পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভুতের দাদাগিরি না দাদার ভুত?

  • 19 November, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 2333 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
ইদানীং নাকি সবাই ভুত দেখছে, কোথায় না ‘জি বাংলা’য়। দাদাগিরিতে। দাদাগিরির মতো অনুষ্ঠানে কেন সৌরভ গাঙ্গুলীদের মতো লোকদের আনা হয় বলুন তো? সেই নিয়ে কিছু কথা

ইদানীং নাকি সবাই ভুত দেখছে, কোথায় না ‘জি বাংলা’য়,দাদাগিরিতে। দাদাগিরির মতো অনুষ্ঠানে কেন সৌরভ গাঙ্গুলীদের মতো লোকদের আনা হয় বলুন তো? ওরা মানুষের মনস্তত্ব বোঝে, ওরা জানে আমরা কি বিশ্বাস করতে চাই। আপনি যদি ভেবে থাকেন যে দিলীপ ঘোষ এমনি এমনি বলেছেন গোরুর দুধে সোনা পাওয়া যায়, তাহলে ভুল ভাবছেন। ওরা সচেতন ভাবেই এই কথাগুলো বলেন। এই যে সৌরভ গাঙ্গুলী বলছেন তিনি ভুত দেখেছেন, এটার মধ‍্যেও একটা রাজনীতি আছে। উনি বিশ্বাস করছেন বললে অনেক মানুষ সেটাকেই ধ্রুব সত‍্য বলে মেনে নেবে। ভাববে সৌরভ যখন বলছেন, এতো বড় একটা মানুষ, সে কি মিথ‍্যে বলছে? এরপর এই ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপের মধ‍্যে দিয়ে ছড়িয়ে পড়বে। লোকে আলোচনা করবে। তারপর কেউ কেউ নিশ্চিত বিশ্বাস করবে।যখন মোদী বলেন যে উনি ক‍্যামেরা আবিস্কারের আগে থেকে ডিজিটাল ক‍্যামেরা ব‍্যবহার করছেন, কিংবা পুলওয়ামার সময়ে পাকিস্তানি বিমানকে আক্রমণের জন্য মেঘ বা ক্লাউড সমস্যার সৃষ্টি করেছিল তখনো কিছু মানুষ সেটা বিশ্বাস করেছিলেন। যখন সুপ্রীম কোর্ট বলে, রাম মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল বাবরি মসজিদের তলায় সেটা হিন্দুরা বিশ্বাস করে। তাই ওই স্হানে মন্দির হোক।তখন অনেক মানুষ সেটা বিশ্বাস করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই সর্বোচ্চ আদালত এই রায় দেয়।

এই অন্ধ কুসংস্কার প্রচার করার জন্যই এই টিভি চ‍্যানেলগুলো এই লোকদের পয়সা দেয় এবং আপনার সন্তানদের বিজ্ঞান বিমুখ এবং অন্ধ বিশ্বাসের দিকে নিয়ে যেতে চায়, যেখান থেকে ওরাও একদিন বিশ্বাস করতে শিখবে গণেশ দুধ খায়, বা গণেশের মাথা প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়েছিল বা রাম কাল্পনিক নয় ঐতিহাসিক চরিত্র।ওদের এজেন্ডা শুধু ক্ষমতা নয়, ওরা সাংস্কৃতিক ভাবেও আমাদের পিছিয়ে দিতে চায়, যে সমাজে সতীদাহ হবে, যে সমাজে মেয়েরা মন্দিরে ঢুকতে পারবে না। যে সমাজে গোমুত্রে ক‍্যান্সার সারবে।

