উনিশ শতকের বিশিষ্ট বাংলা কথা সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত “বন্দে মাতরম” গানটি নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দল বিজেপি-র তরফে একটা হইচই সৃষ্টি করা হয়েছে। হঠাৎ করেই তারা যে এই খেলায় মেতেছে এমন নয়। স্বাধীন ভারতে সঙ্ঘ পরিবারের অনেক দিনের অ্যাজেন্ডা ছিল সংবিধানের বদলে মনুস্মৃতিকে চালানো, তেরঙা ঝান্ডার বদলে গেরুয়া ঝান্ডাকে জাতীয় পতাকার মর্যাদা প্রদান, “জনগণমন অধিনায়ক” গানের বদলে “বন্দে মাতরম”-কে জাতীয় সঙ্গীত বানানো, ইত্যাদি। এক কথায় বলা যায়, আধুনিক সভ্যতার পরিবর্তে মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতাকে স্বাধীন জাতীয় জীবনের সংস্কৃতির আকারে গড়ে তোলা। প্রচারে এগুলো ছিলই। তবে সরকারি ক্ষমতায় যেতে না পারার জন্য ওরা সেসব কার্যকর করতে পারছিল না। এখন বিজেপি-ই কেন্দ্রে এবং অনেক রাজ্যে শাসক দল। ফলে এখন তাদের চোখ রাঙিয়ে এই সব অ্যাজেন্ডাকে চালু করার চেষ্টা করারই কথা। করছেও।
আপাতত, তারা প্রথম দুটোকে চালু করতে পারছে না। সংসদের দুই বাড়ি মিলিয়ে এখনও তারা যথেষ্ট লোক যোগাড় করে উঠতে পারেনি। বন্দে মাতরম গানটিকেও একক ভাবে জাতীয় সঙ্গীতের স্ট্যাটাস দিতে পারছে না। তবে, এটিকেও সহযোগী জাতীয় সঙ্গীত, কার্যত প্রথম ও প্রধান সঙ্গীত হিসাবে চালু করে ফেলতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তারা নতুন এক আবদার হিসাবে জুড়েছে ছয় স্তবক মিলিয়ে পুরো গানটি সবাইকে গাইতে হবে — স্কুলে কলেজে সরকারি অফিসে সংসদে বিধান সভায়, ইত্যাদি। বিশেষ করে মাদ্রাসাগুলিতে।
আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আবার বলেছেন, শুধু দাঁড়ালে হবে না, সবাইকে ঠোঁট নাড়তে হবে।
অহো, বন্দে মাতরম!
সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাম শস্য শ্যামলাম মাতরম!
[১]
বিজেপি-র এই অ্যাজেন্ডা নিয়ে এত লাফালাফি করার কারণ, হিন্দু বাঙালিদের এক বড় অংশের কাছে এই গানটার বেশ একটা আবেদন আছে। তার প্রথম কারণটাই হল ধর্মীয় আবেগ, জাতীয়তাবোধের আবেগ নয়। বাংলাদেশকে মাতৃরূপে দর্শন ও বন্দনা করা হয়েছে, মা দুর্গার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে — সেই দিক থেকে আবেদন। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন — তার কংগ্রেসি ধারা এবং সশস্ত্র বিপ্লবী ধারা — দুই ক্ষেত্রই সেকালে প্রবল ভাবে হিন্দু ধর্মীয় অনুষঙ্গের দ্বারা সিঞ্চিত ছিল। যদিও সেটা তার শক্তি নয়, দুর্বলতারই চিহ্ন। জাতীয় ঐক্য সাধনের পরিবর্তে যেটা দিনে দিনে অনৈক্যেরই বীজ বপন করে গেছে। ভগৎ সিং সূর্য সেনকে বাদ দিলে, আজাদ হিন্দ বাহিনীতে সুভাষচন্দ্রের প্রয়াসকে বাদ দিলে, জাতীয় নেতাদের মধ্যে খুব কম মানুষই এটা ধরতে পেরেছিলেন। ধর্ম নিস্পৃহ জাতীয়তাবাদী মনোভাব তাঁদের বেশিরভাগের মধ্যেই স্ফূরিত বা বিকশিত হয়নি। রাম, রাম রাজ্য, গীতা, আত্মার দেহান্তর গমন — এই সমস্ত উপকরণ দিয়েই তাঁরা সারা ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করার কথা ভেবেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, নানা বিচিত্র ঐতিহাসিক ঘটনা চক্রে “বন্দে মাতরম” এই দুই শব্দ বিশিষ্ট