পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নারায়ণ দেবনাথ দি গ্রেট

  • 28 January, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 1229 view(s)
  • লিখেছেন : অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়
মফস্বলে নারায়ণ দেবনাথের জন্ম ১৯২৫ সালে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই অঞ্চলে অনাড়ম্বর জীবন কাটিয়েছেন তিনি। ঘিঞ্জি গলির ভেতরে দোকানপাট, লোকজন এবং তাদের হাসি মশকরার যে উপাদান তিনি পেয়েছেন, যথেচ্ছভাবে কাজে লাগিয়েছেন তার কার্টুনস্ট্রিপের চরিত্রায়নে।

গত শতকের ৭০-৮০র দশকে এক প্রবাসী মফস্বলে আমার শৈশব কৈশোর কাটে। আমাদের ছোটবেলায় স্কুলের সামনের সারির ছাত্রছাত্রীরা শুধু নয়, ক্লাসের একটা বড় অংশ বাংলা পত্রিকা এবং কমিকসের সাথে পরিচিত ছিল। আর এই জগতের একটা বিরাট অংশ জুড়েই ছিল বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে। এছাড়া নারায়ণ দেবনাথের কার্টুনস্ট্রিপ বাহাদুর বেড়াল এবং রোমাঞ্চের ছবিতে গল্প গোয়েন্দা কৌশিকের কাহিনী, দেব সাহিত্য কুটিরের অন্যান্য বই, পূজাবার্ষিকী প্রচ্ছদে এবং গল্পের ইলাস্ট্রেশনের সূত্রে নারায়ণ দেবনাথের সাথে আমাদের যথেষ্ট পরিচিতি ছিল।

পরে ৯০এর দশকে কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা সংস্কৃতির সাথে আমার পরিচয় ঘটে। দেখলাম আমাদের প্রজন্মের কাছে এখানেও নারায়ণ দেবনাথ ভীষণ জনপ্রিয়। হয়তো সেই সময়টা এমনই ছিল। তারকাদের আত্মপ্রকাশের মাধ্যম ছিল সীমিত। তাই নারায়ণ দেবনাথকে দেখার চেয়ে তাঁর সৃষ্টিকে দেখাই ছিল সমকালীন রেওয়াজ।

পরে ভিডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণের ইচ্ছেয় তাঁর সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করি। বিনীতভাবে তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, ‘আমি ওসব পারব না’। তবুও লেগে থেকে দেখা করি তাঁর বাড়ি গিয়ে। হাওড়া শিবপুরের এক গলিতে তাঁর বাড়ি। পুরনো আমলের শাল কাঠের দরজার দুপাশে সংকীর্ণ রক পেরিয়ে উঠোনের ডানদিকে ওনার ছোট ঘরে তার জগৎ। একটা ছোট ঘর - সাধারণ কাঠের তৈরি চেয়ার-টেবিল, বাংলা মেঝে আর ডিসটেম্পার দেওয়া অনুজ্জ্বল দেওয়াল। কথায় কথায় তাঁকে রাজি করাতে পেরেছিলাম সাক্ষাৎকার দিতে। বোধহয় কথা বলে ভরসা পেয়েছিলেন। তারপর স্টুডিওতে এসে সাক্ষাৎকার দেন। সম্প্রচারিত হয়েছিল ২০০১ সালের প্রথম দিন DD7এ। সম্ভবত সেটাই ওনার প্রথম ভিডিও সাক্ষাৎকার। ওনার সম্বন্ধে জেনেছি কথা বলে, চোখে দেখে, কিছু লেখা পড়ে। কিছু জিজ্ঞাসার স্পষ্ট উত্তর দিয়েছিলেন সাক্ষাৎকারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই পূর্ববঙ্গ থেকে চলে আসা এক পরিবার কোনোমতে থিতু হয় হাওড়ার শিবপুরে। সেই মফস্বলে নারায়ণ দেবনাথের জন্ম ১৯২৫ সালে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই অঞ্চলে অনাড়ম্বর জীবন কাটিয়েছেন তিনি। ঘিঞ্জি গলির ভেতরে দোকানপাট, লোকজন এবং তাদের হাসি মশকরার যে উপাদান তিনি পেয়েছেন, যথেচ্ছভাবে কাজে লাগিয়েছেন তার কার্টুনস্ট্রিপের চরিত্রায়নে। প্রথমে জীবিকার প্রয়োজনে কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হয়ে ওঠেন, যদিও তিনি ছিলেন ফাইন আর্টসের ছাত্র। বইয়ের প্রচ্ছদ এবং ইলাস্ট্রেশন করতে করতে ‘শুকতারা’ পত্রিকার প্রয়োজনে ১৯৬২তে আত্মপ্রকাশ করে ওনার প্রথম কার্টুনস্ট্রিপ ‘হাঁদা ভোঁদার কান্ডকারখানা’। পরে ক্রমে বাটুল দি গ্রেট, মুটকি আর ছুটকি, নন্টে ফন্টে, বাহাদুর বেড়াল, ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু ইত্যাদি। প্রায় ৩৫ হাজার বা তার বেশি কমিকস তৈরি করেছেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সমর্থক ছিলেন। গত শতকে কিন্তু ওনার চারপাশে এমন রাজনীতির দাপট ছিল না। তবে তাঁর কোনো কমিকস কাহিনীতে কখনো ধর্মীয় পরিমণ্ডল তৈরি বা ঈশ্বর সাধনার প্রকাশ কখনোই ঘটেনি। ৭০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে একবার শুধু বাঁটুল খানসেনাদের পাথর ছুঁড়ে কুপোকাৎ করেছে। এর বেশি একটুও নয়। জাতীয়তাবাদের গন্ধই সেখানে ছিল না। সহজ, পরিচিত উপাদান থেকে নির্ভেজাল হাসির কারিগর ছিলেন তিনি। হিংস্রতা-অহিংসা, শিক্ষা-অশিক্ষা, ভালো-মন্দ ইত্যাদি কোনো বিষয় আসলে তাঁর এজেন্ডায় ছিল না। শিশুদের শিখিয়ে মানুষ করার বা জনগণকে সচেতন করার দায় নারায়ণ দেবনাথ নেননী। জীবিকা এবং নিরাসক্ত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন একদিন করে ১৯৬২ থেকে কার্টুনস্ট্রিপ এঁকেছেন ২০১৭ পর্যন্ত। খ্যাতি, প্রচার, দুনিয়ার দায় কাঁধে নেওয়া, নিজের বিশ্বাসকে টপকে বড় ভাবনার চেষ্টার ঠিক উল্টোদিকে ছিলেন মানুষটি। নিজের জীবন নিয়ে বিরাট কোনো উচ্চাশা তাঁর ছিল না। ঠিক তেমনই সময়ে পুরস্কার না পাওয়ার বিষয়টিও তার ভাবনায় ছিল না। আজ সমাজ মাধ্যমে আমরা একটা ছোট লেখা লিখে একঘন্টা পরে ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’, ‘শেয়ার’ গুণতে শুরু করি। হয়তো ঠিক উল্টো দর্শনের অনায়াস দার্শনিক ছিলেন বলেই এক পা এক পা হেঁটে শরীরের ক্ষমতাকে ছাপিয়ে ৯২ বছর বয়স পর্যন্ত সৃষ্টি করেছেন অনাবিল আনন্দ। চলার পথে কোনো সুদৃশ্য পান্থশালা তার খিদে মেটাতে পারেনি। থেমেছেনও নিজের স্বার্থেই।

0 Comments

Post Comment