কচি ভুট্টার দানা সেদ্ধ করে কফির জন্য গরম জল চাপিয়ে দিয়েছে। ভোট দিতে যাওয়ার আগে ওকে রান্না সেরে ফেলতে হবে। ভিক্টর, মানে ওর বরও, সকাল-সকাল উঠে পড়েছে। মোরগের লড়াই আর ডাকাডাকি ওকে জাগিয়ে দিয়েছে। ঘরের পাশে ছাঁচতলায় ওর পাঁচ-পাঁচটা মোরগ। এইবার ওদের ও সেদ্ধ ভুট্টা আর জল দেবে। এই মোরগগুলো ওর জীবনে অন্য সবকিছুর চেয়ে প্রিয়। সংসারে কোন সময় অভাব হলেও ওদের খাবারে কখনও হাত পড়েনি।
একটা মোরগ হাতে নিয়ে ভিক্টর ঘরের বাইরে থেকে হাঁক দিলো, “কারমেন, একটু তাড়াতাড়ি কর। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে হবে।”
“আসিকা, তোর তিন ভাই স্নান করেছে?”
“মা, আজে আর নিতো নদীতে নাইতে গেছে। আর মারিও তো কাল বাড়ি ফেরেনি।“
“সত্যি…? তা হলে ও শুলো কোথায়?
“গতকাল দুপুরে ও বলে গেছে যে ও স্বপ্নবিকাশ পার্টির অফিসঘরে শুয়ে যাবে।“
ভিক্টর বাইরে থেকে হাঁক পাড়ে,” ভুট্টা আর রাঙা আলু তৈরি হয়ে গেছে?”
আসিকা উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, বাবা।“
ঘরে ঢুকে ভিক্টর ডানদিকের ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে। কারমেন ওর মেয়েদের নিয়ে পেছনে রান্নার ছোট্ট জায়গায় বসে পড়ে। এরকমভাবেই ওদের জীবন বয়ে চলে। পুরুষদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে মেয়েদের খাওয়াটা ওদেশে রীতি নয়। মেয়েদের স্থান সবসময় পেছনে।
ওরা সকলেই ওদের ভালো জামাকাপড় পরে নিলো। এই গরমেও ভিক্টর সাদা জামার ওপর একটা কালো জ্যাকেট চাপালো। কারমেন পরলো একটা হাল্কা রঙের ঐতিহ্যবাহী কাপড় আর গলায় নেকলেস। চুল ক্লিপ
দিয়ে বাঁধা। বেতের ছোট্ট বাক্সে ভরে নিল পান আর চুন-সুপুরি। রোজ পান-সুপুরি না চিবোলে ওর প্রচন্ড মাথা ধরে। আর একবার মাথা ধরলে পেইনকিলার বা কোন ওষুধে কাজ হয় না। সেসময় শুধু পান-সুপুরি চাই। সেটাই ওষুধ। চিবোলে মাথাব্যথা দৌড়ে পালায়।
“চলে এসো মা। বাবা বেরিয়ে গেছে। আজে আর নিতোও।“
আসিকা মাকে ডাকলেও কারমেন ঘরে বসে থাকলো। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে হঠাৎ করে কিছু চিন্তা ওর মাথায় গেড়ে বসেছে। গত মাসে ওদের এই ছোট পরিবারে তিন ছেলের মধ্যে কিছু উত্তেজনা দানা বেঁধেছে। ওর ছেলে মারিও গ্রামস্তরে স্বপ্নবিকাশ পার্টির সমন্বয়ের কাজে যুক্ত। নিতো নবস্বপ্ন পার্টির হয়ে কাজ করে। আর আজে অমরস্বপ্ন পার্টির যুব নেতা। ভিক্তর মারিওর দলে। কারণ মারিও বাবাকে মোরগ-লড়াইয়ের জন্য সবসময় কিছু না কিছু অর্থসাহায্য করে। স্বপ্নবিকাশ পার্টির প্রচার-সমন্বয়ক কালডি লেট মহাশয় প্রায়ই মারিওর সঙ্গে দেখা করতে আসেন।
গত সপ্তাহে কারমেন যখন রান্নাঘরে তখন সে তালপাতার দেয়ালের ফোকরে উঁকি মেরে দেখেছিল যে দলের শীর্ষকর্তা কালডি লেট ছেলের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। প্রচারের কাজে এত ব্যস্ততার মধ্যেও উনি মারিওর বাড়িতে এক কাপ কফি খেয়ে যেতে ভোলেননি।
“মারিও, তুমি তোমার ছোট ভাইদের কেন বশে আনতে পারছো না। শুনছি ওরা আমাদের লোক ভাঙিয়ে নিচ্ছে। সত্যি?” একটু রুক্ষ স্বরেই কালডি মারিওকে বললেন।
“না, দাদা, না। একেবারেই না। আমাদের লোকেদের ভাঙিয়ে নেওয়া খুব কঠিন।“
“তোমাকে একটু বেশি করে খাটতে হবে। নভেম্বরে বিয়ে করছো শুনলাম। কিছু দরকার হলে বোলো। “
আসিকা বললো, “সবসময় কোন না কোন অভিযোগ ওদের।“ মজা করে আসিফাকে তদারকি আধিকারিক নাম দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডিও সে ডিঙোয়নি। ও ঘরে থেকে মাকে রোজ নানা কাজে সাহায্য করে। মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে মাঠেও কাজ করতে যায়।
কারমেন কথাটা ঠিক বুঝতে না পেরে হতাশভাবে বলে, “অভিযোগ? কীসের অভিযোগ?”