মন্ত্রটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুখে এক জনপ্রিয় শ্লোগান হয়ে দাঁড়ায়। এবং সেটা তখন আর শুধু বাঙালিদের মধ্যে নয়, সারা দেশের সামনেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এতটাই যে ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যেও এই শ্লোগান বেশ আতঙ্কের সঞ্চার করত। যে কারণে আজকের বিজেপি-র পিতামহ-নেতারা সেকালে এই শ্লোগান উচ্চারণ করতে ভয় পেত এবং সাধ্য মতো এড়িয়ে চলত। বিনায়ক দামোদর সাভারকর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বা মাধব সদাশিব গোলওয়ালকরের প্রাক-১৯৪৭ সালের কোনো রচনা বা ভাষণে “বন্দে মাতরম” ধ্বনির অস্তিত্ব চোখে পড়বে না। ব্রিটিশ শাসক প্রভুদের ওঁরা তখন এই মন্ত্র পাঠ করে বিরক্ত করতে চাইতেন না। পক্ষান্তরে, এই দুটো শব্দবন্ধের জনপ্রিয়তাই আসলে ধীরে ধীরে পুরো গানটার পক্ষে এক নির্বিচার দুর্নিবার মনমোহনী নিঃশব্দ আকর্ষণের কারণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, বন্দে মাতরম শ্লোগানটা জাতীয় আবেগে ভরপুর হয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে মানেই যেন গোটা গানটাও একই সঙ্গে জাতীয়তার আবেগে সম্পৃক্ত।
আর কে না জানে, ধর্মীয় চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকলে মানুষের বিবেচনাবোধ বিচার শক্তি বিভিন্ন জটিল প্রশ্নের ক্ষেত্রে হ্রাস পেয়ে যায়?
তৃতীয়ত, গানটির ভাষা। আপাত দৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র গানটি রচনা করেছিলেন বাংলা ভাষায়। কিন্তু তন্বিষ্ঠ পাঠক মাত্রই জানেন, বহু জায়গাতেই গানের ভাষা আর সাধু বাংলা থাকেনি, বিশুদ্ধ সংস্কৃতকে আঁকড়ে ধরেছে। বাংলা আর সংস্কৃত বিভিন্ন পংক্তিতে যেন পালা করে জায়গার দখল নিয়েছে। আর এও সকলেই জানেন, এক আশ্চর্য সামাজিক ঐতিহাসিক ঘটনাপুঞ্জ উনিশ শতক থেকে হিন্দুদের মধ্যে সংস্কৃতকেও যতটা ভাষা উপাদান হিসাবে তার চাইতে অনেক বেশি ধর্মীয় অনুপান হিসাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এই মোহ থেকেও জাতীয় নেতাদের প্রায় কেউই মুক্ত ছিলেন না।
চতুর্থত, হয়ত সেই কারণেই কংগ্রেসের মঞ্চেও এই গানটিকে বার বার জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে আবাহন করার চেষ্টা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও এর প্রথম দুটি স্তবকে সুরারোপ করে কংগ্রেসের অধিবেশনের মঞ্চে গানটি পরিবেশন করেছেন। তার ফলেও এটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
তা সত্ত্বেও একে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা প্রদানের প্রশ্নে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। কংগ্রেসের প্রভাবশালী অহিন্দু নেতাদের অনেকেরই এই গানে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারের কারণে একে সর্বসাধারণের জন্য জাতীয় সঙ্গীত রূপে বরণ করার ব্যাপারে আপত্তি ছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই আপত্তির প্রসঙ্গ তুলেই গানটির দুটি স্তবকের বেশি গ্রহণ না করার পক্ষে মত রাখেন। তাঁর আপত্তির কারণ ছিল খুব স্পষ্ট। যাঁরা ধর্মীয় চিন্তায় নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করেন এবং মূর্তি পূজায় বিশ্বাস করেন না (ব্রাহ্ম হিসাবে কবি নিজেও এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন), তাঁদের পক্ষে গানটির ধর্মীয় অনুষঙ্গ অঙ্গীকার করা অসুবিধাজনক। যুক্তিটি স্বদেশি আন্দোলনের সেদিনের আবহে প্রায় সর্বসম্মত রূপে গৃহীত হওয়ায় বন্দে মাতরম কখনই ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হয়নি এবং এর দুটি স্তবকের বেশি দেশাত্মবোধক গান হিসাবেও গণ্য হত না।
