পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভারতীয় জ্ঞান-পদ্ধতি প্রসঙ্গে (তৃতীয় ভাগ)

  • 15 December, 2023
  • 1 Comment(s)
  • 829 view(s)
  • লিখেছেন : শংকর
রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীরা বরাবরই চিৎকার করে বলার চেষ্টা করেন যে, বেদে সকল জ্ঞান আছে। বেদের মধ্যে পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র, বিমান চালনার কৌশল, দর্শন, ধর্ম, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, গণিত সকলই আছে। বেদ থেকেই এই জ্ঞান সর্ববিশ্বে ছড়িয়েছে। তথাকথিত বস্তুবাদীরা, বিশেষ করে বামপন্থীরা জোরের সাথে এই বক্তব্যের বিরোধতা করেন। তাঁরা বলেন, বেদে এসব কিছুই নেই। সেখানে কিছু অর্থহীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস টিশ্বাসের কথা ছাড়া আর কিছুই নেই। আমাদের এটা পরিষ্কার বুঝে নিতে হবে যে, এই উভয় বক্তব্যই ভুল।

বলা হয় বেদ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা সকলেই জানেন আমরা অধুনা যাকে হিন্দুধর্ম বলি তার প্রায় কিছুই বেদে নেই। বেদ সম্পূর্ণ আলাদা কিছু বিশ্বাস ও অনুশীলন থেকে উদ্ভুত হয়েছিল। বিষয়টি বেশ জটিল। একদিকে যখন রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীরা শতমুখে বেদের মাহাত্ম্য প্রচার করেছে, অন্যদিকে কমিউনিষ্টরা বেদের ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের মধ্যে ঢোকার কোনো প্রচেষ্টাই নেন নি। বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে যে কমিউনিষ্ট জ্ঞানচর্চাকারীরা বেদ নিয়ে আলোচনা করতে প্রয়াসী হয়েছেন তাঁরা প্রায় সকলেই ব্যতিক্রমহীনভাবে কমিউনিষ্ট পার্টি ও কমিউনিষ্ট পরিমন্ডল থেকে বিপুল বাধা, অজ্ঞনতাজনিত অবজ্ঞা ও টিটিকিরির সম্মুখীন হয়েছেন। এমনকি এই কথা প্রথম যুগের কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা ডাঙ্গের ক্ষেত্রেও খাটে। দেবীপ্রসাদ তাঁর সুবিখ্যাত 'লোকায়ত' গ্রন্থটি লেখার পরে কী ধরণের সমালোচনা এই মধ্যমেধার কমিউনিষ্ট আমলাতন্ত্রের কাছ থেকে পেয়েছিলেন তাও আজকাল সবারই জানা।

 

