পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পরিযায়ী দুর্গা ও ভারতমাতা

  • 23 October, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 603 view(s)
  • লিখেছেন : কৌস্তুভ চক্রবর্তী
বাঙালির অন্তরের দেবত্বকে নানা রূপে স্বীকার করার ঐতিহ্যে কখনোই ছেদ পড়েনি। বিকাশ ভট্টাচার্যের দুর্গা সিরিজের উপজীব্য উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ নয়, বরং প্রাত্যাহিক জীবনের নান্দনিকতা। পল্লব ভৌমিকের দুর্গাই হয়তো ভারতমাতা। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে কাজটি সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছেন তিনি।

বেহালার বড়িশা ক্লাবে শিল্পী পল্লব ভৌমিকের বানানো পরিযায়ী দুর্গার খবর ও ছবি ইতিমধ্যে ভাইরাল। নেটিজেনরা কেউ সাধুবাদ দিচ্ছেন, কেউ আবার এর মধ্যে রাজনীতির গন্ধ পাচ্ছেন ও চমকে উঠছেন। অনেকে শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যর দুর্গা সিরিজের একটি ছবি যার অনুপ্রেরণায় পল্লব ভৌমিক এই দুর্গা প্রতিমাটির রূপকল্পের নির্মাণ করেছেন তার প্রসঙ্গ টানছেন।

একটু ভেবে দেখলেই কিন্তু বিষয়টি পরিষ্কার ধরা পড়বে যে পল্লব ভৌমিক বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে কাজটি সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছেন। বাঙালির (ভারতীয় ও বটে) ঐতিহ্য সাধারণের মধ্যে দৈবী শক্তিকে আবিষ্কার করা ও দেবতার মধ্যে সাধারণত্বকে খুঁজে পেয়ে তাঁকে আরো নিজের বলে ভাবা। এই " দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়রে দেবতা" র শক্তিতেই শাক্ত কবি  বলেছেন - " মন ছাঁচে তোমাকে ফেলে শ্যামা মনময়ী মূর্তি আজ লবো তুলে.." শিল্পীর ও সাধকের মন যা চায় সেই রূপেই তিনি তাঁর আরাধ্যকে দেখতে পান।  প্রাচীন ভারতীয় শিল্পশাস্ত্র শিল্পকে বলেছে " অনন্য পর তন্ত্রা" । সে কারো ধার ও ধারে না।* সেই জোরেই দুর্গা হয়েছেন ঘরের মেয়ে। শিব নেশাখোর ভুঁড়িয়ালা ভুলো জামাই। বাঙালি নিশ্চিন্তে কালীকে  সর্বনাশী বলেছে, 'কালো মাগী'  বলেছে, তাঁর কাটা মুন্ডু নিয়ে নেবারও হুমকি দিয়েছে। কানুকে 'হারামজদা' বলেছে( সম্প্রতি ' বুলবুল ' সিরিজে ব্যবহৃত "কলঙ্কিনী রাধা " গানটি নিয়ে সংবেদনশীল বিশুদ্ধতাবাদীরা আপত্তি তুলেছিলেন) ।  শুধু তাই নয়, অতি বড় সাধকও সন্দেহ প্রকাশ করে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন -- "ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন মুন্ডমালা কোথায় পেলি?" এমন ভয়ানক মূলগত প্রশ্ন করার জন্য হিন্দু রাষ্ট্রে বেচারা কমলাকান্তকে নির্ঘাত বিপদে পড়তে হতো।

যাই হোক, বাঙালির অন্তরের দেবত্বকে নানা রূপে স্বীকার করার ঐতিহ্যে কখনোই ছেদ পড়েনি। বিকাশ ভট্টাচার্যের দুর্গা সিরিজের অন্য ছবিগুলো যদি দেখি তো দেখবো উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধর্মের কঠিন কাঠামো নয়, বরং প্রাত্যাহিক জীবনের নান্দনিকতা তার উপজীব্য। কোথাও ত্রিনয়নী বাজারের থলি হাতে ধীর পদক্ষেপে হেঁটে আসছেন বা নিম্ন - মধ্যবিত্ত ছাদের কার্নিশ থেকে চকিতে পিছু ঘুরে দেখছেন।  "Durga in the morning" ছবিটি তো বিশুদ্ধ ভক্তদের জন্য আরো সমস্যার। তিনি রতিক্লান্ত। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা পরা একজন চোঁয়াড়েমার্কা শিব যেন তাঁকে পরিত্যাগ করে চলে যাচ্ছে।

 

 

 

 

 ছবি শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের Durga in the Morning ছবি সমূহ থেকে নেওয়া

