পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

'চতুরঙ্গের রাজা' আবদুর রাউফের ইন্তেকাল

  • 10 June, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 299 view(s)
  • লিখেছেন : গোলাম রাশিদ
চলে গেলেন আবদূর রউফ, যুক্তি ও বোধের সমন্বয়ে প্রবন্ধচর্চাকে যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন ভিন্ন এক স্তরে৷ বাংলার সুধীমহলে সম্মানের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে, আজ থেকে আরও বহু বছর পরেও।

চলে গেলেন 'চতুরঙ্গের রাজা' আবদুর রাউফ৷ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যে ৭.৪৫ মিনিটে পার্ক সার্কাসের ৭ নম্বর মেহের আলি রোডের ফ্ল্যাটে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)৷ যুক্তি ও বোধের সমন্বয়ে প্রবন্ধচর্চাকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন ভিন্ন এক স্তরে৷ বাংলার সুধীমহলে সম্মানের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে৷ দীর্ঘ ২৬ বছর হুমায়ুন কবীর ও আতাউর রহমান প্রতিষ্ঠিত 'চতুরঙ্গ' পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন৷ এই সময়কালে তিনি পত্রিকাটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন৷ এক সময় আবদুর রাউফ ও চতুরঙ্গের নাম বিদগ্ধ মহলে একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে৷ আবদুর রাউফের ইন্তেকালের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে৷ গুণমুগ্ধ মানুষরা তাঁর বাড়িতে ভীড় করেন৷ আবদুর রাউফের পুত্র আসাদ রউফ নেদারল্যান্ডসে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন৷ তিনি পিতার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সেখান থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন৷ এসে পৌঁছাবেন শনিবার৷ সেদিনই রাতে আবদুর রাউফের দাফনকাজ সম্পন্ন হবে বলে জানা গিয়েছে৷ আপাতত তার লাশ পিস ওয়ার্ল্ডে রাখা হয়েছে৷ গত এপ্রিল মাস থেকে তিনি অসুস্থ ছিলেন৷ শরীর নিঃসাড় হয়ে পড়েছিল৷ কাউকে চিনতে পারতেন না৷ শেষ স্টেজে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল৷ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে বাড়িতে রেখেই তার চিকিৎসা চলছিল৷ স্ত্রী মুসতাবসেরা রাউফ জানান, কয়েকদিন থেকে পেটে জল জমছিল৷ চিকিৎসায় কোনও রকম সাড়া দিচ্ছিলেন না তিনি৷ এর আগের বছর তিনি কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছিলেন৷ তবে করোনাকে হারিয়ে জীবনে ফিরে এসেছিলেন৷ এবার ক্যান্সারের কাছে হার মানলেন চতুরঙ্গের রাজা৷ ৭৬ বছর বয়সে পাড়ি জমালেন অন্য ভুবনের উদ্দেশে৷

স্বাধীনতার কয়েক মাস আগে ১৯৪৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হুগলির গয়েশপুরে তাঁর জন্ম৷ স্থানীয় তারকেশ্বর হাইস্কুলে পড়াশোনার পর ভর্তি হন কলকাতার মাওলানা আজাদ কলেজে৷ কলেজে পড়াকালীনই বৌদ্ধিক জগতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটতে থাকে৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে এমএ পড়ার সময় থেকে তিনি লেখালেখি শুরু করেন৷ পরবর্তীতে আনন্দবাজার পত্রিকা, দৈনিক বসুমতী, যুগান্তর, আজকাল, সংবাদ প্রতিদিন, পুবের কলম সহ বহু পত্রিকায় মননশীল নিবন্ধ লিখেছেন৷ চতুরঙ্গ ছাড়াও 'আল হিলাল' নামে একটি পাক্ষিক ও 'যুব সংস্কৃতি' নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন৷ সংবাদ প্রতিদিনে তাঁর নিয়মিত কলাম 'দৃষ্টিপাত' সাহিত্যসমাজমনস্ক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল৷ বহুমাত্রিক নজরুল, স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান, মুক্তমনের সংকট, ভারতের বাংলাভাষী মুসলমান, গণতন্ত্র ও সংখ্যালঘু সমস্যা প্রভৃতি গ্রন্থে তাঁর শাণিত যুক্তির উপস্থাপনা দেখা গিয়েছে৷ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিকাশে অনবদ্য অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় সংহতি পরিষদ তাঁকে সম্মানিত করেছিল৷ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির লিটল ম্যাগাজিন মেলায় সেরা সম্পাদক হিসেবে পুরস্কারের পাশাপাশি পেয়েছেন নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার৷ বাংলার মিশনারি শিক্ষা আন্দোলনের পাশে থেকেছেন নানাভাবে৷ সরকারি-বেসরকারি বৌদ্ধিক সভায় তাঁর উপস্থিতি ও মেধাবী বক্তৃতা আলাদা করে নজর কেড়েছে সুধীজনের৷ স্বাধীনতার পর এপার বাংলায় হাতে গোনা কয়েকজন প্রাবন্ধিক বৃহত্তর সমাজের কাছে নিজেদের শাণিত মেধা ও প্রজ্ঞাকে তুলে ধরতে পেরেছিল৷ আবদুর রাউফ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য৷

0 Comments

Post Comment