বেদ রচিত হয়েছিল দীর্ঘকাল ধরে। বেদের চারটি অংশ, সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ রচনার মোট সময়কাল এক হাজার বছর ব্যাপী বিস্তৃত। এই এক হাজার বছরে আর্য সমাজের উথাল পাথাল করা পরিবর্তন ঘটে যায়। সুতরাং, ধ্যানধারণা, বিশ্বাস এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে নি। বেদের রচয়িতাদের বিশ্বাস, তত্ত্ব, ভাবনা এসবই পরিবর্তিত হয়েছে। এমনকি একদম একশো আশি ডিগ্রি পালটে গিয়েছে। আর মজার ব্যাপার হল, সবটা মিলিয়ে এই স্ববিরোধী গোটা রচনাস্তুপটিই আমাদের কাছে বেদ নামে পরিচিত। সুতরাং, মনোযোগ দিয়ে বেদ অধ্যয়ন করলে যা পাওয়া যাবে তা হল এক স্ববিরোধী বক্তব্যের সমষ্টি, যার মধ্যে বিভিন্ন উপাদান পরষ্পরের বিপরীত এবং প্রতিদ্বন্দ্বি। এই বিপরীত বক্তব্যগুলি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরুন, সর্বপ্রাচীন বেদ ঋগ্বেদের সর্বপ্রাচীন সূক্তগুলিতে দেবতাদের অসুর নামে সম্বোধন করা হত। অগ্নির উদ্দ্যেশে একাধিকবার এই সম্বোধন ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদের উদ্দেশ্যেও তাই করা হয়েছে। আর অসুরদের বলা হত দেবতা। কিন্তু পরবর্তীকালে এটি উল্টো হয়ে যায়। অধুনা একটি গুরুত্বপূর্ণ  বিতর্ককে যে খুঁচিয়ে তোলা হচ্ছে তার সমাধানে এই স্ববিরোধিতাটির বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হল আর্যদের পরিযান সংক্রান্ত বিতর্ক। বর্তমানে যতই বিজেপি/আর এস এসের ফ্যাসিবাদী শাসন দেশে দৃঢ় হচ্ছে ততই এটা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে যে, আর্যরা ভারতের বাইরে থেকে আসেন নি, বরং তাঁদের আদি বাসস্থান হল ভারত। এখান থেকেই তাঁরা বাইরে গেছিলেন। এই আর্য হোমল্যান্ড থিওরির অন্থঃসারশূণ্যতা প্রমাণে ঋগ্বেদের এই স্ববিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। যাই হোক, সে কথায় আমরা পরের ভাগে আসব। বর্তমানে আমরা মনোনিবেশ করব অন্য একটি স্ববিরোধিতায়। সেটি হল কর্ম প্রসঙ্গে বৈদিক সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্ববিরোধিতায়।

 

রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীরা বরাবরই চিৎকার করে বলার চেষ্টা করেন যে, বেদে সকল জ্ঞান আছে। বেদের মধ্যে পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র, বিমান চালনার কৌশল, দর্শন, ধর্ম, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, গণিত সকলই আছে। বেদ থেকেই এই জ্ঞান সর্ববিশ্বে ছড়িয়েছে। তথাকথিত বস্তুবাদীরা, বিশেষ করে বামপন্থীরা জোরের সাথে এই বক্তব্যের বিরোধতা করেন। তাঁরা বলেন, বেদে এসব কিছুই নেই। সেখানে কিছু অর্থহীন, কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস টিশ্বাসের কথা ছাড়া আর কিছুই নেই। আমাদের এটা পরিষ্কার বুঝে নিতে হবে যে, এই উভয় বক্তব্যই ভুল। বৈদিক সাহিত্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। তাতে অনেক কিছুই আছে। কিন্তু সব কিছু নেই। পৃথিবীর কোনো রচনাতেই সব কিছু থাকতে পারে না। কারণ রচনার একটা সময়কাল আছে। কিন্তু মানুষের জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি অসীম, অশেষ। সময়ের কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে দাঁড়িয়ে সকল জ্ঞান পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আবার এর অর্থ এই নয় যে, বেদে কিছুই নেই। অবশ্যই আছে। সে যুগের অর্জিত জ্ঞানভান্ডারের আলোচনা নিশ্চয়ই আমরা তাতে দেখতে পাব। এখন প্রশ্ন হল, প্রাচীন ভারতের অধিবাসীদের আদৌ কি কোনো জ্ঞান ছিল?

