পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কাফী খাঁ অথবা পাখি রাষ্ট্র

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ
কথাটা শুনে নিশারের মাথাটা কেমন যেন হালকা হয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে পড়বে। সামনে প্রায় বুক অবধি উঁচু কাউন্টার। দু'পাশে স্টিলের দুটো স্ট্যান্ড যাতে লাল ফিতে বাধা, লাইনগুলো আলাদা করার জন্য। ঝুঁকে পড়লো সে কাউন্টার। দুটো হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলো কাউন্টারের প্লাইটপ। লোকটা কথাটা বলে আবার মন দিয়েছে নিজের ডেস্কের কম্পিউটারে। এসি চলছে। তবু ঘাম হচ্ছে নিশারের।

বাইরে কড়া রোদে বেশ কিছুটা হাঁটতে হয়েছে। বাধপাড়ার পাশে তার গ্রাম। মুবারকপুর। বাসরাস্তা এখনো নেই। সাইকেলে বা হেঁটে যাতায়াত। অটোও ঢোকে না। ভ্যানো কখনো-সখনো চলে। কিন্তু ভ্যানো পায়নি সে। পাবে কেমন করে? ভ্যানোর চালকেরাও তো বাকীদের মতো ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়েছে এসে। লেলেগড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কটির একটাই শাখা। আর দুটো প্রাইভেট ব্যাঙ্ক আছে। কিন্তু তাদের মতো মানুষেরা এখনো রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কেই ভরসা বেশী করে বলে, সেখানেই সব রাখে। তাই বেশ কিছুটা হেঁটে এসে, ব্যাঙ্কে লাইন দিয়েছে প্রায় ঘন্টা তিনেক।

থিক্‌থিক করছে ভীড়। ক'দিন ধরেই কথাটা ঘুরছিলো। মানুষের মুখে মুখে, কারো কারো মোবাইলে মোবাইলে। সেও তার মোবাইলে একজনকে বলতে শুনেছে, এই যে এসআইআর হচ্ছে, এতে যদি নাম না ওঠে - কী যেন কথাটা - আনম্যাপ্‌ড আনম্যাপ্‌ড - তাহলে সরকারি সুবিধে তো কিছু পাবেই না, ব্যাঙ্কের টাকা-গয়না সব ব্যাঙ্ক আটকে দেবে। অন্য দেশে পাঠিয়ে দেবে। সবাই ভাবছে আগেভাগে টাকা তুলে নিয়ে রাখার কথা তাই। হাতে কিছু টাকা থাকলে অন্য কোথাও পাঠালেও তো অন্তত বাঁচার চেষ্টা করবে। না থাকলে তো সব গেলো।

আরে, বল্‌লাম তো হোবে না! বেকার দাঁড়িয়ে আছেন কেন? অন্যদের আসতে দিন! যান যান! চলে যান!

শরীরটা শক্ত করার চেষ্টা করছে নিশার। কিন্তু আরো যেন দুর্বল হচ্ছে। এমন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে তাকে ঐ কথাগুলো বলা ব্যাঙ্ককর্মীটিকে সে অনেকদিন চেনে। অনেক বছর বলা চলে। লোকটার নাম বিভু পান্ডে। এখন এই ব্যাঙ্কের অ্যাসিটেন্ট ম্যানেজার। আগে ছিল কেরাণী বোধহয়!

আজ প্রচুর লোক বলে ডেস্কে বসেছে। ব্যাঙ্কের লোক তো কম। দিনে দিনে আরো কমাচ্ছে সব ব্যাঙ্ক। একজনকে দিয়ে দশজনের কাজ করাচ্ছে। নতুন চাকরি দেবে না। দিলেও তাদের পার্মানেন্ট করবে না। এসব ব্যাঙ্কের লোকেরাই বলে। সেও শুনেছে। তার মধ্যে এই লোকটা বেশ ফুলেছে-ফেঁপেছে। অনেক বছর একটাই ব্যাঙ্কে থাকা মানে ভালো খুঁটির জোর আছে।

অন্যান্য সময় ওকে এসব কাজে বসতে খুব একটা দেখাই যায় না। আগে তো এই ডেস্কটাতে বসতো দাসদা। তার আব্বুরও দাসদা, তারও দাসদা। পূব বাংলারই লোক। বাঙাল ছাড়া অন্য কোনো ভাষাই শোনেনি তারা তাঁর মুখে। দেশভাগের আগেই দাসদার পরিবার চলে এসেছিল এপাড় বাংলায়। নানা পেশায় গিয়েছে পরিবারের লোকজন। দাসদা, ব্যাঙ্কে ঢুকেছিল।

আব্বুকে খুব ভালোবাসতো দাসদা। এলেই বলতো, বয়েন বয়েন তালেব মিঞা! চা আনাই? আব্বুও যে পূববাংলাতে গেছিলো একদা, অতএব খাতিরদারি। আরো একটা কারণ ছিল। সে কারণটা -!

এ-এ দিবাকর! এ লোকটাকে সোরাবে কখন! ঘন্টে কা সিকিওরিটি হো তুম!

বাংলা-হিন্দি মিশিয়েই কথা বলে পান্ডে। জম্মকম্ম এই পশ্চিমবাংলাতেই। ইলামবাজারে নয়, মালদার দিকে। বিহারে নাকি ওদের আদিবাড়ি। এখন অবশ্য ঝাড়খণ্ডে সেটা। ঠাকুদ্দা মালদার এক গ্রামে মুদির দোকান করেছিল চলে এসে। কে এনেছিল কে জানে! পান্ডের বাপও দোকানদার। পান্ডে ওদের পরিবারে প্রথম উঁচা পড়িলিখি ছেলে। মানে বাকীরা পাঠশালায় গুনতি অবধি করেছে, কিন্তু পান্ডে একেবারে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব করেছে। ব্যাঙ্কের আগে মালদারই এক ট্রাক কোম্পানিতে হিসেব রাখতো। আর খুব পড়তো ব্যাঙ্কের পরীক্ষা পাশ করার জন্য। অবশেষে পাশ করেছে। দু-একটা ট্রান্সফারের পর এখানে।