যেভাবে  সতীনাথ ভাদুড়ী রামায়ণ এর রঘুকুলতিলককে  সময় ও স্বকীয়তায় জারিত করে লিখে ফেলেন  "ঢোঁড়াই চরিত মানস" বা  মহাশ্বেতা দেবী মহাভারতের রাজেন্দ্র‌াণী দ্রৌপদীকে করে তোলেন রাষ্ট্রের পুলিশের দ্বারা ধর্ষিতা দ্রৌপদী মেঝেন, ঠিক সেভাবে পল্লব ভৌমিক গড়ে তুলেছেন পরিযায়ী দুর্গাকে। তিনি বর্তমান সময়ের দাবি মেনে দুর্গার নতুন রূপের অকালবোধন করেছেন। সময়ের ডাকে সাড়া দেওয়া শিল্পীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। পল্লব ভৌমিকের মূর্তি সাধারণ  নকল-নবিশি  নয়। একটি সার্থক শৈল্পিক প্রতিগ্রহণ। বিকাশ ভট্টাচার্যের দুর্গা ন্যাংটো কাত্তিককে কোলে নিয়ে পারিপার্শ্বিক দৈন্যের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। দৃষ্টি তাঁর ঊর্ধ্বমুখী ও মুখে জমাট প্রতিবাদী কাঠিন্য। পল্লব সেই ঊর্ধ্বমুখী দৃষ্টিকে সচেতন ভাবে নামিয়ে এনেছেন। বর্তমান ভারতের মাটিতে। দুর্গার ঠোঁটের কোণায় একটি স্নিগ্ধ মৃদু হাসির ভাব আছে। অনেক নেট পাড়ার মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন, ইনি কেনো রেগে নেই? কেনো ইনি বিরক্ত নন? কিন্তু হিংসা ও বিভাজনের রাজনীতি কি ঘৃণা দিয়ে জেতা যায়? ইনি তো মনে মনে ফৈজের কবিতা আওরাচ্ছেন-- " হাম দেখেঙ্গে" । শান্ত ভাবে বলছেন, তোমার তুঘলকি সিদ্ধান্তের জন্য আমার খেটে খাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়েছে --- আমি দেখছি। তুমি আমায় হাজার হাজার কিলোমিটার হাঁটতে বাধ্য করেছ-- আমি দেখছি। তুমি আমার গায়ে জীবাণু হটানোর নামে কীটনাশক ছড়িয়ে দিয়েছ -- আমি দেখছি। তুমি তোমার মনের কথা বলার সময় সামাজিক দূরত্বের কথা বলে আমায় গাদাগাদি করে ট্রেনে-বাসে-লরিতে ঠেলে-তুলে-গুঁজে দিয়েছ---- আমি দেখছি। উমর খালিদ দিল্লি দাঙ্গায় জড়িত কিনা তার জন্য তোমার কাছে হাজার হাজার পাতা প্রমাণ আছে কিন্তু ডিজিটাল ইন্ডিয়ার চাণক্যের খাতায় আমার কোনো "ডেটা" নেই-- আমি দেখছি। সঙ্গের তিনটি শিশুও যেন কিছুক্ষনের জন্য খেলা ফেলে সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের কম্পোজিশনে মায়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে আছে। তারাও দেখছে।

মা ও শিশুর মোটিফ শিল্পের ইতিহাসে খুবই জনপ্রিয় ও সফল। প্রায় সব শিল্পীরই এই বিষয়ে কিছু না কিছু কাজ আছে। অন্যান্য ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে অমৃতা শেরগিল, যামিনী রায়, চিত্তপ্রসাদ, হুসেন যুগান্তকারী সব মা ও শিশুর ছবি এঁকেছেন। হুসেন ভারতমাতা ও মাদার টেরেসার রূপকল্পকে এই প্রসঙ্গে অসামান্য ভাবে ব্যবহার করেছেন।

অমৃতা শেরগিল

যামিনী রায়

চিত্তপ্রসাদ

এম এফ হুসেইন

বাঙালি যা দুর্গার সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশ করে, পাশ্চাত্য নান্দনিকতা সেক্ষেত্রে ম্যাডোনার আশ্রয় নেয়। ধ্রুপদী শিল্পীদের কথা আপাতত বাদ দিলে আধুনিকতার আঙ্গিকে আঁকা ম্যাডোনাগুলির মধ্যে আমার প্রিয় (সময়ক্রম না অনুসরণ করে) ম্যাডোনা - রচয়িতারা হলেন মুঙ্ক, কান্দিনস্কি ও দালি।

