পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

গণতন্ত্রের মৃত্যু

  • 11 November, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 1168 view(s)
  • লিখেছেন : ফারহা কাজী
নিজেকে অন্যের চোখে ভালো করার নেশায় কিংবা সংখ্যাগুরুকে তোল্লাই দেওয়ার নেশায় আমি অন্যায়কে ন্যায় বলিনি। ইতিহাসের পাতায় আপনাদের এই বিশ্বাসঘাতকতা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

চারপাশের সংখ্যাগুরু আস্ফালন এবং কিছু সংখ্যালঘুর অতিবিনয় দেখে কয়েকটা কথা লিখতে বাধ্য হলাম।

প্রথমত, সুপ্রিম কোর্ট বলেনি বাবরি মসজিদের তলায় রামমন্দির আছে। বাবরি মসজিদের তলায় রামমন্দিরের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার ভাবে বলেছে বাবরি মসজিদ ভাঙা অন্যায় ছিলো এবং বাবরি মসজিদ যে মন্দির ভেঙে তৈরী হয়েছে তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বাবরির নীচে অনেক পুরোনো কিছু অ-ইস্লামিক স্থাপত্য পাওয়া গেছে, কিন্তু তা হিন্দু মন্দির তার কোনো প্রমাণ নেই। অর্থাৎ সেটা বাথরুম থেকে বৈঠকখানা কিংবা জৈন বা বৌদ্ধমন্দির যা কিছু হতে পারে। কিন্তু যাই হোক না কেন... পরিষ্কার করে মাথায় ঢুকিয়ে নিন যে তা ভেঙে মসজিদ তৈরী হয়নি।

দ্বিতীয়ত, সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করেছে বাবরি মসজিদ ভাঙা অন্যায় ছিলো। অন্যায়ের অর্থ বোঝেন? অন্যায় হলে তার বিহিত হতে হয়। এখানে হল কি ?

এবার তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে রামমন্দির কেন? ১০৪০ পাতার রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছে হিন্দুরা বিশ্বাস করে ঐ স্থানে রাম মন্দির আছে। তাই হিন্দুদের ঐ ২.৭৭ একর জমি দেওয়া হলো রামমন্দিরের জন্য। মুসলিমদের অন্যত্র জমি দেওয়া হবে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এতে যারপরনাই আনন্দিত যে সাচ্চা রায়দান হয়েছে। লক্ষ করছি , কিছু মুসলমানও দারুন আনন্দিত। কারণ তারা মনে করে অন্তত রায়দান তো হলো!!!

আপনারা বোঝেন জাস্টিস কী? সত্যি বলুন তো? যদি জেনেও এই উল্লাস করেন তার অর্থ আপনারা জাস্টিস চাননি... আপনারা চেয়েছিলেন শুধুমাত্র রায়দান তা সে গুন্ডার পক্ষে গেলেও!!

একদল দুর্বৃত্ত ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলো। ভারতের সংখ্যালঘুর সঙ্গে সংখ্যাগুরুর বিবাদ করিয়ে দিলো.. তারপরে কী হলো? বিচারের নামে প্রহসন হয়ে সেই জমি দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেওয়া হলো!!! আর আপনারা গ্রেট ভার্ডিক্ট বলে দু হাত তুলে সমর্কথন করছেন!!!হিন্দু মুসলমান ভাই ভাই বলে নাচছেন!! দুঃখিত, মুসলমান যদি আপনাদের ভাই হতো তাহলে তার অধিকার ছিনিয়ে এইরকম উদ্বাহু নেত্য আপনারা করতেন না। আপনারা জোর গলায় বলতেন সুপ্রিম কোর্টের কাজ তথ্য আর যুক্তির উপর নির্বিভর করে বিচার করা। বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে রায় দেওয়া না।

