“এখনই বের হবে?” “হুম।" - রতনদাকে উত্তর দিয়ে ব্যাগটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে রাস্তায় নামলাম। বিপাশার মেয়ের জন্য একটা টেডিবিয়ার কিনেছি। ভাবলাম এরসঙ্গে বই দেবো। আমাদের অফিস থেকে কলেজ স্ট্রিটের দূরত্ব নেই বললেই চলে। এখনও হাতে কিছুটা সময় আছে। বিকেলের কলেজ স্ট্রিটের একটা অদ্ভুত মাদকতা আছে। বইয়ের গন্ধ আর চায়ের ধোঁয়া মিলেমিশে সব একাকার হয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের দল জোরকদমে পুলের জলে সাঁতার কাটছে। জলে রুপালি রঙের রোদ আঁকছে ক্ষণিকের চিহ্ন। একটা ছোটদের বইয়ের দোকানে ঢুকলাম। চারদিক আলো করে ছড়িয়ে আছে চাঁদের পাহাড়, নালক, ক্ষীরের পুতুল, শিশু, কিশলয় ছাড়াও নানা বইয়ের সম্ভার। মনে হচ্ছিল মুহূর্তের মধ্যেই ফিরে গেছি ছোটবেলাতে। চরিত্রগুলো স্মৃতির চৌকাঠ টপকে চলে এসেছে বাস্তবিক জীবনের মুহূর্তকথায়। উপেন্দ্রকিশোর আর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটা বই সংগ্রহ করলাম বিপাশার মেয়ের জন্য। তারপর রওনা দিলাম নেমন্তন্ন বাড়ির দিকে। বিপাশার শ্বশুরবাড়ি ফড়িয়াপুকুরে। মোড় থেকে নেমে দু পা হাঁটলেই বাড়ি দেখা যায়। এখানে আমরা কয়েকবার এসেছি। বাড়ির গেটের সামনেই দেখলাম রূপশালী একটা ঝলমলে নীল রঙের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই বললো, “ চল, এই তোকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম। মিতা ঝুমা সবাই এসে গেছে।” “ এই একটু দেরি হয়ে গেল রে, বাহ্! তোকে খুব সুন্দর লাগছে।” উত্তর কলকাতার পুরোনো বাড়িগুলোর মধ্যে একটা অদ্ভুত মায়াময় টান আছে। কালের স্রোতে সব ভেঙে বড় বড় ফ্ল্যাটবাড়ি গড়ে উঠলেও যেটুকু আছে সেখানে গেলেই মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। উঠোনের চত্বরটা পেরিয়ে মূল বাড়িতে ঢোকার আগে কড়িবর্গাগুলো দেখে খুব নস্টালজিক লাগছিল। সবখানেই যেন নাকে আসছে অতীতের সুবাস! “ ময়ূরাক্ষী, রূপশালী তোরা এসে গেছিস?” বিপাশা দেখে আমাদের দুজনেই জড়িয়ে ধরলো। “ বিপাশা আমাদের নিয়ে গেল ড্রইংরুমে। এ বাড়ির বসার ঘরটা খুব নান্দনিক, সহজেই নজর কাড়ে। বসার ঘরের লাগোয়া একটা সুসজ্জিত বইঘর আছে। বিপাশার শ্বশুরমশাই বলরামবাবু কলকাতা শহরের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, রসায়নের শিক্ষক হলেও সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। বসার ঘর থেকে একটু চলে গেলাম বইয়ের ঘরে। তাকে আর আলমারিতে থরে থরে সাজানো আছে বই। মনে হচ্ছে কেউ অনেক দিন নাড়াচাড়া করেনি। হালকা ধুলোর আস্তরণ রয়েছে সর্বত্র। হঠাৎই পিঠে অনুভব করলাম রূপশালীর হাত। “ চল ওখানে সবাই তোকে খুঁজছে।” “ দেখ রূপশালী কত বই ? আমার এত আনন্দ হয় দেখে যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না।” “ জানি তো, কলেজ লাইফে পড়ার বইয়ের বাইরে তুই সবসময়ই সমরেশ, সুনীল, নববনীতা দেবসেন- এ ডুবে থাকতিস। “ বসার ঘরে আবার এসে দেখলাম বিপাশা আর ঝুমা এককোণে কেক সাজাচ্ছে। “ ওই ময়ূরাক্ষী চিরকাল একরকম রয়ে গেলি, বল, বই- পাগল মানুষ?” ঝুমার কথার সুরেই বললাম, “ তা বলতেই পারিস। বিপাশা, বইয়ের উপর বেশ ধুলো জমেছে! “ কথা শেষ না হতেই ও বললো,” বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন ওই ঘর গমগম করত, এখন বাবা নেই , কেউ আর যায় না। তোদের একটা কথা বলতেই ভুলে গেছি। আমরা কিছুদিনের মধ্যেই এই বাড়ি ছেড়ে নিউটাউনের ফ্ল্যাটে যাচ্ছি, গৃহপ্রবেশে সবাইকে আসতেই হবে।” আনন্দে আটখানা হয়ে মিতা বললো,” হোয়াও বিপাশা, খুব ভালো খবর। অনেক সময়েই বলেছি ওইদিকে চল,যাইহোক শেষ পর্যন্ত যাচ্ছিস।” “ হুম রে মিতা বাড়িটা প্রোমোটারকে দেওয়া হচ্ছে, উত্তর কলকাতায় আর থাকার ইচ্ছে নেই।” মনটার তারে একটা চিনচিনে ব্যথা খেলে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললাম, “ বাড়ির কন্ডিশন তো ভালো আছে রে! এত অভিনব সুন্দর বাড়িটা ভাঙা পড়বে?” কথার মাঝেই বিপাশার জীবনসঙ্গী সুজিতদা উপস্থিত। “ বাহ, অনেক দিন পর গুরুদাস কলেজের অনেকেই দেখছি। তোমার কথা একটু শুনলাম ময়ূরাক্ষী, আসলে বাড়িটা রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা হচ্ছিল গো, দাদা তো বিদেশে থাকে জানো। আর আমার ছোটভাই অমিতও আর এখানে থাকতে চায় না। আমার রাজারহাটে অফিস, এখান থেকে রোজ যাওয়ার পথে জ্যামে পড়তে হয়।” ঝুমা বললো, “ আজকাল পুরোনো বাড়ি অনেকেই রাখছে না সুজিতদা। আমার মামারবাড়ি তো বিক্রি হলো।” “ তোমাদের এই বাড়িটার একটা মেজাজ আছে, অতীত কথা বলে, জেঠুর সাহিত্য প্রীতি খুব ছিল। কত নামজাদা সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এখানে এসেছেন বলো তো! এত বইয়ের সম্ভার কোথায় আছে?” রূপশালীর কথার উত্তরে বিপাশা বললো,” আর বকিস না, ফ্ল্যাটে আমি এত কিছু রাখবো না। কে বই পড়ে বল তো? সবাই এখন মোবাইল ঘাঁটতে ব্যস্ত। “ মিতা বললো, “ আমার ছেলে তো বাংলা একেবারে পড়তে চায় না। বলে বাংলা এত কঠিন, কত যুক্তাক্ষর মনে রাখতে হয় মাম্মা। বাংলা আমি সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ রেখেছি। হিন্দি রাষ্ট্রভাষা, তাই শেখা দরকার।” একটু জোরেই বললাম, “ যেকোনো ভাষা মানুষ শিখতেই পারে। তবে মাতৃভাষা ঠিকঠাক না শিখলে চলে? আর তোকে কে বলেছে তোকে হিন্দি রাষ্ট্রভাষা? ভারতের কোনো রাষ্ট্রভাষা নেই। হিন্দি ইংলিশ অফিসিয়াল ভাষা। একটু সংবিধান উল্টেপাল্টে দেখ। বই না দেখলে গুগল সার্চ কর। “। মিতা একটু তেড়েফুঁড়ে আবার বললো, “ বাংলা কথা বলাটুকু ছাড়া আর শিখে কোনো লাভ আছে বল? আমাদের পরবর্তী জেনারেশনের কজন পশ্চিমবঙ্গে থাকবে?” প্রত্যুত্তরে রূপশালী বললো, “ যে ভাষায় মানুষ চিন্তা করতে, কল্পনা করতে আর স্বপ্ন দেখতে পারে সেই নিজের ভাষা সংস্কৃতি থেকে সরে গেলে জীবনের ভিতটাই নড়ে যায়। “ একটু অসন্তোষ প্রকাশ করেই মিতা বললো,” তোর নিজের সন্তান থাকলে তখন চিন্তা বদলে যেত। “ রূপশালীর কিছুদিন আগেই ইউট্রাসের সার্ভিক্সে একটা টিউমার হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে পুরো ইউট্রাসটাই বাদ যায়। রূপশালীর মুখটাতে একটু কষ্টের মেঘ জমলো। হঠাৎই রঙিন প্রজাপতির ঝাঁকের মতো বিপাশার মেয়ে কয়েকজন সমবয়সী ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঝড়ের বেগে হাসতে হাসতে এলো। বিপাশা একটু আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বললো, “ তোরা এতক্ষণ নিশ্চয়ই মোবাইল ঘাঁটছিলি। সবসময় ফোন আর ফোন! “ ঝুমা বললো, “ আমার বছর তিনেকের ছোটছেলে তো ফোন ছাড়া খায় না। “ আমি বললাম,” একটু গল্প কবিতা বলতে পারিস তো ! বলতে বলতে ঠিক মন যাবে।” ঝুমা উত্তর দিল,” মিতা যা বললো নিজেদের নিজেদের ছেলেমেয়ে থাকলে বুঝতিস! এখনকার ছেলেমেয়েদের ইলেকট্রনিক গ্যাজেট থেকে দূরে রাখা খুবই মুশকিল।” “শোন ঝুমা, তিতলি আর মিকু আমার ছেলেমেয়ের চেয়ে কিছু কম নয়। দুই ভাইবোন তো বড় হলো। দুজনেই ফোন ব্যবহার করে। তবে সীমারেখা টানার শিক্ষাটা আমি আর মা দিয়েছি। “ কথার ফাঁকে কখন যে কেক কাটা শুরু হয়েছে বুঝিনি। এর মাঝে টেডিবিয়ারটা বিপাশার মেয়েকে দিলাম। নিজের ভাষার এত যেখানে অনাদর বইগুলো অপাত্রে দান করতে মন চাইলো না। খাওয়ার পর্ব শুরু হতেই ঝুমা বললো,” তোকে একটা কথা বলা হয়নি ময়ূরাক্ষী। কিছুদিন আগে তনয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, এখন ইউএসএ তে থাকে। তখন তিতলি আর মিকুর জন্য সবটাই জলাঞ্জলি দিলি। ভাইবোনের তো একদিন জগৎ তৈরি হয়ে যাবে!” নীরব রইলাম।
বাইরে চলে এসেছি। তনয়ের কথা কেউ তুললেই ভালো লাগে না। আমি তখন গ্র্যাজুয়েশনের ছাত্রী। চরম দুর্যোগ আমাদের পরিবারে ঘনিয়ে আসে। দিনটা ছিল একটা ছুটির দিন। বাবা বাজারে গিয়েছিল। ওখানে মালবোঝাই লরি এসে বাবার স্কুটারে সরাসরি ধাক্কা দেয়। বাবা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় । বাবার রক্তাক্ত মুখটা আজকেও ভাবলে শিউরে উঠি। মায়ের ক্ষণে ক্ষণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ! উফ্ এত বছর পরেও ভুলতে পারিনি। তিতলি আর মিকু তখন অনেক ছোট। মা বাইরের জগৎ সম্পর্কে কিছু জানত না। সংসারের হাল ধরতে আমাকেই হয়। প্রথমে বেসরকারি সংস্থায় কাজ ঢুকি। রাতে বাড়ি ফিরে সারারাত পড়তাম। তারপর পিএসসির ক্লার্কশিপ দিয়ে চাকরি পাই। প্রেমটা আমাদের কলেজ লাইফ থেকে ছিল। সংসারের টানাপোড়েনে একবারে সম্পর্কের দিকে নজর দিতে পারিনি। অভিমান বিষম বস্তু। তনয় প্রচণ্ড অভিমান নিয়ে সরে যায়। তখন এত যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না, তারপর শুনি ও চেন্নাই চলে গেছে পড়তে… “ ম্যাডাম,ও ম্যাডাম কোথায় যাবেন?” দেখি একটা ট্যাক্সি ডাকছে, “ একটু বেলেঘাটায় নামিয়ে দেবেন দাদা?” “ হুম, চলুন।” উঠলাম। ওঠার মিনিট দশেকের মধ্যে উনি বললেন, “ আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আজ গাড়ি গ্যারেজে তুলে দেবো। বাড়ি চলে যেতে হবে। আজকাল সবাই ওরা উবের চড়ে দিদি। হলুদ ট্যাক্সি হাতে গোনা কিছু চলছে।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “ জানি দাদা, তবে আমি দাদা এখনও হলুদ ট্যাক্সিতেই ভরসা করি।” ঝড়ের বেগে গাড়ি উল্টোডাঙায় এলো। রাস্তা ক্রমশ ফাঁকা হচ্ছে। রাত নামছে শহরে। হঠাৎই চোখ পড়লো ড্রাইভার দাদার পাশে রাখা প্যাকেটটায়। প্যাকেটের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে কার্তিক ঘোষের ছড়ার বই। “ এই বইগুলো কার?” “ ওহ্ আমার ছোট মেয়ের ম্যাডাম। দুই মেয়ে বইয়ের পোকা। আমি মাঝে মাঝেই নিয়ে যাই। দুজনে সরকারি স্কুলে পড়ে। খুব চেষ্টা করছি ম্যাডাম ওরা দাঁড়াক। আপনার জায়গা এসে গেছে।” নেমে ওঁকে টাকা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের প্যাকেটটা দিলাম।” মেয়েদের দেবেন, হয়তো ভালো লাগবে। ওঁর চোখে আবেগের জল।
ট্যাক্সি চলে গেছে। গলির পথে পড়েছে সাদা চন্দনের মতো চাঁদের আলো, এগিয়ে চললাম বাড়ির দিকে।