পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মাছে ভাতে বাঙালিকে নিরামিষাশী বানানোটাই উদ্দেশ্য ?

  • 01 July, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 711 view(s)
  • লিখেছেন : ত্রিয়াশা লাহিড়ী
দেশের অর্থনীতি যত দুর্বল হয়েছে, বেকারত্বের সংকট যত বৃদ্ধি পেয়েছে, সময়ের সাথে রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র, কলকাতা শহরের সরকারি স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলের প্রয়োজনীয়তার ছবিও বদলেছে। আগে অনেক অভিভাবক বলতেন, কলকাতার স্কুলে মিড-ডে মিল খাওয়ানোর কী দরকার? গ্রামের স্কুলগুলোতে খাওয়ালে ওরা একটু বেশি খেতে পায়! লকডাউনের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আজ এ'কথা বলতে পারেন, এমন অভিভাবকের সংখ্যা নিঃসন্দেহে কমেছে।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের রাজ্য বাজেট পেশ হয়েছে। সেখানে অর্থমন্ত্রী ড: স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা করেন, কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলের খাবারের দায়িত্বে থাকবে ইসকন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, 'পাইলট প্রোজেক্ট' হিসেবে কলকাতার স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলের খাবার সরবরাহ করবে ইসকন। বিজেপি সরকার বাজেটে প্রাথমিক স্তরে মিড-ডে মিল খাতে বরাদ্দ মাথাপিছু ৬ টাকা ৭৮ পয়সা থেকে ১০ টাকা করেছে। আগে ছিল ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। তবে উচ্চ প্রাথমিকে বরাদ্দ ১০ টাকা ১৭ পয়সার কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ, প্রাথমিকের তুলনায় উচ্চ-প্রাথমিকেই পড়ুয়াদের সংখ্যা বেশি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাদের শরীরে খাবারের চাহিদাও বাড়ে। তাহলে উচ্চ প্রাথমিক স্তরে কেন মিড-ডে মিলের বরাদ্দ টাকার পরিমাণ প্রাথমিক স্তরের প্রায় সমান হবে, এই নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়! মিড-ডে মিলের মতো সরকারি প্রকল্পের দায়ভার কেনই বা কোনো টেন্ডার ছাড়া বে-আইনিভাবে তুলে দেওয়া হবে বেসরকারি সংস্থার হাতে?

আমরা জানি, ইসকন একটি ধর্মীয় সংগঠন। ফলতঃ খুব স্বাভাবিকভাবেই, ইসকন তাদের ধর্মীয় আবেগকে অক্ষুণ্ণ রেখে পড়ুয়াদের সাত্ত্বিক ও সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার খাওয়াবে। বর্তমানে কলকাতার সরকারি স্কুলগুলিতে যারা পড়াশোনা করে, তাদের সিংহভাগই সাধারণত নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং গরীব বাড়ির সন্তান। আমি নিজে কলকাতার একটি আধা-সরকারি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী। আমি যে স্কুলে পড়েছি, সেই স্কুলের শ্রেণী নির্বিশেষে সকলেই মিড-ডে মিলের লাইনে দাঁড়িয়ে একটু ঘুগনি, একটু আলুর দম, এবং অবশ্যই একটা করে ডিম নিত। আমাদের স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কম থাকায় উচ্চমাধ্যমিক স্তরের ছাত্রীরাও খাবার নিত। আমরা যখন স্কুল ছাড়ছি, একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেছিলাম; মিড-ডে মিলের লম্বা লাইন টিফিন-টাইমের অর্ধেক পেরিয়ে যাবার পরও শেষ হয় না। মেয়েরা পাত পেড়ে মিড-ডে মিলের খাবার খায়। বাড়ি থেকে টিফিন আনে অল্প কয়েকজন। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি যত দুর্বল হয়েছে, বেকারত্বের সংকট যত বৃদ্ধি পেয়েছে, সময়ের সাথে রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র, কলকাতা শহরের সরকারি স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলের প্রয়োজনীয়তার ছবিও বদলেছে। আগে অনেক অভিভাবক বলতেন, কলকাতার স্কুলে মিড-ডে মিল খাওয়ানোর কী দরকার? গ্রামের স্কুলগুলোতে খাওয়ালে ওরা একটু বেশি খেতে পায়! লকডাউনের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর আজ এ'কথা বলতে পারেন, এমন অভিভাবকের সংখ্যা নিঃসন্দেহে কমেছে।