আপনারা এগুলো নিয়ে ব‍্যাস্ত থাকলে ওদের সিটিজেনশিপ আ্যমেন্ডমেন্ট বিল পাশ করাতে, বা সরকারি লাভজনক সংস্থা বেচে দিতে সুবিধা হবে, কারণ আপনাকে তো ব‍্যাস্ত রাখা গেছে অন্য কিছুতে। কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন জ্যোতিষীরা ভবিষ্যত বলতে পারেন, তাই তাঁদের জ্যোতিষীদের উপর অগাধ বিশ্বাস। বিশ্বাসাদের সংখ্যাই হয়তো বেশী। এখনও বাংলার গ্রাম থেকে ডাইনি, তুকতাক, ঝারফুঁকের ঘটনার খবর আসে। এই ঠগ জোচ্চোরদের ওপর যারা বিশ্বাস করেন তাঁদের সংখ্যাটাও কম নয়। শহরেও বহু লোত এইসব বিশ্বাস করেন। এই খান থেকে শুরু হয় গুজব ছড়ানো। মানুষের মধ্যে একটা ধারণা যদি তৈরি করে দেওয়া যায়, ওই ‘নেতা’ কিংবা ‘মন্ত্রীর’ অসীম ক্ষমতা এবং তিনি সমস্ত কিছুতে পারদর্শী তাহলে সেই ধারণার জোরেই হয়তো বা নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব। সেই ধারণা সেই নেতাকে এমন উঁচু স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দেয় যাতে মনে হয় সেই নেতাকে গণতান্ত্রিকভাবে আর বোধহয় হারানো সম্ভব নয়। এমন একটা ধারণা থেকেই জন্ম নেয় সেই বিশ্বাস, ‘উনি’ মিথ্যা বলতেই পারেন না, তাঁর জন্যই প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে আমরা উচিত শিক্ষা দিতে পেরেছি এবং পারব ভবিষ্যতেও যদি ‘উনি’ জিতে আসেন। পারলে ‘উনিই’ পারেন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াতে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হলে হয়তো তাঁর গোরুর দুধে সোনার তত্ত্ব সত্যি হতে পারে। তাই মেদিনীপুরের এক কৃষক গোরু নিয়ে ব্যঙ্কেও উপস্থিত হয়ে যান, বন্ধক রেখে ঋণ পাওয়ার জন্য।

এই নেতা মন্ত্রীরা বা চ্যানেল মালিকেরা জানেন মানুষকে যদি অন্য আলোচনার মধ্যে মগ্ন রাখা যায় তাহলে অনেক অপ্রিয় প্রশ্ন তারা তুলবেই না। ভাবছেন আপনি বুদ্ধিমান আর দিলীপ ঘোষ বোকা? তিনি বলেছেন গোরুর দুধে সোনা পাওয়া যায় আর সেই নিয়ে সারাদিন কাটিয়ে দিলেন হোয়াটসআপে। ওদিকে পাঞ্জাব মহারাস্ট্র ব‍্যাঙ্কে টাকা তোলার যে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে তার ফলে মৃত‍্যুর সংখ‍্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮। ডিটেনশন ক‍্যাম্পে মৃত‍্যু মিছিল অব্যাহত— সংখ‍্যাটা বোধহয় ২৭। কাশ্মীর অবরুদ্ধ হয়ে আছে প্রায় ৩ মাস। মানুষ যোগাযোগ বিহীন হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এনআরসি-র আতঙ্কে আত্মহত‍্যা করছেন বহু মানুষ। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন বিভিন্ন জায়গায় নাম ঠিক করা আর ঠিকানা ঠিক করতে। চাকরি-বাকরি নেই। ওদিকে মোদী বলেছে ৯ ঘন্টা কাজ বাধ‍্যতামূলক করতে হবে। মানুষ দিল্লিতে নিশ্বাস নিতে পারছেন না।

দাদাগিরির ভুত

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সেই ছোট ছেলেটিকে আজ বড় প্রয়োজন ছিল যে প্রশ্ন করেছিল ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ কিন্তু আজকের সময়ে কি পাওয়া যাবে এমন কাউকে যে এই প্রশ্নটা করবে কিন্তু দেশদ্রোহী চিহ্নিত হবে না ? নাকি অজ্ঞানতা অপবৈজ্ঞানিক চিন্তার দিকে আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ? আগামী প্রজন্ম কিন্তু প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত আমাদেরকেই করবে যখন ভারতবর্ষ সেই মিনি বাসের কন্ডাকটারের মতো বলবেন ‘আস্তে আস্তে পিছনের দিকে এগিয়ে চলুন’। উত্তরটা কিন্তু আমাদেরই দিতে হবে। এই সব তথাকথিত সেলিব্রিটিদের সামনে পেলে প্রশ্ন করুন আপনি কি নিজের মেয়েকেও এক শিক্ষা দিয়ে থাকেন ? তাহলে তো ভুতের কোনো ভবিষ্যৎ নেই! নাকি এরপর লোকে দাদার ভবিষ্যৎ কি সেই প্রশ্নটাও জানতে চাইবে? আর দাদা সেইটার উত্তর দেবে আর আমরা অবাক হয়ে দেখবো?

0 Comments

Post Comment