সভ্যতার অগ্রগতির যে একমাত্রিক এবং সরলরৈখিক ধারণাকেই আমরা চিরকাল সঠিক বলে ভাবতে অভ্যস্ত, আমাদের মনস্তত্ত্বও নির্মিত হয়েছে যে ধারণার ওপর তা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, প্রাচীন সমাজগুলি ছিল বর্বর। সেখানে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে থাকা মানুষ হাজারো কুসংস্কারের জালে জড়িয়ে থাকত। ফলে তাঁদের সেভাবে কোনো জ্ঞান ছিল না। জ্ঞানের কিছু টুকটাক বিকাশ হয়েছিল বটে তবে সেগুলো খুব একটা তাৎপর্যপূর্ণ নয়। আসল জ্ঞানের বিকাশ তো শুরু হল বুর্জোয়া আমলে। তার আগে তো সবটাই মোটামুটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়। বুর্জোয়ারা নিয়ে আসল আলো। ঘটল 'এনলাইটমেন্ট', আলোকায়ন। বুর্জোয়াদের সৃষ্ট এবং প্রচারিত এই তত্ত্ব এমনকি মার্কসবাদী তথা বামপন্থীদের মাথায় এত দৃঢ় হয়ে গেঁথে রয়েছে এবং তাতে একপ্রকার অন্ধবিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে যা প্রায় ধর্মীয় বিশ্বাসের চেহারা নিয়ে ফেলেছে। বুর্জোয়াদের এই প্রচার এবং তাতে মার্ক্সবাদীসহ প্রায় সকল চিন্তাশীল মানুষের এই ধর্মসম বিশ্বাস প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আঘাত পায় উনবিংশ শতকের শেষভাগ এবং বিংশ শতকের প্রথমদিকে, যখন তথাকথিত ইতিহাস-পূর্ব (prehistoric) মানবজীবন নিয়ে ঐতিহাসিকরা এবং পুরাতত্ত্ববিদরা কাজ শুরু করেন। এর ফলে একদিকে যেমন বুর্জোয়াদের উক্ত তথাকথিত আলোকায়নের প্রচার ধাক্কা খায় তেমনি অন্যদিকে প্রথাগত মার্কসবাদী বক্তব্যও পাল্টাতে শুরু করে। মার্কস-এঙ্গেলসের জীবদ্দশাতেই, তাঁদের দ্বারা এই পরিবর্তন সূচিত হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে মার্কসবাদী ভাষ্যের এই পরিবর্তন নানা কারণে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয় নি। ফলে ইতিহাস-পূর্ব জ্ঞানালোচনার পূর্ববর্তী মার্কসবাদী ভাষ্যই আজও আমাদের দেশসহ বিশ্বের একটি বড় অঞ্চলে প্রধান মার্কসবাদী ভাষ্য হিসাবে টিঁকে রয়েছে এবং বলা বাহুল্য বিশ্ব-প্রগতিশীল আন্দোলনের চূড়ান্ত ক্ষতিসাধন করে চলেছে। যাই হোক, এটি একটি স্বতন্ত্র আলোচনা। আমরা আবার আমাদের বিষয়ে ফেরত আসি।

ভারত সম্পর্কে একটা কথা মার্কসবাদী এবং উদারনৈতিক বুর্জোয়া মহলে চালু আছে। তা হল ব্রিটিশরা আসার আগে পর্যন্ত নাকি এখানে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীন অর্থনীতি চালু ছিল। এবং এটাই ছিল ভারতের সকল পশ্চাৎপদতার কারণ। প্রাক্-পুঁজিবাদী অর্থনীতি নাকি এমনই হয়। বুর্জোয়ারাই একে ভাঙ্গে। উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ পণ্য তৈরি করে। সেই পণ্য সারা বিশ্বে বিক্রি করার জন্যে তারা পৃথিবীর সর্বত্র দৌড়ে বেরায়। সৃষ্টি হয় বিশ্ববাজার। গ্রামীন স্বয়ংসম্পূর্ণতা ভেঙ্গে পড়ে। প্রকৃত আলোকায়ন সম্ভব হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি। অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত মার্কসবাদী পুরাতত্ত্ববিদ ভি গর্ডন চাইল্ড তাঁর বিখ্যাত বই 'তাম্রযুগ' (The Bronze Age) -এ দেখিয়েছেন যে, এমনকি নব্যপ্রস্তর যুগেও মানুষ পুরোপুরিভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতিতে বাস করতে পারে নি। এর কারণ ছিল উৎপাদনের কাঁচামালের অসম উপলব্ধি। নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষ তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে খুব দ্রুত হৃদয়ঙ্গম করেছিল যে পাথরে পাথর ফারাক আছে। সব পাথর দিয়ে সব কাজ হয় না। পাথরের কাজকর্ম যতই সূক্ষ্ম হতে লাগল ততই বিভিন্ন ধরণের পাথরের প্রয়োজন পড়তে লাগল। ততই দেখা গেল অনেক পাথরই আনতে হচ্ছে উৎপাদক গোষ্ঠীর বাসস্থানের সীমানার বাইরে থেকে। কিন্তু তবুও নব্য প্রস্তরযুগের অর্থনীতি মূলত দাঁড়িয়েছিল স্বয়ংসম্পূর্ণতার ওপর। কিন্তু তাম্রযুগে এসে তা আর সম্ভব হল না, বিশেষ করে ব্রোঞ্জের উৎপত্তির পর। কারণ, বিশুদ্ধ তামা বহু জায়গাতেই পাওয়া গেলেও ব্রোঞ্জ তৈরির জন্য যে টিনের প্রয়োজন পড়ে তা মোটেই পৃথিবীর সর্বত্র সুলভ নয়। সুতরাং, তথাকথিত স্বয়ংসম্পূর্ণতা চুলোয় গেল। এবং এর ফলে ঘটতে লাগল যুগান্তকারী একের পর এক পরিবর্তন।  (১)

