পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অন্তরীক্ষের অদ্বিতীয় সম্বোধন ৮

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়
আজ অন্তরীক্ষের অদ্বিতীয় সম্বোধন এই ধারাবাহিক উপন্যাসটির অষ্টম পর্ব। আগের পর্বের সূত্র এই লেখার প্রথমে। লিখেছেন হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়।

(২৮)

দেবীমম্বামহীনাং শশধর বদনাং চারুকান্তিং বদন্যাম। হংসারূঢ়মুদারাম সুললিত বসনাং সর্বনাম সর্বদেব।।

স্মেরাস্যাং মণ্ডিতাঙ্গীং কনকমণিগনৈর্মুক্তয়া চ।

প্রবালৈর্বন্দেহ হংসাষ্টনাগামুরুকু চপলাং ভোগিনীং কামরুপাম…

 

এই মন্ত্রোচ্চারণে যখন ধুপগন্ধ উদ্ভাসিত চতুর্দিকে ঝাঁঝর ও শঙ্খনিনাদে মুখরিত সমগ্র কোঠাবাড়ি চত্বর, ঠিক সেই মুহূর্তে, শঙ্খচিতি স্বরূপধারণপূর্বক স্থান পরিত্যাগান্তে পূজাস্থলে আলপনা-অঙ্কিত মেঝেয় উপস্থিত হইয়া কুণ্ডলীবৎ উপবেশন করিয়া শ্রোতা-দর্শকদের বিস্ময়প্রকাশে এক অন্য অধ্যায়ের সূচনা করিয়া বসিল।

 

হতচকিত পূজারি মন্ত্রোচ্চারণ স্তব্ধ করিয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া সর্পের পরবর্তী কার্যকলাপ ভয়ার্তচিত্তে অবলোকন করিতে থাকিল। শ্রোতা-দর্শকবৃন্দ পরস্পর পরস্পরকে বিপদসঙ্কুল পথে অগ্রসর করাইয়া নিজেকে নিরাপত্তার বেষ্টনীতে আবদ্ধ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করিতে থাকিল। একমাত্র আদরিনী অঞ্চল বিস্ফারিত করিয়া পূর্ববৎ উপবেশন করিয়া মায়ের স্মরণে নিজেকে নিবেদিত করিল।

 

নিমেষেই স্তব্ধ হইয়া গেল ঝাঁঝর শঙ্খধ্বনি।

 

সেইসব দৃশ্য অনুমানে পর্যবেক্ষণ করিয়া শঙ্খচিতি ক্রমে নিজেকে চলমান অবস্থায় স্থাপন করিয়া উপস্থিত আমন্ত্রিতদের ত্রাস শতগুণ বাড়াইয়া দিল। কেউই পলায়ন করিবার সাহস দর্শাইতে সক্ষম হইল না, সর্পের মনোভাব নাগালে না পাওয়ার কারণে।

 

যে যাহার মত প্রকাশ করিল বটে, কিন্তু অপেক্ষা ব্যতিরেকে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হইল না। এইরকম রোমহর্ষক মুহূর্তে অকস্মাৎ শঙ্খচিতি নতমস্তকে ধীর পদক্ষেপে আদরিণীর ক্রোড় দখল করিয়া বসিল। ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তখন পূজাপ্রাঙ্গণে। মূর্তিস্বরূপ অবস্থান তখন আদরিনীর। সেই মুহূর্তে আদরিনী যেন স্বয়ং মা মনসা।

 

ক্রমে শঙ্খচিতি আদরিণীর উরু অতিক্রম করিয়া সদর দরজা লঙ্ঘন করিয়া অগ্রসর হইতে হইতে অদৃশ্য হইয়া গেল।

 

একটা স্বস্তির পরিবেশ প্রত্যাবর্তনে সমগ্র ভয়ার্তদের হৃৎকম্পন প্রশমিত হইল।

 

বটব্যালবাবুও স্বচক্ষে দেখলেন এই অবিস্মরণীয় ঘটনাটি। যে যার ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় বটব্যালবাবু লখাইকে বলে গেলেন, “তোমার এই ঘরের তিনফুট প্যাসেজের সঙ্গে আমিও তিনফুট জায়গা দিয়ে এখানে একটা মনসা মেলা বানিয়ে দেবো, কথা দিয়ে গেলাম।”

 

এমন একটা লোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী হতে পারলো না লখাইয়ের দাদা-বৌদি। বলা সত্ত্বেও ওরা অগ্রাহ্য করেছিল লখাইয়ের অনুরোধ। পরেও কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি, ঠিকঠাক কাজটা পেরিয়েছিল কিনা। বরং অন্যেরা এসে লখাই-আদরিনীর কাছে ঘটনার আদ্যপান্ত জেনে আদরিনীকে সাক্ষাৎ মা মনসা বলে করজোড়ে প্রণামও করেছিল। লখাইকে ভাগ্যবান বলে ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। কিন্তু রাম-সৌদামিনীর কোনো প্রতিক্রিয়া আর জানা গেলো না।

