পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আনিসের মৃত্যু ও পুলিশী সংস্কার

  • 16 March, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 783 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
লখিমপুর খেরিতে সিবিআই হোক বা আনিস খান হত্যাকান্ডে বিশেষ তদন্তকারী দল— উভয়ের ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতার অভাবই আসল কারণ। কোনো তদন্তেই আসল অপরাধী শাস্তি পায় না। তাই পুলিশের সংশোধন বা রিফর্মকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি নিয়ে রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের এগিয়ে আসা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে সরকার বদল হলেও পুলিশ নিরপেক্ষ থাকে।

আনিস খান, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মারা গিয়েছেন। আনিসের পরিবারের বয়ান অনুযায়ী গভীর রাতে পুলিশ এসে আনিসের খোঁজ করে। তারপর, আনিসের বৃদ্ধ বাবাকে বন্দুকের নলের সামনে আটকে রেখে, তাঁর খোঁজে বাড়ির তিন তলায় চলে যান পুলিশের ৩ জন আধিকারিক। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির সামনে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পান আনিসের বাবা। তারপরেই, তিনজন সিভিক পুলিশ, যাঁরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে গিয়েছিলেন, অত্যন্ত দ্রুত পায়ে নেমে আসেন, এবং যিনি নীচে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁকে নিয়ে সেই জায়গা ত্যাগ করেন। আনিসের বাবার কথা অনুযায়ী, ওই পুলিশদের যাওয়া আসার সময়ে কোনও গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যায়নি। তারপর বৃদ্ধ সেলিম খান বাইরে এসে দেখেন, আনিসের দেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে, এবং মাথা থেকে রক্ত বেরোচ্ছে। তিনি প্রতিবেশীদের ডেকে, একজনের গাড়ি করে বাগনান হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দেন, কিন্তু মাঝপথেই লক্ষ্য করেন, আনিসের দেহে কোনও সাড় নেই, তাই তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন, এবং আমতা থানায় খবর দেন। কিন্তু খবর দিলেও, পরদিন সকাল সাড়ে নটার আগে কোনও পুলিশের দেখা মেলে না। তারপর ধীরে ধীরে খবর হয় যে, আনিস খান, প্রতিবাদী সমাজকর্মী মারা গিয়েছেন, এবং তাঁর বৃদ্ধ বাবা অভিযোগ করেন, পুলিশই এই হত্যা করেছে।

সংবাদমাধ্যমের দৌলতে এই খবরগুলো এখন সবার জানা। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, আনিস খানের হত্যার তদন্তের স্বার্থে ‘সিট’ অর্থাৎ বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে, এবং এই বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। যদিও আনিসের পরিবারের মানুষজন, প্রথম থেকেই বলে আসছেন, যেহেতু রাজ্যের পুলিশই এই মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাই তাঁরা চাইছেন কেন্দ্রের সিবিআই তদন্ত করুক। এই নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলাও হয়েছে। আদালত রাজ্য সরকারের বিশেষ তদন্তকারী দলের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন। কিন্তু তাও বিতর্ক থামছে না। দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত করার জন্য, পুলিশ ভোররাতে উপস্থিত হলে, আবারও আনিসের পরিবার এবং পাড়া প্রতিবেশীরা বিরোধ করেছেন। বারংবার পুলিশ প্রশাসন আশ্বাস দিলেও, ঐ অঞ্চলের মানুষ, পরিবারের লোকজনকে কিছুতেই বিশ্বাস করানো যাচ্ছে না, যে এই রাজ্য পুলিশকে দিয়ে ঐ হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত করানো সম্ভব। কারণ, তাঁদের বয়ান অনুযায়ী, যে-পুলিশ রাতের অন্ধকারে একজন মানুষের বাড়িতে চড়াও হতে পারে, সেই পুলিশ শাসকদলের দলদাস ছাড়া কিছু হতে পারে না। সেই রাতে যদি ধরেও নেওয়া হয়, আনিস খান পুলিশের হাতে ধরা দেবেন না বলে লাফ দিয়ে পালাতে গিয়ে, পড়ে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন, তাও তা ঘটেছিল পুলিশের কিছু কর্মীর উপস্থিতিতে। আনিসের দেহ পড়ে থাকতে দেখেও পুলিশ কর্মীরা অসংবেদশীল ভুমিকা নিয়েছিল, যে সময়ে তাঁদের উচিৎ ছিল, আনিসের দেহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, তাঁরা তা করেননি।

