পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ঔপনিবেশিক বাংলার ফুটবল সংস্কৃতির সামাজিক চরিত্র

  • 01 September, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 337 view(s)
  • লিখেছেন : ডঃ দেবাশিস মজুমদার
বৃহত্তর সমাজের বিচ্ছিন্নতা ও বিভাদ নীতিও ঔপনিবেশিক পর্বে কলকাতা ময়দান তথা বাংলার ফুটবলকে সেভাবে প্রতিবিম্বিত করতে পারেনি। শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ বিচ্ছিন্নতাই এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। তাই ফুটবলকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক পর্বে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদের প্রকাশও ছিল অত্যন্ত তীব্র।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাবে মহমেডান স্পোর্টিংয়ের ১৯৩০-এর দশকের ঈর্ষনীয় সাফল্য মোহনবাগানের ১৯১১-র আইএফএ শিল্ড বিজয়ের সাফল্যের মত সার্বিক সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করতে বা উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। তবে মহমেডান স্পোর্টিংয়ের ওই সাফল্য কার্যত কলকাতা ময়দানে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ ফুটবল ক্লাবগুলির বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে দেয়।

উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির অঙ্গ হিসাবে বাংলায় যে নব্য ক্রীড়াসংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটেছিল তার সর্বাধিক সফল বিকাশ বাংলার মাটিতে ঘটেছিল ফুটবল খেলার মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের প্রথমদিকে এই খেলা সীমাবদ্ধ ছিল শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক এবং ততপরবর্তী কলকাতায় বসবাসকারী অ্যাঙ্গলো ইন্ডিয়ানদের মধ্যেই। ১৮৭০-এর দশক থেকে কলকাতায় ফুটবল ক্লাব গড়ে উঠতে শুরু করে। কিন্তু সে সবই ছিল শ্বেতাঙ্গদের প্রতিষ্ঠিত ক্লাব। নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী বাঙালি তথা ভারতীয়দের মধ্যে ফুটবল খেলার প্রচলন করেন ১৮৭০-এর দশকের শেষ লগ্নে। ১৮৮০-র দশকে একে একে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দেশীয় ফুটবল ক্লাব যেমন— ওয়েলিংটন, টাউন, শোভাবাজার, মোহনবাগান, ন্যাশনাল প্রভৃতি ক্লাব গড়ে ওঠে। বাঙালিদের মধ্যে ফুটবল খেলার প্রবণতা তথা জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু দেশীয় ক্লাবগুলি তখনও ইউরোপীয় দলগুলিকে মোকাবিলা করার মত অবস্থায় পৌছয়নি।

১৮৯০-র দশকে ইন্ডিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন (আইএফএ) প্রতিষ্ঠা হওয়ার সময় থেকেই নানা উল্লেখযোগ্য ফুটবল প্রতিযোগিতার উদ্ভব হয়। ইতিপূর্বে কয়েকটি সামরিক বাহিনী এবং কয়েকটি দেশীয় রাজ্যের মহারাজা বা জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরী হওয়া ফুটবল প্রতিযোগিতার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু প্রাথমিক পর্বে এই ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলির সর্বোচ্চ স্তরে বা গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননীয় ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলিতে যেমন আইএফএ চ্যালেঞ্জ শিল্ড বা কলকাতা ফুটবল লীগের সর্বোচ্চ ডিভিশনে দেশীয় ক্লাবগুলিকে অবাধে অংশ নিতে দেওয়া হত না। দেশীয় খেলোয়াড়দের নিজেদের সমগোত্রীয় বলে মনে করত না কলকাতা ময়দানের শ্বেতাঙ্গ দলগুলি। ফলে এই সময় কলকাতা ফুটবলের মূল রেষারেষি সীমাবদ্ধ ছিল কয়েকটি শ্বেতাঙ্গ দলের মধ্যে। এই রেষারেষির মধ্যে আবার সিভিলিয়ান ও মিলিটারি দলগুলির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ক্রমে দুই শ্বেতাঙ্গ সিভিলিয়ান দল— ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব ও ডালহৌসি এথলেটিক ক্লাব কলকাতা ময়দানের ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রাথমিক পর্বে একে অপরের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়।

