পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সত্যজিতের মহাপুরুষ

  • 14 August, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 318 view(s)
  • লিখেছেন : মানস ঘোষ
সত্যজিৎ রায় যেভাবে ধার্মিকতা ও নাস্তিক্যের সমাজতত্ত্বটিকে এই বিভিন্ন টাইপের চরিত্রগুলির মধ্যে নাটকীয় টানাপোড়েন ও সংলাপের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেন তা বিশ্লেষণ করলে বর্তমান মধ্যবিত্ত সমাজে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বটির একটি আভাস মেলে। 'মহাপুরুষ' ছবি নিয়ে একটি লেখা যা আজকের সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ছবিটির লিঙ্ক নীচে থাকলো।

 

আমরা এমন একটা দেশে এখন বাস করছি যেখানে আজ প্রতি মুহুর্তে একটা ব্যাটল অফ রিজন চলছে। বৈজ্ঞানিক যুক্তি-পারম্পর্য বনাম ধর্মীয় কল্পরাজ্য – একটা দারুণ যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধটা চলছে  অনেকগুলো ফ্রন্টে। রাজনীতি, সংবিধান, সংস্কৃতি,  গণমনস্তত্ত্ব বিবিধ স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে তা। এরকম একটা সময়ে যখন তিক্ততা গ্রাস করেছে মন তখন এক বর্ষার দুপুরে সত্যজিৎ রায়ের মহাপুরুষ দেখতে বসলাম। নির্ভেজাল হাসির ছবি সন্দেহ নেই। কিন্তু হাসির আড়ালে সেখানেও একটা যুদ্ধ চলছে দেখলাম। ব্যাটল অফ রিজন।

ছবির চরিত্রগুলোকে যদি বিভিন্ন গোত্র বা টাইপে ভাগ করা যায় তাহলে দেখা যাবে ছয় ধরণের লোক পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম দল অবশ্যই বিরিঞ্চিবাবা ও তার খাস চেলা কেবলরাম। ধর্ম এদের ব্যবসা। পুরোটাই চোখে ধুলো দেওয়া পারফর্মেন্স। আর একদল হল প্রবল ধর্মবিশ্বাসী – গুরুপদবাবুর মত ভক্ত, এরাই সংখ্যায় বেশি। অন্যদল হল প্রবল অবিশ্বাসী – ঘোর নাস্তিক যদিও তার সংখ্যালঘু। যেমনটা নিবারণবাবু ও সত্যচরণ। এটুকু সহজবোধ্য। কিন্তু এরা ছাড়া আরও আছে। যারা এই ধর্মকে বিশুদ্ধ স্থুল স্বার্থে ব্যবহার করে টুপাইস কামাতে, যেমন গনেশমামা। আর একদল রয়েছে যারা বেশ দোদুল্যমান চিত্তের লোক। যেমন নিতাইবাবু আর পরাগ। এরা বিশ্বাস অবিশ্বাসের মধ্যে দোল খাচ্ছে। যেকোন দিকেই ভিড়ে যেতে পারে সুবিধামত। ভাসমান চরিত্র। আর এখানে শেষ একটা দল রয়েছে। যে দলে আছে প্রফেসর ননী, তার স্ত্রী ও গুরুপদবাবুর ছোট মেয়ে বুঁচকি। তারা বাবাজির ভন্ডামি বুঝতে পারে। কিন্তু বিবিধ অবলিগেশন ও পারিবারিক স্টেকের কথা মাথায় রেখে তারা নীরব থাকে।

সত্যজিৎ রায় যেভাবে ধার্মিকতা ও নাস্তিক্যের সমাজতত্ত্বটিকে এই বিভিন্ন টাইপের চরিত্রগুলির মধ্যে নাটকীয় টানাপোড়েন ও সংলাপের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেন তা বিশ্লেষণ করলে বর্তমান মধ্যবিত্ত সমাজে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বটির একটি আভাস মেলে। সত্যি কথা বলতে কি রাজশেখর বসুর গল্পের মধ্যে টানাপোড়েনটিকে সত্যজিৎ রায় ছবিতে অনেকখানি ক্ষুরধার করে তোলেন। রাজশেখর বাবুর কাহিনীখানা শুরু হয় নিবারণবাবুদের মেসে ধর্ম ও বাবাজী সংক্রান্ত গল্পগুজবের মধ্যে দিয়ে। সত্যজিৎ কিন্তু ছবি শুরু করেন ট্রেনে দুর্বলচিত্ত ও ভগ্নহৃদয় গুরুপদবাবু কিভাবে বাবাজির পায়ে আত্মসমর্পণ করলেন সে ঘটনা দিয়ে। চমৎকার কমিক সিকোয়েন্স সন্দেহ নেই। কিন্তু গূঢ অর্থও মিলতে পারে। আসলে ধর্ম দূর্বল চিত্তে সহজে প্রবেশ করে, যেমনটা গুরুপদবাবুর ক্ষেত্রে হল আরকি। তা আফিমের মতই উন্মাদনা তৈরি করে। গুরুপদবাবুর মত যারা একবার মজেছে তাদের বেরিয়ে আসা সহজ নয়। একই সঙ্গে সত্যজিৎ দেখাতে থাকেন ধর্ম কিভাবে কেবল ব্যক্তি নয়, সমষ্টির মধ্যেও গণউন্মাদনা তৈরি করতে থাকে। আর শেষ পর্যন্ত ধর্ম ও বাবাজিকে কেন্দ্র করে একটা অদ্ভুত ইকোনমি গড়ে ওঠে। সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাবাজির জন্য ভেট, তিনতলা আশ্রমের প্রতিশ্রুতি, গনেশমামার কমিশন সবকিছুই চলতে থাকে এই আশ্চর্য ইকোনমির মধ্যে।

তবে শেষ পর্যন্ত চোখে ছানি অথবা মনে ভক্তি, এর বাইরে এলেই ধর্মের বিপদ। তাই যতদিন সম্মোহিত রাখা যায় আরকি! মহাপুরুষ ইমেজটা অন্ধ ভক্ত, ধর্ম ব্যবসায়ী আর ধুরন্ধর গুরু সবারই কাজে আসে। সেদিক থেকে দেখলে রাজশেখর বসুর গল্পের ‘বিরিঞ্চিবাবা’ শিরোনামের থেকে সত্যজিৎ বাবুর ছবির মহাপুরুষ নামকরণ আমার অধিক পছন্দের। ‘মহাপুরুষ’ শব্দটার মধ্যে এখানে একটা শ্লেষ রয়েছে। নির্দোষ কমেডি নয়, এই শ্লেষটুকু আমাদের দরকার।



ছবিটি ইউটিউবে দেখুনঃ   

https://www.youtube.com/watch?v=bljuNMSll0A

 

0 Comments

Post Comment