পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভুতের বাপের রান্নাঘর

  • 19 June, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 612 view(s)
  • লিখেছেন : বিশ্বেন্দু নন্দ
বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ধারণার সঙ্গে স্বচ্ছল ভদ্রবিত্ত দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে। বন্ধু আত্মীয়ের বাড়ির নেমন্তন্নে পাত পেড়ে খাওয়াবার রীতি কোন যুগে শুরু হয়েছিল কেউ জানেনা। কিন্তু আমি অন্তত দুই ঘনিষ্ঠ স্বচ্ছল আত্মীয়র বাড়ির নেমন্তন্নে এপ কোম্পানির আনানো খাবার গিলতে বাধ্য হয়েছি। স্বচ্ছল বাঙালি গৃহস্থ খাবারদাবারের নানান সামাজিক প্রথা খুব তাড়াতাড়ি ভাঙতে শুরু করেছে। বড় মিডিয়া বলে ভারতের নানান শহরের তুলনায় কলকাতার ভদ্রবিত্তর রেস্তোঁরায় যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।

স্বচ্ছল ভদ্রবিত্তের বাসস্থানের কাছাকাছি অধিকাংশ স্থানীয় রেস্তোঁরার খাবার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কাঠামো এখন মোটামুটি সুপরিচিত। বিগত দেড় বছর কোভিদ পরিবেশ কাজে লাগিয়ে ভদ্রবিত্তস্বার্থবাহী লকডাউন লকডাউন খেলা শুরু করেছে ডিজিটাল পুঁজি তার পরিকল্পিত নব্য স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট পলিসিতে। চেটেপুটে লাভ খাচ্ছে আম্বানি থেকে জেফ বোজর স্বার্থবাহী গিগ অর্থনীতি। কোভিদ গিগ অর্থনীতির জন্যে ছাড়া হয়েছে নাকী কোভিদের জন্যে গিগ অর্থনীতির রমরমা এই বিতর্কে না ঢুকলেও ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে উঠছে নানান কল্পিত/বাস্তব ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ক্রয়ক্ষমতাওয়ালা ভদ্রবিত্তকে যতদিন ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে, ততদিন স্থানীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করা গিগ অর্থনীতির লাভ।

বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়ার ধারণার সঙ্গে স্বচ্ছল ভদ্রবিত্ত দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে। বন্ধু আত্মীয়ের বাড়ির নেমন্তন্নে পাত পেড়ে খাওয়াবার রীতি কোন যুগে শুরু হয়েছিল কেউ জানেনা। কিন্তু আমি অন্তত দুই ঘনিষ্ঠ স্বচ্ছল আত্মীয়র বাড়ির নেমন্তন্নে এপ কোম্পানির আনানো খাবার গিলতে বাধ্য হয়েছি। স্বচ্ছল বাঙালি গৃহস্থ খাবারদাবারের নানান সামাজিক প্রথা খুব তাড়াতাড়ি ভাঙতে শুরু করেছে। বড় মিডিয়া বলে ভারতের নানান শহরের তুলনায় কলকাতার ভদ্রবিত্তর রেস্তোঁরায় যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। রেস্তোঁরার ব্রান্ড ভিত্তি করে বাড়িতে খাবার পৌঁছবার কাঠামো কলকাতায় সব থেকে বড় – জেলা শহরেও কম নয়। জোমাটো, সুইগি, উবের ইটসএর মত হযবরল আজ স্বচ্ছল ভদ্রবিত্তর পাকস্থলিতে সেঁধিয়েছে। বাড়িতে খাবার পাঠানোর কাঠামো, কার্ড সংস্কৃতির সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় যে কোম্পানি আপনার প্রিয় রেস্তোঁরার নাম খাবার এনে দিচ্ছে, সেটা সেই রেস্তোঁরার খাবার তো!

--

আমি বহুকাল হকার ইউনিয়নে ছিলাম। আজ কারিগর সংগঠনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। হকার সংগঠনের সঙ্গে কারিগর সংগঠনের জোট। ২০১৬ থেকেই শুনছি বিভিন্ন শহরে হকারদের, বিশেষ করে যারা রান্না খাবার তৈরি করেন, চলতিভাষায় যাদের টিফিন হকার বলে, বিক্রি পড়তির দিকে। কোথাও ২০% শতাংশ কোথাও ৪০% পর্যন্ত রোজগার হারিয়েছেন হকারেরা। ঘটনাটা ঘটছে মূলত সরকারি নিয়ন্ত্রণবিহীন এপ নির্ভর গিগ কোম্পানিগুলোর জন্যে যারা বিপুল বিনিয়োগে বাড়িতে বাড়িতে পণ্য/খাওয়ার পৌঁছনোর কাঠামো তৈরি করেছে। বিভিন্ন শহরে বলপ্রয়োগে হকার উচ্ছেদ না করেও একে একে রাস্তা হকারশূন্য হচ্ছে।