এদিকে ক্রমশ দেশীয় ক্লাবগুলিও উত্তরোত্তর উন্নতি করছিল। তারা অনুপ্রাণিত হচ্ছিল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের মাঝমাঝি পর্বে বাঙালি ভদ্রসমাজে যে দৈহিক ক্ষমতাযুক্ত ক্রীড়াসংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছিল তার দ্বারা। কোচবিহার কাপ, ট্রেডস কাপ প্রভৃতি প্রতিযোগিতাগুলি মূলত আয়োজিত হত দেশীয় ফুটবল ক্লাবগুলির জন্য। সেইসব প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে কিছু দেশী ক্লাব যেমন ন্যাশনাল প্রভৃতি ক্রমশ জনমানসে ফুটবল খেলার জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে থাকে। ১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার বছর শক্তিশালী ডালহৌসি ক্লাবকে হারিয়ে গ্ল্যাডস্টোন কাপ জেতে মোহনবাগান। এরপর থেকে মোহনবাগান ক্লাব ও বাঙালিদের খালি পায়ে ফুটবল খেলার দেশীয় রীতির জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। মোহনবাগানও এরপর একের পর এক সাফল্য পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯০৯ সালে আইএফএ চ্যালেঞ্জ শিল্ডে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। এই সময় থেকেই কলকাতা ময়দানের সামাজিক ক্ষেত্রে আরও এক নতুন ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবির্ভাব হয়। এটি হল শ্বেতাঙ্গ ফুটবল দলগুলির সঙ্গে দেশীয় দলগুলির প্রতিযোগিতা। ১৯১১ সালে শ্বেতাঙ্গ দলগুলিকে পরাজিত করে মোহনবাগান যখন আইএফএ শিল্ড জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করে তখন থেকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা জনমানসে আরও তীব্র আকার ধারণ করে। যদিও মোহনবাগানের তরফে সুবেদার মেজর শৈলেন বসু তাঁর বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, মোহনবাগানের এই জয় ফুটবল খেলার মাঠের এক অসাধারণ জয়লাভ মাত্র কিন্তু পরাধীন জনতা এই ক্রীড়াসাফল্যের মধ্যে জাতীয়বাদী আদর্শের প্রচ্ছুরণ দেখতে পায়। ফলে মোহনবাগান এক অনন্য সাধারণ জাতীয়তাবাদের প্রতীকে পরিণত হয়। আপামর ভারতবাসী এই জয়ে আপ্লুত হয়ে পড়ে। জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই বিজয়ের শরিক হয়। যদিও মোহনবাগানের ইতিহাস সৃষ্টিকারী দলের দশজন খেলোয়াড় ছিলেন হিন্দু এবং একজনমাত্র বাঙালি খ্রীষ্টান (রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জী এবং দলের মধ্যে ইনিই একমাত্র বুট পরে খেলতেন) তথাপি সংখ্যালঘু শ্রেণী বিশেষ করে মুসলিম যুবসমাজের মধ্যে এই জয়কে কেন্দ্র করে ব্যাপক উল্লাস ও উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। ১৯১৫ সালে মোহনবাগান কলকাতা ফুটবল লীগের প্রথম ডিভিশনে উন্নীত হলে দেশীয় ফুটবল প্রেমীর কাছে স্বদেশীয় ফুটবল মর্যাদা প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে মোহনবাগান। শ্বেতাঙ্গ সিভিলিয়ান ক্লাবগুলির মধ্যে কলকাতা ময়দানে সবথেকে সফল ফুটবল ক্লাবের দেশীয় প্রত্যুত্তর হয়ে ওঠে মোহনবাগান ফলে ফুটবল মাঠের সামাজিক ক্ষেত্রে এইসময় থেকে ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব ও মোহনবাগানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে। শুধু খেলায় জেতা বা সাফল্য নয়। শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়দের শারীরিক সংঘাতে পর্যুদস্ত করাও বিজয়ের সমতুল্য হয়ে ওঠে। সেই কারণে নিজের সারাজীবনে মোহনবাগানের জার্সিতে আইএফএ অনুদিত কোনও বড় প্রতিযোগিতা জিততে না পারলেও তার কড়া ট্যাকেলের জোরে সাহেব খেলোয়াড়দের ভূপতিত করে দেশীয় সমর্থকদের নয়নের মণি হয়ে উঠেছিলেন গোষ্ঠ পাল। তাঁর ক্রীড়ারীতির প্রশংসায় ইংরেজ সরকারের প্রতিভূ দৈনিক সংবাদপত্র তাঁকে ভারতীয় ফুটবলের চীনের প্রাচীর বলে উল্লিখিত করেছিল। একইভাবে মোহনবাগানেরই সন্তোষ দত্ত যখন ক্যালকাটা ক্লবের উইলিয়ামসনের নাক ভেঙেছিলেন বা তুলসী দত্ত যখন স্যান্ডেমোনিয়াম দলের বিদেশী খেলোয়াড়ের পাঁজরের হাড় ভেঙে দিয়েছিলেন কড়া ট্যাকেলে তখন তাঁরাও একইভাবে স্বদেশীয় সমর্থকদের চোখে বীররূপে পূজিত হয়েছিলেন।

