অসমে জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ (এনআরসি)-এর নামে বাঙালি হিন্দু মুসলমানের সর্বনাশ করার পরে এবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাকি প্রায় সব রাজ্যেই তার উত্তেজনার আঁচ পৌঁছেছে কমবেশি। ‘বিদেশি শনাক্ত’ করার সবচেয়ে বেশি তাগিদ মেঘালয়ে। বিজেপির সমর্থনে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)–র সরকার জানিয়ে দিয়েছে, তারা এনআরসি চালু করতে আগ্রহী। মণিপুরের সঙ্গে অসমের যে সীমান্ত সেখানেও নজরদারি দিন দিন কঠোর হচ্ছে। অরুণাচল প্রদেশ ছাত্র সংস্থা (আপসু)–র দাবি, তারা ইতিমধ্যেই ১৪০০ ‘বিদেশি’ ফেরত পাঠিয়েছে। ত্রিপুরাতেও উঠেছে এনআরসি–র দাবি। নাগাল্যান্ড আর মিজোরামে তো তারা তাদের মতো করে ‘বিদেশি’ চিহ্নিতকরণের একটা ব্যবস্থা প্রায় পাকা করে ফেলেছে। সব মিলিয়ে এনআরসি নিয়ে অশান্তিতে গোটা উত্তরপূর্বাঞ্চলের বাকি ছ’টি রাজ্য।
মনিপুরে বিজেপি ক্ষমতায়, নাগাল্যান্ডে শাসক জেটে রয়েছে বিজেপি। এই দুই রাজ্যই মিয়ানমার থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নিয়ে বিশেষ তৎপর। অসমে এনআরসি থেকে যাঁরা বাদ পড়েছেন তারা রাজ্যে গোপনে ঢুকে পড়তে পারেন বলেও তাঁরা আশঙ্কা করছেন। মনিপুরের বিভিন্ন অসরকারি সংগঠন এনআরসি করার দাবি তুলেছে। তাঁদের দাবি, ১৯৭১ নয়, নাগরিকত্বের মাপকাঠি হোক ১৯৫২ সাল। ইতিমধ্যে নাগাল্যান্ড এনআরসি শুরু করার প্রথম ধাপ হিসেবে রেজিস্ট্রার অব ইন্ডিজেনাস ইনহ্যাবিট্যান্টস অব নাগাল্যান্ড (আরআইআইএন) শুরু করে দিয়েছে। এর লক্ষ্য হল ১৯৬৩ সালের ১ ডিসেম্বর (নাগাল্যান্ডের ভারতভুক্তির দিন)-এর পরে যারা রাজ্যে বসবাস শুরু করেছে তাদের খুঁজে বের করা। ওই দিন থেকেই ৩৭১-এ অনুচ্ছেদের বিশেষ মর্যাদা পায় নাগাল্যান্ড। নাগাল্যান্ডে কংগ্রেস আরআইআইএন সমর্থন করলেও এনআরসি-র বিরোধিতা করছে।
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লবকুমার দেব নিজেই ভারতীয় কি না সে প্রশ্ন ওঠায় শাসক দল এনআরসি নিয়ে আর তেমন উচ্চবাচ্য করছে না। সিপিএম-ও এ নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ। তবে বিজয় রাঙ্খলের নেতৃত্বাধীন আইএনপিটি দাবি তুলেছে, ত্রিপুরায়ও এনআরসি চালু করতে হবে। দিল্লিতে তারা ধর্না দিতে যাচ্ছে। তবু ত্রিপুরায় এনআরসি নিয়ে বিতর্ক অপেক্ষাকৃত কম। এমনকী, বিপ্লবকুমার দেবের নাগরিকত্ব নিয়েও বিতর্ক স্তিমিত। নাগরিকত্বের ভিত্তি বছর ১৯৭১–এর ২৪ মার্চ। কিন্তু বিপ্লবকুমার দেবের জন্ম ২৫ নভেম্বর, ১৯৭১। বিপ্লবের দাবি, তাঁর জন্ম ত্রিপুরাতেই। তবে উইকিপিডিয়ায় তাঁর জন্ম বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার কচুয়া থানার মেঘদাই গ্রামে বলে প্রথমে লেখা হয়েছিল। পরে অবশ্য তা সংশোধন করা হয়। আসলে বিপ্লবদের ওখানেই বাড়ি ছিল। কিন্তু তাঁর বাবা ত্রিপুরার উদয়পুরের কাছে জামবুরিতে এসে বাড়ি করেন। বিপ্লব নিজে জানিয়েছেন, তাঁর জন্ম সেখানে।
মেঘালয়, মণিপুর, অরুণাচল প্রদেশ এনআরসি নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। মেঘালয়ের উপমুখ্যমন্ত্রী পেস্টন টিনসং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস সাংমা মঙ্গলবার জানিয়েছেন, তাঁরা এনআরসি চালু করতে বিশেষ আগ্রহী। মেঘালয়ে ঢোকার জন্য তাঁরা ইনার লাইন পারমিটের মতো কিছু একটা চালু করতে উদ্যোগী বয়েছে মেঘালয় সরকার। তা নিয়ে বিদানসভায় সিদ্ধান্তও হয়েছে। মণিপুর পুলিস বাহিনী এখন অসম সীমান্তের জিরিবামে দিনরাত পাহারা দিচ্ছে। মণিপুরি ছাত্র সংস্থার দাবি, ইতিমধ্যেই তারা চার গাড়ি ‘বিদেশী’কে ঢুকতে দেয়নি। তাঁদের কাছে নাকি বৈধ কাগজ ছিল না। অরুণাচল প্রদেশ ছাত্র সংস্থার দাবি করেছে যেতারা ১৪০০ ‘অবৈধ নাগরিক’কে ফেরত পাঠিয়েছে। সেইসঙ্গে রাজ্য সরকারকে সময় বেঁধে দিয়েছে অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করার জন্য। তাদের সাফ কথা, বৈধ ইনারলাইন পারমিট ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেওয়া চলবে না।
