পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মিনষে

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 678 view(s)
  • লিখেছেন : সামসুন নিহার
রুজদার মনের মেঘ সরে গেল বাস যাত্রীদের কোলাহলে। নীড় না হোক, বাসও তো রুজদার এক অর্থে বাসা। নয় নয় করে দিনের প্রায় তিন ঘন্টা তো বাসেই কাটে। বাস বলেই তো একটা বসার স্থান পাবার আশা থাকে। পেলে তো বিরাট ব্যাপার। জানালার ধারে হলে তো কথাই নেই।

বাস ছাড়ার কেন্দ্রবিন্দুতে সে বাস ধরলেও ছুটে ছুটেই তো ধরতে হয়। তাই বসার স্থান হলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। না পেলে খোঁজে অপরিচিত মুখ। আর চলে নীরব চোখে অন্বেষণ, কে কোথায় নামবে।এরমধ্যে মনে একটা ক্ষীণ আশাও জাগে এই বুঝি পরিচিত কণ্ঠের অহ্বান আসবে, দিদি এখানে দেখুন, অমুক জায়গায় নামবে। পেয়েও যায় সেই নির্দিষ্ট জায়গা। এ তো নিত্য দিনের কারবার। ও নিয়ে ওতো কথা না লিখলেও চলে। ওরা যে লেখার সময় সামনে এসে দাঁড়ায়। দাবি জানায় নিজের অধিকারের! কী আর করি বলুন?

যাক, ফিরে আসি যাপনে। রুজদার বাল্যকাল গ্রামে কেটেছে। এখনো কোনো না কোনো ভাবে সেই সভ্যতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে না হলেও, সে জড়িয়ে আছে। নাড়িটা যে পোঁতা আছে ওখানে। সেখানের মানুষদের সম্পর্কে সে ওয়াকিবহাল। জানে, বোঝেও তাদের মনের ভাব ভাবনাকে। যাদের কাছে ছোটোবেলা যাতায়াত ছিল, কখনো সখনো গ্রামে গেলে ঘুরে ঘুরে তাদের সঙ্গে দেখা করে। কত পুরাতন কথা উঠে আসে কথার লতায়। কত ঘটনা, কত কথার সাক্ষী হয়ে থাকে প্রতিটি জনপদ। রুজদা ভাবে। সেই ভাবনার ঘোমটায় দোলা দিয়ে উঁকি মারলো এক মামীর কণ্ঠস্বর। বেশ কয়েক বছর আগে সেই কন্ঠস্বরের জন্ম হয়েছিল। সম্পর্কে এক মামী-মার সঙ্গে দেখা করতে গেলে সে রুজদার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে খুব দুয়া করলো। এবং খুব আন্তরিক ও ঘনিষ্ট কণ্ঠে বললো, " মা, তোর সবই খুব ভালো। কিন্তু মাথায় কাপড় কেন দিস না? মোমিন মুসলমানের মেয়ে। মাথায় ওড়না না নাও, হিজাব তো নিতে পারো।" রুজদা মৃদু হাসি মুখে খেলিয়ে নির্বিকার দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইল। সে লক্ষ্য করেছে চলমান কালে শহরে-গ্রামে -গঞ্জে সর্বত্র ধর্মের নতুন চর্চার এক প্রবাহ তৈরি হয়েছে। যা বীরভুমের জীবন চর্যায় তো একেবারে নতুন আমদানি। মনে এলো, সে যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে, তখন এসবের প্রচলন ছিল না বললেই চলে। সে দেখেছিল, তার একটিমাত্র ছাত্রী তা পড়ে আসে। তবে অবাক চিত্তে রুজদা লক্ষ্য করেছিল, চিত্রটা কয়েক বছরের মধ্যে দ্রুত গতিতে বদলাতে শুরু করলো। এখন আর লক্ষ্য করতে হয় না। সাধারণ ভাবেই চোখে পড়ে। ভীষণ ভাবে চোখে পড়ে। বাসে সহযাত্রীদের মধ্যেও সেই ছবি দেখা যায়।