তাতে অবশ্য স্বাধীনতা আন্দোলনেরও কোনো ক্ষতি হয়নি, দেশপ্রেমিকদের দেশাত্মবোধেও কোনো চোট লাগেনি। অন্য দুর্বলতা সত্ত্বেও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সকলেই এটাকে খুশি মনে মেনে নিয়েছিলেন। সঙ্ঘ পরিবারের সেকালের নেতাদের বাদ দিলে সমস্ত দেশপ্রেমিকরাই “বন্দে মাতরম” শ্লোগান উচ্চারণ করতে এবং/অথবা এই গানের দুই স্তবক গাইতে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন।
[২]
দুঃখের কথা হল, আমাদের বর্তমান সময়েও যারা বিজেপি-র গায়ের জোয়ারি মনোভাবের বিরোধিতা করে বন্দে মাতরম গান সম্পর্কে সমালোচনামূলক বক্তব্য রাখছেন, তাঁরাও সেই রাবীন্দ্রিক যুক্তির পাকেই আজও বাঁধা পড়ে আছেন। তার বাইরে আর তাঁরা বেরতে পারছেন না। বিজেপি যাদের সেকু মাকু বলে গাল পাড়ে, তাঁরাও এই জায়গায় এসে সত্যিকারের সেকু মাকু যুক্তি তর্ক উত্থাপন করতে ভুলে যাচ্ছেন। ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের প্রশ্নগুলি উত্থাপন করতে সম্ভবত দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আছেন!
সেই জায়গাগুলো দেখে নেওয়া যাক।
প্রথমত, বলা বাহুল্য, জাতীয় সঙ্গীত হতে হলে সংশ্লিষ্ট গানটির বাণী অংশে জাতির একটা সার্বিক প্রতিনিধিত্ব থাকতে হয়। যেমন, “জনগণমন অধিনায়ক” গানটিতে আছে। (অবিভক্ত) ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের এবং ভাষাভাষি অঞ্চলের নাম আছে, বিভিন্ন নদী এবং পাহাড়ের নাম দিয়ে একটা সর্বভারতীয় ছবি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে এই “বন্দে মাতরম” গানটির ভূগোল এক্তিয়ার হচ্ছে অবিভক্ত বাংলাদেশ, গানটির জনসমষ্টি হচ্ছে (উনিশ শতকের শেষ পাদের হিসাবে) সাত কোটি বাঙালি। বঙ্কিমচন্দ্র তো আর ভারতীয় জাতিকে লক্ষ করে গানটি রচনা করেননি। আজ সেই কারণেই গানটির বিজেপি-প্রচারিত সরকারি ভাষ্যে সাত কোটি বাঙালির চোদ্দ কোটির হাতের উল্লেখ বদলে দিয়ে “কোটি কোটি” করে দিতে হয়েছে। কিন্তু তাতেই কি আর সেটা বাঙালির হাতছাড়া হয়ে ভারতীয় হয়ে ওঠে? না। যখনই এবং যত বার বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম গানের কথা বলা হবে, তখনই এবং তত বারই সেই বাংলার জনমণ্ডলির কথাই মনশ্চক্ষে ভেসে উঠবে। আর “সুজলাং সুফলাং . . .” বললেও সেই অবিভক্ত নদীমাতৃক শস্যসমৃদ্ধ বঙ্গভূমিকেই সূচিত করতে থাকবে। এই কথাগুলি গেরুয়া মাথায় নাও ঢুকতে পারে, কেন না তারা যুক্তি বা তথ্য দিয়ে চিন্তা করতে অভ্যস্ত বা প্রশিক্ষিত নয়। বরং যুক্তি তথ্য অগ্রাহ্য করাই তাদের পেশা বা দস্তুর। কিন্তু যাঁরা যুক্তিবাদী, যাঁরা ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের প্রেক্ষিত থেকে সমস্ত সামাজিক প্রশ্নকে বিবেচনা করবেন বলে ভাবা হয়, তাঁরা কী করে এই বিষয় সমূহ উপেক্ষা করছেন?
