সিজেপি-র পাশাপাশি বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনও এই কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
প্রশ্ন হল, কোনও কর্মসূচিতে ব্যারিকেড ভাঙার অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হোক, আইন অনুযায়ী বিচার হোক। কিন্তু সেই অভিযোগের দায়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন আর জাতীয় পতাকা হাতে বৃহত্তর নাগরিক জমায়েত আটকানোর প্রশ্ন কি এক? কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই কি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত প্রতিবাদকে সন্দেহের চোখে দেখতে হবে? অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে গ্রেফতারি কি শাস্তির বিকল্প হয়ে উঠতে পারে? আর শান্তিপূর্ণভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের দাবি জানানো মানুষদের কেন সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হবে?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি বোঝা যায় শুধু অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার পদক্ষেপ দেখে নয়, বরং বিরোধী মতের মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র কতটা সংযত থাকে, তা দেখে। আইন প্রয়োগের অধিকার সরকারের আছে। কিন্তু সেই অধিকার সীমাহীন নয়। আইনের প্রয়োগ আর আইনের সাহায্যে প্রতিবাদকে নিরুৎসাহিত করা এক বিষয় নয়।
১৬ অক্টোবরের কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লি পুলিশের প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। কনট প্লেস ও তার আশপাশে পুলিশ, কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী বা সিআরপিএফ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স মোতায়েন করা হয়। প্রশাসন ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞামূলক নির্দেশের কথা জানিয়ে আয়োজক ও নেতাদের নোটিশ দিয়েছিল। এই ধারা জরুরি পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য বিপদ, জনশান্তি বিঘ্নিত হওয়া বা অনুরূপ আশঙ্কা মোকাবিলায় নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ জারির সুযোগ দেয়। কিন্তু কোনও এলাকায় নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ জারি হলেই কি তার প্রয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বন্ধ হয়ে যায়? প্রশাসনকে কি জানাতে হবে না, ঠিক কী ধরনের আশঙ্কা ছিল, কেন এত বিপুল বাহিনী মোতায়েন করা প্রয়োজন হল এবং কম কঠোর কোনও ব্যবস্থা কেন যথেষ্ট ছিল না?
কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক অভিজিৎ দীপকে, আইসা নেত্রী নেহা বোরাসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। কেউ কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই, কেউ আবার কর্মসূচি চলাকালীন পুলিশের হেফাজতে যান বলে উঠে এসেছে। অথচ এত পুলিশি প্রস্তুতি ও ধরপাকড়ের পরেও শত শত মানুষ কনট প্লেসে জড়ো হন এবং ইনর সার্কেলে মার্চ করে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
এখানেই প্রশাসনের প্রশ্নটি উঠে আসে যে যদি এই কর্মসূচি আটকানোর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে জনসমাগম রোধ করা, তবে এত মানুষের উপস্থিতি কী প্রমাণ করে? মানুষের রাজনৈতিক ক্ষোভ কি ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রাখা যায়? আটক করে সাময়িকভাবে কোনও জমায়েত ছত্রভঙ্গ করা সম্ভব, কিন্তু জমায়েতের পেছনে থাকা প্রশ্নগুলিকে কি তাতে মুছে ফেলা যায়?