 

এরকম অভূতপূর্ব এবং অবিস্মরণীয় ঘটনার প্রচার টিভি চ্যানেল ছাড়াই পৌঁছে গেলো শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। পথেঘাটে বাজারে সর্বত্রই এনিয়ে আস্তিক-নাস্তিকের বিতর্ক চলতেই থাকে। তারপর গতানুগতিক প্রাত্যহিক জীবনের প্রবাহে বিষয়টি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে প্রায় বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।

 

তবে লখাই আর আদরিনীর অন্তরে সেই শঙ্খচিতি কুণ্ডলি পাকিয়ে বসেই থাকে সবসময়।

 

(২৯)

 

কিছুদিন পর কোঠাঘরের তিনদিকের তিনফুট প্যাসেজে (একদিকে দরজা খুললেই জনসাধারণের ব্যবহার্য রাস্তা) ঢুকে লখাই দেখতে চায়, সাপটা আবার এসেছে কিনা। কাজের ব্যস্ততায় এতদিন সে ওই গলিতে যাবার সুযোগ পায়নি। কিম্বা দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি।

 

আজ সেই গলিতে ঢুকে সে সাপ তো দেখতে পায়নি, তবে তার চোখে পড়লো একটা পেঁপে গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কী আশ্চর্য! কে লাগালো গাছটি! নাকি কোনো পাখি ঠোঁটে বীজ এনে এখানে ফেলে দিয়েছে। লখাইয়ের সে কী আনন্দ! গাছপ্রেমিক লখাই তার খুশি আর ধরে রাখতে পারলোনা। সেখান থেকেই সে জোরে হাঁক পাড়ে, 'আদু'।

 

ঘর থেকেই আদু বলে, “কী হল!”

 

“আয় দেখে যা!”

 

“কী দেখবো!” (আদু তো সবকিছুই জানে। ইচ্ছে করেই লখাইকে বলেনি।)

 

“আয় না জলদি।”

 

আদরিনী কাজ ফেলে লখাইয়ের কাছে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই লখাই বলে, “এই দ্যাখ!

একটা পেঁপে গাছ!”

 

আদরিনী না জানার ভান করে বলে, “বাঃ। বেশ তো। তোমার গাছে তো বরাবরের নেশা। তাই ভগবান গাছটাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তুমি আবার পুরানো অভ্যাসবশত পেঁপে গাছটাতে চড়তে যেও না। বিপদ হতে পারে। এবার যাও, রেডি হও। কাজে যেতে হবে।”

 

এদিকে অ্যাপার্টমেন্টের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ।

 

সকাল সকাল একটা লরি এসে থামলো 'অভিষিক্তা' অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। এক লরি জিনিসপত্র নামানো হল। কোনো ফ্ল্যাটের মালিকের হবে বোধহয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা এরকমটাই ভাবতে লাগলো আর কানাকানি করতে থাকলো।

 

এসময় আদরিনী নেই। কোন্ ভোরে উঠে সে গেছে শাক তুলতে। আজ চৌদ্দরকমের শাক রান্না হবে। চৈত্রসংক্রান্তির দিন এই চৌদ্দ রকমের শাক রান্নার রেওয়াজ তার বাপেরবাড়িতে আবহমান কাল থেকেই চলে আসছে। সেই নিয়ম ভাঙতে চায় না আদরিনী। তাই মাঠেঘাটে শাক খুঁজতে গেছে একটা ঝুড়ি নিয়ে।

 

ফিরে এসেই দেখে লাল কাপড় পরে মাথায় পাগড়ি বেঁধে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর হাতে ত্রিশূল নিয়ে শিব সেজে একজন দাঁড়িয়ে আছে ওদের কোঠাঘরের সামনে। আর তার পাশেই পার্বতী সেজে একজন। সেইসঙ্গে বাজছে খোল-করতাল, ঢাক-ঢোল। এরই মাঝে 'হনু' সেজে একজন পাগলামির অভিনয় করছে।

 

কার সাথে কথা বলছে লখাই। এই পাড়ায় চৈত্রসংক্রান্তিটাও বেশ জমে উঠেছে আজ। বটব্যালবাবু তখন মোটরসাইকেল থেকে নেমে গটগট করে ঢুকে গেলেন অ্যাপার্টমেন্টে।

 