দ্বিতীয়ত, গানের ভেতরে যে দুর্গা দেবীর উল্লেখ রয়েছে, তাতে ব্রাহ্ম, মুসলমান বা খ্রিস্টানের আপত্তি থাকে মূর্তি পূজার ব্যাপারে, যেটা হয়ত ঈশ্বর বা পরমেশ্বরের উল্লেখ থাকলে হত না। যদিও তখন সেই ঈশ্বরকে হাত এবং প্রহরণ প্রদান করা মুশকিল হত। আবার, তাতে হয়ত আমাদের মতো যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক একজন দেশপ্রেমিকেরও আপত্তি থাকতে পারে, যে দেশভক্তির গানে ঠাকুর দেবতার নাম আসবে কেন। কিন্তু সেই যুক্তিগুলি এখানে আমি আপাতত ধরতে বা আনতে চাইছি না। এই মুহূর্তে আমার কাছে সবচাইতে বড় আপত্তির কারণ হচ্ছে এই জায়গাটা — এমনকি ধর্মীয় প্রতীক হিসাবেও দেবী দুর্গার কোনো সর্বভারতীয় জন গ্রাহ্যতা নেই। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বাঙালি হিন্দুদের বাইরে বিহার থেকে শুরু করে সারা ভারতের আর একটা রাজ্যেও দুর্গাপূজা হয় না। আগেও হত না। এমনকি, রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার কাহিনি (তথাকথিত অকাল বোধন) রামায়ণে থাকা সত্ত্বেও রাম হনুমান ভক্তদের অঞ্চলে উত্তর ভারতের কোথাও আজ অবধি দুর্গাপূজার প্রচলন হয়নি। বঙ্কিমের আমল থেকে শুরু করে মোদীর জমানা অবধি। অর্থাৎ, ধর্মীয় প্রতীকের অর্থেও গানটি নিতান্তই বাংলার প্রতিনিধি স্থানীয়। যদি দেশ ভাগের সময় অবিভক্ত বাংলা আলাদা একটা দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করত, বা করতে পারত, তাহলে এই গানটির সেই দেশের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার দাবি নিয়ে মাথা দেওয়া যুক্তিযুক্ত হত। কিন্তু ভারতের জন্য এই গানটির জাতীয় পরিচয় দাবি করার মতো কোনো সামান্যতম ভিত্তি বা উপলক্ষ নেই।
তৃতীয়ত, কেন নেই, তাও এই প্রসঙ্গে বুঝে নেওয়া দরকার। তার জন্য শাক্ত ও বৈষ্ণব উপাসকদের মধ্যেকার পার্থক্য সম্পর্কে এখানে সংক্ষেপে দুচার কথা বলা যেতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্র এই সঙ্গীতে যে ভৌগোলিক অঞ্চলটার ছবি এঁকেছিলেন, সেটা মূলত শাক্ত উপাসকদের জায়গা। বৈষ্ণব ভক্তি কৃষ্ণভক্তির আকারে থাকলেও তা তুলনায় অনেকটাই দুর্বল। এখানে কৃষিকে কেন্দ্র করে বুদ্ধোত্তর কালে এক ধরনের তন্ত্রসাধনা দেখা দেয়, যার স্বাভাবিক পরিণতিতেই দুর্গা কালী চণ্ডী জগদ্ধাত্রী লক্ষ্মী সরস্বতী বাসন্তী অন্নপূর্ণা ইত্যাদি নারী শক্তির আরাধনা প্রায় সমস্ত বঙ্গদেশ জুড়ে জনপ্রিয় দেব-চর্চা হিসাবে গড়ে ওঠে। এই দেবতাদের মধ্যে লক্ষ্মী বাসন্তী অন্নপূর্ণা সরাসরিই কৃষি বা অন্ন উৎপাদন (ধান বোনা, ধান কাটা) ইত্যাদির সঙ্গে সংযুক্ত। বাকিদের নিয়ে ফসল রক্ষা, পশুপালন, দস্যুর হাত থেকে মুক্তি, ইত্যাদি লক্ষ্য থেকে নানা রূপক কাহিনিকে অবলম্বন করে শাক্ত উপাসনা গড়ে উঠতে থাকে। কালক্রমে ধর্মীয় সংস্কৃতির আপেক্ষিক ভাবে স্বতন্ত্র বিকাশের প্রক্রিয়ায় এসবের