এর পাশাপাশি কলকাতা মাঠে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে আঞ্চলিকতারও উন্মেষ ঘটে। ঘটি-বাঙালের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ক্রমে খেলার মাঠের সামাজিক পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। এইসময় কলকাতার বিভিন্ন ক্লাবে এমন অনেক খেলোয়াড় খেলতেন যাদের জন্মগত পরিচিতি ছিল পূর্ববঙ্গীয় হিসাবে। এইরকম খেলোয়াড়দের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত হয়েছিলেন নিজেদের ক্রীড়াদক্ষতায় (গোষ্ঠ পাল নিজে পূর্ববঙ্গীয় ছিলেন)। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অনেক সামান্য ঘটনা বা ভ্রান্তির জন্য এই পূর্ববঙ্গীয় খেলোয়াড়দের দায়ী করা হয়েছিল। ১৯১৯-এর কোচবিহার কাপে জোড়াবাগান বনাম মোহনবাগান খেলায় এই রকম একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গীয় খেলোয়াড়দের সম্মান ও সার্থরক্ষার সার্থে সুরেশ চৌধুরী উদ্যোগ নিয়ে নসা সেন ও শৈলেশ বসু-কে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের আঞ্চলিক পরিচিতিকে ফুটবল মাঠে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে ১৯২০ সালের আগষ্ট মাসে প্রতিষ্ঠা করেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের। অধ্যাপক সারদারঞ্জন রায়, ভাগ্যকুলের জমিদার তড়িতভূষণ রায়সহ পূর্ববঙ্গীয় আরও অনেক বিশিষ্ট জনের সান্নিধ্য ও সাহচর্যলাভে অগ্রবর্তী হয়েছিল এই ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। যদিও ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূত্রপাত ১৯২০-র দশক থেকেই কিন্তু তা সীমাবদ্ধ ছিল সাংস্কৃতিক ঘটি-বাঙাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা রূপেই। যেরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছিল ইস্টবেঙ্গলের সাথে এরিয়ান এবং কুমারটুলি ক্লাবের। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের চরম রেষারেষির বৃহত্তম সামাজিক আঙ্গিক প্রস্তুত হয় স্বাধীনতা উত্তর পর্বে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা বিধ্বস্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার সামাজিক প্রেক্ষাপটে।