ঠিক হল হকার ইউনিয়ন খাবার বিক্রি করা হকারদের জন্যে পরীক্ষামূলকভাবে একটা এপ তৈরি করবে। সফল হলে এতে অন্যান্য পণ্য বিক্রির হকারদের জুড়ে নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে কাকতালীয়ভাবে বছর দুয়েক আগে আমাদেরই এক বন্ধুপুত্র ডাচ সরকারের আর্থিক সহায়তায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে সাহায্য করার জন্যে একটি কোম্পানি তৈরি করেছিল। ২০১৯এ কোভিদের ঠিক আগে তাদের সঙ্গে মিলে একটি ফুড এপ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কাজে আমি জুড়েছিলাম। এপটির নাম হল হকার এক্সপ্রেস – শুরুতে সেবা দেবে সল্ট লেকের সেক্টর ফাইভ এবং নিউটাউন জুড়ে। হকার সংগঠনের নিজস্ব সাইকেল বাহিনী থাকবে, তারা বিভিন্ন হকারের থেকে খাবার বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেবে। যাদের কোভিদপূর্ব সময়ে সেক্টর ফাইভএ রেস্তোঁরার বাইরে খাওয়াদাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, জানেন ফুটের খাবার কী পরিমান জনপ্রিয় ছিল। গ্রাহক সমীক্ষাতে বোঝা গেল ভদ্রবিত্ত পরিবারে হকার খাবার নেওয়ায় সমস্যা আছে, কিন্তু অনেকে উৎসাহ দিলেন।

এপ তৈরির কাজ চলার সময় হকারেরা ঠারেঠোরে জানাচ্ছিলেন তাদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাঠামোটা খুবই তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হবে। আমরা ভাবছিলাম বিষয়টা তাঁরা খাবারের গুণমানের জোরের থেকে বলছেন। তখনও ঘোস্ট কিচেন সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। এক শনিবার বিকেলে সেক্টর ফাইভে ফাঁকা ফুটে বৈঠক চলছে এপ নিয়ে, হঠাতই একজন হকার বললেন ঘোস্ট কিচেনের কথা। ঘোস্ট কিচেন আমাদের খাওয়ারের গুণমানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। আমাদের এক বন্ধু বললেন তিনি জানেন তাদের এরকম বেস কিচেন আছে। হকারভাইটি বললেন, আপনারা জানেন না, এখানে বিশাল একটা কিচেন আছে যেখানে নানান নামি রেস্তোঁরার নাম লেখা প্যাকেটে করে খাবার যায়। এটা হকারদের কাছে ওপেন সিক্রেট। এই ধরণের বিশাল রান্নাঘর তৈরি করে কোম্পানিরা গ্রাহকদের বিশ্বাস নির্ভর করে বিপুল লাভ করছে। ভদ্রবিত্ত যে খাবার বরাত দিচ্ছে, সেটি তার প্রিয় রেস্তোঁরা থেকে আসছে কী না কোনওভাবেই নিশ্চিত করা যায় না।

এবারে প্রশ্ন উঠল ভোক্তারা হকার এক্সপ্রেসে তার প্রিয় হকারের কাছে প্রিয় রান্নাটি অর্ডার দিচ্ছেন, সেটি যে তার দোকান থেকেই যাচ্ছে, এই এপ সেটা কী করে নিশ্চিত করছে। হকারভায়েরা বললেন অবশ্যই এটা নিশ্চিত করতে হবে। আমি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, বুদ্ধি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে আমার নাম তৈরি করেছি, এবার যদি আমার দোকানের নাম করে অন্য জায়গা থেকে খাবার যায়, তাহলে আমার বদনাম। তক্ষুণি সিদ্ধান্ত নেওয়া হল এপে লাইভ ভিডিওর ব্যবস্থা রাখা হবে। বন্ধুরা মাথায় রাখবেন গত দেড় বছরে লাইভ ভিডিও জলভাত হয়ে গেছে। এটা ২০১৯এর নভেম্বর ডিসেম্বর। তখনও সে কাঠামো তৈরি খরচ সাপেক্ষ। তবুও সিদ্ধান্ত নেওয়া হল কোনও দোকানের রান্নার বরাত এলে, ক্রেতা যদি চান, সেই দোকানের নাম সহ খাবার তৈরির লাইভ ভিডিও দেখাবার ব্যবস্থা রাখা হবে। যাই হোক কোভিদের জন্যেই হকারদের এই এপটি তৈরি হয়েও প্রকল্পটি বানচাল হয়ে গেল। কোভিদ নিয়ে কর্পোরেটরা যেটা চাইছিল সেটাই ঘটল। হকারেরা কবে ফুটে বসে আগের মত দোকান করবেন, আদৌ করতে পারবেন কী না, করলে আগের রোজগারে পৌঁছতে কতদিন যাবে কেউ জানেন না।