 

নব্যপ্রস্তর যুগের স্বয়ংসম্পূর্ণতা থেকে তাম্রযুগের বাণিজ্যের দিকে যাত্রার কথা এই যে আমরা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললাম এর পেছনে কিন্তু আছে এক দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে কর্ম ও জ্ঞানের এক পারষ্পরিক মিথস্ত্রিয়া। উভয়ই উভয়ের জননী এবং উভয়ই উভয়ের ফলাফল। মানুষের ব্যবহারিক জীবন মূলত জ্ঞাননির্ভর। জ্ঞান ছাড়া ব্যবহারিক জীবন সম্ভব নয়। কর্ম সম্ভব নয়। আবার কর্ম ছাড়া জ্ঞানলাভও সম্ভব নয়। গভীরতর বিচারে দেখা যায় যে, মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গেই তার জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা যুক্ত। গর্ডন চাইল্ড তাঁর আর একটি বিদগ্ধ লেখা 'ম্যান মেকস হিমসেলফ' (Man Makes Himself)-এ দেখিয়েছেন যে, জ্ঞান ছাড়া মানুষের অস্তিত্বই সম্ভব হত না (২)। সুতরাং মানুষের অস্তিত্বের অন্যদিকটি হল তার কর্ম যার অনিবার্য ফলাফল ও শর্ত উভয়ই হল জ্ঞানচর্চা।