এসব নিশার জেনেছে বাকীদের কাছে। লেলেগড়ে তো কারো কথাই খুব একটা গোপন থাকে না। জায়গাটা বিরাট নয়। শহরও নয় তেমন। মফস্বল-গ্রাম মেলানো-মেশানো। পান্ডের কথাও সবাই জানে। এও জানে সে কত করিৎকর্মা। শুধু ব্যাঙ্কে বসে অন্যের টাকা গোনে না, নিজের টাকাও বানাতে জানে। লেলেগড় বা লালগড় তো গ্রামীণ জনপদ। ইলামবাজার, যা ব্রিটিশ আমলে ছিল নিলামবাজার, তার সঙ্গে যুক্ত। ইলামবাজারের মূল কেন্দ্রে অবস্থিত প্রাচীন হাটতলা এই অঞ্চলের খুচরো ও পাইকারি ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিনের কাঁচাবাজারের পাশাপাশি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে বড় হাট বসে। লেলেগড় ও সংলগ্ন এলাকার মানুষ এই বাজার থেকেই মুদিখানা, জামাকাপড়, এবং দৈনন্দিন সামগ্রীর খুচরো ও পাইকারি ব্যবসা পরিচালনা করেন। আছে অজয় নদের অববাহিকায় থাকার জন্য উর্বর জমিতে ধান ও চালের ব্যবসা ধান চাষ এবং স্থানীয় চালকলের মাধ্যমে চালের পাইকারি ব্যবসা এখানকার অন্যতম বড় অর্থনৈতিক উৎস। স্থানীয় চাষীদের উৎপাদিত টাটকা সবজি সংগ্রহ করে বোলপুর, শান্তিনিকেতন বা দুর্গাপুরের মতো বড় শহরের বাজারগুলোতে সরবরাহ করার লাভজনক ব্যবসা রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় পোল্ট্রি ফার্ম এবং ডেয়ারি বা দুগ্ধজাত ব্যবসার ব্যাপক চল রয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে ইলামবাজার লাক্ষা বা গালার কাজের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। যদিও সাহেবদের আমলের সেই সোনালী দিন এখন অনেকটাই ম্লান, তাও স্থানীয় কিছু কারিগর এখনো গালার পুতুল, চুড়ি ও নানা শোপিস তৈরির কুটির শিল্পের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছেন। এই অঞ্চলের সুতি কাপড়, লুঙ্গি এবং তসর সিল্কের কাপড়ের স্থানীয় ও পাইকারি ব্যবসা বেশ পরিচিত। ইলামবাজার, বিখ্যাত চৌপাহাড়ী শাল জঙ্গল সংলগ্ন হওয়ায় এখানে বৈধ উপায়ে কাঠের আসবাবপত্র তৈরির প্রচুর দোকান ও কাঠ চেরাই কলের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। আবার পানাগড়-মোরগ্রাম হাইওয়ে বা এন এইচ ফোরটিন এ-র ওপর অবস্থান হওয়ায় লেলেগড়-ইলামবাজার অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্ব যথেষ্ট। ফলে এখানে লরি, ট্রাক এবং বাণিজ্যিক গাড়ি কেনাবেচা ও পরিবহনের বড় ব্যবসা রয়েছে। হাইওয়ের পাশে মোটর পার্টস, টায়ার, অটোমোবাইল সার্ভিসিং এবং টু-হুইলার, ফোর-হুইলারের গ্যারেজ বা শোরুমের ব্যবসা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বোলপুর-শান্তিনিকেতন এবং উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হওয়ায় হাইওয়ের ধারে প্রচুর ধাবা, রেস্টুরেন্ট এবং চা-নাস্তার দোকানের ব্যবসা বেশ রমরমিয়ে চলে।

এই এত-শত ব্যবসার মধ্যে এই ব্যাঙ্ক স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি কোনো চাষা, গালার কারিগর, কাঠুরে বা কাঠচেরাই শ্রমিক ইত্যাদি কাউকে ঋণ দিয়েছে এমন অপবাদ কেউ দেবে না। কিন্তু ঋণ কি দেয় না তাবলে? দেয়। পান্ডে এখান থেকে গাড়ি কেনাবেচা, চালকল আর চেরাইকলের মালিক, হোটেল-বারের মালিক এদের ঢের ঋণ দিইয়েছে। দাসদার কাছে আব্বু পোল্ট্রির জন্য আর সবজি চাষের ঋণের জন্য নরহরি সামন্তকে এনেছিল। সামন্ত বাংলাদেশ থেকে সপরিবারে সেখানকার মুক্তিযুদ্ধের পর চলে আসে। দাসদা ব্যাঙ্ক কর্মী ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতা হওয়া সত্ত্বেও সেই ঋণ করাতে পারেনি। কিন্তু যবে থেকে পান্ডে এসেছে, ব্যাঙ্কের লোন নানা মালিকদের দিয়ে দিয়ে ভরিয়ে ফেলেছে। নরহরি সামন্ত লোন না পেতে পারে, গাড়ি কেনাবেচার ভগতরাম ঝুনঝুনওয়ালা লোন পাবেই পাবে।

এখন পান্ডের ইলামবাজারে জমি, শিলিগুড়ি আর কলকাতায় ফ্ল্যাট। বেনামে টাকা কোথায় আর কত খাটে কেউ জানে না। বা যারা জানে তাদের এতোটাই খাইয়ে দেয় পান্ডে যে তারা কিছুই দেখতে পায় না এই ভাব করে চলে যায়। ম্যানেজার ওঠে-বসে পান্ডের কথায়। কারণ পান্ডে তাকেও ভালোই খাওয়ায়। অনেক উপরেও তার পান-মিষ্টি পৌঁছে যায়। এক ম্যানেজার পান্ডের হাত থেকে ব্যাঙ্কের কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিতে চেয়েছিল। প্রায় চোখের জলে নাকের জলে হয়ে তাকে সাসপেন্ড হতে হয়েছে, তহবিলে কারচুপির দায়। যদিও কারচুপি কে করেছে এখানে সবাই জানে! ব্যাঙ্কও কি আর জানে না? তবুও, অমন হয়ে থাকে এখানে। পরের ম্যানেজারেরা পান্ডের তোষামুদিই করে এসব বুঝে গিয়ে।

তাই, নিশার জানে ম্যানেজারের কাছে অভিযোগ করে কিছু লাভ নেই। চিঠি দিতে বলবে। সে চিঠি সম্ভবত যাবে ডাস্টবিনে। পান্ডের ক্ষমতা এতোটাই, যে ব্যাঙ্ক স্ট্রাইক হলে কর্মীদের বলে দেয় ঐ ব্র্যাঞ্চে স্ট্রাইক করলে চাকরিই খেয়ে নেবে। দাসদার আমলের যে এক-আধজন আছে, ইউনিয়ন করা লোক, চুপ করে সব সহ্য করে যায়। নতুনেরা জানে পান্ডেকে চটাতে নেই। আর পান্ডে? তার জায়গায় টেবিলে পা তুলে যাদের লোন দেয় তাদের বলে, বঙ্গালকো সুলতানো নে লুটা, মুঘলোঁ নে লুটা, আংরেজ লুটা, আব পান্ডে কি বারি হ্যায়!