কয়েক সপ্তাহ আগে ঘোস্ট কিচেনের বিষয়টি ফেবুকে দিতেই বন্ধুদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল – বুঝলাম অনেকেই এপে খাওয়ার আনা অভ্যেস করে ফেলেছেন। শিক্ষক শামিম বললেন হাওড়ায় এরকম একটা ভুতুড়ে রান্নাঘর আছে। আরেক বন্ধু অরুণজিত বললেন তিনি জানেন কারন তিনি কর্পোরেটে দোকানগুলোয় কাজ করেছেন। অনেকেই ইনবক্স করে জানালেন এদের খাবারের গুণমান নিয়ে মাঝেমধ্যেই সন্দেহ হয়েছে। ঘোস্ট কিচেন আজ চরম বাস্তব – আপনার জিভের স্বাদ নিয়ে স্রেফ ছেলেখেলা করা। বেস কিচেন নিয়ে আপাতত আলোচনা করছি না। সেটাও আরেক রকম ধোঁকা, ঘোমটা পরা ঘোস্ট কিচেন। কেউ চাইলে বলা যাবে কেন ধোঁকা। দুটোই ভুতুড়ে কিচেন – শুধু নামে আলাদা।

ভদ্রবিত্ত চোখবুজে কর্পোরেটবন্ধু[ কর্পোরেট কী তাকে বন্ধুভাবে?]। ব্রান্ড সচেতন ভদ্রবিত্ত স্থানীয় উৎপাদন কাঠামো অবজ্ঞা করে। কর্পোরেটদের মত ঘাম তীব্র অপছন্দের বিষয়। গিগ খাদ্য কোম্পানি এই রন্ধ্রপথে ঢোকে। কোম্পানিগুলো খুব বেশি হলে ২-৩ কিমি দূরের রেস্তোঁরা থেকে খাবার এনে দেয়। কাজটা সাইকেল নিয়েও সকাল বিকেল জিম করা ভদ্রবিত্ত করতে পারে – কিন্তু করবে না, চোখবুজে ভরসা করবে নীতিনৈতিকতাবিহীন কর্পোরেটকে। যে ব্যবসা উদ্বৃত্ত তার স্থানীয় অর্থনীতিকে জোরদার করতে পারত, সেই উদ্বৃত্ত সবল করছে হয় নিউ ইয়র্ক, না হয় টোকিও না হয় লন্ডন বা ইওরোপের কোনও শহরের/দেশের অর্থনীতি। ভুতের রান্নাঘর যত জোরদার হবে ততই স্থানীয় রেস্তোঁরাগুলো, স্থানীয় অর্থনীতি মার খাবে। কর্পোরেটরা চায় কোভিদের ভয়ে তারা আরও বেশি বেশি বাড়ি বসে থাকুক। ছোটছোট দোকান উঠে গেলে সেই বাজার তার হাতের মুঠোয় আসবে। তখন কয়েকটা বড় রেস্তোঁরা বাদে গোটা সরবরাহ চক্র চলবে ভুতুড়ে রান্নাঘরভিত্তিক। এই পরিকল্পনাটাই টাকা বাতিল, জিএসটি, কোভিদের উদ্দেশ্য – এটাই ডিজিটাল পুঁজির নতুন স্ট্রাকচারাল এডজাস্টমেন্ট নীতি।

ভুতের রান্নাঘর থেকে খাবার আনাবার চান্স নেবেন না কী হেঁটে, সাইকেল কিনে অথবা ছেলে-মেয়ের সাইকেলে গা-ঘামিয়ে স্থানীয় প্যারাডাইস রেস্তোঁরা থেকে খাবার আনবেন, ব্যবসা উদ্বৃত্তকে স্থানীয় অর্থনীতিতে রাখবেন, সেই সিদ্ধান্তে হাজার হাজার মানুষের বাঁচা মরা নির্ভর করে, দেশের অর্থনীতি নির্ভর করে। কোভিদের সময়েই কর্পোরেট হামলা রুখতে নেই হয়ে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে আপনারই বেঁচে থাকার স্বার্থে, হে ভদ্রবিত্ত।

0 Comments

Post Comment