ভারতে সভ্যতা গড়ে ওঠার ইতিহাস এখনও পর্যন্ত যা জানা যায় তাতে মেহেরগড় সভ্যতাই হল প্রাচীন এবং প্রাক্-সিন্ধুসভ্যতা। মেহেরগড় নিয়ে এখনও খুব বেশি কিছু জানা যায় নি। সিন্ধুসভ্যতা নিয়েও অনেক কিছু পরিষ্কার নয়, তবুও বেশ কিছু তথ্য গোদা আকারে জানা গেছে। সিন্ধুসভ্যতা ছিল তাম্রসভ্যতা। গর্ডন চাইল্ড দেখিয়েছেন যে তাম্রসভ্যতা মানেই হল বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একগুচ্ছ অগ্রগতি ও আবিষ্কার। নতুন আবিষ্কৃত এই ধাতুটি যে আগুনের তাপে পরিবর্তিত হয়, তার ভৌতচরিত্রের পরিবর্তন হয় এটা বুঝতে পারাই ছিল এই অগ্রগতিগুচ্ছের প্রথম ধাপ। এর পরে আসছে তার গলনাঙ্ক সম্পর্কে ধারণা এবং তাপ তৈরি করার কৃৎকৌশলের উন্নতিসাধন। প্রকৃতিতে তামা প্রধানত যে আকরিক হিসাবে পাওয়া যায় তা চিহ্নিত করা এবং তা থেকে তামা নিষ্কাশন করাও ছিল একগুচ্ছ আবিষ্কার ও অগ্রগতির ফল। এর পাশাপাশি এই যে বড় আকারে ধাতুর খনন, নিষ্কাশন ও তা থেকে নিভিন্ন পন্য উৎপাদন –--- সাধারণ সুস্থ বুদ্ধিতেই বোঝা যায় যে এর জন্যে বিপুল পরিমাণে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মযোগ লাগে। এটা সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের ও উৎপাদন-পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন ছাড়া সম্ভব নয়। এর অর্থই হল বিজ্ঞানের বিপুল বিকাশ। রসায়নশাস্ত্র, ধাতুবিদ্যা, গণিত, ভৌতবিজ্ঞান —- এসবের পর্যাপ্ত উন্নতি ছাড়া তাম্রসভ্যতা গড়েই উঠতে পারত না। সিন্ধুসভ্যতার সময় থেকেই প্রাচীন ভারতের সভ্যতাগুলিতে এই অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় এবং তা খুব স্বাভাবিকও বটে। এই ঘটনা শুধু ভারতেই ঘটে নি, তৎকালীন বিশ্বের যে কেন্দ্রগুলিতে তাম্রসভ্যতা গড়ে উঠেছিল সেসব জায়গাতেও জ্ঞানবিজ্ঞানের এই বিকাশ ঘটেছিল। জ্ঞানের বিকাশ ছাড়া কর্মের বিকাশ, সভ্যতার বিকাশ অসম্ভব। বিজেপি/আর এস এস দাবি করে শুধু ভারতেই সকল অগ্রগতি ঘটেছিল, তদুপরি তাদের দাবি হল বেদই হল এই সকল জ্ঞানের আকর। ইউজিসি, এনসিইআরটি প্রভৃতি সংস্থাগুলিতে গেরুয়াকরণ এতদূর ঘটানো হয়েছে যে তারা আজকাল যে পাঠক্রম তৈরি করছে তাতেও এই অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিহাসিক মতবাদ চাপানো হচ্ছে। গোটা নয়া শিক্ষাব্যবস্থাকেই এই ধরণের মিথ্যাচারের ওপর দাঁড় করানো হচ্ছে ভারতীয় শিক্ষা-পদ্ধতির নামে। অথচ ইতিহাস অন্য কথা বলে। 

 

বৈদিক আর্যদের ভারতীয় উপমহাদেশ অভিযানের ফলে সিন্ধুসভ্যতার পতন ঘটে। গোটা ঋগ্বেদজুড়ে তার বিস্তৃত বর্ণনা দেওয়া আছে। অথচ এই পরিষ্কার সত্য কথা খুব কম ঐতিহাসিকই উচ্চারণ করেন। রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীরা তো মনেই করেন না আর্যরা বাইরে থেকে এসেছিল। তাদের মতে সিন্ধুসভ্যতা আর্যদেরই প্রতিষ্ঠিত। এর থেকে বড় হাস্যকর মিথ্যা আর কিছু হয় না। অন্যদিকে বামপন্থী ঐতিহাসিকরা বেদের সাক্ষ্যকে কখনই খুব একটা নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সূত্র বলে স্বীকৃতি দিতে চান নি। অথচ, ইরান-আফগানিস্তান সীমান্তের সিস্তান এলাকা থেকে হেলমন্ড লেকের প্রথম যুদ্ধ থেকে শুরু করে যমুনাতীর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূভাগে অনেকগুলি সভ্যতাকেন্দ্রের সাথে প্রায় দুশো বছরব্যাপী অবিরত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বৈদিক আর্যরা যে এলাকা দখল করে, এবং যার নাম তাঁরা দেয় 'দেবভূমি', তাতে সিন্ধুসভ্যতা পরবর্তী যে সভ্যতা তাঁরা গড়ে তুলল তা ছিল ঐতিহাসিক বিচারে অনেক অনেক পশ্চাৎপদ।

 