কালই তো পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। অ্যাপার্টমেন্ট উদ্বোধনের মাহেন্দ্রক্ষণ। অ্যাপার্টমেন্টের কাজকর্ম সেরে বিকেলে আদরিনী আবার বাপের বাড়ি যায়। গৃহপ্রবেশের দিন সবাইকে আসার অনুরোধ করতে।

 

কথাটা শুনে আদরিনীর মা-বাবা কি কম খুশি। বলেন, “এমন শুভদিনে কি না গিয়ে থাকতে পারি, বল! নিশ্চয়ই যাবো।”

 

উপেন মেয়েকে বললেন, “রূপেনকে একবার বল। ওর বৌকেও যেতে বলবি। তোর কাজ তুই কর। দ্যাখ ওরা কী বলে।”

 

বৈঠকখানায় তখন রূপেন টিভি দেখছিল। আদরিনী দরজার সামনে গিয়ে ডাকে, 'দাদা'!

 

'কে?’

 

“আমি আদু।”

 

“কী মনে করে!”

 

“কেন, আসতে নেই বুঝি!”

 

“তা বলবো কেন! বাপের ঘর, আসতেই পারিস তো, বল, কী বলছিলি।”

 

আদরিনী ভয়ে ভয়েই বলে, “কাল তো আমরা ফ্ল্যাটে যাবো দাদা, পুজো-টুজো হবে। তোরা যাবি। রাগ করে বসে থাকিস না।”

 

রূপেন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। হয়তো কী বলবে সেটাই মনে মনে আওড়ে নিচ্ছিল। তারপর বললো, “রাগ তো আমি দেখাইনি, তুই ভুল বুঝলে আমি কী করবো! আমি তো উচিত কথাই বলেছিলাম।”

 

আদরিনী চোখের কোণের জলটা মুছে নিয়ে বললো, “দ্যাখ দাদা! যা হয়েছে তা তো আর ফেরানো যাবে না! আমরা এক ভাই এক বোন, আমরা যদি মিলেমিশে না থাকি, লোকে তো মজা দেখবে। তুই কি সেটাই চাস দাদা!”

 

— “সব বুঝি। কিন্তু একহাতে তো তালি বাজে না, বল। ভেবে দ্যাখ, ভুলটা কার!”

 

তারপর আদুকে সামনে ডেকে ওর পিঠে হাত রেখে রূপেন বলে, “আমি তোর সেই দাদাই আছি রে। ভাবিস না। আমরা সকাল সকাল সব্বাই তোর ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হবো। লখাইকে বলে দিস।”

 

সঙ্গে সঙ্গে আদরিনীর চোখের দু-কোণায় দু-এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। তারপর বৌদির সঙ্গে দেখা করে ফিরে যায় সে।

 

(৩০)

 

রাত প্রায় আটটা। লখাই আর আদরিণী দু’জনেই গিয়ে দাঁড়ায় রামের সদর দরজায়। ঠকঠক আওয়াজ দেয় লখাই। বেশ কয়েকবার। একটু পরে সৌদামিনী দরজা খোলে। দেখে, লখাইরা দু’জনে দাঁড়িয়ে।

 

“হঠাৎ কী মনে করে!”

 

লখাই বৌদির পা ধরে বলে, “বৌদি! যদি কিছু ভুল করে থাকি, ক্ষমা করো।” সঙ্গে সঙ্গে আদরিনীও জা-য়ের পা ছুঁয়ে মাফ চায়।

 

সৌদামিনী ওদের হাত ছাড়িয়ে বলে ওঠে, “আহা। এসব কী করছো! এসো, ঘরে এসো।”

 

“দাদা কোথায়?”, লখাই জানতে চায়।

 

“ঘরেই আছে।”

 

এরপর লখাই সোজা দাদার কাছে গিয়ে পা ছুঁয়ে বলে, “দাদা। কেন রাগ করে আছো! আমাকে তুমি কোলেপিঠে মানুষ করেছো। আর আজ এমনি দূরে ঠেলে দিলে হবে, বলো। আগের দিনগুলো সব ভুলে গেলে দাদা।”

 

আদরিনীও দূর থেকে দাদাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। ভাসুর তো, তাই ছোঁয়া যাবে না। সেই সাবেকি সংস্কার এখনো এদের মনের মধ্যে শেকড় গেড়ে আছে।

 

রাম আচমকা এই দৃশ্যে একটু বিচলিত হয়। কী বলবে ভেবে উঠতে পারে না। রাম কিছু বলার আগেই সৌদামিনী এসে লখাইকে বলে, “আজ হঠাৎ কী দরকার পড়লো!”