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া তরুণদের প্রশ্ন—নিজের দেশে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করাও কি অপরাধ হয়ে উঠেছে? স্বাধীনতার অর্থ কি শুধু জাতীয় দিবসে পতাকা উত্তোলন, তারপর বাকি সময়ে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সামনে নীরব থাকা? কারণ, নাগরিক স্বাধীনতা কেবল সেই মানুষের জন্য নয়, যাঁর বক্তব্য সরকারের পছন্দ হয়। বরং যে বক্তব্য সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে, গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।
এই প্রতিবাদের রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝার জন্য জাতীয় পতাকাকে ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকানো প্রয়োজন। জাতীয় পতাকা কোনও রাজনৈতিক দল, সরকার কিংবা নির্দিষ্ট মতাদর্শের সম্পত্তি নয়। এটি দেশের মানুষের সম্মিলিত স্বাধীনতার প্রতীক। তার মধ্যে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের রাজনৈতিক বিশ্বাস এক ছিল না, স্বাধীন ভারতের চরিত্র সম্পর্কেও তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু সেই ইতিহাসকে কোনও একটি সংগঠন বা দলের একচ্ছত্র উত্তরাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ইতিহাসের বহুত্বকে অস্বীকার করে।
আরএসএসের প্রাথমিক ইতিহাসে জাতীয় পতাকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ১৯৪৭ সালে তিরঙ্গা গ্রহণের সময় আরএসএসের মুখপত্র অর্গানাইজার-এ প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়তে পতাকা নির্বাচন নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল(৩ শুভ নয়)। সেই ইতিহাসকে বাদ দিয়ে আজ জাতীয়তাবাদের সমস্ত সংজ্ঞা যদি একটি রাজনৈতিক শিবিরের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে ইতিহাসের সঙ্গে সুবিচার করা হবে না। একই সঙ্গে অতীতের কোনও বক্তব্যের ভিত্তিতে বর্তমানের প্রত্যেক সমর্থকের মনোভাব নির্ধারণ করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। সমালোচনার লক্ষ্য হওয়া উচিত নির্দিষ্ট বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান এবং তার বাস্তব প্রয়োগ।
কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে আজ যদি কোনও তরুণ জাতীয় পতাকা হাতে সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন, তাঁকে কি কম দেশপ্রেমিক বলা হবে? ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ তুলে কেউ রাস্তায় নামলে, তিনি কি জাতীয় স্বার্থের বিরোধী হয়ে যান? নাগরিক অধিকার রক্ষার দাবিতে যাঁরা আন্দোলন করেন, তাঁদের দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হবে কেন?
জাতীয় পতাকাকে সম্মান করার অর্থ কি কেবল রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রতিনিধিদের সম্মান করা? নাকি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করাও দেশপ্রেমের অংশ? স্বাধীনতার ইতিহাস তো আমাদের শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা রাষ্ট্রের শত্রুতা নয়। নাগরিকের অধিকার খর্ব হলে তার প্রতিবাদ করাও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।
জাতীয় পতাকা হাতে সরকারবিরোধী প্রতিবাদকে তাই জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করা কিছুতেই যায় না। বরং প্রশ্ন উঠতে পারে, যে জাতীয়তাবাদ নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকারকে অস্বীকার করে, সেই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক কোথায়?
কনট প্লেসের কর্মসূচি শুধু গ্রেফতারির প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর বৃহত্তর রাজনৈতিক পটভূমিতে রয়েছে ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে চলতে থাকা বিতর্ক। সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ চলছেই।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন, ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া মাত্রই প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমন ইচ্ছাকৃত ভোট চুরি প্রমাণিত হয় না তেমনই ভুল, স্থানান্তর, মৃত্যু-সংক্রান্ত তথ্য, নথির সমস্যা কিংবা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণেই নির্বাচন কমিশনের দায় কমে যায় না। বরং কোনও নাগরিকের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হলে তার কারণ নির্ণয়, তথ্য প্রকাশ, আপত্তি জানানোর সুযোগ এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কমিশনেরই।