প্রতিবেশীদের এই অবস্থার মধ্যে অসমেও বিতর্ক থামার কোনও লক্ষণ নেই। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ ফের সমালোচনা করেছেন এনআরসি প্রক্রিয়ার। এনআরসি–কে নিজের ব্রেনচাইল্ড বলে দাবি করে তিনি রাজ্য সরকারের কাছে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি করেন। বিজেপির জোটসঙ্গী অসম গণপরিষদ নাগরিকত্ব সংশোধন বিল নিয়ে ফের জানিয়েছে তারা নাগরিকত্ব সংশোধন বিলের বিরোধিতা করবে। এমনকী, এনআরসি–র ক্ষেত্রেও অসমচুক্তিকে মান্যতা দিয়ে ১৯৭১–এর ১৪ মার্চের পরে আসা বাংলাদেশিদের বিতারিত করতে হবে। ধর্মের ভিত্তিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া চলবে না বলে হুমকি দিয়েছে অগপ।
নিজের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে অসমের সংখ্যালঘু নেতা, এআইডিইউএফ কর্ণধার এবং সাংসদ বদরুদ্দিন আজমল জানিয়েছেন, এনআরসি ধর্ম বা ভাষার ভিত্তিতে হচ্ছে না। তাঁর মতে, এনআরসি–র সঙ্গে ধর্ম বা ভাষাকে জড়িয়ে রাজনীতি করা অন্যায়। এনআরসি শুধু বাংলাদেশি খুঁজছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইতিমধ্যে গুয়াহাটিতে নেডা-র (নর্থ ইস্ট ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স) চতুর্থ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন আসবেই। কিন্তু তার জেরে কোনও রাজ্যের নিজস্ব আইন বা জনজাতির অধিকার খর্ব হবে না। তাঁর আরও দাবি ছিল, কেন্দ্র অসম থেকে অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ালেও তারা পাশের রাজ্যে ঢুকে বাঁচতে পারবে না। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে সময়সীমা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। তাই নাগাড়ে বিদেশ থেকে আসা হিন্দুদের মোটেই নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না— অমিতের সেটাই দাবি। এই প্রথম উত্তর-পূর্বে ৮ রাজ্য একই রাজনৈতিক দল বা জোটের শাসনাধীন। নর্থ ইস্ট ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স হল উত্তর পূর্বাঞ্চলের অঞ্চলিক দলগুলোর একটি রাজনৈতিক মঞ্চ। ২০১৬ সালে নেডা জোট গড়েছিলেন তদনীন্তন বিজেপি। তখন যে লক্ষ্য স্থির করেছিল বিজেপি মাত্র তিন বছরের মাথায় সেই লক্ষ্য অর্জন করেছে তারা। কিন্তু নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল আনার পরে নেডা ভাঙতে বসে। বিল পাশ না হওয়ায় নেডা রক্ষা পায়।
নেডার চেয়ারম্যান হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, এনআরসি-তে অনেক ভারতীয় বাদ পড়েছেন, বিদেশিদের নাম ঢুকেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও অনেক আপত্তি উঠছে। গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে, সকলের মত নিয়ে এই ব্যাপরে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মেঘালয়ের নিজস্ব আবাসিক সুরক্ষা আইন আছে। তিন রাজ্যে আইএলপি রয়েছে। আছে ষষ্ঠ তফশিলের সংরক্ষণ। মেঘালয়ের আইন ও স্থানীয় জনজাতির অধিকার খর্ব করে যদি কেন্দ্রীয় আইন চাপানো হয়, তাই নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। অসমের এনআরসি-ছুটরা মেঘালয়ে ঢুকতে থাকলেও বিপদ। একই আশঙ্কা করছেন, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল, মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রীরাও। মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা বলেছেন, কেন্দ্র একতরফা কিছু করলে জনসংখ্যার বিন্যাসে বদল আসবে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে।
অমিত শাহ অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, কোনও অনুপ্রবেশকারীকে অসম থেকে পালিয়ে পাশের রাজ্যে ঢুকতে দেওয়া হবে না। কাশ্মীর উপত্যকায় যেমন ছিল ৩৭০ অনুচ্ছেদ, ৩৭১ অনুচ্ছেদ উত্তর-পূর্বের স্থায়ী ও বিশেষ ধারা। কাশ্মীরে ৩৭০ বাতিল হলেও উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলোতে তা বজায় থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন অমিত। রাজ্যগুলিতে জনজাতির স্বার্থ সুরক্ষিত করতে ষষ্ঠ তফসিল ও স্থানীয় আইনে হাত পড়বে না। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরকে ভিত্তি তারিখ রেখে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন আনা হবে। তারপরে ভারতে ঢোকা কেউ নাগরিকত্ব পাবে না। বলাই বাহুল্য, নতুন নাগরিকত্ব পাওয়া কেউ ইনারলাইন আইনের আওতায় থাকা রাজ্যে বাড়ি কিনতে বা স্থায়ী বাসিন্দা হতে পারবে না।
0 Comments
Post Comment