 

আদরিনীর দিকে তাকায় না সৌদামিনী। আদরিনী সেটা বুঝতে পারে। আঘাত পেলেও সেটা সহ্য করে নেয় সে। এসময় মনধরাধরি ঠিক হবে না। সে জায়ের হাত ধরে বলে, 'দিদি। আগের কথা আর ধরে রাখবেন না। আপনার দুটি হাতে ধরি।”

 

এবার রাম মুখ খোলে। সে লখাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, 'কী বলতে এসেছিস বল্।” লখাই সবিস্তারে সবকিছু বলে দাদা-বৌদিকে তার গৃহপ্রবেশে যাওয়ার আকুতি জানায়।

 

রাম, সৌদামিনীর দিকে চেয়ে থাকে। মানে উত্তরটা সৌদামিনীর কাছ থেকেই যাক, এরকম ভাব আর কী।

 

সৌদামিনী বলে, “একবারও তো তোমার ফ্ল্যাট তৈরি হবার সময় ডাকো নি। আজ গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্ন করতে এসেছো।

 

লখাই বলে, “ওরকম বলছো কেন বৌদি। ফ্ল্যাটটাতো আমার বানানো নয়। আমার তো প্রায় সব জায়গাটাই চলে গেছে। আমার না আছে উঠান, না আছে ছাদ। ঐ ঘরটুকুই সম্বল।”

 

এইভাবে ঠান্ডা-গরম কথাবার্তা চলতে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর শেষ কথাটা বলে রাম, “ঠিক আছে। পারলে যাবো।”

 

“পারলে নয় দাদা, তোমাদের যেতেই হবে। তোমাদের পায়ের ধুলা ছাড়া আমাদের ঘর শুদ্ধ হবে না।” সেই সঙ্গে বলে, ”তোমাদের ভাড়াটিয়াকেও নিয়ে যাবে। দেখা তো হল না, তোমরাই বলে দিও।”

 

“বৌদি! যাবে কিন্তু” – এই সর্বশেষ কথাটা বলে দুজনেই আর একবার দাদা-বৌদিকে প্রণাম করে বেরিয়ে গেল।

 

কিছুদিন আগেই সাহাবাবুদের বাড়িতে গৃহপ্রবেশের দিন সবাইকে আসার অনুরোধ জানিয়ে এসেছে আদরিনী। সাহাবাবু অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি আর তাঁর স্ত্রী যেতে পারবেন না। বিশেষ কোনো কাজে তাঁরা বাইরে যাবেন। তবে ছেলে তন্ময় আর মেয়ে বিউটি অবশ্যই যাবে।

 

এই শুভ অনুষ্ঠানে তন্ময়-বিউটি তো যাবেই, সেইসঙ্গে তারা পুরো অনুষ্ঠানটির ভিডিও রেকর্ড করবে বলেও জানিয়ে দিয়েছে।

 

(৩১)

 

ঘড়িতে রাত ন'টা। বটব্যালবাবু তখনো অ্যাপার্টমেন্টে। একজন লেবার মারফৎ তিনি ডেকে পাঠালেন লখাইকে।

 

ডাক পেয়েই লখাইয়ের বুক কাঁপতে থাকে। কালই তো তার মজুর খাটার দিন শেষ! সেকথা জানাতেই কি ডেকে পাঠালেন! একথা ভাবতে ভাবতে বটব্যালবাবুর কাছে এসে হাজির হয় লখাই।

 

প্রোমোটার লখাইকে একটু কাছে ডেকে বললেন, “লখাই! কাল একটু সকাল সকাল আসবে। অনেক কাজ আছে তো।”

 

লখাই বলে, “তা আর বলতে হবে না। বললে আজ রাতে আমি এখানেই থেকে যেতে পারি।”

 

— “না না। তা দরকার হবে না। সকালে এলেই হবে।” তারপর বললেন, “তো, পরশু থেকে কী করবে? কোথাও কাজ পেয়েছো?”

 

“এখনো কোথাও খোঁজ পাইনি। পরে দেখবো।”

 

বটব্যালবাবু বললেন, “কাল অনুষ্ঠানের পর একবার দেখা কোরো। তোমার পাওনা-গন্ডা মিটিয়ে দিতে হবে তো। আর তোমার বৌকেও কোনো সময় দেখা করতে বলবে।” মজা করে বললেই, “ঐ যে বেহুলাকে।”

 

লখাই বলে, “কী যে বলেন।”

 

(৩২)

 

আজ পয়লা বৈশাখ। সকাল সকাল অভিষিক্তা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে সারি সারি মারুতি, সুজুকি, অল্টো, টয়োটা, অটো ইত্যাদি নানাধরনের গাড়ি দাঁড়িয়ে। নানাবিধ পোশাকে ফ্ল্যাটের মালিকরা সপরিবারে এসে হাজির।

 