সবাই হ্যা হ্যা করে হাসে। যে পান্ডে একদিন দাসদার অধীনে লালঝাণ্ডা ইউনিয়ন করতো, সে এখন কপালে গেরুয়া তিলক কেটে ব্যাঙ্কে আসে। নতুন রাষ্‌ট্রওয়াদি ইউনিয়নের হর্তা-কর্তা।

নিশারের কাঁধে হাত দিয়েছে দিবাকর। পেছনের লোকজনও কাঁইমাঁই করছে। হাত দিয়ে ব্যাঙ্কের প্লাইটপটা ঠেলে নিজেকে সোজা করার চেষ্টা করে নিশার। আবছা আবছা চোখে পড়ে পান্ডে তার দিকে মুখটা বেঁকিয়ে চেয়ে আছে বিরক্তিতে। ঘেণ্ণাতেও কি? মঙ্গলবার থেকেই এসআইআর শুরু হয়ে যাবে। তার আগে সোমবারেই এসেছে ব্যাঙ্কে সে। এই কাজটা সারতে। দিবাকর তার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে সোজা করছে। খামচে ধরেনি এখনো। ধরবে কিনা জানে না নিশার! দাদাজানের মুখটা আবছা ভাসে। জলে ডুবে যাচ্ছেন? কেন?

জল তো অনেক বেশী ছিল পূর্ব-পাকিস্তানে। দাদাজানই বলতো। পানি আর পানি, ড্যাঙাল মোরা, ঐ অইত্যো পানি সইতি পারি! লেলেগড়ের কাছে নিচুপাড়ার পেছনে তাদের গ্রাম। এদিকে পূর্ব-পাকিস্তান কিংবা পরে বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুই বেশী। এখানকার মুসলমানেরা দল বেঁধে চলে গেছিল ১৯৪৭-এর দেশভাগের পরে। কবে থেকে অথচ তারা ছিল এখানে। মুঘল আমলের দলিল আছে তাদের ঘরে। দাদার দাদাও বলতে পারতো না বোধহয় কবে থেকে আছে। এমনকি এও বলতে পারতো না, কবে থেকে তারা মুসলমান, আগে কী ছিল!

আব্বু, এখানে দারুত্তালীব মাদ্রাসায় পড়াতো। তার দাদাজানের মতোই। আব্বুকে আর বাকীদের নিয়ে দাদাজান দেশভাগের সময় চলে গেছিলো পূর্ব-পাকিস্তান। ঢাকায় কিছুদিন ছিলো। তারপরে চলে যায় যশোরের দিকে। কিন্তু সেখানে দাদা কিংবা আব্বু কিংবা দাদি কিংবা ফুফাদের কারো মন বসে না। দাদাজান যশোরে আর পড়াতো না। পাটের ব্যবসা ফেঁদে বসেছিল কয়েকজন পুরোনো বন্ধুর সাহায্যে। দাদা মুসলিম লীগ করতো। সেই সূত্রে এসব জান-পহেচান। অর্থ আসছিল। কিন্তু নেহরু-লিয়াকত চুক্তির পরে, যখন বলা হলো, কোন দেশে কারো কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই, সবাই সুখে-শান্তিতে থাকবে, তখন প্রায় রাতারাতি ব্যবসা গুটিয়ে, দাদা সবাইকে নিয়ে আবার চলে আসে পশ্চিমবঙ্গের এই লেলেগড়ের কাছে তাদের চিরপুরাতন মুবারকপুরে। সবচেয়ে বড় কথা হলো আসার এতো তাড়া ছিলো যে সেই আমলে বিমানে করে চলে এসেছিল। ট্রেন নয়, অন্য কিচ্ছু নয়, সোজা উড়োজাহাজ? ভাবলেও নিশারের অবাক লাগে।

সেই সময় খবরের কাগজে বেরিয়েছিল খবরটা। মুবারকপুরে চলে আসার আগে, দাদাজান সবাইকে নিয়ে কলকাতায় দু-তিনদিন ছিল। সেই সময়েই কাগজটা যোগাড় করেছিল। ১৯শে মে, ১৯৫০-এর কাগজ। কীভাবে এবং কেন, তা সে পরে জেনেছে। এও জেনেছে, কাগজটা দাদাজান এবং আব্বুর কাছে খুব প্রয়োজনীয় ছিল। ঐ কাগজ সেও দেখেছে। হলদে হয়ে যাওয়া পুরোনো কাগজ। প্রথম পাতাটা দাদাজন এনেছিলেন। সেখানেই ছিল বিমানযোগে ১৬২ জন হিন্দু ও ৭৩ জন মুসলমানের পশ্চিমবাংলায় চলে আসার কথা। আবার ঐ বিমানযোগেই ৬২ জন হিন্দু ও ১৫ জন মুসলমান চলে যাওয়ার কথাও ছিল। আশেপাশের খবরে কমনওয়েলথের জন্য ভারতের দান, উপনিবেশ থাকবে না বলে ডঃ রামস্বামীর বক্তব্য, পূর্ববঙ্গে পাকিস্তানের আনসার এবং পুলিশের প্রত্যাগত সাঁওতাল এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের ঘর-বাড়ি কাড়া, দোকান পোড়ানো ইত্যাদি অত্যাচার, বাংলার অর্থমন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকারের পুরী যাত্রা, ভিয়েৎমিনে ফরাসীদের গেরিলা হত্যা, ভারত ও পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বিভাগের মন্ত্রীদ্বয় সি সি বিশ্বাস এবং ডঃ এ মালেকের মানবতার দিক থেকে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত - এমন নানানটা ছিল। নিশার এখনো স্পষ্ট দেখতে পায় কাগজটা। দেখতে পায় ছাপা হরফগুলোকে। .

সে কাগজটা দেখেছিল আব্বুর সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে। একটু বড় হতে আব্বুকে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন কাগজটা দেখে বারবার। আব্বু বলেছিল দাদাজানের কথা। দাদাজান, আব্বুকে বলেছিল, আর কখনো বিমান উঠবা কিনা জানা নাই, তয় এই কাগজ রাখা। এই কাগজ দেখলাই মনে আসবো বিমান থিক্যা যা দেইখছিলা। সেই দেখা চিরডাকাল মনে রাইখ্যো।

সরুন লাইন থেকে!