এতদিন ভারতের সংখ্যালঘুরা সরকারের উপর বিশ্বাস না করলেও সুপ্রিম কোর্টের উপর বিশ্বাস রাখতো। গতকালের রায় প্রমাণ করলো ভারতবর্ষের গণতন্ত্র মরে গেছে। সংখ্যালঘুর জন্য ভারতে আর কিছু নেই। বিচার, অধিকার কিচ্ছু না! নিজভূমে তারা আজ পর। ভবিষ্যতে তাদের আরো শুনতে হবে পাকিস্তানে চলে যা... NRC -র নাম করে তাদেরকে দেশ থেকে বের করার চক্রান্তও চলবে। তাদের লিঞ্চ করা হবে আরো উদ্যমে।

কারণ এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেল , যে সুপ্রিম কোর্টের কাজ ছিলো ভারতের সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তারা সেটা না করে সংখ্যাগুরুর ভয়ে রায়দান দিচ্ছে। তারা মনে করছে রামমন্দির না হলে দেশে অরাজকতা হবে। তারা শুধু সংখ্যালঘুর অধিকার অস্বীকারই করেনি , তারা সংবিধানকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।

ইতিহাস একদিন বলবে কীভাবে ভারত গণরাজ্য বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি হিন্দু গণরাজ্যে পরিণত হয়েছিলো। কিভাবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে দেশের আপামর শিক্ষিত লোক চুপ থেকেছিলো । আপনারা নিজেরাও জানেন আপনারা অসাম্প্রদায়িক নন... আপনারা সাম্প্রদায়িক... সেই কারণে আপনারা জাস্টিস নিয়ে চিন্তিত নন, আপনারা এই রায়দান নিয়ে উচ্ছ্বসিত। এই রায় শুধু মন্দির বা মসজিদ তৈরীর রায় ছিলো না... এই রায় ছিলো ভারতে মুসলমানের অধিকারের লড়াই। নিজের দেশে তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক না, সেইটা প্রমাণের লড়াই। দেশভাগের সময় এবং এখনো অবধি প্রতিটা পদে পদে ভারতবর্ষকে নিজের দেশ ভাবার পাশে দেশও তাদের নিজের ভাবে সেইটা প্রমাণের লড়াই ছিলো।

যারা ঐ জায়গায় বাথরুম, স্কুল কলেজ ইত্যাদির দাবি তুলছেন তারাও এই ইনজাস্টিসকে সমর্থন করছেন। শুধু হিন্দুত্ববাদীরা না... আপনারাও সমান ভাবে দায়ী এই দেশের গণতন্ত্রকে খুন করার মহযজ্ঞে। কারণ আপনারা জাস্টিসের থেকে রায়দানকে বড়ো করে দেখেছেন। উচ্ছ্বাস করুন জণগণ... আনন্দ করুন.. ভারতীয় গণতন্ত্রের লাশের উপর দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস করুন। ভবিষ্যতই বলবে কোন আগুনের উপর আপনারা দাঁড়িয়ে উদ্বাহু নেত্য করেছেন! আগুন প্রতিবেশীর ঘরে লাগলে আপনার আনন্দের কিছু নেই। বাংলাদেশ পাকিস্তানকে দেখে শিক্ষা নিন। গণতন্ত্রের লাশের উপর দাঁড়িয়ে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না এটা মনে রাখবেন। আজ এই কথাগুলো উচ্চারণের জন্য আমাকে আপনারা যত ইচ্ছে সাম্প্রদায়িক বলুন। কিন্তু একদিন আপনারা বুঝবেন দেশের কী ক্ষতিটাই না আপনারা করেছেন! সেদিন আমার আনন্দ হবেনা, কারণ নিজের দেশের ক্ষতিতে কারোর আনন্দ হয়না... কিন্তু আমি জোর গলায় বলতে পারবো আমি সঠিক ছিলাম। নিজেকে অন্যের চোখে ভালো করার নেশায় কিংবা সংখ্যাগুরুকে তোল্লাই দেওয়ার নেশায় আমি অন্যায়কে ন্যায় বলিনি। ইতিহাসের পাতায় আপনাদের এই বিশ্বাসঘাতকতা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

0 Comments

Post Comment