এখন আসা যাক, ইসকনের নিরামিষ খাবার নিয়ে এত হইহই রব উঠেছে কেন? প্রাণীজ প্রোটিনের বদলে প্রক্রিয়াজাত প্রোটিন কি আদৌ নিরাপদ? পুষ্টিবিদদের মতে, প্রাণীজ প্রোটিন (মাছ, মাংস, দুধ, ডিম) হল কমপ্লিট প্রোটিন। প্রাণীজ প্রোটিন থেকে মানবদেহের পেশী গঠনে সাহায্যকারী ৯টি অ্যামাইনো অ্যাসিডই পাওয়া যায়। প্রাণীজ প্রোটিন অনেক বেশি সহজপাচ্য। ডিমে থাকে ভিটামিন ডি এবং বি ১২। এর সাথে ডিমে উপস্থিত কোলিন শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডিমে থাকা সেলেনিয়াম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এক কথায় ডিম একটি 'সুপার ফুড'। গরীব পড়ুয়াদের মিড-ডে মিল থেকে ডিম কেড়ে নিয়ে বিজেপির নেতামন্ত্রীরা যুক্তি দিচ্ছেন, ডিমের সমান প্রোটিন বাচ্চারা রাজমা, সয়াবিন আর পনির থেকে পাবে। এই তথ্য একেবারেই ভুয়ো। কারণ, প্রক্রিয়াজাত প্রোটিনের (সয়াবিন, পনির) বায়োলজিকাল ভ্যালু প্রাণীজ প্রোটিনের তুলনায় অনেকটাই কম। উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এবং প্রক্রিয়াজাত প্রোটিনে অ্যামাইনো অ্যাসিডের মাত্রা থাকে কম। কেবলমাত্র পুষ্টিগুণের কথা মাথায় রেখে নয়, স্কুলপড়ুয়াদের স্বাদকোরক রাজমা, সয়াবিন, পনিরে তৃপ্ত হয় না। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সরকারি স্কুলের শিশু এবং তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছে, মিড-ডে মিলের নতুন খাদ্যতালিকা নিয়ে তাদের কী মত! সকলেই ডিম সরিয়ে নেওয়ার বিরোধিতা করেছে। বাচ্চারা বলেছে, সয়াবিন নয়, তাদের পছন্দের খাবার ডিম। বিজেপির যে নেতামন্ত্রীরা ইসকনের নিরামিষ খাবারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তারা কি রোজ দু-বেলা নিরামিষ খায়? মাছ, মাংস, ডিমের বদলে সয়াবিন আর পনির খায়? বিজেপির বিধানসভা নির্বাচনে জেতা বিধায়করা অনেকেই মিডিয়ার সামনে মাছ-ভাত খেয়ে প্রমাণ করেছিলেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসলে কাউকে নিরামিষ খেতে বাধ্য করবে না! কিন্তু ভোটে জেতার পর আমরা দেখলাম তারা তাদের চেনা ছকে ফিরেছে। 

বিজেপির এই সিদ্ধান্তে দেখলাম, কলকাতার ভদ্রবিত্তরা আপ্লুত। ডিম যেন মুসলমানদের খাবার! সয়াবিনই বাঙালি হিন্দুদের একমাত্র প্রোটিন সোর্স। যাদের সন্তানরা বেসরকারি স্কুলে পড়ে, যারা মিড-ডে মিলের খাবারের উপর নির্ভরশীল নন, তারা ছাড়া আর কাউকে দেখিনি এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাতে। কারণ যারা সরকারি স্কুলে পড়ে, তারা অনেকেই বাড়িতে সপ্তাহে দু'দিন ডিম খেতে পায় না। অথবা, বাড়িতে খেতে পেলেও, স্কুলের মিড-ডে মিলের ডিমটা আহ্লাদ করে খায়। মিড-ডে মিল প্রকল্প শুরুই হয়েছিল শিশুদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে পুষ্টির অভাব পূরণ করতে, গরীব পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করে তুলতে, স্কুলছুট পড়ুয়ার সংখ্যা কমাতে, সব ধর্ম ও জাতির সন্তানদের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে। আজ যদি সরকারের হাত থেকে সেই প্রকল্প অচিরেই বেসরকারি সংস্থার হাতে গিয়ে পড়ে, তাদের কি দায় থাকবে এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যগুলি সঠিক পদ্ধতিতে সাধন করার? তাছাড়া, একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশে, সরকারি প্রকল্পে ধর্মীয় সংস্থানকে যুক্ত করা কি আদৌ যুক্তিযুক্ত বিষয়?

পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে ইসকনের জন্য সরকারি স্কুলের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দিল, সেই ইসকনের নামে একাধিক জায়গায় শিশুদের যৌন হেনস্তার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কয়েকদিন আগে নেপালের কাঠমান্ডুতে বুধানীলকণ্ঠ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস (ইসকন)-এর এক পরিচালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির নাম সুরজকৃষ্ণ শ্রেষ্ঠ। ইসকনে অধ্যয়নরত শিশুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার মায়াপুরে অবস্থিত ইসকন মন্দিরের প্রধান সমন্বয়কারী ও সন্ন্যাসী জগদার্তিহা দাস নিখোঁজ হয়ে গেছিলেন। মন্দিরের এক নিরাপত্তারক্ষী তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর থেকেই তাঁর খোঁজ মিলছিল না। নবদ্বীপ থানায় দায়ের করা এফআইআরের অভিযোগ অনুযায়ী জানা যায়, ওই সন্ন্যাসী নিরাপত্তারক্ষীকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাঁর ওপর যৌন নির্যাতন করতেন। স্থানীয় পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও ওই সন্ন্যাসীর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অনুরূপ অভিযোগ উঠেছিল। তবে এবারই প্রথম তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর, ইসকন পরিচালিত স্কুলগুলিতে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত চেয়ে দায়ের হওয়া আবেদনকারীদের তাদের অভিযোগ নিয়ে ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অফ চাইল্ড অ্যাবিউজ (এনসিপিসিআর)-এর দ্বারস্থ হতে নির্দেশ দেয়। 

এর পাশাপাশি, এর আগে গুজরাট, কর্ণাটক, ওড়িশা প্রভৃতি যে রাজ্যগুলিতে ইসকন মিড-ডে মিলের দায়িত্বে থেকেছে, সেই সমস্ত রাজ্যে ইসকনের বিরুদ্ধে লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২০ সালে দুর্নীতির অভিযোগ এনে ইস্তফা দিয়েছিলেন ইসকনের মিড-ডে মিল প্রকল্পের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোহনদাস পাই। ২০০০ সালে 'অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশন' নামে একটি সংস্থা তৈরি করেছিল ইসকন। এই অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশন ওইসময় থেকে ব্যাঙ্গালোরের সরকারি স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলের খাবার সরবরাহ করতে শুরু করে। বর্তমানে ইসকন পরিচালিত এই অক্ষয় পাত্র ফাউন্ডেশন দেশের প্রায় ২৫,০০০ স্কুলের ২৩ লক্ষ পড়ুয়াকে মিড-ডে মিলের খাবার খাওয়াচ্ছে। এই ফাউন্ডেশন তৈরি করার বছরখানেক পর থেকে ইসকনের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির পাহাড় প্রমাণ অভিযোগ সামনে আসে। ইসকনের দায়িত্বশীল কর্মীরা সরকারের দেওয়া মিড-ডে মিলের চাল, গম বাইরের বাজারে বিক্রি করে দিত। খাবারের খরচ বাড়িয়ে দেখাত। সাধারণ মানুষের দানের টাকা আত্মসাৎ করে নিজেদের পকেট ভরাত। ইসকন ছেড়ে দেওয়ার পর অনেকেই ইসকন কর্তৃপক্ষের একাংশের  বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন। ২০২১ সালে ইসকনের জন সংযোগ আধিকারিক সৌরভ ত্রিবিক্রম দাসের বিরুদ্ধে বৃন্দাবনের পুলিশ এক কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ আনে। দুর্নীতিতে জর্জরিত তৃণমূল সরকারের প্রতি তিতিবিরক্ত হয়ে বাঙালিরা বিজেপি সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে। অথচ, বিজেপি শাসিত বাদ বাকি রাজ্যগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, দুর্নীতির পথ খুলতে এই সরকার, আগের সরকারের চেয়ে ঢের বেশি এগিয়ে। অভিভাবকদের ভেবে দেখা উচিৎ, কোনো টেন্ডার ছাড়া এমন কোনো বেসরকারি সংস্থাকে কি আদৌ সরকারি স্কুলের কোনো দায়িত্ব দেওয়া যায়? এ কি স্বল্প খরচে গরীব বাড়ির সন্তানদের সরকারি শিক্ষা লাভের পথ রোধ করে, শিক্ষাক্ষেত্রের বেসরকারিকরণের দিকে দু'কদম এগিয়ে থাকা নয়?

মিড-ডে মিল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত মিড-ডে মিল কর্মীরা। অত্যন্ত অল্প টাকায়, মিড-ডে মিলের রান্না করত, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবার থেকে আসা মহিলারা। এইবছর বাজেটে বিজেপি সরকার মিড-ডে মিল কর্মীদের ১,০০০ টাকা বেতন বাড়িয়েছে। কলকাতার সরকারি স্কুলগুলিতে যে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েরা মিড-ডে মিলের খাবার রান্না করত, তাদের রুটি-রুজির কী হবে সেই বিষয় সরকার এখনো স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। কোনো বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও তারা করবে বলে মনে হয় না। অন্নসংস্থানের চিন্তায় মিড-ডে মিল কর্মীদের রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে। হকার উচ্ছেদ, বুলডোজার-রাজ দিয়ে শুরু হয়েছিল। এখন আঘাত নেমেছে মিড-ডে মিল কর্মীদের উপর। গরীবের পেটে লাথি মেরে বিজেপি সরকার রাজ্যে কেমনতর উন্নয়ন করছে? কলকাতা কর্পোরেশনের অন্তর্গত প্রায় ৭০ শতাংশ সরকারি স্কুল তালা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। সরকারি স্কুল চালু না করে, কাদেরই বা খাওয়ানো হবে মিড-ডে মিলের নতুন সাত্ত্বিক মেন্যুর রাজমা-চাউল, সয়াবিন, মটর পনির আর কুমড়োর চানা?