সিন্ধুসভ্যতার উন্নত কৃষিকাজ যা কৃষি থেকে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তৈরি করত, যার ওপর দাঁড়িয়েছিল উন্নত শহর, শিল্পোৎপাদন, মাইনিং, খনন, ধাতুবিদ্যা, শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদন এবং তৎকালীন বিশ্বের অন্যান্য সভ্যতা কেন্দ্রের সঙ্গে নিয়মিত বাণিজ্য, এবং ফলত সমুদ্রবিজ্ঞানের অগ্রগতি, পরিবহনের অগ্রগতি, ফলত জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতি —- এই সবকিছু এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক কিছু চুলোয় গেল। ভারতে সভ্যতার বিকাশ সাময়িকভাবে থমকে গেল, অন্ধকারে ডুবে গেল। বৈদিক আর্যরা ছিল পশুচারণকারী যাযাবর গোষ্ঠী কিন্তু প্রকৃতিপরিবেশের কারণে ঘোড়ার ব্যবহার জানত এবং ছিল যুদ্ধবিদ্যায় ভয়ঙ্কর পারদর্শী। কিন্তু তা তাঁদের উন্নত সভ্যতার প্রতিফলন ছিল না, ছিল বরং উলটো। তাঁদের যুদ্ধবিদ্যার উৎকর্ষ ছিল তাঁদের অপেক্ষাকৃত নিম্ন সভ্যতার প্রতিফলন। ফলে প্রাথমিকভাবে বৈদিক আর্যদের দ্বারাই ভারতে উৎপাদন-পদ্ধতির বিকাশ এবং তজ্জনিত জ্ঞানবিজ্ঞানের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হল। এই কথাটা প্রথমেই খুব পরিষ্কার করে আমাদের বলা দরকার।

 

কিন্তু তবুও এটাও সত্য যে, আদিবৈদিক মানুষ ছিল প্রধানত কেজো মানুষ। কর্মের স্তরের দিক থেকে বিচার করলে তা ছিল সিন্ধুসভ্যতার থেকে পশ্চাৎপদ, কিন্তু কর্ম জিনিসটি বাতিল হয়ে যায় নি। ইতিহাস সাময়িকভাবে বেশ কিছুটা পেছনে গিয়ে আবার সামনের দিকে চলতে শুরু করল। কিন্তু এই পিছিয়ে যাওয়ার ফলে এই সভ্যতার মানুষদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়াল ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তা। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইটা আবার নতুন করে তাঁদের শিখতে হল। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা অবশ্য যাঁদেরকে পরাজিত ও বিতাড়িত করেছিল সেই অনার্যদের কাছ থেকে কৃষিকাজ শিখেছিল, কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁদের জ্ঞানগম্যি ছিল অতি প্রাথমিকস্তরে। ফলে খাদ্য উৎপাদনের অনিশ্চয়তা তাঁদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়াল। ফলে যাগযজ্ঞাদি হয়ে দাঁড়াল তাঁদের নিত্যকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর এই যজ্ঞ করতে গিয়েই বৈদিক আর্যদের শিখতে হল উচ্চস্তরের গণিত। আবার কালক্রমে ঐ একই বৈদিক দর্শনে এবং ফলত বৈদিক সাহিত্যে জন্ম নিল তীব্র কর্মবিরোধিতা, এবং ফলত যজ্ঞবিরোধিতা। বৈদিকচিন্তায় প্রথমদিকে কর্মের মাহাত্ম্য এবং পরবর্তীকালে প্রবল কর্ম বিরোধিতা, কর্ম ও জ্ঞানকে বিচ্ছিন্ন করে এককে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর সাথে বৈদিক সমাজে নতুন করে জ্ঞানের বিকাশ এবং তাতে বাধাদানের বিষয়টি যুক্ত। আর আমরা জানি বৈদিক জ্ঞানের বিকাশে যারা বাধাদান করল তাদের উত্তরসূরিরাই আজ বেদমাহাত্ম্য প্রচারে অতিউগ্র! ইতিহাসের সঙ্গে এই রসিকতার মুখোশ উন্মোচিত করাই এঁদের বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি হওয়া উচিত। পরের ভাগে এই নিয়ে আমরা আরও বিস্তারিত আলোচনায় যাব।