একে একে আসছে মজুর-মিস্ত্রিরা, যারা এই প্রাসাদের প্রতিটি ইঁটের সঙ্গে পরিচিত। যাদের শারীরিক পরিশ্রম আর বুদ্ধিমত্তা সাজিয়ে তুলেছে এই প্রাসাদকে।

 

সাহাবাবুর বাড়ি থেকে এসেছে সাহাবাবুর ছেলে তন্ময় আর মেয়ে বিউটি। সঙ্গে ভিডিও-ক্যামেরা। এবং সর্বাগ্রে যারা এসেছিল উদ্বোধনের দিন, সূর্য উঠতে না উঠতেই, তারা লখাইয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন। শ্বশুরমশাই উপেন এবং তার ছেলে, ছেলের বৌ—রূপেন আর রূপসী।

 

ওরা এসে উঠেছিল লখাইদের মাটির ঘরেই। আদরিণীর মা আসতে পারেননি। হাঁটুতে ব্যথা। হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। তাই তাকে ঘরেই থাকতে হয়েছে।

 

উপেন একটা সাদা-কালো নতুন টিভি এনে লখাইয়ের হাতে দিয়ে বলে, “বিয়েতে তো কিছু দেওয়ার সুযোগ পেলাম না, তাই এই নতুন ফ্ল্যাটের জন্য একটা টিভি-ই নিয়ে এলাম।”

 

টিভি পেয়ে লখাই কী খুশি! কী খুশি!

 

তবে বলতে হয় বলে বললো, “এখন কী দরকার ছিল। পরে দিলেই পারতেন।’

 

উপেন বললো, “ও ঠিক আছে। ইচ্ছে হল, তাই নিয়ে এলাম।”

 

আজ আবার হালখাতা। দোকানে দোকানে লক্ষ্মী-গণেশের পূজা। মিষ্টান্ন বিতরণ। শঙ্খধ্বনি।

 

“এই কারণেই সম্ভবত রাম আসতে পারলো না। আর রাম না আসায় সৌদামিনী এবং তাদের ভাড়াটিয়াও অনুপস্থিত”—এরকমটাই ভাবে লখাই।

 

পরক্ষণেই ভাবনার মধ্যে একটা বিরূপ ভাবনা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, “সত্যিই কি তাই? নাকি অন্য কোনো কারণ? কী জানি! তবে, এলে ষোলকলা পূর্ণ হতো।” লখাই একটু হতাশ হয়।

 

(৩৩)

 

বটব্যালবাবু আদরিনীকে দায়িত্ব দিলেন উপস্থিত সকলকে ছাতু, দই আর পাকা বেল দিয়ে তৈরি শরবত পরিবেশন করে অভ্যর্থনা জানাতে। এটা নববর্ষ পালনের একটা পুরানো সংস্কৃতি।

 

“এটা কি নববর্ষ উদযাপন! নাকি গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠান!” আগত অনেকের মধ্যেই এ প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে থাকে।

 

আবার কেউ কেউ ভাবে, “গৃহপ্রবেশ আবার কী! কার গৃহপ্রবেশ!”

 

লখাই বাদে ছ'টা ফ্ল্যাটের মালিক ছ'জন। তারা নিজের সুবিধামত গৃহপ্রবেশ করবেন, অনুষ্ঠান করবেন। এখানে প্রোমোটারের তো কোনো এক্তিয়ার নেই!

 

যাই হোক, মোটামুটি ভাবগম্ভীর পরিবেশে এবং তন্ময় ও বিউটির পর্যায়ক্রমে ভিডিও রেকর্ড করার লক্ষণীয় আদবকায়দার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান প্রাক-অপরাহ্নেই সমাপ্ত হয়ে গেলো।

 

অনেকেই ফিরে গেলো। আর ফ্ল্যাটের মালিকরা নিজ নিজ ফ্ল্যাটে গিয়ে যে যার মতো সময় কাটিয়ে সন্ধ্যার আগে-পিছে ফিরে গেলো সেদিনের মতো।

 

বটব্যালবাবু তখনও আছেন। মিস্ত্রী মজুররাও ফিরে গেছে। শুধু বটব্যালবাবুর কাছে দাঁড়িয়ে আছে কর্ণ আর অর্জুন। লখাইকে ডাকলেন প্রোমোটার বাবু। সঙ্গে আদরিনীকেও। দুজনেই এসে দাঁড়ালো উৎকণ্ঠায়।

 

বটব্যালবাবু বললেন, “শোনো লখাই। তোমাকে আর আদরিনীকে যে যে কাজ করাচ্ছিলাম, কাল থেকে তো সে কাজ আর করতে হবে না।”

 

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো দু’জনেই।

 

বটব্যালবাবু বললেন,  “হ্যাঁ, না কিছুই বলছো না যে তোমরা।”

 

লখাই কিছু বলতে পারলো না। আদরিনীই মুখ ফসকে বলে ফেললো, “তা আর কী বলবো, বলুন। তবে বলছি কী, আমাদের বখশিশটা।

 

‘বখশিশ!’

