পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কেন আমি বলছি নো ভোট টু বিজেপি ?

  • 13 March, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 457 view(s)
  • লিখেছেন : বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী
প্রথম থেকেই দেখে মনে হয়েছিল এটা খুব গুরুত্বপূর্ন একটা ক্যাম্পেন। কারন বিজেপি’র বিরুদ্ধে, বিশেষ প্রচারের দরকার আছে। কেন? কারন বিজেপির পক্ষে যে বিশাল ক্যাম্পেন চলছে, সেটাকে আলাদা করে কাউন্টার করার দরকার আছে। কারা করছে এই ক্যাম্পেন, বিজেপি’র পক্ষে? আর কেন এই ক্যাম্পেনের পক্ষে দাঁড়ানোটা সময়ের দাবী?

ফেসবুকের রাজনীতি’র সাথে, জমির হকিকতের কোনও যোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফেসবুকের এলগোরিদম আপনাকে আপনার বন্ধু মহল, বন্ধুর বন্ধু আর তার বাইরে ছিঁটে ফোটা কিছু লোকের বিষোদ্গার, প্রেমালাপ, খিল্লি, খেউর, বিলাইয়ের ফোটো, কোফতা কারি, বালুচরি শাড়ি এইসব দেখায়। আমরা সেটাকে প্রায়ই “জনগন কি ভাবছে” তার সাথে গুলিয়ে ফেলি। ভাগ্যিস সেসব সমাজের গোটা চিত্র নয়। ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় যে আমার ফেসবুক দুনিয়ার বাইরে, হয়তো লোকে এত বাজে বকে না। এই যেমন নো-ভোট-টু বিজেপি’র বিরুদ্ধে আগুন ঝরানো।

প্রথম থেকেই দেখে মনে হয়েছিল এটা খুব গুরুত্বপূর্ন একটা ক্যাম্পেন। কারন বিজেপি’র বিরুদ্ধে, বিশেষ প্রচারের দরকার আছে। কেন? কারন বিজেপির পক্ষে যে বিশাল ক্যাম্পেন চলছে, সেটাকে আলাদা করে কাউন্টার করার দরকার আছে। কারা করছে এই ক্যাম্পেন, বিজেপি’র পক্ষে?

১) গোদি মিডিয়াঃ রাভিশ কুমারের দেওয়া নাম, ল্যাপডগ মিডিয়ার চলতি ভাষায় নাম। এই ধরুন ইন্ডিয়া টুডে। মহাজোটের ব্রিগেড’কে বলল “hundreds of people participated”. অথচ মোদীর ব্রিগেড ওদের মতে “মেগা র‍্যালি ”। বেলা বাড়লে দেখা গেল, শুধু ওরা না, রিপাব্লিক, টাইমস নাও মায় রাভিশের এনডিটিভি পর্যন্ত মোদীর ব্রিগেড’কে বলছে “মেগা র‍্যালি ”। খুব সস্তা হিসেব। বোঝা যাচ্ছে ওপর তলার একটি “টুল কিট” সারকুলেটেড হয়েছে ওই টার্মটা ব্যাবহার করানোর জন্য। ইন্ডিয়া নিউজ বলল ব্রিগেডের ইতিহাসে নাকি মোদীর এই র‍্যালি সবচেয়ে বড় র‍্যালি ছিল। হিন্দি চ্যানেলের টুল কিটে যে শব্দটা দেওয়া ছিল সেটা হল “জন স্যালাব” (জন-প্লাবন)। মাঠের মাঝখানে ক্যামেরা বসিয়ে লাগাতার এই প্রচার চলল। এই অ্যাডভান্টেজ’টা শুধু বিজেপি পায়। আর কেউ নয়।

দিলীপ মন্ডল, সিনিয়ার এডিটর, দুদিন আগে জানালো সমস্ত নিউজরুম’কে বলা হয়েছে আপাতত এনআরসি নিয়ে টুঁ শব্দ না করতে। এবং তারা অক্ষরে অক্ষরে এই নির্দেশ পালন করবে, নিশ্চিন্ত থাকুন। মিডিয়ার ওপর এই কন্ট্রোল শুধু বিজেপি’র আছে। তাই ওদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্যাম্পেন জরুরি।