তেতো স্বরে কথাটা বলে, তাকে ধাক্কা দেয় কাঁধ ধরে দিবাকর। ব্যাঙ্কের রাইফেলধারী গার্ডদের একজন। নিশার টাল খায়।

পান্ডে তাকে দেখছে নির্ণিমেষ চোখে। প্রচণ্ড রাগ আর বিরক্তি নিয়ে। এই নিশার লোকটা একে তো বাঙালি, তায় আবার মুসলমান। তাছাড়া এর বাপ্‌টা ঢিঁট ছিলো খুব। সে তখনো অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার হয়নি। বছর দশেক আগে, তখন দাস চলে গেছে। সে জায়গায় তার কাজ হয়েছে সিএসআরের। কাস্টমার সার্ভিস রিপ্রেজেন্টেটিভের। অ্যাকাউন্ট খোলা-বন্ধের দায়িত্ব তার। বিশেষ অ্যাকাউন্ট হলে অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার দেখবে। সেই সময় একদিন লোকটার বাপ তালেব মিঞা মুবারকপুরের মসজিদের ইমামকে নিয়ে এসেছিল, মসজিদের অ্যাকাউন্ট খোলাতে। মসজিদ নতুন করে হচ্ছে। ইমামও নতুন। শুনে গা জ্বলে গেছিল পান্ডের। চিড়বিড় করতে করতে বলেছিল, ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে তো সুদ হোবে। তুমহারা বিয়াজ লেনা গুণাহ্‌ হ্যায় না?

শরিয়ত বলে নিরাপত্তার অভাব বা অন্য কোনো বাধ্যবাধকতা থাকলে সাধারণ বা ইসলামিক ব্যাংকে মসজিদের মূল অনুদানের টাকা জমা রাখা জায়েজ। প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ বা সুদের টাকা মসজিদের নির্মাণকাজে, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতনে কিংবা মসজিদের অন্য কোনো পবিত্র কাজে ব্যয় করা শরিয়তে জায়েজ নয়। সুদের টাকা পিয়াজ বা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দান করতে হয়। ব্যাংক থেকে আসা অতিরিক্ত লভ্যাংশের অর্থ সওয়াবের নিয়ত না রেখে গরিব-দুঃখী বা জনকল্যাণমূলক কাজে -যেমন রাস্তাঘাট বা ড্রেন নির্মাণ ইত্যাদিতে - সওয়াবের আশা ছাড়াই বিলিয়ে দিতে হয়। এতোটাও জানে না পান্ডে। হোয়াট্‌স অ্যাপে মুসলমান সম্পর্কে আকথা-কুকথা যাই পায় তাই গেলে।

সেই রামমন্দির বানানোর যাত্রা যবে শুরু হলো, তারপরের দাঙ্গা-ফাসাদের সময়, বাবরি ভাঙার সময় জুড়ে আস্তে আস্তে পান্ডে অনুভব করেছে সে হিন্দু। অনুভব করেছে, এদেশে হিন্দুর জায়গা। মুসলমানের পাকিস্তান। তারাই মারদাঙ্গা করে পাকিস্তান নিয়েছে। ব্যাঙ্কে লালপার্টির ইউনিয়ন মজবুত ছিল বলে সেও জুটেছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বদলাচ্ছিল। মনে পড়ছিল পিতাজির কথা। তিনি বলেছিলেন, তাছাড়া নানা জায়গাতেও পড়ছিল, বিহারে মুসলমানেরা কী দাঙ্গা করেছে! কত মেরেছে! মুসলমান কখনো ভারতীয় হতে পারে না, তার বদ্ধমূল বিশ্বাস হচ্ছিল। যেখানেই তারা থাকে, সেটাকেই মিনি পাকিস্তান বানিয়ে নেয়। সেই মুসলমানেরা, তার ব্যাঙ্কে এসে মসজিদের অ্যাকাউন্ট খুলবে? আবার তাকে শরিয়ৎ বোঝাবে?

আরে যাও না, অপ্‌নে মূল্‌ক পাকিস্তান মে! ইসলামি ব্যাঙ্ক হ্যায় না! উঁহা যা কর খোলো!

ব্যাঙ্ক ম্যানেজার অবধি উপস্থিত হয়ে গিয়েছিল এই লোকটার আব্বার সঙ্গে তার সেদিনের ঝগড়ায়। কিন্তু ম্যানেজার কী করবে? পান্ডে ম্যানেজারকে বলেছিল, আপনি চোলে যান ম্যান্‌জার সাহেব! আব হমারা সরকার হ্যায়! রাষ্‌ট্রওয়াদী সরকার! আপনি হামাকে কুছু বলবেন তো বাৎ দিল্লি তক্‌ ভি যা সক্‌তি হ্যায়! সমঝে না? মসজিদকা অ্যাকাউন্ট হাম নহি খোলনে দেঙ্গে।

ঝামেলা হয়েছিল সেবার লেলেগড় ও সংলগ্ন অঞ্চলে। পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলের সরকার। অন্য বিরোধী দলগুলোও ছাড়েনি এমন ইস্যু। এরা সবাই ঝামেলা করেছিল। ব্যাঙ্কের লালঝান্ডা ইউনিয়নও। পান্ডে, ইউনিয়নকে বলেছিল, উয়ো বেগম ইন্‌ লোগোকো মাথায় চোড়ায়। ইয়ে লোগ্‌ ভি মওকা ইস্তেমাল কোরে। তুম্‌লোগোকো হঠা দিয়া না? তো লাজ নহি আতি বেগমকা পার্টিকে সাথ দেনে মে? আবার বেগমের পার্টিকে এবং অন্য বিরোধীনেতাকে বলেছিল, আখির হাম সব হিন্দুই তো হ্যায়! ভাইচারা হ্যায় অপ্‌না। শোচো, সাথ সাথ রামনভ্‌মি মনায়ে কে নহি? হাম সে লোন-উয়োন মিল্‌তা কে নহি? কিত্‌না ভোট হ্যায় ইনলোগোকা? কাহে ইন্‌কো চড়্‌হা রহে হো সর্‌পে?