দেখেছো স্মৃতি কী বেহায়া! সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে লাইন দিতে। এ যেন লক্ষ্মীরভাণ্ডার! যেন লাইনে দাঁড়ালেই হলো! সকলে একসঙ্গে হুড়োহুড়ি করলে হয়? সকলের কথাই লিখবো। সময় তো দিতে হবে। কাকে বোঝাই বলুুন তো? একবার যেই ঘোষণা হলো অমনি সব.....।

যাক গে। রুজদা আবার স্মৃতির সরণীতে বসে তাদের সঙ্গেই আলাপ জমালো। বাসের সিটে গা এলিয়ে ভাবতে শুরু করলো। বহু যাত্রীর কলরব নিয়ে সৃষ্ট এই কোলাহলও তো একটা চরিত্র। জীবনের মতো সেও তো জীবনের কথাই বলে। একের নয়, বহুর কথা বলে সে। রুজদা সেই কোলাহলকেও উপভোগ করে। আর এই কোলাহলের মাঝ থেকে কখনো কখনো একক কণ্ঠস্বর মাথা তুলে নিজেকে ব্যক্ত করে। একদিন এমনই কণ্ঠস্বরে রুজদার ঝিমিয়ে আসা মন চাঙ্গা হয়ে পিছন ফিরে তাকাল। দেখে বছর চল্লিশের এক মহিলা, শোনে তার তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর। সে একক ভাবেই চিৎকার করছে। "ছিটে বসে রইচে তাও হয় না। লোকে দাড়িন দাড়িন যাবে। আর উরা পটের বিবির মতো বসি বসি যাবে। তাতেও জান ভরে না। গায়ে গা লাগতি দিবে না। গা ক্ষয়ি যাবে। দ্যাখো দিকি। " স্বাভাবিকভাবেই সঙ্গ দেবার কিছু মানুষও পেয়ে যায়। এই দৈনিক যাত্রীদের প্রতি কোনো কোনো যাত্রীর একটা চাপা ক্ষোভ থাকে। অনেক সময় কেউ কেউ সামান্য জিনিসকে নিয়ে এমন চিৎকার করেই থাকে। রুজদা জানে সেটা। তবুও পাশে বসে থাকা সহযাত্রীর কাছ থেকে জানতে চাইল ঘটনা কী ঘটেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে রুজদার সহকর্মী মৌমিতার সঙ্গে। মৌমিতা বেশ গোছানো মেয়ে। সুন্দর করে শাড়ি পড়ে। তার শাড়িতে কোথাও একটু ভাজ পড়ে না। বাসে যাতায়াত করলেও। সুন্দর ভাবে সাজে। তার সাজে এক বিন্দুও টোল পড়ে না, চরম গ্রীষ্মের পরম তাপেও। রুজদাও আফসোস হয়, ঈশ! যদি এমন নিখুঁত ভাবে সাজতে পারতো। এক সময় হিংসেও হতো। সাজতে তো পারেই না রুজদা । আবার যাও একটু সাজে তাকে বহন করতে পারে না। শাড়ি পরা তো দূরে থাক। যাক। তবে মৌ এমনিতে শান্ত স্বভাবের মেয়ে। অকারণে কাউকে কিছু বলা তার ধাতে নেই। সেই মৌমিতার সঙ্গে এমন কাণ্ড! মৌমিতা কিন্তু তার মৌনতা একবারের জন্যও ভাঙে নি।

দাড়িয়ে থাকা স্থূলকায় মহিলাটি ধারে বসা মৌমিতার শরীর উপর নিজেকে এলিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। মৌমিতা তাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বলাতে তিনি গেছেন চটে। 'ল্যাখাপড়া' মেয়েদের তো তিনি পিণ্ডি চটকালেনই। সেই সঙ্গে রাজ্যের তৎকালীন প্রধানেরও। " ওই বুদ্ধ মিনষে , কী করতে যে এই মাগীগুলাকে চাকরি দ্যায় ক্যা জানে। মাগীদের আবার চাকরি দিতে আছে নাকি? ওই মিনষের জন্যই মাগীগুলার এতো বার" বলতে বলতে সে তার গন্তব্যে নেমে গেল। যাত্রীদের নীরবতায় তখন বাসে সূচ পড়লে শোনা যাবার পরিবেশ ।

0 Comments

Post Comment