২) ইলেকশান কমিশানঃ তামিল নাড়ু’ তে ২৫৪ সিট। ইলেকশান হচ্ছে এক দিনে, এক চরনে। বাংলায় ২৯৪ সিট, ইলেকশান হবে ৮ ফেসে!! কেন? কারণ মোদী যেদিন তামিল নাড়ু যায়, তার একদিন আগে থেকে টুইটারে ‘মোদী গো ব্যাক” ট্রেন্ড করে। ও জানে ভোট চাইতে ও নিজে তামিলনাড়ু গেলে হিতে বিপরীত হবে। কিন্তু এ পোড়া বাংলায় মোদীর জনপ্রিয়তা বেশি। তাই নাড্ডা-গাড্ডার সভার মাঠ ফাঁকা থাকলেও মোদীর দাড়ি দেখতে লোকে ঠীক পৌঁছে যায়। অতএব মোদী যাতে বাংলায় ম্যাক্সিমাম ক্যাম্পেন করতে পারে, তার ব্যাবস্থা স্বয়ং ইলেকশান কমিশন করে দিচ্ছে। কোনও রাজনৈতিক দল এত নির্লজ্জ ভাবে সরকারি মেশিনারি’র দুর্ব্যাবহার করে নি, ভারতের ইতিহাসে যতটা এই বিজেপি সরকার করেছে। তাই ওদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্যাম্পেন জরুরি।

৩) ইলেক্টোরাল বন্ডঃ এই যে নানা সার্ভে দেখাচ্ছে, বিজেপি তার জমি হারাচ্ছে, একটা কথা মাথায় রাখবেন, টাকার খেলা এখন পুরোপুরি শুরু হয় নি। আপাতত শুধু টিএমসি’র নেতা কিনতে টাকা ছড়ানো হচ্ছে। এর পর ওটা গ্রাসরুটে ঢুকতে আরম্ভ করবে। সিপিএম জেনারেল সেক্রেটারি বরাবর এটা নিয়ে সবচেয়ে বেশী সোচ্চার। উনি বার বার দেখান কিভাবে কোটি কোটি টাকার অনামি বন্ডে একা বিজেপি টাকা পাচ্ছে। ইলেক্টরাল বন্ডের ৮৫% টাকা ওনার মতে একা বিজেপি’র ঘরে ঢোকে এবং তার কোনও অডিট নেই। সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে কোন ব্যাবস্থা নিতে রাজি নয়। ওনারাও তাই এই প্রচার মেশীনারির পার্ট। এই অ্যাডভান্টেজ আবারো একা বিজেপি’র। তাই ওদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্যাম্পেন জরুরি।

গত লোকসভা ভোটে বামজোট পেয়েছিল ৭% ভোট। বিজেপির ভোট বেড়ে গেছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। এই ৩০ শতাংশ নতুন ভোটার কেন ভোট দিয়েছিল বিজেপিকে? এরা কি সবাই কড়া হিন্দুত্ববাদী? নাকি পুলোয়ামা, বালাকোট এবং আঞ্চলিক কারন ২০১৮’র পঞ্চায়েত ভোটের ভয়াবহ হিংসার দগদগে ঘা? এরা’তো প্রায় সবাই বাম-কংগ্রেসের ভোটার ছিল। বিজেপি’র একমাত্র ভরসা এই ভোটটাকে ধরে রেখে, এটা আরো বাড়ানো। আমাদের লক্ষ্য কি হবে? এই ভোটটাকে ফেরত আনা। সেটা করতে গেলে বিজেপি’র বিরুদ্ধে বিশেষ ক্যাম্পেন করতে হবে, না হবে না?