 

“কী বখশিশ চাও, বলো!” বটব্যালবাবু হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন।

 

বটব্যালবাবুর জিজ্ঞাসায় আদরিনী কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। শেষমেষ বললো, “আপনার যা খুশি।”

 

এবার লখাইকে শুধালেন, “আর তোমার বখশিশ?”

 

মূর্খ লখাই অবাক করে দিয়ে বললো, “আপনার আশীর্বাদ।”

 

এরকম বখশিশ চাইবে, বটব্যালবাবু ভাবতেই পারেননি। এমন তাজ্জব কথা শুনে তিনি বললেন, “দারুন বললে তো! কে বলে তুমি মূর্খ, অশিক্ষিত। তোমার কাছ থেকে আমাকেই শিখতে হবে দেখছি।”

“লজ্জা দিচ্ছেন কেন?”—তৎক্ষণাৎ প্রত্যুত্তর লখাইয়ের।

 

এমন সময় লোডশেডিং।

 

“তুমি জেনারেটর চালাতে পারো?”—লখাইয়ের কাছে জানতে চান বটব্যালবাবু।

 

“পারি। এখানে কাজ করতে করতে শিখে নিয়েছি।”

 

“যাও চালিয়ে এসো তো দেখি।”

 

লখাই জেনারেটর চালিয়ে আসতেই বটব্যালবাবু আরও জানতে চান, লখাই লিফ্ট চালাতে শিখেছে কি না।

 

মূর্খ লখাই লিফ্ট চালাতেও জানে। প্রোমোটার লখাইয়ের এইসব কাজ শেখার আগ্রহ দেখে খুবই সন্তুষ্ট হন।

 

এবার কর্ণ আর অর্জুনের সঙ্গে লখাইয়ের পরিচয় করান তিনি। বলেন, “এই সেই মহাভারতের দুই বীর–কর্ণ আর তৃতীয় পান্ডব।”

লখাই থোড়াই জানে তৃতীয় পান্ডবের মানে। সে তো মহাভারতের 'ম' ও জানে না। পাশেই ছিল আদরিনী। সে বটব্যালবাবুর এই ধরণের রসিকতার সামনাসামনি হয়নি কখনো। তার সন্দেহ হয়, “তবে কি বাবু আজ নেশা করে এসেছেন।”

 

থাকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সে বলেই ফেললো প্রোমোটার বাবুকে – “বাবু। আজ আপনাকে অন্যরকম লাগছে।”

 

‘কীরকম?’

 

“মানে, আপনি তো কখনো এমন রসিকতা করেননি আমাদের সঙ্গে।”

 

“আজ বছরের প্রথম। তাই একটু খোলামেলা আছি। তাছাড়া, কাল থেকে আমি আর তেমন তো আসবো না। এবার তোমাদের সাত সংসারের আনাগোনা, আলাপচারিতা।”

 

তারপর বললেন, “যাবার আগে তোমাদের বখশিশটাও দিয়ে যাবো। জানি না, তোমাদের পছন্দ হবে কি না।”

লখাই বললো, “আপনি যা দেবেন, আমরা তা-ই দুহাত পেতে নেবো।”

একদা পাঁচ কাঠা জমির মালিক আজ এমন করুণ সুরে কথা বলছে, বটব্যালবাবুর মনটা সাময়িক হলেও একটু আনমনা হয়ে যায়।

 

কিছুক্ষন চুপ থেকে তিনি লখাইকে বলেন, “শোনো লখাই, কর্ণ আর অর্জুন কাল থেকে এখানে গার্ডের কাজ করবে। রাজি থাকলে তুমিও গার্ড থাকতে পারো। এখানে তিনজন গার্ড দরকার। কি, থাকবে তো?”

 

লখাই সম্মতি জানায়।

 

অতঃপর বটব্যালবাবু তিনজনের কাজের ধরণ এবং সময় বুঝিয়ে দেন। বেতন হিসেবে মাসের শেষ তারিখে প্রত্যেককে ছ'হাজার টাকা এবং দুর্গাপূজায় তিন হাজার টাকা বোনাস দেওয়ার কথা জানিয়ে দেন।

বেতন শুনে সবাই স্তম্ভিত হয়ে যায়! “মাত্র ছ', হাজার। এই কম টাকায় সংসার চলবে কী করে!”

কেউ আর মুখ খুলতে পারছে না।

 

বটব্যালবাবুর বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এরা এই বেতনে সন্তুষ্ট নয়।

 

জিজ্ঞেস করেন, “কী, ঠিক আছে তো?”