দালি

দালি প্রেয়সী গালাকে তাঁর ব্যক্তিগত ম্যাডোনা হিসাবে দেখিয়েছেন। কান্দিনস্কির ম্যাডোনা আঙ্গিকে আধুনিক কিন্তু মুলত শান্তরসের ছবি।

মুঙ্ক এর ম্যাডোনা

মুঙ্ক-এর ম্যাডোনা তাঁর বিখ্যাত "ক্রাই"-এর মতই অন্ধকারের গর্ভ থেকে সুতীব্র ভাবে উঠে আসে। তবে এই সময়ের 'রেফারেন্স ' হিসাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ছবিটি মনে আসে সেটি একজন ফিলিপিন্সের শিল্পীর আঁকা। ভিসেন্তে মানান সালার ( Vicente Manansala) ১৯৫০ সালে আঁকা  "Madonna of the slums".

 

সন্তান কোলে নিয়ে বস্তির এক মা শূন্য দৃষ্টিতে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। এছাড়াও এক ' আফ্রিকান ম্যাডোনার ছবিও আমার খুব পছন্দের ( অনেক খুঁজেও শিল্পীর নাম জোগাড় করতে পারিনি) । প্রসঙ্গত বলি, পরিযায়ী মা-শিশুকে নিয়ে আমি একটি সাদা-কালো সিরিজ করি - The migrating Madonna. যার কয়েকটি ছবি রিতম সেন পরিচালিত মিউজিক ভিডিও " অসুখের গান" এ ব্যবহৃত হয়েছে ( নিচে লিংক দেওয়া আছে)

আবার ফিরি পুজোর কথায়। গত কয়েক বছর ধরে দুর্গাপুজোর সময় আর একধরনের দেবী কলকাতার বিভিন্ন প্যান্ডেলে মহাসমারোহে পূজিত হচ্ছেন। তিনি ভারতমাতা। সর্বভারতীয় উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি এখন দেশজুড়ে এই পুজোর চালিকাশক্তি হলেও ভারতমাতার জন্ম কিন্তু এই কলকাতা শহরেই। রামায়ণে লক্ষ্মণের মুখে জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের থেকেও গৌরবোজ্জ্বল, এই কথা শোনা গেলেও ১৮৭৩ সালে কিরণ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের "ভারতমাতা" নামক নাটকের মধ্য দিয়েই ভারতমাতার ধারণার প্রথম সুস্পষ্ট সূত্রপাত। বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮২ সালে "আনন্দমঠ"-এ ভারতমাতার স্তোত্র রচনা করলেন। ১৯০৫ সালে অবনীন্দ্রনাথ ভারতমাতার রূপ নির্মাণ করেন

অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা

( কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের সময় পশ্চিমে ও পূর্বে জাতীয়তাবাদী নেতাদের আগ্রাসন দেখে কিছুদিনের মধ্যেই অবনীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের মোহিনী মায়াজাল কেটে বেরিয়ে এসেছিলেন)
। ১৯৩৭ সালে গান্ধী বেনারসে ভারতমাতার মন্দির উদ্বোধন করেন।

পল্লব ভৌমিকের দুর্গা সেই মন্দিরের দেবী নন, বরং  জীবনযুদ্ধের শরিক প্রাণচঞ্চল এক মানসপ্রতিমা। পাঁচ বছরের কেয়ারটেকারের খাতায় তাঁর "ডেটা" নাই থাকতে পারে কিন্তু তিনিই হয়তো সেই "জনগণমনঅধিনায়ক"।

জাতীয়তাবাদী ভারতমাতা

বাঙালির ঐতিহ্য মেনেই পল্লব ভৌমিক তাঁকে "সিংহ এবং সিংহাসনে " খুঁজে পাননি। রামপ্রসাদের বেড়ার ধারে তাঁর দেখা পেয়ে সাধারণ জনস্রোতের মধ্যে দিয়ে তাঁকে হাঁটাতে হাঁটাতে নিয়ে এসেছেন পুজোর আঙিনায়। মাতিস সাহেব কি আর এমনি এমনি বলেছেন -"creativity takes courage". পল্লব ভৌমিকের দুর্গাই হয়তো ভারতমাতা। যাঁর মন্ত্র লুকানো আছে "গোরা" উপন্যাসের একদম শেষে --  'গোরা কহিল -- "মা, তুমিই আমার মা। যে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসে ছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই -- তুমি শুধু কল্যাণের প্রতিমা। তুমিই আমার ভারতবর্ষ।"'

 

এম এফ হুসেইনের ভারতমাতা

0 Comments

Post Comment