“ও মা, আমাদের ভোট দেওয়ার সময় হলো এবার। মা গতকাল আমি মারিওকে খামভর্তি টাকা হাতে দেখেছিলাম। সন্ধ্যাবেলা আমি বাজারে তোই চাচার সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম। চাচাই তো আমায় বললো মারিও ওদের প্রত্যেককে ১০০ ডলার করে হাতে দিয়েছে।“
“তাহলে একথা সত্যি। গতকাল দেখলাম তোর বাবাকে ও ১৫০ ডলার হাতে গুঁজে দিল। কিন্তু কই, তোর বাবা তো্ ওই টাকা আমায় দিল না। মারিও কোত্থেকে ওই টাকা পেল?
“ছেড়ে দাও মা ওকথা। আমরা ভোটের বুথে প্রায় এসে গেছি।
বুথের সামনে সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর লোকে ছয়লাপ। কারমেন স্পষ্ট দেখতে পেল ছেলের রক্তাক্ত দেহ মাটিতে পড়ে আছে। বুলেট বুকের সামনে দিয়ে ঢুকে পেছন ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে। ছেলেকে কাছ থেকে দেখতে ও দৌড় দিল। ওর মনে হল যে শেষ নিশ্বাস ফেলার আগে ও যেন মা বলে কেঁদে উঠেছিল। কারমেন চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। কিন্তু কেউ কি শুনলো সেই কান্না? অন্যদের সাহায্য নিয়ে আসিকা আস্তে আস্তে সেখান থেকে মাকে সরিয়ে আনল ভোটকক্ষের দিকে।
নখে রং লাগানোর জন্য হাত বাড়িয়ে ধরার সময় কারমেনের চোখ থেকে এক ফোঁটা জল ঝরে পড়লো ব্যালট পেপারে। হাতটা সরিয়ে নিয়ে মুখটা একবার মুছে নিল। তারপর হাতে থু থু করে ভরে নিল পানের পিক আর সেই পিক দিয়ে রাঙিয়ে দিল সমস্ত ব্যালট। তারপর নিজের ব্যালটটা ভাঁজ করে শান্তভাবে এগিয়ে গেলো ভোটকক্ষের দিকে। তার মন জুড়ে এখন শুধু সেই বুলেট যা ছেলের বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে। ক্ষোভে-দুঃখে নিজেকে প্রশ্ন করলো, “কেন ওরা মারলো আমার ছেলেকে? ছেলে কি তবে কোন খারাপ কাজ করেছে!” কারমেন বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলো সেখানে মেয়ে ওর অপেক্ষায়।
“কাকে ভোট দিলে মা? কেন এত দেরি ড়লো তোমার? চোখ লাল কেন, কাঁদছিলে বুঝি?” বড় দুঃখে আসিকা ওর মাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।
কারমেন খুব শান্তভাবে নিজেকে আবার প্রশ্ন করলো, “কেন? আমার ছেলেকেই কেন… ?”
ভগ্নহৃদয়ে কারমেনের স্বগতোক্তি: “ ব্যালটের ওপর এই পানের পিচ আসলে আমার ছেলের রক্ত।“
তারপর হঠাৎ আশিকার দিকে তাকিয়ে বললো, “আমি চাই যে পার্টির নেতারা আজ আমার ব্যালটের ওপর তোর বড় ভাইয়ের রক্ত দেখতে পাক। বিচারের আশায় আমি অপেক্ষা করে থাখবো আজীবন।“
“কী… .? ব্যালটের ওপর থু থু করে পানের পিচ…!”
পূর্ব তিমোরের ড্যাডোলিন মুরাককের লেখা অনুবাদ করলেন গৌতম চক্রবর্তী