এরা সবাই বাঙালি এবং যে দলেই থাকুক না কেন, নিজেদের হিন্দু বলেই গর্বিত। কারো কারো বাড়িতে স্টিকার সাঁটানো আছে, গরভ্‌ সে বোলো হম্‌ হিন্দু হ্যাঁয়! তালেব মিঞা, তার ছেলে নাশির, ইমাম কিংবা বাঙালি মুসলমান সমাজ, অথবা অবাঙালি মুসলমান নেতা কেউ সুবিধে করতে পারেনি। পান্ডের নামে অনেকের সই করা কমপ্লেন গেছে। দিল্লি তো পাত্তাই দেয়নি। ইলামবাজারের অবাঙালি মুসলমান নেতাকেও পান্ডে বুঝিয়েছিল, ভোটে জিততে হলে হিন্দু ভোট জরুরী। কাজেই এই ইস্যুতে বাঙালি মুসলমানের পাশে থাকার দরকার নেই। বরং নিজের রাষ্‌ট্রওয়াদি ভাবমূর্তি রাখলে হিন্দু ভোটেই জিতবে। এমন অনেক খেলা খেলেছিল। কিন্তু সময়ও তো গেছিল তার। পরিশ্রম গেছিল। এই লোকটা আর তার হারামি আব্বুর জন্য।

ভোলেনি পান্ডে। এই ক'দিন ধরে অঞ্চলের হাওয়া গরম হচ্ছিল। গত কয়েকদিন ধরেই ব্যাঙ্কে লাইন বাড়ছে। লোকে হুড়মুড়িয়ে টাকা তুলছে। কেউ একসঙ্গে। কেউ ধাপে ধাপে। ম্যানেজার তার সঙ্গে পরামর্শ করেছিল। এতো অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলে তাকে তো জবাবদিহি করতে হবে। পান্ডে বুঝিয়েছিল কিচ্ছু হবে না। বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দুগুলো ভয় পাচ্ছে। নাম কাটা যেতে পারে তাদের। ভোটার, আধার, রেশন এসব কার্ড থাকলেও বেশীরভাগের জমি নেই। ২০০২-তে বেশীরভাগের নাম নেই। কেউ কেউ বাইরে কাজ করতো, ভিন রাজ্যে, তাই এখানে নাম নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কেউ আবার এখানে থেকেও নাম তোলার উৎসাহ পায়নি। ভোট তো তারা কোনোবারেই দিতে পারে না প্রায়। তবে টাকা কিছু পেয়ে যায়। ভোট থাকলো কিনা তাতে কি আসে যায়!

ভোট যে এতোবড়ো কাণ্ড ঘটাবে এসব কে ভেবেছে! রক্তমাংসে তারা উপস্থিত, এই তো যথেষ্ট। কার্ড আছে এই তো যথেষ্ট। তারা নাগরিক। আর নাগরিক সেই বাহান্নর ভোট থেকে সরকার বানায়। সরকার থোড়ি না নাগরিক বানায়? কিন্তু বিহারের এসআইআর থেকেই তাদের মন কু ডাকছিল। বাংলায় শুরু হতেই মাথায় হাত। কাগজপত্র থাকলেই হবে না, কীসব ম্যাপিং হবে-টবে। সে সব না মিললে, কেউ বলছে তাড়িয়ে দেবে, কেউ বলছে ক্যাম্পে পুড়ে দেবে। জমি-টমি নাই থাক, টাকাকড়িও কেড়ে নেবে। তাই টাকা তোলার হিড়িক।

কিন্তু এসবের মধ্যে বসে পান্ডে ঠান্ডা মাথায় হিসেব কষেছিল। সে এখন শুধু রাষ্‌ট্রওয়াদি দলই করে না, প্রায় হাফ নেতাও। বাংলাদেশী হিন্দুগুলো যদি সত্যিই চলে যায়, টাকা নিক গে! জমি তো নিতে পারবে না। সরকারের বা অন্য কারোর জমি দখল করেছে, কেউ কেউ পেরেছে কিনতে, সব ফেলে যাবে। বাড়িঘর ফেলে যাবে। ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট কমুক, এতো জমি-বাড়িতে তার কম লাভ হবে? ভয়ের বাণিজ্য এক বিরাট বাণিজ্য, পান্ডের মাথা তাকে পরিস্কার বলে দেয়। বাকীটা দলের মধ্যে আলোচনা। সে এবং তারা বেচাকেনায় বিপুল মুনাফা করবে। যেগুলো থেকে যাবে, সেগুলো সুরসুর করে আবার ভোটের পরে অ্যাকাউন্ট খুলবে। ব্যাঙ্কের আবার আয়পয় বাড়বে। তদ্দিন ম্যানেজার উপরমহলকে বলে দেবে, যে তার কিছু করার নেই। সে সবাইকে বোঝাচ্ছে। তারা বোঝাচ্ছে। কিন্তু গায়ের জোরে তো যার টাকা তাকে তুলে নিতে দেওয়া থেকে থামাতে পারে না!

অতএব লাইন পড়েছে, তারা আটকায়ওনি তেমন করে। পুরোনো কহাবৎ আছে, সরকারকা মাল, দরিয়া মে ডাল। মেনে চলেছে পান্ডে। কতো কতো লোক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাঙ্কের টাকা মেরেও দেশের মাথা মাথা হয়ে বসে আছে, সে এই ক'টা অ্যাকাউন্ট নিয়ে সেই সব ব্যাঙ্কের জন্য ভাববে? পাগল নাকি?

কিন্তু পান্ডে তো পান্ডেই। রাষ্‌ট্রওয়াদি সজ্জন হিন্দু। সে হিন্দুদের ছাড় দিতে পারে, মুসলমানদেরও দেবে? তা হয়? পান্ডে থাকতে তাদের ব্র্যাঞ্চ থেকে একটা মুসলমানও যদি টাকা তুলতে পারে, তাহলে তার নামে কুকুর পোষা হলেও তার আপত্তি থাকবে না। এই নিশার, বা নিশারুদ্দিন শেখ মুসলমান। ওর আগেও যারা এসেছিল, তাদেরও পান্ডে ভাগিয়ে দিয়েছে। একে ছাড় দেবে? অবশ্য এই বাজারেও লোকটা টাকা তুলতে আসেনি। এসেছিল, তার সেফ ডিপোজিট বক্সটা খোলার জন্য। শুধু খুলে দেখবে থোড়ি না! নিশ্চয়ই ওর মধ্যে সোনা-দানা হিরে জহরৎ রেখেছে! সেগুলো গায়েব করবে! পান্ডে থাকতে - !