রাজনৈতিক দলেরাও এই সমস্ত বিষয় সামনে নিয়ে আসছে, এবং আনিস হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলন শুরু করলেও, একটা বিষয় নিয়ে এখনো কথা বলা শুরু করেনি। পুলিশের সংশোধন বা রিফর্ম। এইখানেই সমস্যার মূল। আজকে যে পুলিশেরা শাসকদলের দলদাস হিসেবে কাজ করছেন, তাঁরাই বাম আমলে বাম সরকারের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ করতেন। বারংবার দেখা গেছে, বিভিন্ন পুলিশ অফিসার যাঁরা, কোনো একটি শাসনে নিন্দিত ছিলেন, তাঁদেরই পদোন্নতি হয়েছে পরের আমলে। রুনু গুহনিয়োগী থেকে শুরু করে অন্যান্য যে পুলিশ অফিসারেরা কংগ্রেস সরকারের সময়ে অত্যাচার করেছেন, তাঁদেরকেই বাম আমলে আবার সরকারের কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়েছে। সেই একই ঐতিহ্য সমানে চলছে এখনো। শুধু এই রাজ্যে নয়, সারা দেশেই পুলিশ সংক্রান্ত এই অভিযোগ আছে। প্রশাসন নিরপেক্ষ না হলে কি তদন্ত নিরপেক্ষ হয়? তাই লখিমপুর খেরিতে সিবিআই হোক বা আনিস খান হত্যাকান্ডে বিশেষ তদন্তকারী দল— উভয়ের ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতার অভাবই হয়তো আসল কারণ। কোনো তদন্তেই শেষ পর্যন্ত আসল অপরাধী শাস্তি পায়না। তাই রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আওয়াজ ওঠা উচিৎ সবার আগে পুলিশের সংশোধন বা রিফর্মকে সামনে নিয়ে আসা, যাতে ভবিষ্যতে সরকার বদল হলেও পুলিশ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে। এই ধরনের অভিযোগ যাতে কমে আসে।