মধ্যে নানা রকম ব্রাহ্মণ্য ও আধ্যাত্মিক উপচার যুক্ত হয় এবং সেই অনুযায়ী তাৎপর্য আরোপিত হতে থাকে। তথাপি, এই সমস্ত পূজার্চনার মধ্যে ধান দূর্বার ব্যবহার, বহুবিধ ফল, পশুবলি, নৈবেদ্য সংক্রান্ত মন্ত্রটন্ত্র — নানা উপকরণের মধ্যে কৃষি, ফসল, অন্ন উৎপাদন, খাদ্য সংগ্রহ জড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানী সুলভ আবেগ মুক্ত অনুসন্ধানী আলো ফেললেই তা দেখতে পাওয়া যাবে।
উত্তর ভারতে পশুপালন অনেক কাল আগে থেকেই (বৈদিক যুগ থেকেই) চালু ছিল। বেদোত্তর কালে কৃষি শুরু হলেও সেই অঞ্চলে বাংলার মতো মাছ মাংস অঢেল প্রাপ্তির সুযোগ ছিল না। তার উপর বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফলে প্রধানত তথাকথিত উচ্চ বর্ণের জনগোষ্ঠীর ভেতরে নিরামিষ ভোজন বেশি করে প্রচলিত হয়ে যায়। সমাজে তাদেরই দাপট বেশি হওয়ায় সেই খাদ্যাভ্যাসই উত্তর ভারতে প্রধান বৈশিষ্ট্য রূপে গড়ে ওঠে। পশ্চিম থেকে বহিরাগত জনজাতিগুলির রচিত ঋগবেদ ব্যাপক ভাবে আমিষ ভোজনের পক্ষপাতী হলেও তাদের উত্তর ভারতীয় উত্তরসূরিরা ভূ-সাংস্কৃতিক কারণেই নিরামিষ ভোজী হয়ে ওঠে। (এখানে বলে রাখি, এই ভোজন বৈষম্যও বৈদিক জনগোষ্ঠীর পূর্বসূরিদের ভারতের বাইরে থেকে এই অঞ্চলে আগমনের একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ।) তারা তখন ঋগবেদের অন্যতম দেবতা সূর্য থেকে পৌরাণিক বিষ্ণুকে উৎকলন করে গৌতম বুদ্ধের পূর্বজ হিসাবে তাকেও একজন নিরামিষাশী দেবতা বানিয়ে ফেলে।
বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্ম সম্বন্ধীয় মতবাদ সঙ্ঘ পরিবারের যত ভালোই লাগুক, তিনিও শাক্ত পন্থাবলম্বী ছিলেন। তাই তাঁর দেশপ্রেমিক সঙ্গীতে নিরামিষ বৈষ্ণবদের তুলনায় শাক্ত দেবী হিসাবে দুর্গাই একমাত্র স্থান পেয়েছেন। কৃষ্ণচরিত্র নিয়ে প্রবন্ধ লিখলেও তিনি “বন্দে মাতরম” রচনা করতে বসে বাংলার দেশমাতৃকা রূপে দুর্গা বন্দনার কথাই ভেবেছেন, রাম কিংবা কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে “বন্দে পিতরম” লিখতে যাননি। আর তার দ্বারাই তিনি এই গানের ভৌগোলিক পরিসীমাকে অখণ্ড ভারতের বদলে অবিভক্ত বাংলার নদীবিধৌত পলিমাটির দেশে আবদ্ধ করে ফেলেন। কোনো শল্য চিকিৎসা করেই আর এই গানকে সারা ভারতের বন্দনা করার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার উপায় তিনি রাখেননি।
শুধু মাত্র এই কারণেই “বন্দে মাতরম” সঙ্গীতটির ভারতের জাতীয় আবেগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করে দেশাত্মবোধক গান হিসাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। বরং এই গানের চর্চার মধ্য দিয়ে কোনো না কোনো ভাবে বাঙালির বিচ্ছিন্নতা বোধকে উস্কানি দেবার সম্ভাবনা পুরোদস্তুর বিদ্যমান!
“বন্দে মাতরম” নিয়ে মাতামাতি করার আগে এই কথাগুলি সবাইকে ভেবে দেখতে হবে।