দিবাকর কাঁধ ধরে হালকা ধাক্কা দিতেই নিশার সরে যায়। পান্ডে কী ভাবছে সে সব সে জানেও না। জানার কথাও নয়। কে আর অন্য মানুষের মন সবটা পড়তে পারে। অনুমান করতে পারে। অনুমান ঠিক হবে তার কোনো মানে নেই। সে যেমন অনুমান করছিল এতো লোক টাকা তুলছে বলে ব্যাঙ্কের কাজের চাপে পান্ডে বিগড়ে গিয়েছে। সে যদি টাকা তুলতে চাইতো নিশ্চয়ই দিতো। যদিও সে শুনেছে কয়েকজন মুসলমানকে ফিরে যেতে হয়েছে। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তাদের অঞ্চলে ক'জনের আর টাকা তেমন আছে যে ব্যাঙ্কে রাখবে? যে মেয়েদের ভাতা আছে, তাদের ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট করতেই হয়। অনেকেই স্বাক্ষর নয়। নিশারও কয়েকজনের অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছে। অন্যরাও দেয়। লিখিপড়ির কাজ যে! একশো দিনের কাজের লোকদের থাকে অ্যাকাউন্ট। তাতেও হাত লাগিয়েছে নিশার কতোবার! যদিও এখন তা বন্ধ।

এখানকার বাঙালী মুসলমান কী হিন্দু যারা, তাদের বেশীরভাগের উদ্বৃত্ত থাকে না, যে তার জন্য ব্যাঙ্কে আসবে। ন্যূনতম টাকা, যা রাখতেই হয়, সেটুকু পেলেও তাদের ভালো। সেইরকম বাঙালী মুসলমানেরা কেউ কেউ এসে ফিরে গেছে। ব্যাঙ্ক বলেছে, মাসের শুরুতে অনেক কাজ থাকে তাদের। কাজেই পরে আসতে। হিন্দুদের মধ্যেও নিশ্চয়ই এমন কাউকে কাউকে ফিরিয়েছে ব্যাঙ্ক? জানে না নিশার। খোঁজ নেয়নি। শুধু দাদাজানের কথা, যা আব্বা তাকেও বলেছিল, সেইটার জন্যই ব্যাঙ্কে আসা।

এখনও মাথাটা হালকা। দিবাকরের ধাক্কাটা তাকে খাড়া করেনি। বরং লাইনের দিকে পিঠ থাকা অবস্থা থেকে বুক দেওয়া অবস্থায় নিয়ে এসেছে। এখনো সে পায়ের জোর পাচ্ছে না। দিবাকর ধাক্কা দিলেও, তাকে ছেড়ে দেয়নি। পান্ডে বিরক্তি আর ক্রোধ নিয়েই লাইনের পরেরজনের টাকা তোলার ফর্ম দেখছে।

পানি, পানি!

অস্ফুটস্বরে বলে নিশার। তার বুকটা যেন শুকনো হয়ে গেছে অনেকটা। মরুভূমির মতো। মরুভূমি শব্দটা আবছা ভাবে তাকে মনে পড়ায় মরুভূমি থেকেই ছড়িয়েছিল ইসলাম, জগতে। মরুভূমিতে পানি কম। এখানেও পানি নেই? কেউ তাকে দিচ্ছে না কেন, একফোঁটা পানি?

দাদাজান বলেছিল, আব্বু বলেছিল, আম্মু বলেছিল পূর্ববঙ্গে শুধু পানি আর পানি! এখানে পানি নেই? তাহলে কেন ফেরত এসেছিল দাদাজান সবাইকে নিয়ে আবার? কেন আব্বুকে বলেছিল, বিমান থিকা যা দ্যাখলা মনে রাইখ্যো!

কি দেখ্‌ছিলা আব্বু?

জমিন দ্যাখ্‌ছিলাম বেডা। পানি দ্যাখ্‌ছিলাম, জঙ্গল দ্যাখ্‌ছিলাম। সব কেমন জ্যামিতির ছক্‌। আরো উপ্রে গেলে শুধু ম্যাঘ আর ম্যাঘ।

এইডা মনে রাখতে ক্যান কইছিল দাদাজান?

এইডা না!

তাইলে?

মোদের বিমানযাত্রা কতা যেই কাগজে ছেলো, সেইডা যুগান্তর কাগজ। ছবি আছিল একখান খবরের লাহান। একখান্‌ খাম্বা। তার উপ্রে চারডি ফলক। একদিকে বানপুর, বনগ্রাম। অইন্যদিকে দর্শনা, বেনাপোল। বানপুর, বনগ্রামের দিকে এক মিঞাসাব আর বিবিজান যাইতেছে। দর্শনা, বেনাপোলের দিকে হিঁদু সোয়ামি-ইস্তিরি। ছবির পিছ্‌নের দিকে - দর্শনা, বেনাপোলের দিকে - পূব বাংলার দিকে তিনজন মোছলমানে বইস্যা বইস্যা আনন্দে হাসতাছে হিঁদুগো দেইখ্যা।

বিমানযাত্রা কইতে ছবির কতা কও ক্যান?

ছবির মানুষজন, পায়ে হাঁইট্যা যাইতে আছিল। মোরা বিমানে। অগোর জন্যি বর্ডার চিনাতে খাম্বা আছিল। বানপুর, বনগ্রাম হইলো ভারতের দিক। দর্শনা, বেনাপোল যায় পূব পাকিস্তানের দিক। মোছলমানে ভারতে ফিরত্যাছে, হেঁদুতে পূব পাকিস্তান। অনেক রক্ত, অনেক অইত্যাচারের পর, লাইন টাইন্যা আমাগো ভাগ কইর‍্যা দেওনের পর কতা হইছিল, আর লয়, হগ্‌গলে যে যার জায়গায় থাকবো সুখে-শান্তিতে।

আরে, বিমানযাত্রা কইতে ছবির কতা কও ক্যান? ছবি আমারে দেখাও ক্যান?

বিমানে বইস্যা পিরথিবিটা দ্যাখলাম যে! জল-জঙ্গল-নদী-মাটি সব ছোটো হতি হতি মিলায়ে গেলো! আব্বুরে কইলাম, আব্বু মোরা বর্ডার পার হতেছি? আব্বু কইলো, হ! জিগাইলাম, বর্ডার কই? নীচে তো কিসুই দেখি না। হগ্‌গলডি তো একৈ লাগে! আব্বু কইলো, মোরা পাখির লাহান! পাখির কুনো বর্ডার নাই! কলকাত্তায় যুগান্তর আইন্যা আমারে ডাইক্যা কইলো, এই যে খাম্বা, হেইডা বর্ডার। নীচ্‌ মাইনষের নীচ্‌ মন বানাইছে। উপ্রে আল্লা কিংবা ভগ্‌মানের কাসে বর্ডার নাই। বিমান উপ্রে ওড়ে। তাই তুমি বর্ডার ট্যার পাও নাই। নীচ্‌ মনুষ্যে দুনিয়ায় বর্ডার খাড়া কইর‍্যাছে!