ভোটার তালিকা গণতন্ত্রের প্রাথমিক ভিত্তি কিন্তু নাগরিকত্ব নয়। ভোট দেওয়ার দিন বুথে পৌঁছে যদি নাগরিক জানতে পারেন যে তালিকায় তাঁর নাম নেই, তখন তাঁর সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবে কতটা সুরক্ষিত থাকে? ভোটের আগে নাম বাদ পড়ার কারণ জানার সুযোগ নেই, আপিলের প্রক্রিয়া জটিল কিংবা প্রশাসনিক ভুল সংশোধনের ব্যবস্থা কার্যকর না হলে, কাগজে থাকা ভোটাধিকার আর বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য ভোটাধিকারের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়। জাস্টিস নারিমান বলেছেন ৯৩% নাম ভুল কাটা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে।
এই ব্যবধানই রাজনৈতিক উদ্বেগের বিষয়। ভোটার তালিকার প্রতিটি সংযোজন ও বিয়োজনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা দরকার। কত নাম বাদ গেল, কেন বাদ গেল, কত আবেদন গ্রহণ করা হল, কত আবেদন বাতিল হল, কত ভুল সংশোধন করা হল—এই তথ্যগুলি সহজে যাচাই করা সম্ভব হওয়া উচিত। কোনও অভিযোগকে কেবল রাজনৈতিক বলে উড়িয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না। আবার প্রমাণ ছাড়া প্রতিটি বিয়োজনকে ষড়যন্ত্র বলছি না কিন্তু নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকাশ্য তথ্য এবং কার্যকর জবাবদিহি প্রয়োজন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে প্রশ্ন তাই সরাসরি, কোনও নাগরিকের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ উঠলে কমিশন কীভাবে তার নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করছে? ভোটার তালিকার পরিবর্তনগুলি যাচাই করার জন্য কী ব্যবস্থা রয়েছে? ভুল প্রমাণিত হলে নাম পুনরায় যুক্ত করার প্রক্রিয়া কতটা সহজ? রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন ও সাধারণ ভোটারদের আপত্তির জবাব কীভাবে দেওয়া হচ্ছে?
সুপ্রিম কোর্টের কাছেও নাগরিকদের প্রত্যাশা রয়েছে। বিচারাধীন মামলার বিষয়ে আদালতকে প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু ভোটাধিকার নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠলে দ্রুত শুনানি, কার্যকর প্রতিকার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিচারযোগ্যতা নিশ্চিত করা কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও স্পষ্ট। আদালতের কাছে মানুষের প্রত্যাশা কেবল একটি রায় নয়; তাঁদের অধিকার বাস্তবে রক্ষা পাওয়ার নিশ্চয়তা। তবে কোনও আদালত, নির্বাচন কমিশন কিংবা সরকার সম্পর্কে চূড়ান্ত অভিযোগ তোলার আগে নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। সেই সতর্কতা বজায় রেখেই বলা যায়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা শুধু তাদের সাংবিধানিক পরিচয় থেকে জন্মায় না। আস্থা তৈরি হয় কাজের স্বচ্ছতা, সিদ্ধান্তের যুক্তি এবং ভুল হলে তা সংশোধনের ক্ষমতা থেকে।
গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলন এবং ভোটাধিকার হরণ বা ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কোনও মন্তব্য করেননি। কোনও রাজনৈতিক বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি বক্তব্যের জবাব দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু ভোটাধিকার, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে যখন দেশজুড়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব কী? শুধু বিরোধীদের বক্তব্যের পাল্টা প্রচার চালানোই কি যথেষ্ট? নাকি মানুষের উদ্বেগের কেন্দ্রে থাকা প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়া প্রয়োজন?