১৯৩০-এর দশকটা কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলে ছিল মহমেডান স্পোর্টিং-এর দশক। উনিশ শতকের শেষ লগ্নে মুসলিম সমাজে আগত নবজাগরণ তথা নতুন সাঙস্কৃতিক উত্থানের ক্রীড়াক্ষেত্রে বিশেষত ফুটবল মাঠে প্রকাশ ছিল মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব হিসাবে। কিন্তু এই ক্লাবটি নানা চড়াই-উতরাই-এর অভিঘাতের পর সাফল্যের দরবারে অধিষ্ঠিত হয় ১৯৩০-এর দশকে। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ টানা পাঁচবার কলকাতা লীগের প্রথম ডিভিশন জয়। ১৯৩৬ সালে আইএফএ শিল্ড জয়। এরপর ডুরান্ড ও রোভার্সের মত সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতায় সাফল্য এই দলটিকে তার সুবর্ণযুগে অধিষ্ঠিত করে। কিন্তু এই সময়েই ভারতীয় রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা মাথা চারা দিয়ে ওঠে। মহমেডানের এই সাফল্যকে সাম্প্রদায়িক মাপকাঠি দিয়ে বিচারের চেষ্টা হয়। যদিও ১৯৩৬-৩৭-এর মরশুমে মহম্মদ সেলিমের স্কটল্যান্ডের সেলটিক দলের হয়ে খেলা ও সাফল্য ভীষণভাবে ইউরোপীয় মাটিতে ভারতীয় ফুটবলের তথা ভারতীয় পরিচিতির জয়যাত্রাকেই প্রতিভাত করে। কিন্তু দেশের মাটিতে উদ্ভূত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাবে মহমেডান স্পোর্টিং-এর ১৯৩০-এর দশকের ঈর্ষনীয় সাফল্য মোহনবাগানের ১৯১১-র আইএফএ শিল্ড বিজয়ের সাফল্যের মত সার্বিক সামাজিক প্রভাব সৃষ্টিতে ও উদ্বুদ্ধকরণে সফল হয়নি। তবে মহমেডান স্পোর্টিং-এর এই সাফল্য কার্যত কলকাতা ময়দানে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ ফুটবল ক্লাবগুলির প্রভাব প্রতিপত্তির বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে দেয়।

১৯৪০-এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবে কলকাতা ময়দান থেকে শ্বেতাঙ্গ ফুটবল ক্লাবগুলি কার্যত বিদায় নেয়। এই সময় থেকে কলকাতা ফুটবলে দেশীয় ক্লাবগুলির জয়যাত্রা শুরু হয় আক্ষরিক অর্থেই এবং ফুটবল কেন্দ্রিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন অধ্যায় সূচীত হয়। বনেদীয়ানা ও সাধারণ পরিচিতি এবং এর পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচিত এই বিষয়গুলি প্রকট বিভাজনমূলক বিষয় হিসাবে দেখা দেয়। উনিশ শতকে দেশীয় বাঙালি সমাজে মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্য দিয়েই ফুটবল খেলার প্রচলন ও প্রসার ঘটলেও অচিরেই ফুটবল তার ক্রীড়াগত বৈশিষ্ট্যের জন্য গণক্রীড়ায় পরিণত হয়। সার্বিকভাবে বাঙালি সমাজ এর দ্বারা উদ্বলিত হয় বিশ শতকের সূচনা থেকেই। ক্রিকেটের মত শ্রেণীগত ও সামাজিক অবস্থানগত বিরোধ ফুটবলের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক পর্বে কখনওই সতত প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠেনি। এই খেলায় বৈষম্যের অবস্থানও ছিল নিতান্তই কিঞ্চিৎ। বৃহত্তর সমাজের বিচ্ছিন্নতা ও বিভাদ নীতিও ঔপনিবেশিক পর্বে কলকাতা ময়দান তথা বাংলার ফুটবলকে সেভাবে প্রতিবিম্বিত করতে পারেনি। শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ বিচ্ছিন্নতাই এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। তাই ফুটবলকে কেন্দ্র করে ঔপনিবেশিক পর্বে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদের প্রকাশও ছিল অত্যন্ত তীব্র। তবে ১৯৩০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতার প্রভাব পরিলক্ষিত হতে থাকে ফুটবল মাঠে যা আরও তীব্র আকার ধারণ করে ১৯৪০-এর দশকের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভয়ঙ্কর প্রেক্ষাপটে। আর এই বিদ্বেষমূলক বিভাজন ধর্মীয় ও আঞ্চলিক পরিচিতিকে কেন্দ্র করে আরও তীব্র আকার ধারণ করে স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৫০-এর দশকে। এই সময় ক্লাব পরিচিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজন আরও তীব্র আকার ধারণ করে যার প্রেক্ষাপটে দেশভাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যার এক বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে খেলা হিসাবে ফুটবল ঔপনিবেশিক পর্বে দেশীয় জনগণ ও বাঙালি মননে সার্বিক গণসংস্কৃতি হিসাবেই প্রসারিত হয়েছিল একথা নিঃসন্দেহে দাবি করা যায়।    

0 Comments

Post Comment