হাঁ হয়ে গিয়েছিল নিশার ছোট্টবেলায় এসব শুনে। ছবিটা দেখে। ভালো বোঝেনি। বড় হতে হতে বুঝ বাড়লো। তদ্দিনে কাঁটাতার, বন্দুক সব বসে গেছে। সে বিমানে উঠে কখনো দেখেনি কেমন দেখতে পৃথিবীকে। অনুভবে বুঝেছে আব্বুর কথা। দাদাজানের কথা। যত দিন গেছে, যত আবার করে হিন্দু-মুসলমানে ঘেণ্ণা-হিংসা-বিভাজন বেড়েছে, বাড়ানো হয়েছে, সে ততো ঐ ছবি আর বিমানের কথা ভেবেছে। আর ব্যাঙ্কে আসাটা তার ঘনঘন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতবারই এসেছে, যতবারই এমন কিছু ঘটেছে, যা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেকার ঘেণ্ণাকে বাড়িয়েছে, কিংবা সে বুঝেছে তারা এখন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, ততোবার ভেবেছে, সব জায়গাতেই তো এমন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক আছে। আরো হচ্ছে। সেই সব নাগরিকদের নিয়ে কি আকাশে একটা বিমান-রাষ্ট্র বানানো যায় না? বা পাখিরাষ্ট্র? যেখান থেকে পৃথিবীকে দেখলে পৃথিবীই মনে হবে শুধু, অন্য কিচ্ছু নয়? মেঘের মধ্যে উড়ন্ত একটা রাষ্ট্র কি সম্ভব নয়? চাইলে সেখানে সবাই থাকতে পারবে। উড়ন্ত বিমান রাষ্ট্র, পাখি রাষ্ট্র। তারপর ভেবেচিন্তে, উড়ন্ত পৃথিবীটাই ভালো নাম বলে মনে হয়েছে তার। ছবিটায় হাত বুলোতে বুলোতে এইসবই ভেবেছে সে।

এখন দিবাকর তাকে ঠেলছে আস্তে আস্তে ব্যাঙ্কের দরজার দিকে। তার পা চলছে না। টলমল করছে। কিন্তু দিবাকর দাঁড়াতে দিচ্ছে না। হুকুম আছে তার উপর। দরজা পার করিয়েই সে থামবে। তার কাছে পান্ডে সাহেব মাইবাপ। পান্ডে সাহেব মানেই সরকার, সরকার মানেই তার চাকরী খাবার ক্ষমতার অধিকারী। অতএব সে আদেশ পালন করবেই। পানির কথা শুনলেও তার করার কিছু নেই। এসআইআরে সেও ভয় পেয়েছে। কিন্তু পান্ডে সাহেব বলেছে হিন্দুদের ভয় নেই। কাগজ না থাকলে কাগজ করানো হবে। মুসলমান হঠাও। যদিও সে দেখছে হিন্দুদের মধ্যেই ভয় বেশী। পালে পালে এসে টাকা তুলে নিচ্ছে। যদিও সে খবরের কাগজ পড়ে। অসমে প্রথম, তারপরে বিহারে অজস্র হিন্দুর নাম আর ভোটার তালিকায় নেই। তাদের সরকারী সুযোগ-সুবিধেও বন্ধ, শুনেছে সে কথা। তবুও মনে মনে ভাবে, হিন্দুদের সরকার এসেছে। নিশ্চয়ই হিন্দুদের ভয় নেই। নিশারকে সেও চেনে। মাঝেমধ্যেই আসে। অল্প টাকা জমায়। কিন্তু প্রত্যেক মাসে এসে একবার করে সেফ ডিপোজিট বক্স খোলে। সব্বাই আড়ালে বলে, কী এতো জমাচ্ছে ওখানে? কত সোনা, কত হিরে-মুক্তো? মাসে মাসে দেখে কেন? এখন তো সপ্তাহে সপ্তাহে আসছে।

লোকটা টলছে। তবু তাকে বের করে দিয়ে থামবে দিবাকর। পান্ডে সাহেব আবার কাজে মন দিয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যেই দেখে নিচ্ছে কদ্দূর সে লোকটাকে ঠেলে নিয়ে গেলো। লোকটা টলছে।

আরে আরে! এবারে তো পড়ে যাবে মনে হচ্ছে!

পড়ে যাবার অবস্থাতেই ছিল নিশার। তাকে কেউ পানি দিচ্ছে না। বুকটা শুকিয়ে কাঠ। হালকা মাথাটা ঘুরে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। মাথা নয়, যেনো পৃথিবী ঘুরছে। তার শরীরে তবু ভার। এতো ভার পা দুটো নিতে পারছে না। পা তো মানুষের ভার নেয়। এই দুনিয়ার ভার কে নেয়? ছোটবেলায় ভাবতো। আস্তে আস্তে জেনেছে, পৃথিবীর ভার টিকে আছে সূর্যের টানে। এই অনর্থ হওয়া সময়ে তারও অমন একটা টানের দরকার ছিল যে। তাই না সপ্তাহে সপ্তাহে আসছিল।

আব্বু, ছবিটায় যেনা আঁকছে তেনার নাম, কাফী খাঁ! আমাগো মতোই মুসল্লি?

আব্বু জানতো না। কিন্তু সে জেনেছে। অনেক তত্ত্ব-তালাশ করে। ইতিহাসে একজন খাফী খাঁ ছিলেন। মুঘল বাদশাহ অওরঙ্গজেবের দরবারে। সারা সাম্রাজ্যের বিবরণ সংগ্রহ করে সত্যনিষ্ঠভাবে সেই বিবরণ দরবারে পেশ করা তাঁর কাজ ছিল। ছবির আঁকিয়ে ঐ নাম নিয়েছিলেন সত্যনিষ্ঠ হবার জন্য। কিন্তু মুসল্লি ছিলেন না। তাঁর আসল নাম ছিলো প্রফুল্লচন্দ্র লাহিড়ী। ছবিটা ছিল একটা কার্টুন। আরো জেনেছিল নিশার, প্রফুল্লচন্দ্র লাহিড়ী মনে করতেন যে, একজন রাজনৈতিক কার্টুনিস্টের কাজও অবিকল সেই ঐতিহাসিক সংবাদদাতার মতোই। সমাজের ও রাজনীতির প্রাত্যহিক ঘটনাপ্রবাহকে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে তার একটি সত্যনিষ্ঠ বিবরণ বা ফিরিস্তি জনগণের সামনে তুলে ধরাই কার্টুনিস্টের মূল ধর্ম। নিজের এই পেশাগত দর্শনের সাথে মিল রেখেই ১৯৩৭ সালে যুগান্তর পত্রিকা চালু হওয়ার পর তিনি বাংলায় রাজনৈতিক ও স্ট্রিপ কার্টুন আঁকার জন্য এই কাফী খাঁ নামটি গ্রহণ করেন। ছবিটা এঁকে তার দাদাজানের মতো কতো মানুষকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তাঁদের দেশ কেউ কেড়ে নেবে না। ধর্মের, ধর্ম আর স্বার্থের রাজনীতিকে, মারামারি-কাটাকাটিকে কালো কালির রেখায় উড়িয়ে দিতে নাম নিয়েছিলেন এক মুসলমানের। আসলে ঐতিহাসিকের। তাঁর আরো নাম ছিল। শিয়াল পন্ডিত, পিসিএল। কিন্তু এই ছবিটায় নাম কাফী খাঁ। হিন্দু ঘরে জন্মেছিলেন। কিন্তু মানুষ হবেন বলেই বোধহয় ইরেজারের একটানে ধর্মছাপ মুছে কাফী খাঁ হয়ে গেছিলেন। দাদাজানের, আব্বুর কলজের টুকরো হয়ে গিয়েছিলেন। তারও।