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে কবি দ্বিজবংশী দাস, বিজয়গুপ্তের 'মনসামঙ্গল' কাব্যের পদে পদে বিবিধ মাছের কথা বর্ণিত আছে। বাংলার জলাভূমির মাছ ছিল সহজলভ্য। তাই বাঙালির দৈনন্দিন খাবারের তালিকা থেকে উৎসব– মাছ ছিল অন্যতম প্রধান খাদ্য। বাইন মাছের টক থেকে কই মাছের তেলঝোল, সব প্রণালী লেখা আছে মঙ্গলকাব্যের পাতায়। চিতল, ইলিশ, চিংড়ি, পাবদা, শোল, খরসুল, কাতলা– কী নেই! সব আছে। যত্নে লেখা সেই ইতিহাস, আমাদের সোনার বাংলার ইতিহাস৷ ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলেও বাঙালির মৎসপ্রেমের ইঙ্গিত মেলে। ইশ্বরগুপ্ত লিখেছিলেন, "ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল। ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।" কবি মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে বাঙালির রসনাবিলাসের নমুনা পাওয়া যায়। এ তো গেল বড়লোকের কথা। কালকেতুর মা, নিদয়া নিজের সাধের অনুষ্ঠানে খেতে চেয়েছিল হাঁসের ডিমের বড়া, চিংড়ির বড়া, সজারুর মাংস। কালকেতু ব্যাধ আর ফুল্লরার গল্পে মুকুন্দরাম রেখেছিল খুদজাউয়ের কথা। কালকেতু পশু শিকার করতে না পারলে, তাদের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসত। শিকার করা পশুর মাংসই ছিল তাদের জীবনধারণের একমাত্র উপায়। চর্যাপদে হরিণের মাংসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হরিণের মাংস সবচেয়ে সুস্বাদ হওয়ায় বিয়েতে বাঙালিদের ভোজের আয়োজনে হরিণের মাংস থাকত। রামায়ন-মহাভারতের সময়ও ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র নির্বিশেষে মাংস খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। রাজা দশরথ অশ্বমেধ যজ্ঞের দিন যে বিশাল ভোজের ব্যবস্থা করেছিল, সেখানে ছিল অশ্বমাংস। রামচন্দ্র যখন বনবাসে যায়, তখন তাকে ফলমূল ছাড়াও হরিণ, মোষ এবং শূকরের মাংস খেতে হয়। 

বিজেপি-আরএসএস জানে, স্কুল পড়ুয়ারা নরম মাটির তালের মতো। যে আকারে গড়বে, গড়ন হবে ঠিক তেমন। তাই তাদের মগজ ধোলাই করতেই এত আয়োজন। সিলেবাসে কাঁচি চালিয়ে নতুন প্রজন্মকে প্রকৃত ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার কাজ অনেকদিন আগেই শুরু করেছে তারা। এখন যদি ছোট থেকে তাদের নিরামিষ খাবারে অভ্যস্ত করে ফেলা যায়, তাহলে আর ভবিষ্যতে  মাছে-ভাতে বাঙালির অস্তিত্ব মুছে ফেলতে বিজেপি-আরএসএস-কে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হবে না। যে বাঙালি অন্য রাজ্যে গিয়ে একমুঠো ডাল-ভাতের আশায় বাড়ি ফেরার দিন গুনত, আজ সেই বাঙালির বাচ্চাদের খাদ্যাভাস থেকে শুধু ডিম নয়, মুসুর ডালটাও বিজেপি সরকার ধুয়ে সাফ করে দিল। কারণ ইসকন মুসুর ডালকেও আমিষ খাবারের আওতায় ফেলে। পশ্চিমবাংলার সরকারি স্কুলে যাওয়া খুদে পড়ুয়াদের খাদ্যাভাসে আজকের এই আক্রমণই ভবিষ্যতে বাঙালির মাছ-ভাতের উপর আক্রমণ; একটি নির্দিষ্ট জাতির সাংবিধানিক অধিকারের উপর নির্মম আক্রমণ।

0 Comments

Post Comment