কর্ণ ক্ষীণস্বরে বলে, “এত কম বেতনে পারবো বাবু?”

বাকি দুজনকে জিজ্ঞেস করলে অর্জুন বললো, “বাবু। একটু বাড়িয়ে দিলে ভালো হয়।”

 

প্রোমোটার ওদের তিনজনকে বাইরে আলোচনা করে আসতে বললে লখাই বলে ওঠে, “বাবু। আলোচনা করার কিছু নেই। আপনিই বিচার-বিবেচনা করে বলুন কত দিতে পারবেন।”

 

অতঃপর ঠিক হলো সাত হাজারে। এবং গার্ডের ড্রেস নিয়েও কথা হয়। দিন সাতেকের মধ্যেই ড্রেস এসে যাবে বলে জানিয়ে দেন প্রোমোটার।

এবার ডাক পড়ে আদরিনীর।

আদরিনী তখন অ্যাপার্টমেন্টের মাথায় ইলেকট্রিক আলোয় ঝলমল করা 'অভিষিক্তা' লেখাটির দিকে তাকিয়ে ছিল। ডাক পেয়েই সে তড়িঘড়ি বটব্যালবাবুর সামনে যেতেই তিনি জিজ্ঞেস করেন, “রাতের রান্না হয়ে গেছে?”

 

“কেন বলুন তো?”

 

— “অনেক রাত হয়ে গেছে তো, তাই।”

 

আদরিণী বলে, “না বাবু, আজ রাতে রান্না করবো না। আজ রাতে রমা সেদ্ধ আর মুড়ি খেয়েই কাটিয়ে দেবো।”

 

— “তাই। রমা সেদ্ধ-মুড়ি তো খুব মুখরোচক খাবার। আমার তো খুব পছন্দ।”

 

“এনে দেবো? খাবেন একটু?”

 

বটব্যালবাবু বলেন, “অন্য একদিন খাবো। আসলে যে জন্য তোমাকে ডেকেছি, তুমি ফ্ল্যাটের বাইরে যে বারান্দা, ব্যালকনি, সাধারণের চলাফেরার জায়গা এইসব আছে, সেগুলো রোজ দু’বেলা ঝাড়ু দেওয়া আর মোছামুছি করার কাজ করতে পারবে? কোথাও যেতেও হবে না। হাতের কাছেই কাজ। পারবে?”

 

“কেন পারবোনা? কবে থেকে করতে হবে, বলুন?”

 

“কাল থেকেই। মাসে তিন হাজার টাকা দিতে পারবো। ভেবে দ্যাখো।”

 

আদরিনী চটজলদি বলে ফেলে, “আপনি যখন বলছেন তখন টাকা না দিলেও আমি একাজ করতে পিছ-পা হবো না।”

 

কথাটা শুনে বটব্যালবাবু খুশি হয়ে আরও পাঁচশ টাকা বাড়িয়ে দিলেন।

 

বলে রাখা ভালো, এইসব আনুষঙ্গিক খরচ কিন্তু বটব্যালবাবুর নয়। তিনি শুধু ব্যবস্থাটুকু করে দিচ্ছেন। এসব খরচ বহন করবে ফ্ল্যাটবাবুরাই। একমাত্র লখাই বাদে।

 

(৩৪)

 

দোসরা বৈশাখ। তখনো ভোর হয়নি। প্রকৃতির রূপ তখনো ফুটে ওঠেনি পরিষ্কার। আদরিনী আর লখাই চটপট মাটির ঘর থেকে তাদের যাবতীয় আসবাবপত্র এনে রাখলো তাদের ফ্ল্যাটে। আসবাবপত্র বলতে গুচ্ছেক বাসনপত্র, একটা তক্তাপোষ, কিছু জামা-কাপড়, কাঠের উনান, কাঠ, ঘুঁটে আর ঠাকুরের ফটো।

 

শেষে কোঠায় উঠে দেখলো সেখানে তেমন কিছু নেই। একটা পুরানো রেডিও আছে আর টিনের একটা বাক্স। তালাহীন। আদরিনী বাক্স খুলে দেখে, ভেতরে একটা কামিজ আর গোটাকয় বেবীস্যুট। সেগুলো তুলেই দেখতে পায় বৃটিশ আমলের গোটাকয়েক একটাকার কয়েন আর কিছু ছ্যাঁদা পয়সা, তামার পয়সা আর একটা গুলতি পড়ে আছে।

 

আদরিনী সেই পুরানো রেডিও আর টিনের বাক্সটাও ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়ে রাখে। তারপর পুরো বাড়িটা লখাই-আদরিণী দুজনেই তন্নতন্ন করে দেখে ঘরটিতে তালাবন্ধ করে চলে যায় ফ্ল্যাটে।