ছবিটার মাথায়, পাঠকের দিক থেকে বাঁদিকে মাস্টহেডে যুগান্তর নামের নীচে লেখা ছিল 'ফিরে চল আপন ঘরে'। কার্টুনটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল নিশারের। বিগত কয়েক দশকে তো আরো বেশী করে। আরো জানতে ইচ্ছে করেছে। কিন্তু লেলেগড় থেকে কতো আর জানা যায়। তবু ন্যাশনাল লাইব্রেরির আর্কাইভে এসেছিল নিশার। মাদ্রাসা শিক্ষকতার ছুটিতে। ঘেঁটেছে, যতোটা সময় পেয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে আসলে জানতে পেরেছিল ঘটনাচক্রেই। যেদিন কলকাতায় ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে কলেজস্ট্রিট এসে কার্টুন নিয়ে বই খুঁজতে খুঁজতে চণ্ডী লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙালির রঙ্গব্যঙ্গ চর্চা" হাতে পেয়েছিল।

ছবিটার নাম এসেছে একটা বাংলা চলচ্চিত্রের গান থেকে। ১৯৩২-৩৪ সাল নাগাদ দেবকী কুমার বসুর পরিচালনায় 'চণ্ডীদাস' চলচ্চিত্রে এই কালজয়ী গানটি গেয়েছিলেন অন্ধ গায়ক ও অভিনেতা কৃষ্ণচন্দ্র দে। অন্ধ গায়ক বলছেন আপন ঘরে ফিরতে। সেই চণ্ডীদাসের জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র, যিনি বলেছিলেন, সেই কত যুগ আগে,

সবার উপরে মানুষ সত্য।

তাহার উপরে নাই।।

কাফী খাঁ, প্রফুল্ল চন্দ্র লাহিড়ী, যুগান্তর, দাদাজান, চণ্ডীদাস, দেবকী কুমার বসু, অন্ধ কৃষ্ণচন্দ্র, আব্বু, কার্টুন, পান্ডে, দেশভাগ সবকিছু এখন মনে হচ্ছে বমির মতো তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসবে। এতোদিন এমন কিচ্ছু হয়নি। প্রায় নীরোগ শরীর তার। এতোদিন কখনো তাকে সেফ ডিপোজিট বক্স খুলতে কেউ আটকায়নি। আজ আটকালো। পান্ডে। গেরুয়া টীকা পরে বলে দিলো, আভি খুলা যাবে না। টেইম নহি! ভাগো! এতোদিন পরে সে আর বক্সটা খুলে সেদিনের যুগান্তর কাগজ সমেত ছবিটা দেখতে পেলো না। সোনা-দানা কিস্যু নয়, বক্সে কাগজটার প্রথম পাতাটা রাখা আছে। ঘরে থাকলে যদি নষ্ট হয়ে যায়? তাই আব্বু ব্যাঙ্কের লকারে সেফ ডিপোজিট বক্সে এনে রেখেছিল, দাদাজানের সংগ্রহ। মাসে মাসে ব্যাঙ্ককে টাকা দেয় তারা এই বক্সটার জন্য। তাদের অমূল্য সম্পদ।

'ফিরে চল আপন ঘরে', হেডিংটাতে হাত বোলালে সে যেন ভরসা পায়, আশ্বাস পায়। দাদাজান, দাদা-দাদিদেরও আগের লোকজন, আব্বু-আম্মি, মুঘল, ইসলাম, মরুভূমি, আকাশ, পৃথিবী এমন কত্ত কিছু পায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান চলে আসছে, হিন্দু চলে যাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান, নির্ভয়ে। আনন্দ চলছে। কেউ ঘর হারাবে না। কেউ উদ্বাস্তু হবে না আর দুনিয়ায়। কেউ উদ্ব্যস্ত হবে না, বোমা-গুলি-ড্রোন-প্লেন-মিসাইল আক্রমণে। কাউকে এভাবে কেউ তাড়াবে না। গ্যাসচেম্বারে কেউ কাউকে মারবে না। কিংবা অন্য কোনো উপায়ে। কারণ একদিন মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে সারা পৃথিবী জুড়ে তারা বিমান-রাষ্ট্র বানাবে। পাখিরাষ্ট্র বানাবে। উড়ন্ত পৃথিবী বানাবে। যাতে সব সময় সবার চোখের সামনে থাকে দুনিয়ার কোনো ভাগাভাগি নেই। সবার আপন ঘর হলো দুনিয়া।

দিবাকর দেখে পান্ডে চেয়ে আছে। কড়া চোখ। লালচে। মত্ত যেন। নাকি উন্মত্ত? সে ঠেলে দেয় লোকটাকে!

শূন্যে কোনো অবলম্বন পায় না নিশার। নিশারুদ্দিন শেখ। পড়ে যায় শূন্য হাতড়াতে হাতড়াতে। শরীর পড়ে আগে। মাথাটা ঠুকে যায় সিমেন্টের মেঝেতে। রক্ত বেরোয় কেটে। চোয়ালে চোট লাগে। তার বমিটা আটকে গেছে। মুখটা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। কাঁধে, কনুই-এ, পেটে লেগেছে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। মেঝেতে সে পড়ে বার দুয়েক ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাচ্ছিল শূন্যে। যেন আকাশে ওঠার চেষ্টা করছিল। নাকি ওড়ার? বিমান-রাষ্ট্রে? পাখি রাষ্ট্রে? নাকি বিমান-বিশ্বে?

দিবাকর এবং আরো কয়েকজন তাকে ঘিরে ঝুঁকছে। নানা কথা বলছে। নানা প্রশ্নের উত্তর চাইছে। সে প্রায় অর্ধ্বোস্ফোটে বলতে চাইছিল, কাফী খাঁ! কাফী খাঁ!

কেউ কি শুনতে পাচ্ছে তার কথা?

এই কার্টুনটা থেকে গল্পটার জন্ম। 

 

0 Comments

Post Comment