২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় ছিল, সারা দেশে পুলিশী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু তারপর ১৬ বছর হতে চললো, সেই বিষয়ে আজ অবধি কোনো রাজ্য সরকার বা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল কার্যক্ষেত্রে তো নয়ই খাতায় কলমেও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যদিও সেই রায়ের পরে, এমন কিছু তথ্য আসেনি, যে পুলিশ নিরপেক্ষ ভুমিকা পালন করা শুরু করেছে, কিন্তু তাও এই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকেও এই বিষয়ে কোনোরকম কোনো চাপ সৃষ্টি করা হয়নি। ঐ রায় দেওয়ার সময়ে সর্বোচ্চ আদালতের তরফে বলা হয়েছিল, মানুষের কাছে পুলিশ শব্দটি একটি বিভীষিকার নামান্তর। অনেকে ভাবতে পারেন, ভালোই তো চলছে পুলিশ- প্রাশাসন, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশ মানে অপেশাদার, অসংবেদনশীল, নির্মম, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং দলদাস ছাড়া কিছু নয়। আজকের সময়েও যতই পুলিশ কোভিডের সময়ে, বিভিন্ন আবাসনে গিয়ে গান শোনাক বা মানুষের সাহায্য করুন না কেন, আদপে চরিত্রগতভাবে পুলিশ এতোটুকুও বদলায়নি। একটি দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক স্বাস্থ্যের জন্য, পুলিশী সংস্কার একটি অপরিহার্য কাজ। অর্থনৈতিক বিকাশের জন্যেও পুলিশের ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নাগরিক যদি রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন তখন তাঁর ভেতরেও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। সেই ক্ষোভ কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য বিপদের বার্তা বয়ে নিয়ে আসতে পারে। রাষ্ট্র সবসময়েই চায়, স্থিতাবস্থা বজায় থাকুক। যে কাঠামোগুলো আছে, গণতন্ত্রের যে স্তম্ভগুলো আছে, তাঁদের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অন্যতম। এই সংস্থা বা কাঠামোগুলো যাতে স্বমহিমায় বিরাজ করতে পারে তা সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় চায়, এই সংস্থাগুলোর ভেতর থেকে বা এই সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে যদি কোনো বিরুদ্ধ মত উঠে আসে, তবে তাকে কি করে পরিচালনা করতে হয়, তা রাষ্ট্র জানে, আর জানে বলেই দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় পুলিশী সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছিল। রাষ্ট্র জানে পুলিশের দ্বারাই আইনের শাসন লাগু করা হয়, আর সেই আইনের শাসন যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে সমাজে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই সে চায় এমন পুলিশী ব্যবস্থা যা প্রশ্নাতীতভাবে দল নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং বাইরের প্রভাবমুক্ত। কিছুদিন আগে নরওয়ের পুলিশের একটি উদাহরণ দিলে হয়তো বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হতে পারে। সেখানকার প্রধানমন্ত্রী, কোভিড বিধি লঙ্ঘন করে তাঁর জন্মদিন পালন করেছিলেন, ফলে তাঁকে শাস্তি স্বরূপ মোটা অঙ্কের জরিমানা করে, নরওয়ের পুলিশ। তাই আনিস খানের হত্যার ঘটনার প্ররিপ্রেক্ষিতে চলে আসে পুলিশ আইন সংশোধনের বা পুলিশী সংস্কারের প্রশ্নটি। তাই শাসকদলের পক্ষ থেকে যতই মুখ্যমন্ত্রীর গঠন করা বিশেষ তদন্তকারী দলের ওপর ভরসা রেখে মিছিল করা হোক না কেন? বা সেই তদন্তকারী দলের পক্ষ থেকে যা রিপোর্টই প্রকাশ করা হোক না কেন, তাতে কি সাধারণ মানুষের ভরসা ফেরত পাওয়া যায়? তাতে কি পুলিশ সম্পর্কে ধারণা পাল্টে যাবে রাতারাতি? তাতে কি আনিস খানের বৃদ্ধ পিতা তাঁর পুত্রকে ফিরে পাবেন? অনেকে বলছেন, আনিস খান নাকি সেদিন রাতে পুলিশ দেখে পালাতে গিয়ে পড়ে গিয়ে মারা যান, যদি সেই রিপোর্টও বিশেষ তদন্তকারী দল প্রকাশ করে, তাহলেও কি পড়ে থাকা আনিস খানের অর্ধমৃত দেহ, ফেলে রেখে চলে আসা, পুলিশের সংবেদনশীলতার পরিচায়ক? তার মধ্যে দিয়ে কি দেশের সর্বোচ্চ আদালত ২০০৬ সালে রায় দেওয়ার সময়ে, যে পর্যবেক্ষণ করেছিল, তাই আবারও সত্যি প্রমাণিত হয় না? আনিস খানের বৃদ্ধ বাবা যখন অভিযোগ করেন, যে পুলিশ তাঁর ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী, সে পুলিশের ওপর তিনি ভরসা রাখতে পারছেন না, তার মধ্যে দিয়েও কি আবারও পুলিশী সংস্কারের দাবীটি সামনে আসে না? নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক দলগুলো কি এই দাবী সামনে আনার কথা ভাববে না?

0 Comments

Post Comment