 

(ক্রমশ)

 

 

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

 

(১) "The most striking feature of a Neolithic community was its self-sufficiency. The sacrifice of that self-sufficiency was only possible when certain sociological and economic conditions had been fulfilled and brought in its train a series of other political and industrial changes." (V Gordon Childe/ The Bronze Age/ Aakar Books/ p 9)

 

(২) "এখনকার মতো এমনকি সেই প্লিস্টোসিন যুগে প্রথম আবির্ভাবের সময় থেকেই কোন বিশেষ পরিবেশে অস্তিত্বরক্ষার মতো শারীরিক ব্যবস্থাদি প্রয়োজনের তুলনায় আপাতভাবে কম ছিল মানুষের। কোন বিশেষ ধরণের অবস্থার মোকাবিলা করার মতো শারীরিক ক্রিয়াকৌশলগুলো মানুষের শরীরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্যান্য জন্তুর তুলনায় নিচু মানের।…..  তা সত্ত্বেও, পরিবেশের বহুরকম ভিন্নতার সঙ্গে অন্য যে-কোনো প্রাণীর চেয়ে মানুষ ভালভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছে। উন্নত প্রজাতির স্তন্যপায়ীদের নিকট-সম্বন্ধীয় প্রাণীদের মধ্যে মানুষ অকল্পনীয় দ্রুততার সাথে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করেছে এবং মেরুভল্লুক, খরগোশ, বাজপাখী আর বাঘকে তাদের বিশেষ কায়দার দিক থেকেও টেক্কা দিতে পেরেছে। আগুনের নিয়ন্ত্রণ এবং পোশাক ও গৃহ নির্মাণের দক্ষতার ফলে সুমেরুবৃত্ত থেকে বিষুবরেখা পর্যন্ত সর্বত্রই মানুষ বসবাস করতে ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পেরেছে, পারে। মানুষ যে সব ট্রেন আর গাড়ি বানিয়েছে তাতে করে সে তড়িৎগতি খরগোশ বা অস্ট্রিচকেও পেছনে ফেলে এগিতে যেতে পারে। প্লেনে চড়ে মানুষ ঈগলের চেয়েও উপরে উঠতে পারে, টেলিস্কোপ দিয়ে বাজপাখীর চেয়েও দূরে দেখতে পারে। বাঘও যে-সব জন্তুদের সাথে এঁটে উঠতে সাহস পায় না তাদেরকেও মানুষ আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে ধরাশায়ী করতে পারে। আমরা বারবার একথা বলব যে, আগুন, জামাকাপড়, ঘরবাড়ি, ট্রেন, প্লেন, টেলিস্কোপ ও বন্দুক মানুষের দেহের অংশ নয়। এ-সব তার জৈবিক উত্তরাধিকার নয়, কিন্তু এগুলোর উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য যে দক্ষতার প্রয়োজন তা সামাজিক উত্তরাধিকারের একটা দিক। রক্তের সূত্রে নয়, বরং অনেক অনেক পুরুষ ধরে সংগৃহীত ঐতিহ্যের কথা ও লেখার মধ্যে দিয়ে প্রবহমানতার ফল।" (ভি গর্ডন চাইল্ড/ ম্যান মেকস হিমসেলফ/ বাংলা সংস্করণ/ দীপায়ন/ ২২-২৩)

 

আগের দুটি পর্ব পড়ুন এই সূত্রে।

ভারতীয় জ্ঞান-পদ্ধতি প্রসঙ্গে (দ্বিতীয় ভাগ)

 

ভারতীয় জ্ঞান পদ্ধতি প্রসঙ্গে (প্রথম ভাগ)

1 Comments

Pulin Chakraborty

15 December, 2023

A very important documentation, essential for today's India. Need to go through all your write-up. Please share the links. Thanks.

Post Comment