প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা থেকে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সরকারের অবস্থান কী? ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তা নিরসনে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
সরকারের কাছে এই প্রশ্নগুলির উত্তর চাওয়া কোনও রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া অধিকার নয়। ভোটার, করদাতা এবং দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই প্রশ্ন করার অধিকার রয়েছে। সরকারের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য রাজনৈতিক দল আছে, সংবাদমাধ্যম আছে। কিন্তু নাগরিকের অভিযোগের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে প্রচারের পরিমাণ দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায় না।
কনট প্লেসের প্রতিবাদে তরুণ ও ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণ এখানেই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। পুলিশের বাধা, আটক হওয়ার আশঙ্কা এবং প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের বক্তব্যে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অধিকার এবং স্বাধীন দেশে প্রতিবাদ করার অধিকারের প্রশ্ন একসঙ্গে এসেছে।
যুবসমাজের এই অংশগ্রহণকে কোনও একটি দলের প্রতি সমর্থন হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেখা ভুল হবে। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের উদ্দেশ্য এক নাও হতে পারে। কেউ গ্রেফতারির প্রতিবাদে এসেছেন, কেউ ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বিগ্ন, কেউ নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে অংশ নিয়েছেন। এই বিভিন্ন কারণকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে একটি সাধারণ উদ্বেগ—রাষ্ট্র কি নাগরিকের প্রতিবাদ করার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে শুধু প্রতিবাদকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, দেখতে হবে, তাঁরা কী দাবি করছেন, কীভাবে প্রতিবাদ করছেন এবং প্রশাসন তাঁদের সঙ্গে কী আচরণ করছে। শান্তিপূর্ণ জমায়েত, স্লোগান, মিছিল ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ। নির্দিষ্ট আইনগত বিধিনিষেধ থাকতে পারে, কিন্তু তার প্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয়, যুক্তিসঙ্গত ও আনুপাতিক।
একই সঙ্গে প্রতিবাদকারীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। অন্যের অধিকার নষ্ট করা, হিংসা ছড়ানো কিংবা জনসাধারণের নিরাপত্তা বিপন্ন করা কোনও গণতান্ত্রিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। কিন্তু কোনও আশঙ্কা বা অভিযোগকে সামনে রেখে সমস্ত বিরোধী জমায়েতকে দমন করার প্রবণতা তৈরি হলে তা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। আমরা কি এমন একটি গণতন্ত্র চাই, যেখানে নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার নির্ভর করবে তিনি ক্ষমতাসীনদের সমর্থন করেন কি না তার ওপর? নাকি এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে সরকারের বিরোধিতা করেও একজন মানুষ সমান মর্যাদায় নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে পারবেন?
তাই পুলিশের ব্যারিকেড, আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতি, নেতাকর্মীদের আটক এবং তার পরেও মানুষের জমায়েত—এই ঘটনাগুলিকে আলাদা আলাদা দৃশ্য হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা বোঝা যাবে না। এগুলিকে দেখতে হবে জাতীয় পতাকা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং ভোটাধিকার নিয়ে চলতে থাকা বৃহত্তর বিতর্কের মধ্যে।
সরকারের কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে নাগরিকের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমিত করা হলে তার ব্যাখ্যাও সরকারকেই দিতে হবে। পুলিশকে প্রশ্ন করা মানেই পুলিশের বিরুদ্ধে বা, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি চাওয়া মানেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে অস্বীকার করা নয়; সুপ্রিম কোর্টের কাছে প্রতিকার চাওয়া মানেই বিচারব্যবস্থাকে আক্রমণ করা নয়। বরং এই প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখার জন্যই তাদের কাজের স্বচ্ছতা জরুরি।
আজ জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নামা মানুষদের সামনে যদি ব্যারিকেড দাঁড় করানো হয়, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন থাকবে—কীসের ভয়? পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি কি নিজেই জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক? নাকি সেই পতাকা হাতে মানুষ যে প্রশ্নগুলি তুলছেন, সেগুলিই রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর? প্রশাসনের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর প্রমাণ ও যুক্তির ভিত্তিতে প্রত্যাশিত।
জাতীয় পতাকা কোনও সরকারের ব্যক্তিগত প্রতীক নয়। এটি নাগরিকেরও। সেই পতাকা হাতে সরকারের সমালোচনা করা যায়, নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাব চাওয়া যায়, আদালতের কাছে বিচার চাওয়া যায়। এই অধিকারগুলিকে পরস্পরের বিরোধী করে দেখানোই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
তাই তিরঙ্গা মার্চের রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই: রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের প্রশ্ন থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা যত বাড়বে, ততই প্রয়োজন হবে প্রশ্নগুলিকে তথ্য, যুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ভিত্তিতে সামনে আনা। জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে শুধু পতাকা উত্তোলন করলেই হবে না; সেই পতাকার প্রতীকী স্বাধীনতা, সমান নাগরিকত্ব এবং অধিকার রক্ষার দায়ও নিতে হবে।