নো ভোট টু বিজেপি একটা শ্লোগান নয়, একটা আন্দোলন। এবং যথেষ্ট সক্রিয় এবং ক্রিয়েটভ একটা ক্যাম্পেন। এদের মধ্যে যারা এক্টিভ তারা অনেকেই টিএমসি’কে ভোট দেবে আবার অনেকেই মহাজোট’কে ভোট দেবে। সিপিএম’এর লোকেদের বিজেপি’র থেকে বেশি রাগ দেখি এই “নো ভোট টু বিজেপির”দের প্রতি। কেন ওরা নো ভোট টু টিএমসি বলছে না? কেন ওরা ভোট ফর লেফট বলছে না? আরে! দাবিটা কি? বস ওরা তোমার পার্টির লোক না। তোমার প্রচার ওরা করবে না। ওরা যাদের বলছে নো ভোট টু বিজেপি, তাদের গিয়ে বোঝাও ভোট ফর সংযুক্ত মোর্চা। আদ্ধেক কাজ তো ওরা ইতিমধ্যে এগিয়ে রেখেছে। তোমাদের নিজেদের ভোটার যারা গিয়ে পদ্মফুলে ছাপ দিয়েছিল, তাদের বোঝাচ্ছে কেন সেটা ভুল। এবার নিজেদের ভোট নিজেরা ঘরে ফেরাও।

এবার জানি হাত নিশপিশ করছে কিছু লোকের। “মমতা ব্যানার্জি নিজে ওদের ধন্যবাদ দিয়েছে।“ তো? কি প্রমান হয় তাতে? এটা তৃনমূলের ক্যাম্পেন? অর্থাত কেউ “নো ভোট টু বিজেপি” বললেই অটোমেটিকালি বলা হয়ে গেল “ভোট ফর টিএমসি”? কেন মহাজোট নেই নাকি ময়দানে? নিজেদের এত আন্ডার এস্টিমেট কর কমরেড? এটা’তো গোদি মিডিয়া আর ওদের ন্যারেটিভ। যে লড়াইটা শুধু দুপক্ষের। আমরা তো তা মনে করি না। এটা ত্রিমুখী লড়াই। ফলে নো ভোট টু বিজেপি মানে, ভোট টু তৃনমূল বা মহাজোট দুটোই হতে পারে। কোনটা হবে সেটা সেই পার্টির ক্যালিবারের ওপর নির্ভর করে। আমার বিশ্বাস নো ভোট ক্যাম্পেন সফল হলে মহাজোটের ভোট’ই বাড়বে। কারন যে ভোট বিজেপিতে গিয়েছিল সেটা ইতিমধ্যে একবার তৃনমূলের বিরুদ্ধে চলে গেছে। তৃনমূলে ফেরত আসার চেয়ে সেটার মহাজোটে যাওয়ার চান্স বেশি।

তাহলে কেন সিপিএম এমন দাঁত মুখ খিঁচিয়ে এদের আক্রমন করে সময় নষ্ট করছে? যার মিনিমাম ইতিহাস বোধ আছে, সে’তো জানে ফ্যাসিবাদ বিরোধি জোট সবচেয়ে broad alliance হয়, তাহলে এই ভয়ঙ্কর sectarianism কেন? এর উত্তর খুব সোজা। ওই যে শুরুতে বললাম ফেসবুকের দুনিয়ার বাইরে একটা বিশাল পৃথিবি আছে, আমার মনে হয় না সেখানে এসব খিল্লি-খিস্তি-খেউর খুব ম্যাটার করে।

ফেসবুকের বাইরের সেই পৃথিবী’তে কৃষকরা লড়ছে। সেখানে সিপিএম’এর ঘরছাড়া কমরেডরা ঘরে ফিরে বন্ধ পার্টি অফিস খুলে নতুন করে লড়াই’এর সঙ্কল্প নিচ্ছে। আইএসএফ’এর ব্যানারে মুসলমান-আদিবাসি যুবক যুবতীরা এক নতুন রাজনীতির নীল নকশা আঁকছে। বেকার ছেলে মেয়েরা চাকরির আশায় হতোদ্যম হয়েও দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য মুষ্টিবদ্ধ করছে।

মনে মনে তারা সবাই বলছে “নো ভোট টু বিজেপি”!

0 Comments

Post Comment