 

গুছানো বাগানো হবে পরে। সময় থাকলে লখাই কিছুটা সাজিয়ে রাখলে রাখবে; নয়তো আদরিনী সাহাবাবুদের ঘর থেকে ফিরে সব ঠিকঠাক করে নেবে।

 

লখাইয়েরও তো ডিউটি ছটা থেকে।

 

মুশকিল হল, আর তো কোনো তালা-চাবি নেই। ফ্ল্যাটতো খোলাই রাখতে হবে আপাতত।

 

আদরিনী লখাইকে বলে, “ছেড়ে দাও, খোলাই থাকুক। কে যে আর আসবে আমাদের ধনসম্পত্তি চুরি করতে। পরে একটা তালা কিনে আনলেই হবে।”

 

এইভাবে লখাই-আদরিণীর ফ্ল্যাটে বসবাসের সূত্রপাত।

 

(৩৫)

 

আদরিনী সকাল ছটায় যায় সাহাবাবুদের ঘর। ঘন্টাখানেকের কাজ। ফিরে আসে সাতটার একটু আগে-পরে। এসেই সোজা ফ্ল্যাটের তিনতলায় ঝাড়ু দেওয়া ও জল-কানি দিয়ে ধোয়া-মোছার পর দোতলা এবং তারপর একতলার কাজ সেরে নিজের ফ্ল্যাটে আসে। এসেই স্নান সেরে ঠাকুরের পূজা করে ঘরের কাজে লাগে।

 

এক্ষেত্রে একটা সমস্যা দেখা দেয় এবার। ফ্ল্যাটে কাঠের আগুনে কী করে রান্নার কাজ হবে! ঘরে কালি পড়বে, ধোঁয়া হবে। ফ্ল্যাট-এ তো মোটেই মানানসই হবে না। এবার গ্যাসের রান্না ছাড়া উপায় নেই। সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস-ওভেন আর গ্যাস-সিলিন্ডার তো পাওয়াও যাবে না। তাছাড়া টাকার তো দরকার। এই মুহূর্তে এত টাকাই বা পাবে কোত্থেকে!

 

যত ভাবনা আদরিনীর। লখাই ওসবের ধার ধারে না। আদুকে এনেই যেন ওর সব দায়-ভার শেষ হয়ে গেছে। ভবিষ্যত নিয়ে থোড়াই চিন্তা করে সে। কপালগুণে সেইরকম বৌও জুটে গেছে, বলতে হবে।

 

জুটে গেছে আবার কী! ও-ই তো জুটিয়েছে এবং সেটাই লখাইয়ের গর্ব। লোকের কাছে সে ফলাও করে বলে, “দ্যাখো! কেমন চয়েস করেছি! স্বয়ং অন্নপূর্ণা।” গর্বে যেন পা পড়ে না লখাইয়ের।

 

অগত্যা কাঠের উনানেই রান্না সারতে হয় আদরিনীকে। আর ভাবতে থাকে গ্যাস-ওভেন আর গ্যাস-সিলিন্ডারের কথা। যেভাবেই হোক দু-এক দিনের মধ্যেই তাকে গ্যাসের ব্যবস্থা করতে হবে। যেভাবেই হোক।

 

(৩৬)

 

এদিকে সকাল ছটার সময় হাজিরা খাতায় সই করে (টেনেটুনে নামটা লিখতে পারে) লখাই যখন প্রথম দিন গার্ডের কাজে যোগ দিল, ঠিক সেই সময় রামলাল তার সামনে এসে 'লখাই' বলে ডাকতেই লখাই খুব উৎফুল্ল হয়ে বলে, 'দাদা'!

 

তারপর দাদার দু'পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলে, “কাল এলে না যে!”

 

“কাল তো হালখাতা ছিলো। দোকান থেকে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিলো। তাই আর আসিনি। যাক্, সব ঠিকঠাক পার হয়েছে তো?”

 

“হ্যাঁ দাদা। সব ভালোভাবেই হয়েছে। শুধু তুমি আর বৌদি এলে না।”

 

— “তা কী করবো বল। পরের অধীনে কাজ তো। ছাড়া না পেলে তো আর কিছু করার নেই।”

 

লখাই দাদাকে তার ফ্ল্যাটে যাবার অনুরোধ করে।

 

রাম বলে, “অন্যদিন আসবো। তোর বৌদিকে নিয়েই আসবো।” তারপর বলে, “তুই আমাকে ভুল বুঝেছিস। পারলে আমি ঘরে থাকতে একবার আসিস। তোর এই ফ্ল্যাটবাড়ির জন্য আমার মনের কষ্টটা যে কোথায়, সেটা তোকে খুলে বলবো।”

 

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

 

0 Comments

Post Comment